• শিরোনাম


    হে মৃত্যুপুরী স্পেন! মনে আছে সেই পাশবিকতা!? লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস, অতিথি লেখক | ০১ এপ্রিল ২০২০ | ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

    হে মৃত্যুপুরী স্পেন! মনে আছে সেই পাশবিকতা!?  লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    করোনাক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যায় অল ওয়ার্ল্ডে চ্যাম্পিয়নের তালিকায় স্পেন। কী ভয়ংকর চিত্র! কত ভীতিকর দৃশ্য! কিন্তু স্পেনের এই অসহায়ত্ব দেখেও হৃদয়ে মোটেও দয়ার উদ্রেক হতে দিইনি। ইতিহসের বিভীষিকাময় গণহত্যাকারীদের মানসসন্তানগুলোর লাশের মিছিল দেখে অতীতের জানালাকেই দুঃসহ স্মৃতির দিগন্তে মেলে ধরেছি। বর্তমান ও অতীতের দুটো দৃশ্যকে পাশাপাশি রেখেই বলছি, গ্রানাডার নির্যাতিত অসংখ্য মুসলিমের অভিশাপই হয়ত আজকের এই মৃত্যুপুরী! সেদিনের ‍ইসাবেলা ও ফার্ডিন্যান্ডের অট্টহাসিই যেন ওদের প্রেতাত্মাদের মজা-মাস্তিকে কেড়ে নিয়েছে! যে কুলাঙ্গাররা খিলাফাহ ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর থেকে আজ অবধি পাঁচশ বছর যাবৎ স্পেনকে ইসলাম ও মুসলমানের জন্য কারাগার বানিয়ে রেখেছে। মুসলিম-গ্রানাডার পতন ও এপ্রিল ফুলের তারিখ সম্পর্কিয় ঐতিহাসিক বিতর্কে আমি যাব না। আমি শুধু তখনকার খৃস্টান নরপিচাশ বাহিনীকর্তৃক মুসলিমনির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রটা তুলে ধরব। এক সময় আন্দালুস (বর্তমান ‍স্পেন) ছিল মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রভূমি। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-দর্শনের প্রতিটি শাখায় গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্রে তার ছিলো বিশ্বময় খ্যাতি। সুদীর্ঘ আটশ বছরের এই খিলাফাতভূমি তৈরী করেছে অসংখ্য ক্ষণজন্মা তাফসিরবিদ, হাদিসবিশারদ, আইনজ্ঞ, দার্শনিক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু একসময় কিছু অযোগ্য ও বিলাসপ্রিয় শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক অবক্ষয় ও অনৈক্য আন্দালুসে মহাবিপর্যয় নিয়ে আসে। স্পেনের মাটি থেকে মুসলমানদেরকে চিরতরে উচ্ছেদ করার ঘোষণা দিয়ে পর্তুগীজ রাণী ইসাবেলা চরম মুসলিম বিদ্বেষী পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান সম্রাট ফার্ডিনান্ডকে বিয়ে করে ৷ বিয়ের পর দু’জন মিলে সম্মিলিত বাহিনী গড়ে তোলে স্পেন আক্রমণের জন্য। ১৪৯২ সালে স্পেনে মুসলমানদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। তারপর স্পেনকে মুসলিমশূন্য করতে নির্যাতন-নিপীড়নের এমন স্টিমরোলার চালানো হয়, যা লিখতে গিয়ে ঐতিহাসিকদের হাত কেঁপে ওঠেছে।

    আরবের গবেষক ইমান খালেদ লিখেন,
    ” سقطت الأندلس بحضارتها وامجادها وبدأ تهجير المسلمين من أرضهم وتشريدهم واجبارهم على اعتناق النصرانية ويتم تلقيبهم ب (الموركسيين) و يعاملون معاملة درجة ثانية و حولت مساجد الأندلس إلى كنائس، نصبت “محاكم التفتيش” و تعد محاكم التفتيش الأبشع وقد مورست في هذه المحاكم معظم أنواع التعذيب المعروفة في العصور الوسطى، وأزهقت آلاف الأرواح تحت وطأة التعذيب، وقلما أصدرت هذه المحاكم حكمًا بالبراءة، بل كان الموت والتعذيب الوحشي هو نصيب وقسمة ضحاياها، فمن يقبض عليه مسلمًا عقوبته القتل والتعذيب حتى الجنون، من يتوضأ ويتطهر فهو مسلم وجب قتله، من لا يشرب الخمر فهو مسلم، من لبس ثيابًا نظيفة يوم الجمعة فهو مسلم ، بلغ ما وقع على المسلمين من قتل واضطهاد بعد سقوط الأندلس ما لم تعرفه البشرية في تاريخها.”
    )21| – ( وضوح الاخبارى يناير، 2019
    ‘‘আন্দালুসের সভ্যতা ও গৌরবের পতন ঘটে এবং মুসলমানদের বিতাড়ন ও তাদেরকে খৃস্টান বানানোর পাঁয়তারা শুরু হয়। ‘ম্যুর’ উপাধিতে ভূষিত করে তাদের সাথে অন্যরকম আচরণ করা হয়। মসজিদগুলোকে গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়। তল্লাশীকোর্ট গঠন করে মধ্যযুগিয় পন্থায় শাস্তি দিয়ে হাজারো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পৈশাচিক ওই আদালতে আসামীর মুক্তির বিধান খুব কমই জারী করা হত। বরং মৃত্যু এবং অমানবিক নির্যাতনই ছিল এতে ফেঁসে যাওয়া কয়েদীদের ভাগ্যলিপি। মুসলিম হওয়ার অপরাধে যাকে গ্রেফতার করা হতো, তার দণ্ড ছিল হত্যা অথবা শাস্তি দিয়ে পাগল করে দেয়া। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কেউ অযু করল বা মদপান করল না তো সে মুসলিম; তাকে মেরে ফেলতেই হবে। মোদ্দাকথা, আন্দালুসের পতন হবার পর মুসলিমদের উপর নির্যাতনের এমন খড়গ নেমে আসে যা মানবেতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুরুহ ব্যাপার।’’



    ফিলিস্তিনের নাবলুস থেকে প্রকাশিত এক দীর্ঘ আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়,
    “فما إن دخلوا الأندلس حتى هجَّروا من فيها من المسلمين، ونصَّروا من ظل بها، وأقاموا محاكم التفتيش للبحث عَمَّن يخفي إسلامه، وأبادوا من بها من المسلمين.”
    ( مقالة: ذكرى سقوط الأندلس في 2/1/1492 ميلادي
    ). موقع اذاعة القرآن الكريم من نابلس -فلسطين (quran-radio.com)

    ‘‘খৃস্টান শাসকগোষ্ঠি স্পেনের ক্ষমতায় বসেই মুসলমানদেরকে দেশছাড়া করলো। যারা ছিল সবাইকে জোর করে খৃস্টান বানালো। আর তল্লাশীকোর্ট গঠন করে গোপনে দ্বীন পালনকারী মুসলিমদেরকে গণহত্যা করলো। ’’

    এরাবিক হিস্ট্রি ম্যাগাজিন লিখেছে,
    “ولما يئس من تنصير المسلمين ، أمر طاغيتهم سنة 1609 م بطرد جميع الموريسكيين عن إسبانيا ، بعد أن صادر كل أموالهم وأخذ كل أبنائهم الذين تقل أعمارهم عن الخمس سنوات. فخرج من إسبانيا حوالي ربع مليون مسلم إلى الشواطئ المغربية والعثمانية.”
    ) 1/1655 (مجلة التاريخ العربي —
    ‘‘স্পেনের শাসক মুসলিমদেরকে খৃস্টান বানাতে অপারগ হয়ে গেলে এই স্বৈরাচারী ১৬০৯ সালে তাদেরকে দেশত্যাগ করার অধ্যাদেশ জারী করল। এর আগে তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ছেলেদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তখন প্রায় এক চতুর্মিলিয়ন মুসলিম স্পেন ছেড়ে মরক্কো এবং উসমানী সাম্রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে হিজরত করেন।।’’

    আমি ইতিহাসের ছাত্র। কোন পৈশাচিক ও তার প্রেতাত্মাদের দুঃখে শোকাহত হতে আমি শিখিনি। আমি কাঁদতে জানি ইমাম কুরতুবি ও মুহাদ্দিস ইবনু আব্দিল বারের কর্ডোবার জন্য, ইমাম আহমদ আমেরী ও হামাদানীর গ্রানাডার বিচ্ছেদে! আমি মর্সিয়া গাই ইসবানিয়ার আমার আলোকিত পূর্বসূরীদের বিরহে, যাদের জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র থেকে আলো গ্রহণ করেই গোটা ইউরোপ বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধন করেছিল! আর হারানো আন্দালুসের বুলবুলিরা আমাকে শক্তি যোগায়, ৮০০বছরের খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার।।

    ***বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন:
    -1 تاريخ ابن خلدون المسمى كتاب العبر طبعة بولاق.
    2- الإحاطة في أخبار غرناطة لابن الخطيب ج 1 القاهرة 1956م.
    3-دولة الإسلام في الأندلس/محمد عبد الله عنان-مكتبة الخانجي-القاهرة -3
    লেখক:
    প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক: শাহবাজপুর, বি-বাড়িয়া, বাংলাদেশ।।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম