• শিরোনাম


    সুশাসন গণতন্ত্রহীন উন্নয়নের পরিণতি অশুভ।

    অনলাইন সংস্করণ | ২৮ মার্চ ২০২১ | ৯:০৭ অপরাহ্ণ

    সুশাসন গণতন্ত্রহীন উন্নয়নের পরিণতি অশুভ।

    জন্মলগ্নে বাংলাদেশ একটি অতি দরিদ্র্য, ক্ষুধার্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে আখ্যায়িত করেছেন। ১৯৭৬ সালে Just Faaland and Jack R Parkinson bvgK `yBRb we‡klÁ Bangladesh: The Tests Case of Development নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে তারা দাবি করেন যে বাংলাদেশের উন্নয়ন করা গেলে, সব দেশেরই উন্নয়ন করা সম্ভব। (প্রসঙ্গত, তখন উন্নয়ন প্রচেষ্টা ছিল মূলত বৈদেশিক সাহায্য ও কারিগরি সহায়তানির্ভর।) তবে শুরুর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক হতাশা ব্যক্ত করা হলেও, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছি। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। দারিদ্র্য দূরীকরণে আমাদের অগ্রগতি দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী, যদিও করোনা মহামারির ফলে এ ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছি। মানব উন্নয়নে আমাদের অগ্রযাত্রা এখন অনেকেরই ঈর্ষার কারণ। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এসব অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আমাদেরকে গর্বিত করে।
    সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্বনামধন্য কলামনিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন সরকারকে দারিদ্র্য দূরীকরণের সবক বাংলাদেশকে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা আমাদেরকে অবশ্যই পুলকিত করে।

    তবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অনেক দূর এগুলেও আমরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনেক দূর পিছিয়ে গিয়েছি। আমরা গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়েছি, যদিও আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণায় তারা অঙ্গীকার করেছিলেন যে রক্তের দামে কেনা এ ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা – যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’



    স্বাধীনতার এ ঘোষণার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংবিধানে ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ আর এজন্যই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে প্রশাসনের সকল স্তরে ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের’ শাসন প্রতিষ্ঠার – অর্থাৎ সত্যিকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় সরকার গঠনের – অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল তৃণমূলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণতা দেয়া এবং এর ভিতকে শক্তিশালী করা।

    এমন সাংবিধানিক অঙ্গীকার সত্ত্বেও আজ আমরা যুক্তরাজ্যের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মতে একটি ‘হাইব্রিড রিজিম’ বা শংকর ব্যবস্থার মধ্যে আছি। বিখ্যাত জার্মান সংস্থা বার্টলসম্যান স্টুফটিং আমাদেরকে একটি ‘সেমি অটোক্রেটিক’ বা আধা-স্বৈরতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছে। আর মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউজ দ্বারা আমরা ‘পার্টলি ফ্রি’ বা আংশিক স্বাধীনতা ভোগকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত।

    ফ্রিডম হাইজের ২০২১ সালের সূচকে আমাদের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৯, যা ২০১৬ থেকে ৫ পয়েন্ট কম। এই স্কোর অর্জনে আমাদের ‘পলিটিক্যাল রাইটস’ বা রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে, নির্বাচন যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, স্কোর ছিল ৪০ এর মধ্যে ১৫, আর ‘সিভিল রাইটস’ বা নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে স্কোর ছিল ৪০ এর মধ্যে ২৪, সর্বমোট ৩৯।

    ফ্রিডম হাইজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী: বাংলাদেশে বিএনপি এবং তার মিত্র বলে পরিচিত ও সমালোচনাকারী গণমাধ্যমকে অব্যাহতভাবে হয়রানি এবং নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তার ক্ষমতাকে এখন পাকাপোক্ত করেছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি ভয়াবহ সমস্যা এবং দুর্নীতি দমন কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকটা অকার্যকর। ন্যায়বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিনা দ্বিধায় মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আসছে।

    আজ আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের দ্বারপ্রান্তে। এরইমধ্যে আমরা আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করেছি। আজকের এ মহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমার মনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বার বার উঁকি দিচ্ছে: বঙ্গবন্ধু যদি জানতেন তার স্বপ্নের বাংলাদেশে, তার নিজের হাতে গড়া আওয়ামী লীগের শাসন আমলে, একটি ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন প্রণীত হবে মানুষের কতগুলো মৌলিক মানবাধিকার হরণ করে ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা প্রদানের জন্য, যার বলি হবে লেখক মোশতাক এবং জেলে যাবে কার্টুনিস্ট কিশোর এবং আরো অনেকে, তাহলে কি তিনি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতেন? তিনি যদি জানতেন যে বিএনপি’র আমলে শুরু হওয়া বিচার বহির্ভূত হত্যা আওয়ামী লীগের আমলেও অব্যাহত থাকবে এবং দেশে একটি গুমের সংস্কৃতির প্রচলন হবে, তাহলে কি তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য নিজের জীবন বাজি রাখতেন? আর আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যদি জানতেন যে স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হবে, যে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন, তাহলে কি তারা পকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেন? ভবিষ্যতে বাংলাদেশে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটের একটি স্বর্গরাজ্যে এবং উগ্রবাদের সূতিকাগারে পরিণত হবে এমন জানলে আমাদের মা-বোনরা কি তাদের ইজ্জতকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হতেন?

    ষাটের দশকে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত হবার সুবাদে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা এবং বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের ইতিহাসের আলোকে আমার কেন যেন মনে হয়, ৫০ বছর বয়সে বাংলাদেশের এমন পরিণতি হবে জানলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের হয়তো নেতৃত্ব দিতেন না। আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারাও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে নিজেদের জড়াতেন না। আমাদের নারীরাও স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে নিজেদের অনেক দূরে রাখতেন। বস্তুত, আমার আশঙ্কা যে গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপন উপলক্ষে অস্বস্তিতে বঙ্গবন্ধু হয়তো তার কবরে নড়েচড়ে উঠছেন!

    এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার আজ চরমভাবে লঙ্ঘিত। আইনের শাসন নগ্নভাবে পদদলিত। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বহুলাংশে তিরোহিত। লুণ্ঠন ও বঞ্চনা সর্বত্র। ভোটাধিকার অপহৃত। এক কথায়, গণতন্ত্রহীনতার এক নির্লজ্জ উল্লাস যেন আজ চারদিকে।

    আর বর্তমানের এ দুঃসহ পরিস্থিতি কিন্তু সাঁজোয়া গাড়ির বহর নিয়ে একদল সামরিক উর্দি পরা ব্যক্তি ট্যাঙ্কে চড়ে এসে সৃষ্টি করেনি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সুবিধা নিয়েই মানুষের ভোটের মাধ্যমেই অর্থাৎ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফলভোগী হিসেবেই, দিনবদলের অঙ্গীকার করে, বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া দল ১২ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিল। দল তখন অঙ্গীকার করেছিল, মানুষ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলে তারা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো সুসংহত করবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটাবে। দলীয়করণে লাগাম টানবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। মানবাধিকার সমুন্নত রাখবে। একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলবে। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও শক্তিশালী করবে। আয়-সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য দূরীভূত করবে। সর্বোপরি একটি সত্যিকারে বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন।

    কিন্তু কীভাবে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হারিয়ে গেল?
    একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মোটাদাগে তিনটি জিনিস প্রয়োজন: গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। ক্ষমতা রদবদলের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হলো নির্বাচন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সর্বস্তরে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে। যার মাধ্যমে জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীনদের ‘ডাউনওয়ার্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা নিম্নমুখী দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে। আমাদের দেশে এক তরফা নির্বাচনসহ মধ্যরাতের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে।

    গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার খুঁটিস্বরূপ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানে কতগুলো প্রতিষ্ঠান – যেমন, জাতীয় সংসদ, উচ্চ আদালত, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি – সৃষ্টির বিধান রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো আইনের দ্বারা সৃষ্ট কতগুলো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর হলে গণতন্ত্রের জন্য শক্ত ভিত রচিত হয় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। সরকারের ‘প্যারালাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা সমান্তরাল দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে আমরা যেন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার এক ‘ডেমলিশন ডার্বির’ বা ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন করেছি। তাই আমাদের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, যার ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

    খেলার যেমন কতগুলো নিয়ম থাকে এবং নিয়ম মেনেই খেলা খেলতে হয়, তেমনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলেও কতগুলো নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। পরমত সহিষ্ণুতা, নৈতিকতাবোধ, ছাড় দেয়ার মানসিকতা, ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে বৃহত্তর স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হওয়া ইত্যাদি মূল্যবোধ ধারণ না করলে এবং এগুলো দ্বারা পরিচালিত না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
    আর এসবই করা হয়েছে উন্নয়নের নামে – উন্নয়নের স্লোগান ব্যবহার করে। বস্তুত সাম্প্রকিতকালে উন্নয়নের একটা বিকৃত সংজ্ঞা ব্যবহার করে। উন্নয়নকে আমাদের ক্ষমতাসীনরা মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের সমার্থক করে তুলেছে, যার মাধ্যমে বিরাট অঙ্কের অর্থকড়ি ব্যয় হয় এবং প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়। ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা পক্ষপাতদুষ্ট পুঁজিবাদ সৃষ্ট ‘আপনজনদেরকে’ অন্যায় সুযোগ-সুবিধা তথা ফায়দা দেয়া হয়। দেশে ধনী সৃষ্টির হার পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ করা যায়। ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এসব করা হচ্ছে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বিবর্জিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যেখানে পদে পদে মানবাধিকার, আইনের শাসন আর সামাজিক ন্যায়বিচার পদদলিত হচ্ছে।

    আমাদের ক্ষমতাসীনরা উন্নয়নের যে একটি বিকৃত সংজ্ঞা ব্যবহার করছে তা নোবেল বিজয়ী উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের লেখা থেকেই সুস্পষ্ট। তিনি তার Development as Freedom গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে উন্নয়নের জন্য ব্যক্তি সত্তার স্বীকৃতির পাশাপাশি তার সামর্থ্যের বিকাশ আবশ্যক, আর তার এ সামর্থ্যের বিকাশ বহুলাংশে নির্ভর করে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং যেসব স্বাধীনতা সে ভোগ করে তার ওপর। অমর্ত্য সেনের মতে, মানুষের স্বাধীনতার ক্ষেত্রসমূহের বিস্তৃতি উন্নয়নের একদিকে যেমন লক্ষ্য এবং একই সঙ্গে মাধ্যমও। তাই শুধু আয় ও সম্পদই নয়, ভোগ করা নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাও মানুষের জীবনমানের অপরিহার্য পরিমাপক।

    প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপন উপলক্ষে কাউকে কাউকে বাগাড়ম্বর করতে শোনা যায়, উন্নয়নের সাফল্যের দিক থেকে আমরা পৃথিবীর বিস্ময়। যারা এসব কথা বলেন, তাদের উন্নয়নের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত সীমিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা ধরা যাক। ১৯৭১ সালে জন্মলগ্নে বাংলাদেশ আর দক্ষিণ কোরিয়া একই অবস্থানে ছিল। উভয়েরই মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১০০ মার্কিন ডলার। উভয়েরই দেশজ উৎপাদনের বিপরীতে রপ্তানি ও বিনিয়োগের হার ছিল প্রায় সমান সমান। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদহীন দক্ষিণ কোরিয়া আজ কোথায়? গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু গড় আয় ছিল ৩১,০০০ ডলারের ওপরে, আর বাংলাদেশের ছিল ২,০০০ ডলারের একটু বেশি।

    এটি সুস্পষ্ট যে, শুধুমাত্র মৌলিক চাহিদা পূরণ করলেই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য তার আরো প্রয়োজন কতগুলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বা স্বাধীনতা। বস্তুত মৌলিক চাহিদা পূরণ হলে বেঁচে থাকতে পারে শুধুমাত্র নিচ প্রাণী। তাই মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা তথা গণতান্ত্রিক অধিকার বিবর্জিত প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন প্রচেষ্টা টেকসই হতে পারে না- দীর্ঘমেয়াদিভাবে এর অবসান অনিবার্য। কিন্তু এটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে দমনপীড়নের প্রয়োজন হয় এবং ঘৃণা-বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়, তার ভবিষ্যৎ পরিণতি অমঙ্গলকর হতে বাধ্য, কারণ দমনপীড়নের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়-মন জয় করা যায় না। বস্তুত এর মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার বিভোরে সাধারণত এতই মগ্ন থাকে যে তারা ভাবতেও পারে না যে বল প্রয়োগ করে টিকিয়ে রাখা ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তাদেরকে সকল বাড়াবাড়ির মাসুল দিতে হয় – এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

    স্বল্পমেয়াদিভাবেও আইনের শাসন ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বিবর্জিত ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে অব্যাহত থাকতে পারে না। অনেক দেশেই ‘প্রিভিটিভ অ্যাকুমুলেশন’ বা অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম আইনের শাসন এবং চুক্তির বলবৎকরণ, যার অভাবে পুঁজি বৈধ-অবৈধভাবে বিদেশে চলে যায় – যেমন সামিট পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়ায়ই সিঙ্গাপুরে চলে গিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পুঁজির এমন বিদেশে যাত্রা দিন দিন বাড়ছে। গণতন্ত্রহীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এটিকে আরো ত্বরান্বিত করতে বাধ্য। এ ছাড়াও অবকাঠামোতে বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে ক্রমাগতভাবে অর্থের জোগান বাড়াতে হবে, যা-ও সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। উপরন্তু ফায়দাভিক্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, ফায়দা গ্রহীতার সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে – যেমন, এখন প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ – যা ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে অশুভ প্রতিযোগিতা, এমনকি অস্থিরতা এবং সহিংসতাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই গণতন্ত্র বিবর্জিত উন্নয়ন প্রচেষ্টা নিকট ভবিষ্যতেও সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

    আরেকভাবেও গণতন্ত্রহীনতা সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি তথা সুষ্ঠু নির্বাচনই নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নির্বাসনে প্রেরণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেললে, অনিয়মতান্ত্রিক ও অশান্ত, এমনকি সহিংস পথে ক্ষমতার রদবদলের পথ প্রশস্ত হয়। আর সহিংসভাবে ক্ষমতার বদল হলে কারো নিরাপত্তাই নিশ্চিত নয়।

    এ ছাড়াও গণতন্ত্রহীনতা এবং বিদ্যমান অধিকার সংকোচনমূলক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা তাদেরকে উগ্রবাদের পথে হাঁটতে উৎসাহিত করতে পারে। তারা, বিশেষত আমাদের তরুণরা, এর দ্বারা বিপথগামী হতে পারে। তারা ধর্মভিত্তিক ‘সমাধানের’ প্রতি ঝুঁকে পড়তে পারে, যার আলামত এরইমধ্যে লক্ষণীয়। এসব উগ্রবাদীদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বর্তমানে রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের একাংশ, যার পরিণতি হতে পারে ভয়ঙ্কর। তাই উন্নয়নের নামে এবং অজুহাতে মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গন কার্যকর বিরোধী দলের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে তা বুমেরাং হয়ে জাতি হিসেবে আমাদেরকে এক ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

    লেখক: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম