• শিরোনাম


    হেফজখানা (গল্পেগল্পে ধর্মানুভতি -৩) : ম. কাজী এনাম

    | ১৪ মার্চ ২০১৯ | ১২:৫১ অপরাহ্ণ

    হেফজখানা (গল্পেগল্পে ধর্মানুভতি -৩) :  ম. কাজী এনাম

    গার্মেন্টস ব্যাবসায়ী জনাব আলতাফ হোসেন হুট করেই নিজের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনলেন। তিনি ছেলেকে হেফজখানায় পড়াতে তেমন আগ্রহ ছিলেন না, উনার ধার্মীক সহধর্মীনির সাথে ছেলেকে ভবিষ্যতে কি বানাতে চান, তা নিয়ে মোটামুটি ঘরোয়া সংগ্রাম। সবশেষে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে স্থির না থেকে স্ত্রীর কথায় সায় দিলেন।

    হেফজখানাটা বেশিদূর নয়, এক কিলোমিটার দূরবর্তী। বেশ কিছু ছাত্র নিয়ে দুইজন হাফেজ সাহেব দিনরাত মেহনত করে আসছেন। প্রতি বছর অসংখ্য কুরআনে হাফেজকে বার্ষিক মাহফিল করে পাগড়ি প্রদান করা হয়। যার মাঝে অধিকাংশ নাবালক টাইপের ছেলেই বেশি। এসব বাচ্ছাদের মাথায় পাগড়ি উঠানো দেখতে মাহফিলে জমায়েত হন এলাকার সর্বস্থরের ইসলামপন্থী, কুরআনপ্রিয় তাওহিদী জনতা। সকলেরই ভাললাগার কেন্দ্রবিন্দু হলো পাগড়ি পড়ানোর সম্মাননা। অনেকে খুবই আফসোস করে একটা সন্তানকে হাফেজ বানানোর ঈর্ষায়! জনাব আলতাফ হোসেনও সবার মত ছেলেকে মাদ্রাসায় দেয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো।



    ছেলেকে মাদ্রাসায় দেয়ার সাধারণ উল্লেখযোগ্য কোন কারন নেই। ছেলেটা সোজা, সহজ-সরল, দুনিয়া কিচ্ছুই বুঝেনা বলতে এককথাই যা বুঝায় উত্তর-দক্ষিণ চিনেনা। ব্যাবসায়ী বাবার সন্তান হবে মেধা-মননে সবার চেয়ে উচ্চ এবং উন্নত, সেখানে ছেলের পাচ বছরে এখনো কেমন যেন ঘরকোনু হয়ে আছে ছেলেটা। এক চিন্তা থেকেই ছেলেকে মাদ্রাসায় দেয়ার ইচ্ছে। অবশ্য মিসেস আলতাফের ইচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তিনি গর্ভে থাকা কালীনই মান্নত করেছলেন যে, আল্লাহ যদি একটা ছেলে সন্তান দেয় তাকে দ্বীনি প্রতিষ্টানে পড়াবেন। অনেকগুলো বাচ্ছা নষ্ট হবার পর এই ছেলেটাই একমাত্র ঠিকেছে, যার দরুন এই ছেলেটার প্রতি বাড়তি আগ্রহ।

    প্রথম যেদিন মাদ্রাসায় ছেলেকে নিয়ে গেলেন জনাব আলতাফ হোসেন সেদিনই তিনার তেমন ভাল লাগেনি। অনিচ্ছাসত্ত্বে ছেলে ভর্তি করে আসলেন। ভাল না লাগার সুনির্দিষ্ট কোন কারন নেই, তবে ফ্লুরে বসে পড়া, সবার সাথে একই সাথে ফ্রুরে বসে খাওয়া, রাতে ফ্লুরে ঘুমানো এই জাতিয় সমস্যাগুলোই উনাকে উদগ্রীব করে তুলেছেন। তাছাড়া উনার মত বিত্তবান টাকাওয়ালা সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটা ছেলে কিছু গরিব-অসহায়(উনার ধারনামতে) ছেলেদের সাথে পড়বে, কেমন যেন নিজেকে ছোটলোক ছোটলাট লাগছে। খানার মান নিয়েও ছিল সংকোচবোধ।
    তবুও নিজের সরলমনা ছেলেকে মাদ্রাসায় দেওয়া ছাড়া উনি আর কোন পথ খুজে পেলেন না।

    কয়েক মাস পর শুনতে পেলে ছেলেটা অসুস্থ্য। ছুটে গেলেন। বাসায় নিয়ে এলেন। সামান্য জ্বরেরধাক্কা তেমন প্রভাব ফেলেনি, উনি ছেলেকে মাদ্রাসায় নিয়ে যেতে চাইলেন, ছেলে যেতে অনাগ্রহ। ছেলে বলতেছে মাদ্রাসায় তার ভাল লাগেনা। সারাক্ষণ খালি পড়া আর পড়া, খানাও সমস্যা। তিনি ঈদানিং খেয়াল করলেন, ছেলে আগের চেয়ে অনেকটা চটপটে হয়ে গেছেন। যে ছেলে পাঁচটা প্রশ্ন করলে একটা উত্তর দিতো, সে এখন নিজেই পাঁচটা কথা বলে। এই পরিবর্তন মিসেস আলতাফ হোসেনও লক্ষ্য করেছেন। সর্বশেষ বাসা থেকে এসে-গিয়ে পড়ার শর্তে রাজি হলেন।

    বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী বলে হাফেজ সাহেব বাসা থেকে আসা-যাওয়ার অনুমিত দেন। কিন্তু প্রতিদিন যেন ঠিকমত সবক(পড়া) আদায় হয়, সেদিকে বাড়তি সচেতন করে দিলেন।
    দিন যায়, মাস যায়, এভাবে দুই বছর পেরিয়ে গেলো। একদিন কোন এক শুভ লগ্নে সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে জনাব আলতাফ হোসেনের ছেলে ইশতিয়াক পবিত্র কুরআনের হিফজের শুরু করেন। এরই মাঝে বাসায় থাকার দরুন যে দুর্ঘটনা হয়েছে তা নিম্নরূপ ;
    ক. ইশতিয়াক মোবাইল আসক্ত
    খ. টেলিভিশন অভ্যস্থ
    গ. দুষ্টমিতে উস্তাদ
    ঘ. সবক আদায়ে অনিহা
    ঙ. পাড়ার ছেলেদের সাথে মিশা

    এসব কিছুই হাফেজ সাহেব এবং অভিভাবক আলতাফ হোসেনের দৃষ্টির বাহিরে থেকে হয়েছে। আলতাফ হোসেন একদিন ফোন দিয়ে জানতে চাইল, ছেলে ইশতিয়াক কতটুকো হিফজ হয়েছে। একট মাসের ব্যবধানে সবক পাঁচটি মাত্র পৃষ্টা হয়েছে। আলতাফ হোসেন রাগতঃস্বরে কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কিন্তু হাফেজ সাহেব ব্যপারটা ধরে ফেললেন। তিনি মুখেমুখে বললেন, ঠিক হয়ে যাবে। আর মনেমনে বললেন, অনাবাসিক থেকে কি করে হিফজ সম্ভব (?)

    ইশতিয়াককে দেখা গেলো একদিন অনুপস্থিত, আরেকদিন এক বাহানা, সেই বাহানা। একদিন সরাসরিভাবে আলতাফ হোসেনকে ডাকালেন, মাদ্রাসায় আবাসিক থাকার কথা বললেন, তিনি রাজি হলেও ছেলে রাজি হয়নি। চলতে থাকলো বাসা থেকে এসেসে গিয়ে হিফজের পড়া। আরেকটা বছর গড়িয়ে গেল, এর ভেতর হিফজের উন্নতি হয়নি। আলতাফ হোসেন হাফেজ সাহেবের উপর চরম বিরক্ত…
    তিনি বিরক্তির ভাব নিয়ে হাফেজ সাহেবকে কয়েক জ্ঞানগর্বের কথা শুনালেন, হিজফের কারিকুলাম উন্নতির পরামর্শ দিলেন। এবার হাফেজ সাহেব বলতে শুরু করলেন।

    জনাব মাইন্ড করবেন না, আমি আপনাকে কিছু কথা বলি, মনযোগ দিয়ে শুনুন! আশা করি বুঝে আসবে। বললেন হেফজখানার প্রধান হাফেজ সাহেব হুজুর।
    একটু নিরবতার পর বলতে শুরু করলেন, পবিত্র আল-কুরআন আমাদের ধর্মগ্রন্থ। মহান আল্লাহ তা’আলার ঐশী গ্রন্থ, মানবতার শান্তিরবার্তা হল আল-কুরআন। দুনিয়া ও আখেরাতে এই পবিত্র কুরআনের মান-মর্যাদা, শক্তি,ক্ষমতা সকল মাখলুকের উর্ধ্বে। ইহাকে সংরক্ষণ করার বিশাল জিম্মাদারি পৃথিবীর কেউ নিতে পারেনি, একমাত্র মানুষ একটু সাহস দেখিয়েছে। সুতরাং এমন পাওয়ারফুল গুরু দায়িত্ব কি আদায় করা এতোই সহজ? সহজ না। আবার কঠিনের কথা চিন্তা করে কেউ যেন মুখ ফিরিয়ে না নেয়, এই কুরআনেই বলা হয়েছে, ‘কুরআনকে সহজ করে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন সবাই সহজেই বুঝতে পারে!’
    কিন্তু এই সহজের অর্থ হলো আল-কুরআন খুবই সহজ, বুঝাও সহজ, কিন্তু ক্বলবে যেন কোন ভাইরাস না থাকে। দিল যদি পরিস্কার থাকে, আল-কুরআন খুব সহজেই এখানে সংরক্ষণ করা যাবে। আর যদি এই ক্বলব অন্যত্র ডাইব্রেট হয়ে থাকে কোন ভাবেই সম্ভব নয়।
    কথার মাঝখানে থামিয়ে জনাব আলতাফ হোসেন উঠে এলেন। তিনি কি বুঝলেন কে জানে! তবে এর কিছুদিন পরই ছেলেকে অনেক দূরের একটা নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালেন।

    নতুন প্রতিষ্টানে পড়াশোনার ভিষণ চাপ। বাসায় থেকে পড়ায় অভ্যস্ত ইশতিয়াকের জন্য খুব কঠিন হয়ে গেল। তাছাড়া নতুন প্রতিষ্টানে সবক আদায়ের জন্য অনেক চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমন কি প্রয়োজনে শাসনও করা হয়। তবে দুষ্টুমি ছাড়া স্রিফ সবকের জন্য তুলনামূলক শাসনকার্য কম হয়।

    কয়েক মাসের মাঝেই বুঝা গেলো, ইশতিয়াক সীমাহীন দুষ্ট এবং সবক আদায়ে অমনোযোগী। কুচপরওয়া না করে একদিন ইশতিয়াকের ব্যপারে নালিশ করলো এক ছাত্র, সে নাকি গোপনে মোবাইল ইউজ করে, আরও নাকি কি সব ডিভাইস ওর কাছে আছে। নজরদারির একদিন হাতেনাতে ধরা হলো। মাদ্রাসার আইন অনুযায়ী অভিভাবককে ডাকা হল। তিনি এসে শাসিয়ে গেলেন। কাজ হয়নি।

    এবার ইশতিয়াক ছুটির দিন নতুন একটা মোবাইল নিতে দুই কিলোমিটার দুর ওর খালার বাসায় চলে গেলো। শুক্রবার বলে কেউ বুঝতে পারেনি। আর আহ্লাদী খালাও না করেনি। একটা সেকেন্ডহ্যান্ড মোবাইল সেট ছিল, দিয়ে দিছে। যথাক্রমে সবক আদায়ের চেষ্টা চলতে থাকল। কিন্তু ইশতিয়াকের কোন উন্নতি হচ্ছেনা। তার সাথে অন্য ছেলেরা এক-দু পৃষ্টার সবক দিলেও ইশতিয়াক সেখানে অর্ধ পৃষ্টার সবক দেয়। তাও সপ্তাহান্ত সাত সবকে বেগ ফুহাতে হয়।
    এবার ক্লাসের উস্তাদ, প্রধান হাফেজ সাহেব একজনকে দায়িত্ব দিল ইশতিয়াকের প্রতি নজরদারি রাখতে। সব শেষে জানা গেলো অতিগোপনে ইশতিয়াক মোবাইল ইউজ করে। শত নিষেধাজ্ঞার পরেও মোবাইল ইউজ করাই একটু বেশিই বেত্রাঘাত করা হয়।

    জনাব আলতাফ হোসেন শুধু মামলাই করেনি, সাথে পুলিশ নিয়ে এসেছেন। সেই অসংখ্য অভিযোগের নতিপত্র। বিশিষ্ট ব্যাবসায়ীর ছেলেকে বিনা কারনে প্রহারের অভিযোগে দুইজন হাফেজ সাহেবকে জেলে ডুকিয়ে দেয়া হল। পরদিন পত্রিকায় বিভিন্নভাবে এই ঘটনা ছাপা হল।
    আদালতে অভিযোগ উত্থাপন করা হলো উচ্চবিত্ত বাবার সন্তানকে অর্থনৈতিক কারনে পেটানো হয়েছে। পক্ষের উকিলবাবু এড. আব্দুল কুদ্দুস শত চেষ্টা করেও এই বিষয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
    অবশেষে চুড়ান্ত শুনানির দিন হাফেজ সাহেবকে জিজ্ঞেসবাদ করার জন্য আদালতে উপস্থিত করা হয়। প্রশ্ন করার আগেই তিনি বলতে শুরু করলেন, ইউর অনার, দীর্ঘদিন যাবত আমি এই প্রতিষ্টানে আছি। জনাব আলতাফ হোসেনের মত অনেক টাকাওয়ালার ছেলেকে পিটিয়ে হাফেজ বানিয়েছি। সবশেষে ধন্যবাদ পেয়েছি। আপনি চাইলে আমি প্রমাণ করতে পারি। আচ্ছা সে সবে যাচ্ছিনা, কোন বাবায় যদি ছেলেকে আদর্শ এবং শিক্ষিত মানুষ বানানুর জন্য শাস্তি দেয়, সেই বাবার কি কোন দোষ আছে? কখনোই হতে পারেনা। একজন উস্তাদ ঠিক তেমনই। একটা ছেলেকে আমরা সর্বোচ্চ আদর দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করি। কেউ যদি সেই আদর না নিয়ে অতিরিক্ত দুষ্টমিতে লেগে যায়, আমরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করি। আপনি খোঁজখবর নিয়ে দেখতে পারেন। আমাদের এমনও রেকর্ডস আছে যে, পকেটের টাকা খরচ করেও ছেলেদের হিফজখানায় রাখার চেষ্টা করি, একজন হাফেজে কুরআন বানানোর চেষ্টা করি। আমরা যারা স্টাফ আছি সকলেই একযোগে সেই ভোররাত থেকে পরদিন রাত দশটা পর্যন্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করি। ছাত্রদের হিফজের পাশাপাশি সুন্নতি তা’লিম-তারবিয়াত শিক্ষার ব্যবস্থা করি।

    তদন্তের জন্য আদালত মুলতবী ঘোষনা করা হয় সেদিনের মত!

    #পুনঃচ্ছদ: সর্বশেষ হাফেজ সাহেব দুইজনকে কয়েকটা ধমক দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। আলতাফ হোসেনের ছেলেকে আর কোথাও পড়ানো যায়নি। ছেলেটা এখন এলাকার সবচেয়ে বিরক্তিকর ছেলে।

    #মন্তব্য : ছাড় না দিয়ে কিচ্ছুই অর্জন সম্ভব নয়। না দ্বীন, না দুনিয়া।

    #সকাল, ১৪.০৩.১৯ঈ:

    #লিখক, ম. কাজী এনাম
    বিএসএস অনার্স (অর্থনীতি), ডাবল এমএ(হাদিস),
    উস্তাদ, জামিয়া কুরআনিয়া কাজীপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

    Facebook Comments

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম