• শিরোনাম


    হাজী আব্দুল জব্বার বল্লভপুরী (রঃ) এর জীবন ও কর্ম [] এস এম শাহনূর

    | ২৪ নভেম্বর ২০২১ | ৫:৫০ অপরাহ্ণ

    হাজী আব্দুল জব্বার বল্লভপুরী (রঃ) এর জীবন ও কর্ম [] এস এম শাহনূর

    মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার
    পুণ্য কর্মে ভরা জীবনী তাঁর।

    মা আদর করে ছেলেকে অগণ বলে ডাকতেন।তাই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তাঁকে অগণ হাজী বলে চেনেন।আসল নাম আব্দুল জব্বার।অগণ নামের অর্থ হচ্ছে অসাধারন মানুষ।(ছেলের ভবিষ্যৎ জানতেন বলেই হয়তোবা মা এমন নামে ডাকতেন)সত্যি তিনি ছিলেন অসাধারন মানুষ।তাই সাধারন মানুষের মধ্যে থেকেও শয়তান ও দুনিয়াকে বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে পর্দার আড়ালে চলে গেছেন।  তিনি আনুমানিক ১৯২৮ সালে (কসবা থানার প্রাচীন বসতি ধন গাজী>মন গাজী>জিয়া খা >মিয়া খা>মদন>মস্কন হতে এসে নোয়াব আলী সরকারের ঔরসে) বল্লভপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।রত্ন গর্ভধারিণী মায়ের নাম উম্মে কুলসুমের নেছা।মহান আল্লাহর রেজামন্দি ও নবী প্রেমের আশিক হয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি হজ্ব পালনের জন্য পবিত্র মক্কার বায়তুল্লাহ শরীফ ও মদীনা মনওয়ারায় গমন করেন।পবিত্র হজ্ব পালন শেষে দীনি জজবা বুকে ধারন করে এক নতুন মানুষ রূপে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।ব্যক্তিগত জীবনের প্রারম্ভে ও যৌবনে তিনি পৈতৃক সম্পত্তি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও কোনো দিনও(কাদা জলে হলেও) হাটুর উপরে লুঙি পরতেন না।ছতর ঢেকে রাখতেন,আজানের শব্দ শুনলে ঘরে বসে থাকতেন না,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করতেন,হাটুর নীচ পর্যন্ত ফুল হাতা সাদা পাঞ্জাবী ও  লুঙ্গি পরতেন,সর্বদা মাথায় টুপি অথবা পাগড়ী পরতেন।ভেতরে গোল গলা সাদা গেনজি পরতেন। ইসলামী অনুশাসনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে ১৯৫৬ ইংরেজী মোতাবেক বাংলা ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের ৪ ফাল্গুন একই গ্রামের সোনা মিয়া হাজীর একমাত্র তনয়া জাহানারা বেগম ওরফে ফজিলতের নেছার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
    মহান আল্লাহ মনোনীত ইসলামের স্বাদ ও সৌরভে তৃষাতুর হয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন সমজিদ থেকে মসজিদে,তাফসিরুল কুরআনের মজলিসে,মিলাদ ও দোয়ার মাহফিলে।আড়াই বাড়ী দরবার শরীফ, মাছিহাতা দরবার শরীফ, পুরকুইল দরবার শরীফ, সোনা কান্দা দরবার শরীফ,পাক হাজীপুর, কাশিমপুর দরবার শরীফ, ফুরফুরা শরীফ,ছারছিনা দরবার শরীফ, ছতুরা দরবার শরীফ এমন বহু ওলী কামেলদের দরবারে ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত।  তাই পিতার অঢেল বিষয় সম্পদ, স্ত্রী পুত্র সংসার এবং দুনিয়াবি কোন কিছুই তাকে মোহাবিষ্ট করতে পারেনি।



    প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া হলেন তিনি জ্ঞানী
    তাঁর মহৎ কর্মের কথা কিবা আমরা জানি।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা।কিন্তু ড.মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ,প্রফেসর আব্দুল খালেক(রঃ) এমন ব্যক্তিদের নেক দৃষ্টি তিনার উপর নিপতিত হয়েছে।তাই তিনিও উপমহাদেশের গুণীদের একজন।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা। বিএ,এমএ পাশ করা স্কুল কলেজের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভাল উপদেশ দেন। সক্রেটিস,প্লেটোর মতো তিনিও হেঁটে হেঁটে লোকজনকে শোনাতেন মঙলময় কথামালা। তাই তিনিও সমাজের শিক্ষক।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা।লোকেরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে নিজেকে বদলায় সত্যের মোড়কে। তিনি উচ্চ শিক্ষা না নিয়েও সারা জীবন সত্যের পথে অবিচল ছিলেন।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে মানুষ ধন সম্পদ অর্জন করার কৌশল রপ্ত করে। কিন্তু অনেকেই তার সদ্ব্যবহার  জানেন না।তিনি তা না করেও পবিত্র মক্কা-মদীনা মুনওয়ারা গমন,মসজিদ সংস্কার,ঈদগাহ নির্মাণ করে তাঁর অর্জিত সম্পদের যথার্থ ব্যবহার করেছেন।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা।তবু ফাযেল,কামেল ডিগ্রিধারী বহু মৌলভী,মৌলানাদের  মত ইসলাম পরিপন্থী কাজে নিজেকে জড়াতেন না।

    👀ওঁনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শিখরে উঠে মানুষ বুঝতে পারে কেন মহান আল্লাহ মানুষ সৃজন করেছেন?তিনি তাঁর কৈশোরেই সে ধ্রব সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

    কর্ম বীর মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার
    একনিষ্ঠ প্রেমিক ছিলেন হাবীবে খোদার।

    পার্থিব দুনিয়ার সব কিছুই ক্ষনস্থায়ী। আর বালক বয়সেই তিনি তা বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন।”দুনিয়াতে যারা আছে তাদের সেবা কর,তাহলে আরশে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি খুশী থাকবেন”(হাদীস)
    তাই আরশের অধিপতির রাজি ও খুশির জন্য তিনি সারা জীবন শারীরিক মানসিক ও আর্থিক সহায়তার দ্বার খুলে রেখেছিলেন।

    ★”একটি বানী হলেও পৌঁছে দাও”।(সহি বোখারী-৩২৫০)

    ★”যে ভালো কাজের পথ প্রদর্শন করলো তার জন্য রয়েছে এর সম্পাদনকারীর অনুরূপ সওয়াব”।(মুসলিম-১৮৯৩)

    ( ১) আধুনিক ডিজাইন ও নান্দনিক টাইলসে শোভিত প্রাণ জুড়ানো ইবাদখানা আজকের বল্লভপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।স্বাধীনতার পূর্বে এই মসজিদ খানা টিনের চালা থেকে তারকা আর লতা-পাতায় কারূকার্য খঁচিত পাকা মসজিদ বিনির্মানে তিনি নিজে বল্লভপুর বড় ভাঙা ব্রীজের (আনন্দ ভুবন)কাছে নিজ জমিতে ইটের ভাটা করে ইট পুড়িয়ে মসজিদ পাকা করনের কাজ সমাপ্ত করেন।
    (২) ক্রমবর্ধমান মুসলিম সমাজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বল্লভপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের জন্য জমি দান করে তার সম্প্রসারণ ও পরিশোভনের ব্যবস্থা করেন।
    (৩) পরোপকার যার ধর্ম।তার কিসের ভয়?মানুষের কষ্ট যাকে কষ্ট দেয় তার আর কিসের কষ্ট? “জুগি পুকুর”এটি বল্লভপুর গ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম পুকুর।এ পুকুরের উত্তর পাড়ে নোয়াব আলী সরকার বাড়ী।আর বাকী তিন পাড়ে ছিল হিন্দুদের বসবাস।১৯৫০ সালের কথা।দিনে দিনে পুকুরের মাটি ভরাট হয়ে, পানি শুকিয়ে,গোসল ও রান্নাবান্না করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।শুধু মানুষের সুপেয় পানির জন্য তিনি নিজ পকেটের ৩০০ টাকা খরচ করে পুকুরটি খননের ব্যবস্থা করেন।বিনিময়ে তখনকার পুকুরের হিন্দু মালিকগণ হাজী সাহেবকে পুকুরটি ওনার নামে লিখে নেবার কথা বললেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।অথচ তখন ১৫ থেকে ১৮ টাকায় ১ মন চাল পাওয়া যেত।জমি জমার দাম ছিল খুবই কম।তাহলে ৩০০টাকায় কি নাহতো!
    (৪) আজকাল ডেকোরেটর ও হোটেল রেষ্টুরেন্টের বদৌলতে আমরা অতি সহজেই খানা-জিয়াফত,বিয়ে,মুসলমানি ও মিলাদ মাহফিলের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করতে পারছি।কিন্তু একসময় ছিল যখন না ছিল ডেকোরেটর আর না ছিল কমিউনিটি সেন্টার।তবু মানুষের অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকতো। আর এসব বড় বড় অনুষ্ঠানে রান্না করার জন্য ব্যবহার হতো বড় সাইজের তামার ডেক।তাই সাধারন মানুষের উপকারের কথা বিবেচনা করে তিনি দুটি বড় তামার ডেকচি তৈয়ার করালেন।এবং খুদাই করে একটিতে নিজ পিতার নাম নোয়াব আলী সরকার আর অপরটিতে চাচার নাম আশ্রাফ আলী সরকার লেখালেন।বহু বছর ধরে অনেক দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে তামার এ ডেকচি দুটো নিয়ে যেতো।
    ছিল ব্যক্তিগত পাম্প লাইট,দস্তরখানা,পর্দা ও সামিয়ানা। যা সকল মানুষের প্রয়োজনে ছিল বিনা মাহিনায় উন্মুক্ত।
    (৫) গোয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের অধিকাংশ জমির মালিক ছিলেন উনার বাপ দাদারা।অত্র গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ(স্কুল সংলগ্ন)খানা নির্মাণ কালে তিনি মসজিদের জমিখানা গ্রামবাসীকে দেন।বিনিময়ে (অদল বদল) গ্রামের পশ্চিমে ওনাকে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের জমি দিলেও তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে হাসি মুখে গ্রহণ করেন।আমিন।
    (৬) ব্যক্তি হাজী আব্দুল জব্বারের জনসেবার ধরনের কাছে স্কাউটের শিক্ষা কিংবা নিঃস্বার্থভাবে সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম নীতি বড়ই নিষ্প্রভ। তিনি যখন যেখানেই গিয়েছেন সেখানকার মসজিদের অপরিচ্ছন্ন ও পিচ্ছিল পাকা ঘাটলা ঘষে মেজে পরিস্কার করেছেন।নোংরা টয়লেট ও দম বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রস্রাব খানার সুগন্ধি পরিবেশ ফিরিয়ে অানার ব্যবস্থা করতেন।মসজিদের ভিতর বাহির ও চারপাশ ঝকঝকে তকতকে করে রাখতেন।শুধু নিজ গ্রামের নয়। যখন যেখানে গিয়েছেন কবর স্থানের অপ্রয়োজনীয় অাগাছা ও ঝোপঝাড় পরিস্কার করে সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে অানতেন।কোন সুনাম কিংবা সম্মানের জন্য নয়।শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের মঙ্গলের জন্যই তিনি এতসব কাজ করতেন।

    মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার
    এক অনুকরনীয় আদর্শ সবার।

    পর্দাহীনতা:
    নারীগণ-কে তিনি খুব সম্মানের চোঁখে দেখতেন।বেশির ভাগ সময় মহিলাদেরকে মা বলে সম্বোধন করতেন।নিজ পরিবার কিংবা বাহিরের কোন মহিলাদেরকে বেপর্দা/মাথায় কাপড় দেয়া ছাড়া দেখলে তিনি তা সহ্য করতে পারতেন না।তিনি বলতেন,”বেপর্দা পশুর সমান”।”বেপর্দা সমাজে অনাচারের কারণ”।তাই রাস্তা ঘাটে কোন মহিলাকে মাথায় গোমটাহীন দেখলে তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে মাথায় কাপড় দেয়ার কথা বলতেন।কথিত আছে যে,একবার একদল কমবয়সী মহিলা সাজগোজ করে পর্দাবিহীন অবস্থায় ওনার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি তা সহ্য করতে না পেরে তাদেরকে হাতের লাঠি দিয়ে তাড়া করেছিলেন।আর সে ঘটনার পর থেকে ঐ মহিলারা আর পর্দাবিহীন অবস্থায় ঘরের বাহির হতেন না।

    পছন্দ-অপছন্দ:
    যৌবনের প্রারম্ভে এবং যৌবন কালে নিজে গাভীর দুধ দোহন করে দুধ +কলা+ভাত খেতে ভালবাসতেন।নিজে লালন করা ঘরের গরু কুরবানি দিতেন।আতর সুরমা ব্যহার করতেন।সাদা রঙের পাঞ্জাবী, গোল গলা গেঞ্জি,গোল টুপি ও সাদামাটা লুঙ্গি পরিধানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
    মিথ্যাচার, অপ্রয়োজনীয় কথা বার্তা ও সকল প্রকার নেশা থেকে নিজেকে আমরন হেফাজতে রেখেছেন।

    মাকে তিনি বাসতেন সবার চেয়ে ভালো
    তাইতো জীবন তাঁর এমন রঙিন হলো।

    জীবনের শেষ বিকেলে এসেও যিনি অবুঝ শিশুর মত মা মা বলে কেঁদে বেড়িয়েছেন তিনি মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার।
    “দুঃখের সাগরে মায়ের এক মুখ
    রঙিন ঝিনুকে পুরো মুক্তো এতটুক।”

    “বিদেশ বিরাজ্যে যাদের পুত্র মারা যায়
    পশু পাখি না জানিতে আগে জানে মায়।”

    ” মা নেই গৃহে যার, সংসার অরন্য তার। ”

    “কলা গাছের জীবন শেষ ছড়ির লাগিয়া
    মা বাপের জীবন শেষ সন্তানের লাগিয়া”।

    এমন বহু প্রবাদ আর কথামালা তিনি আপন মনে গুনগুন করে গাইতেন। “মায়ের পদতলে জান্নাত” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এরশাদকৃত এই হাদিস খানা তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন “পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট। “(হাদিস) তাই তাঁদের জীবদ্দশায় সাধ্যমত খিদমত করেছেন। সকল আদেশ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।আর তাঁদের হারিয়ে সারা জীবনভর দুহাত তুলে মহান মনিবের দরবারে এই বলে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করেছেন,
    “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা।”(আল কুরআন)
    তিনি প্রায়ই বলতেন,
    “মায়ের দোয়ায় মক্কা-মদীনা শরীফ গেছি।
    মায়ের দোয়ায় হজ্ব করেছি।
    মায়ের দোয়ায় নয় সন্তানের জনক হইছি।”
    জাজাকাল্লাহ। আমিন। ছুম্নামিন।

    বন্ধু প্রীতি অধিক তাহার অধিক ছিলো মায়া,
    ভালোবাসতেন অধিক আলেম ওলীর ছায়া।

    মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।আমাদের বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত।মানুষ কখনও একা থাকতে পারে না বা চলতে পারে না।জীবনের প্রতিটি সময়ে তার একজন বন্ধু বা সঙ্গী প্রয়োজন।বন্ধুত্ব তৈরী মানুষের
    স্বভাবজাত প্রবণতা। ভালো বন্ধু ও সুন্দর বন্ধুত্ব জীবন যাত্রার সহায়ক এবং আল্লাহর নিয়ামত ।মানুষের কর্ম, চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয় বন্ধুত্বের কল্যাণে। এ কারণে কার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে এবং কাদের বর্জন করতে হবে এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা আমাদের পথ দেখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন,
    “আর ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। তাদের ওপর আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী। [সূরা আত্-তওবা : ৭১]
    মরহুম হাজী আব্দুল জব্বার আজীবন চির শাশ্বত বন্ধুত্বের জয়গান গেয়েছেন। মানুষকে তিনি বন্ধু ভাবতেন, বিশ্বাস করতেন,ভালবাসতেন।অসহায় গরিব পিতার মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব থেকে শুরু করে অনেক অভাবী সংসারের অন্ন পানির ব্যবস্থা করেছেন।তিনি বলতেন,
    “সু সময়ে অনেকেরই বন্ধু বটে হয়,
    অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়।”
    তিনি ছিলেন বিগত শতাব্দীর একজন আদর্শ পুরুষ।একজন শরিয়ত পন্থী মোমেন বান্দা। “মুমিনের সব কাজই আমল-ইবাদত। কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করাও একজন মুমিনের নাজাতের উসিলা হতে পারে।
    রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে কাউকে ভালোবাসল, একমাত্র তার জন্যই কাউকে ঘৃণা করল, তারই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাউকে দান করল এবং তা থেকে বিরত থাকল; তবে নিঃসন্দেহে সে নিজ ইমানকে পূর্ণতা দান করল।’ (আবু দাউদ)

    তিনি সমাজের পথহারা বিপথ গামী মানুষ গুলোকে তীব্র ঘৃনা করতেন।।জগদ্বিখ্যাত কবি আল্লামা শেখ সাদি (রহ.) এর নিম্নোক্ত বিখ্যাত উক্তি তার মুখে প্রায়ই শুনা যেত, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’
    নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, “মুমিন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক মজবুত কর।আর তার সাথেই পানাহার কর।”তাই জীবনে আলেম এবং ওলী মশায়েখ গণকেই তিনি বন্ধু হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। আরাফার সাথী বা বন্ধুদেরকে তিনি প্রাণাধিক ভালবাসতেন।সময় পেলেই তিনি আরাফার বন্ধুদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশে দেশের নানা প্রান্তে ছুটে যেতেন। আরাফার বন্ধু হচ্ছে সেইসব পুন্যময় হাজীগণ  যাঁদের সাহচর্যে অতি কৈশোরে তিনি  ইস্টিমারে দীর্ঘ সময় ও দীর্ঘ সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে পবিত্র হজ্ব পালনের উদ্দেশে পবিত্র মক্কা-মদীনায় গমন করেন।সুখে দুখে, অন্ন-পানিতে  ভাগাভাগি করেন।হজ্জের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত সমূহ খুব কাছাকাছি থেকে অাদায় করেন। এবং পবিত্র হজ্ব পালন শেষে একই সাথে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

    ★হজ্জের ফরয তিনটি
    *হজ্জের নিয়ত করত : তালবিয়া পড়া ,
    একে ইহরাম বলা হয়

    *৯ই জিল হজ্জের সূর্য হেলার পর থেকে
    ১০ই জিল হজ্জের সুবেহ সাদেক পর্যন্ত
    আরাফায় অবস্থান করা

    * তাওয়াফে জিয়ারত, কিন্তু
    আরাফায়ে অবস্থানের পূর্বে যে
    তাওয়াফ করা হয় তা ফরয বলে গন্য
    হবেনা।
    ★হজ্জের ওয়াজিব সমুহঃ
    *মুযদালিফায় অবস্থান করা।
    *সাফা মারওয়ায় সায়ী করা।
    *রমী বা পাথর নিক্ষেপ করা।
    *মাথার চুল কাটা বা ছাটা।
    *মিকাদের বাইরের লোকদের জন্য
    বিদায়ী তাওয়াফ।

    ★হজ্জের সুন্নতসমুহঃ
    > জিলহজ্জের ৮ তারিখে মিনার
    উদ্দেশ্যে গমন করা।
    > সূর্য উদীত হবার পর আরাফার
    উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া এবং সেখানে
    যোহর , আসর , মাগরিব , এশার ও ফযর
    পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া।
    > ৯ই জিল হজ্জ সূর্য উদয়ের পর আরাফায়
    উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।
    > আরাফার ময়দানে গোসল করা।
    > মিনায় অবস্থানকালীন ১০. ১১. ১২
    তারিখ রাত্রগুলো মিনায় অবস্থান করা।
    > আরাফা প্রত্যাবর্তন করে মুযদালিফায়
    রাত্রি যাপন করা।
    > আরাফা থেকে সূর্য অস্ত যাবার পর
    হজ্জের ইমামের রওয়ানার পর রওয়ানা
    দেওয়া।

    প্রফেসর আব্দুল খালেক(রহ.)এর হাতে রেখে হাত
    আল্লাহর রঙে রাঙাতে জীবন গ্রহণ করেন বায়াত।

    পবিত্র হজ্ব পালন শেষে মহান আল্লাহ প্রেরিত,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বাস্তবায়িত সর্ব শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামের সকল অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি তিনি পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দেখাশোনা ও সংসারে মনোনিবেশ করেন। হাজী আব্দুল জব্বারের জীবনে সবকিছুই আছে,আবার কি যেন নেই।সব কিছু থাকার মাঝেও কিসের অভাব যেন তাঁকে মাঝে মধ্যে বেদনাতুর করে তোলে।এক ধরনের অস্বস্তি, অতৃপ্তি তাঁকে রাত দিন তাড়া করে বেড়ায়।
    ইসলামের মূল ৫টি ভিত্তি হলো :
    ১। কলেমা, ২। নামাজ, ৩। যাকাত, ৪। রোজা, ৫। হজ্ব।
    তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন,অামিতো দুনিয়ার জিন্দেগিতে মহান রবের অশেষ মেহেরবানিতে উপরোক্ত ৫টি ভিত্তির উপরেই আমল করেছি।কলেমা পড়েছি,নামাজ আদায় করছি,সাধ্যমত দান সদকা করছি,রমযান সহ বছরের অপরাপর রোযা রাখছি,পবিত্র হজ্ব পালন করেছি।আমার এই  আমলগুলো সঠিক তরিকামতে আদায় হচ্ছে তো? নাকি কোন ভুল আমল আমার সকল নেক আমল গুলোকে আল্লাহর দরবারে পৌঁছাতে বাধা প্রদান করছে?তবেতো আমার ইহকাল পরকাল সকলি বিফলে যাবে!!
    এমন সব চিন্তায় সবসময়ই তিনি বিভোর থাকতেন।
    আল্লাহপাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন –
    “লি-কুল্লিন-জ্বায়াল না মিনকুম শির’আতাউ ওয়া মিনহাজ”।
    অর্থাৎ, আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি জীবন বিধান বা শরীয়ত, অপরটি তরীকত-সম্পর্কিত বিশেষ পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি। (সূরা মাইয়িদা, আয়াত ৪৮)
    আল্লাহ পাক আরও এরশাদ করেন –
    (ওয়া আল লাওয়িস্তেকামু আলাত তারীকাতে- সূরা জ্বিন আয়াত ১৬)
    অর্থাৎ, তারা যদি তরীকতে (সঠিক পথে) কায়েম থাকতো।
    উপরোক্ত আয়াত সমূহের অর্থ  অনুধাবন করে ওনার মোমিনে কামেল হওয়ার  সত্যস্বপ্ন ভেঙে যায়।
    হযরত ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন,” যে ব্যক্তি এলেম ফিকাহ (জবানী এলেম) অর্জন করলো, কিন্তু এলেম তাছাউফ (ক্বালবী) এলেম অর্জন করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাউফের দাবি করে, কিন্তু শরীয়ত স্বীকার করেনা, সে ব্যক্তি যিন্দীক (কাফের); আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার এলেম অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক তথা মু’মিনে কামেল। (মিরকাত, কিতাবুল ইলম)
    অতঃপর তিনি আল্লাহর ভয়ে আরো ভেঙে পড়েন।হায়! হায়!! আমার শরীয়তের তরীই তো ডুবুডুবু। তরিকতের ফায়সালা কি হবে?
    তাইতো জীবদ্দশায় তিনি একমাত্র আল্লাহর প্রেমে বুঁদ হয়ে একাকী পথ চলার পথে অশ্রুসজল নয়নে মনের মাধুরী মিশিয়ে গাইতেন,

    “কী করিবো,কোথায় যাবো,সঙ্গে নাইরে কড়ি,
    খেয়া ঘাটে গিয়া আমি কী যে উপায় করি।
    কী করিবো,কোথায় যাবো,সঙ্গে নাইরে কড়ি,
    হাশরের ঐ বিচার দিনের কী যে উপায় করি।”
    হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে –
    ” শরীয়ত একটি বৃক্ষস্বরূপ, তরীকত তার শাখা প্রশাখা, মারেফাত তার পাতা এবং হাকীকত তার ফল । (সিসরুল আসরার)
    হাদীস শরীফে আরও এরশাদ হয়েছে
    ” শরীয়ত হলো আমার কথাসমূহ (আদেশ-নিষেধ), তরীকত হলো আমার কাজসমূহ (আমল), হাকীকত হলো আমার গুপ্ত রহস্য।”(ফেরদাউস)

    এবার তিনি নিজের আমল সমূহকে পরিশুদ্ধ করার জন্য একজন কামেল পথপ্রদর্শক খোঁজার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।এবং নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর আক্ষরিক ও ভাবার্থ অনুধাবন করা শুরু করেন—
    “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহপাককে ভয় করো, আর তাঁর সন্তষ্টি লাভের জন্য উছিলা গ্রহণ করো (সুরা মায়িদা, আয়াত-৩৫)।
    অন্যত্র  এরশাদ হয়েছে,
    সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ’র অলী বা বন্ধুগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁদের কোনো চিন্তা-পেরেশানী নেই। (সূরা ইউনূস, ৬২)

    আল্লাহ পাক বলেন, “যদি তোমরা না
    জান, তবে আহলে যিকির বা আল্লাহওয়ালাগণকে
    জিজ্ঞেস করে জেনে নাও”। (সূরা নহল-৪৩ ও
    সূরা আম্বিয়া-৭ আয়াত)।
    পবিত্র কুরআনের অন্যত্র  ইরশাদ হয়েছে-
    ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ
    অনুবাদ-হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় কর, আর সৎকর্মপরায়নশীলদের সাথে থাক। {সূরা তাওবা-১১৯)

    আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’আলা কোরমআন শরীফের প্রথম সূরাতেই শিখিয়ে দিচ্ছেন –

    ﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﺻِﺮَﺍﻁَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ
    অনুবাদ- আমাদের সরল সঠিক পথ [সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তোমার নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের পথ। {সূরা ফাতিহা-৬,৭}
    সূরায়ে ফাতিহায় মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর নিয়ামাতপ্রাপ্ত বান্দারা যে পথে চলেছেন সেটাকে সাব্যস্ত করেছেন সীরাতে মুস্তাকিম।
    আর তার নিয়ামত প্রাপ্ত বান্দা হলেন-
    ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ ﻭَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
    অনুবাদ-যাদের উপর আল্লাহ তাআলা নিয়ামত দিয়েছেন, তারা হল নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, ও নেককার বান্দাগণ। {সূরা নিসা-৬৯}
    যুবক হাজী আব্দুল জব্বার ভাবলেন, যেহেতু আমি নবী দেখিনি, দেখিনি সিদ্দীকগণও, দেখিনি শহীদদের। তাই আমাদের সাধারণ মানুষদের একজন পূর্ণ শরীয়তপন্থী হক্কানী বুযুর্গের অনুসরণ করার দ্বারা সীরাতে মুস্তাকিমের উপর চলাটা হবে সবচেয়ে সহজ।

    দক্ষ মাঝি নাহি করে উত্তাল সাগরের ভয়,
    ওলীই কেবল বুঝতে পারে ওলীর পরিচয়।

    পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা অনুসরণ কর, আল্লাহ্ পাক এর, তাঁর রাসুল পাক (সাঃ) এর এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর রয়েছে তাদের।[সুরা ৪ নিসা: ৫৯]।
    (উলিল আমর এর মানে হল ন্যায় বিচারক/ধর্মীয় নেতা/ওলি-আউলিয়া/পীর-মুর্শিদ ইত্যাদি শব্দ ধরা যেতে পারে)

    আরবী ভাষায় “আউলিয়া” শব্দটি “ওলির বহুবচন। ওলি অর্থ মুরুব্বী, বন্ধু,মিত্র বা অনুসারি। কখনো শব্দটির অর্থ হয় শাসক,অভিভাবক বা কর্তা। (তথ্যসূত্রঃ আরবী-বাংলা অভিধান,প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।)
    হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা কার নিকট থেকে দ্বীন শিক্ষা করছ, তাকে দেখে নাও”। (মুসলিম
    শরীফ)। তাই হাজী আব্দুল জব্বার মনে প্রাণে সিদ্ধান্ত নিলেন একজন কামেল ওলী খোঁজে বের করবেন।এবং উনার নিকট ঈমান ও আমলের আনুগত্যের জন্য বায়াত গ্রহণ করবেন।সিদ্ধান্ত মত কাজে নেমে পড়েন।কিন্তু ওলী চিনা তো এত সহজ নয়।ওলীর পরিচয় বড়ই কঠিন।হযরত বায়েজীদ বুস্তামী (রাহঃ) বলেন,আল্লাহর ওলীগণ রহমতে ইলাহির বর।যেখানে তার মুহরেম ব্যতিরেকে আর কারো পৌঁছা সম্ভব নয়।এজন্য বলা হয় ওলীকে ওলীই চিনে।”আল্লাহকে চেনা সহজ, কিন্তু ওলী চেনা বড়ই কঠিন।কেননা রব তাআলা তো স্বীয় জাত সিফাতের দিক হতে মাখলুক হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র  ও মহান এবং প্রত্যেকটি সৃষ্টিই স্রষ্টার সাক্ষী। কিন্তু ওলীগণ তো আকার আকৃতি কাজ- কর্মে একদম আমাদের মত।(শায়খ আবুল আব্বাস)

    পবিত্র হাদিস শরীফে সাইয়্যেদুনা হযরত আব্দুল্লা ইবনে আব্বাস (রাদি আল্লাহু আনহু) হতে এরশাদ হয়েছে, “হুমুল্লাজিনা ইযা-রুয়ু ওয়া উয-কুরুল্লাহা।”–যাঁকে দেখলে আল্লাহতায়ালার কথা স্মরণ হয়, মনে ভয় আসে এবং ইবাদত বন্দেগীতে মন বসে, সে-ই প্রকৃত ওলী/ কামেল মুর্শিদ, আউলিয়া বা আল্লাহতায়ালার খাসবান্দা।(খাযেন)
    ★ওলীর পরিচয় দিতে গিয়ে মাওলানা রুমি(রাহঃ) বলেন,ওলীগণ কথা কম বলেন,কিন্তু তাঁদের অন্তর ভেদসমূহ দ্বারা পরিপূর্ণ।তাঁদের ঠোঁট বন্ধ, কিন্তু অন্তর (যিকরুল্লাহর)আওয়াজে ভরপুর।

    ★হযরত আলী (রাদি আল্লাহু আনহু) ইরশাদ করেন, ‘ওলী ঐ ব্যক্তি যাঁর চেহারা শুষ্ক,চক্ষু ভিজা,আর পেট ভুখা”।(রুহুল বায়ান)

    ★বলা হয়েছে “হে বৎস! আশেকগণের ছয়টি চিহ্ন রয়েছে।অফসোসের নিঃশ্বাস,শুকনো রং এবং চোখে পানি।যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, বাকি তিনটি কি,তাহলে বলে দাও-কম খাওয়া,কম কথা বলা এবং নিজের উপর নিদ্রা হারাম করে নেয়া।
    অনেক আল্লাহর ওলী নিজস্ব যে মর্যাদ বর্ণনা করেন,তা তাঁদের অনিচ্ছাকৃত বিশেষ অবস্থার বহিঃপ্রকাশ।

    ★অনেক ওলী বলেন,ওলীর পরিচয় এই যে,তাঁরা দুনিয়া হতে বেপরওয়া আর মাওলার ধ্যানে বিভোর।অনেকেই বলেছেন,ওরাই ওলী-যাঁরা শরীয়তের ফরয সমূহ অাদায় করেন,রব তাআলার আনুগত্যে মগ্ন  থাকেন,তাঁদের অন্তর আল্লাহর জালালিয়্যতের নূরের মা’রেফাতে ডুবন্ত,তাঁরা যখন দেখেন,কুদরতের নিদর্শন সমূহ দেখেন,শুনলে আল্লাহর কালামই শুনেন,বললে আল্লাহর হামদের সাথেই বলেন। বস্তুতঃ তাঁরা প্রত্যেকটি কাজেই অাল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁরা যিকরুল্লা হতে ক্লান্ত হন না।(খাযায়িনুল ইরফান)

    ★হাদিস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে,ওলী সেই,যে আল্লাহর জন্যই মুহাব্বত এবং আদাওয়াত(শত্রুতা) রাখে।

    ★পবিত্র কুরআনে সুরা ফাতহ এর শেষে আল্লাহ পাক ওলীর পরিচয় দিচ্ছেন,
    “আমার নবীর সাথী(আওলিয়া)যাঁরা,তাঁদের মধ্যে এই আলামত সমূহ বিদ্যমান–কাফিরের ব্যাপারে কঠিন,মুমিনের ব্যাপারে নমনীয়,রুকু এবং সিজদায় পতিত,আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষি।আর তাঁদের ললাটে বিদ্যমান সিজার চিহ্ন। এই আয়াতের মধ্যে আরো ইরশাদ হয়েছে,ওলী ঐ ব্যক্তি, যে নামাজ পড়ে এবং পরহেগার বনেছে।

    পবিত্র কোরআনে “ওলি” এবং “আউলিয়া” এ উভয় শব্দটির ব্যবহার হয়েছে অসংখ্য বার।

    আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন – ” আলা ইন্না আঅলিয়া আল্লাহি লা খাওফুন আ লাইহিম ওয়া লাহুম ইয়াহ্ঝানুন। আল্লাযীনা আ মানূ ওয়া কানূ ইয়াত্তাকানূন।” অর্থ- “জেনে রাখ নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলিদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। ( সূরা ইউনুস ১০: ৬২- ৬৩ )
    এখানে আল্লাহ তায়ালা ওলিদের দুটি গুণ বর্ণনা করেছেন।
    (১) যারা ঈমান আনয়ন করেছে। শিরক মুক্ত মুসলমান যারা।
    (২) তাকওয়া অর্থাৎ, সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নিষিদ্ধ সকল প্রকার হারাম কাজ বর্জন করে চলা।

    “নিশ্চয়ই তোমাদের ওলি হলেন আল্লাহ এবং তাঁর রসুল আর ঈমানদার লোকেরা- যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দিয়ে দেয়, এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত বাধ্যগত থাকে। যারা ওলি মানে আল্লাহকে এবং আল্লাহর রসুলকে আর ঈমানদার লোকদের কে, তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই থাকবে বিজয়ী ( সূরা আল মায়িদা,আয়াত-৫৫-৫৬)
    এ দুটি আয়াত থেকে জানা গেল, সকল মুমিনই আল্লাহর ওলি, যারা সালাত কায়েম করে,যাকাত প্রদান করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর অনুগত থাকে তারাই ওলি।

    ১৯৮৮ সালের ৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিন নিজ বাড়িতে তিনি ওফাত লাভ করেন। ইন্না-লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।মৃত্যুকালে তিনি পাঁচ পুত্র, তিনকন্যা ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান।

    লেখক: কবি, গবেষক এবং হাজী আব্দুল জব্বার বল্লভপুরী (রহ.) এর কনিষ্ঠ পুত্র।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম