• শিরোনাম


    সম্প্রীতির সেতুবন্ধন কসবার অদের খাল: এস এম শাহনূর

    | ০৯ জুলাই ২০১৯ | ৩:৩০ পূর্বাহ্ণ

    সম্প্রীতির সেতুবন্ধন কসবার অদের খাল: এস এম শাহনূর

    বর্ষায় তিতাস, সালদা, বিজনা, সিনাই, সাঙ্গুর,কালিয়াড়া,বুড়ি,ফটিকছড়ি,বেহার খাল,রাজার খাল,সমনের খাল,সেনের খাল,খড়ধর(মান্দার পুর)বড় খাল,অদের খাল সহ অসংখ্য নদী ও খালের জলে স্নাত হয় যে ঐতিহাসিক জনপদ তার নাম কসবা।উপরোক্ত নদী ও খাল গুলো ছাড়া আরো অনেক জলধারা একে বেকে কসবার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।যুগযুগ ধরে সমগ্র নূরনগর এবং বরদাখাত পরগনার মানুষজনকে যে খাল এক বিনাসুতার মালায় আবদ্ধ করে রেখেছে তার নাম অদের খাল।

    নবীনগর উপজেলার সর্ব দক্ষিণের শেষ সীমানা এবং কসবা উপজেলার উত্তরের শেষ সীমানার(বল্লভপুর ও শিমরাইল গ্রামের) মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে কূলকূল করে বয়ে যাওয়া স্রোতধারার নাম অদের খাল।



    নামকরণঃ প্রকৃতির কূলে বেড়ে উঠা আজকের সভ্য দুনিয়ার মানুষ এক সময় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে আড়া,ঝোপঝাড় ও খালের উপর তৈয়ারী বাঁশের সাকো বেছে নিতেন।জনশ্রুতি আছে যে,অদনা বা নিচ কুলের লোকজন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে মলত্যাগের জন্য খাদ>খাল বা গর্ত খুঁজে নিতেন।অদনারা যে খাদ বা খালের তলদেশে মলত্যাগ করে সেই খালের নাম হয় অদের খাল।
    [অদনা শব্দটি বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি বিশেষণ পদ।যার আভিধানিক অর্থ – নিকৃষ্ট, অধম, জঘন্য, নীচ।]

    অন্য একটি তথ্যমতে,
    “ফেলে দেওয়া বদনা
    নিয়া আইল অদনা।”
    এই উক্তির রেশধরে তথ্য সংগ্রহ কালে জানা যায়,
    কোন এক কুলিন হিন্দুর শৌচাগারের বদনাটি অসাবধানতা বশত খাদে/খালে পড়ে গেলে পরে এক অদনা সেই মূল্যবান বদনাটি নিয়ে যায়।সেই থেকে খালের নাম হয় অদের খাল। বদনা বা লোটা বাংলাদেশ এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। বদনা মূলত মল ত্যাগের সময় লজ্জাদেশ পরিষ্কার রাখতে ব্যবহৃত হয়।ভারত উপমহাদেশের লোকজন শৌচকার্যে পানির পাত্র হিসেবেও বদনা ব্যবহার করে থাকেন।প্রাচীণকালে মাটির তৈরি বদনার প্রচলন ছিলো, যা আজো মাঝে মধ্যে দেখা যায়।পিতল, কাঁসা, অ্যালুমিনিয়ামের তৈয়ারি এবং অধুনা প্লাস্টিকের তৈরি বদনা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

    একসময় এ খালে জোয়ারভাটা হত।বর্ষাকালে হাজারো পাল তোলা,দাঁড়টানা আর লগি-বৈঠা বাওয়া নৌকার প্রধান রাস্তা ছিল এটি।আমার জানা মতে এটি তিনলাখপীর ব্রীজের পাদদেশ থেকে উৎপত্তি লাভ করে পশ্চিম দিকে চলে আসে।তিনলাখপীর টু বল্লভপুর সড়কটিকে ঐতিহাসিক ভাবে পোড়া রাজার জাঙ্গাল বলা হয়।পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি এ উচু সড়কটিতে একসময় উত্তর-দক্ষিণের গ্রামগুলোতে বাস করা মৃত মানুষদের সমাহিত/কবর দেওয়া হত বলেই এমন নামকরণের হেতু বলে প্রতীয়মান হয়।পোড়া রাজার জাঙ্গালকে দক্ষিণ তীর ধরে তীর অদূরবর্তী বাদৈর,হাতুড়া বাড়ি,মান্দারপুর গ্রামের উত্তরে এবং শামবাড়ি,নিমবাড়ি,রাইতলা,নিবড়া গ্রামকে উত্তরে রেখে আপন মনে প্রবাহিত হয় অদের খাল। অতপরঃ চারগাছ বাজারের(পূর্বে)ঈদগাহ থেকে চারগাছ গ্রামকে উত্তরে রেখে পশ্চিম দিকে চলে আসে। অতঃপর জয়পুর(উত্তরে) -শেরপুর গ্রামের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে উত্তরে গোয়ালী,দক্ষিণে সূর্যদীঘল গ্রাম বল্লভপুর কে রেখে মিলিত হয় বড়ভাঙা ব্রীজের(আনন্দ ভুবন)নিচে রাজার খালের সাথে। এরপর এর মূল গতিধারা উত্তর পশ্চিমে বেকে বুড়ি নদীর জোয়ার ভাটার সাথে মিলিত হয়।

    আবার এটি গুচ্ছ গ্রামের পূর্বপাশে প্রবাহিত তিতাস নদের শাখা বুড়ি নদী হতে উৎপত্তি লাভ করে(গুচ্ছ গ্রামের দক্ষিণ পাড়া ঘেষে)নবীনগর উপজেলার লাউর ফতেহপুর ইউনিয়নের শেষাংশে টানচারা গ্রাম, মুরাদনগর উপজেলার আন্দিকুট ইউনিয়নের শেষাংশে (গাঙ্গেরকুট) কালীগঞ্জ বাজারের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুই উপজেলাকে বিভক্ত রেখে বাঙ্গরা-ফরদাবাদ অদের খালের সাথে গিয়ে মিশেছে। এই প্রবাহকালে দক্ষিণে গাঙ্গের কুট,জাড্ডা,গাজীপুর,জাঙ্গাল ও গাজীরহাট,উত্তরে টানচারা,আহাম্মদপুর,পাক হাজীপুর ও বাঙ্গরা গ্রামের তীরবর্তী মানুষের কৃষি জমিতে সেচ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিরামহীন ভুমিকা রেখে চলেছে।

    দক্ষিণে রাজাবাড়ী,উত্তরে বৈলঘর।দুই গ্রামের পাশঘেষে মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সরু এক নদী।দুই পাড়ের লোকজন এই নদীকে বলে অদের খাল।খালটি এখানেও তার স্বরূপে কুমিল্লা জেলা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিভাজন করে বয়ে চলেছে।

    গাজীরহাট – বাঙ্গরা৷ সংযোগ ব্রিজ থেকে দক্ষিণে
    -বৈলঘর, হাটখোলা, সাহগোদা, চন্দনাইল গ্রাম এবং উত্তরে
    –রাজাবাড়ী, ইসাপুরা, সাতমোড়া, বাউচাইল,শাহপুর গ্রাম রেখে ঠিক পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে পিপিরা বাজার নৌকা ঘাটে তিতাস নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

    এক সময় এই খালের পানিতে ভেসে যেত নানান প্রজাতির মাছ।গায়ের আবাল,বৃদ্ধ, বনিতা অদের খাল থেকে দেশি প্রজাতির শিং,পুটি,টাকি,মাগুর, কৈ,ভেদা,কাইক্কা,চিংড়ী, শৌল ইত্যাদি মাছ ধরত।।অদের খালে দেখা যেত খরজাল,কনিজাল,ময়াজাল ও পেলুন।বর্ষা শেষে কখনো কখনো ঘোলাপানিতে পলো দিয়ে মাছ মারারও ধূমপড়ে যেত।বর্ষাকালে জোয়ার ভাটার পানিতে ভেসে যেত কচুরিপানা,বাঁশের ভেলা,কলা গাছের ভেলা।দুই পাড়ের ছেলে মেয়েরা সাঁতার কেটে এপার থেকে ওপারে যেত। ভেসে বেড়াত কলা গাছের ভেলায়। বর্ষাকাল জুড়ে নানা রকম পণ্যবাহী নৌকা আসা-যাওয়া করত এই পথ ধরে। বরদাখাত এবং নুরনগর পরগনার মানুষজনের নৌপথে আসা যাওয়া এবং পণ্য পরিবহনের জন্য এটিই ছিল প্রধান জলপথ। দাড় বাওয়া, গুণ টানা,বৈঠা বাওয়া, ডিঙ্গা,কুষাসহ হরেক রকমের নৌকা রাত দিন আসা যাওয়া করত। নৌকা বাইচ, দূর পথে পাড়ি জমানো গয়না, নতুন বর কনের সাঁজোয়া নৌকা, নাইওরির ছয়া ওয়ালা নৌকার মাঝি মাল্লাদের হাঁকডাক আর বেসুরো গানও শোনা যেত। আখাউড়া উপজেলার খড়মপুরের কল্লা সৈয়দ গেছুদারাজ (রঃ)শাহের মাজারে বরদাখাত পরগনার ভক্তগণ নেচে গেয়ে ঢোল বাদ্য বাজিয়ে এই পথ ধরে নৌকাযোগে আসা যাওয়া করত।হাসের পালের মত একটির পিছনে একটি করে আসতো বেদে নৌকার বহর।

    অবৈধ দখলের কারণে খালের প্রশস্ততা কমে নৌ চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি হচ্ছে।
    স্থানীয় প্রভাবশালীরা খাল দখল করে দোকান ঘর,অবৈধ স্থাপনা নির্মান করায় খালটির সৌন্দর্য দিন দিন বিনষ্ট হচ্ছে।

    আমার শৈশব এবং কৈশোরে অদের খালের উত্তর পাড়ধরে কালীগঞ্জের বাজার থেকে উত্তর বাঙ্গরা যাওয়া আসা করতাম।খালপাড়ে সুন্দর মেঠোপথ ছিল।আজ সেই অদের খাল আছে।কিন্তু সেই অদের খাল আগের মতো থাকলেও,পাড় এবং পাড়ের উপর দিয়ে সেই পথের কোনই অস্তিত্ব নেই!আর তা অনেক ব্যথিত করে আমায়!

    “মুগ্ধতায় ভরা শৈশবের স্নান পাত্র অদের খাল;
    কৈশোরে বিছায়েছ এ কী ভাবনার অন্তর্জাল!
    সরোবরের স্ফটিক জলের সাথে ছিল আড়ি
    মোহাবিষ্ট ঘোলা জলের প্রেমে খাল পাড়ের বাড়ি।।
    এ পথে নাইওরী কন্যা-নব বধূর কান্নার সুর লহরী
    কত পারাপার,সওদা ভরি যায় মহাজনের তরী।।
    বেদেনী বায় নাও,বেদে পিছনে বসে হাল ধরে থাকে
    মৎস্য শিকারে কৈবর্ত-জেলে খালের বাঁকে বাঁকে।।

    “সম্প্রীতির বন্ধনে তব জলে চলে কত নাও
    বিনি সুতায় বাঁধিয়াছ দুই পাড়ের কত গাঁও!!
    বর্ষা জুড়িয়া থাকে ঝাকে মিঠা পানির মাছ
    শীত বসন্তে কৃষক কুল করে থাকে ধান চাষ।।
    তব কাদাজলে খেলব বলে সখা সখিরা মিলে
    মায়ের শাসন-বকুনি ফেলে ছুটে গেছি কত ছলে।।
    অর্ধেক পৃথিবীর লোনাজল,কাকচক্ষু জল,নীল পানি;
    স্বচোঁখে দেখেছি,অন্তরে তোমার ঘোলাজলের হাতছানি।।

    কত হাবুডুবু খেয়েছি জলে,কেড়ে না নিলে শেষ নিঃশ্বাস;
    পাড়ে দিলে ঠেলে,তাই তব জলে আমার এত বিশ্বাস।।
    শহুরে জীবনে যখন ফর্সা আকাশ ডেকে বৃষ্টি নামে,
    আমি ভাবি তোমার বুকে চিপাখাল,পাবদা বিলের পানি নামে।।
    ভেসে যায় খেরপাড়া,ডুবে যায় কচুক্ষেত,ভাসছে পাতি হাস,
    পেশাগত জীবনেও কী তাই,জলের কাছাকাছি করি বসবাস?”

    কোন কারণে এ খাল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার কৃষক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বন্ধ হয়ে যাবে দেশের একটি অঞ্চলের খাদ্যশস্য উৎপাদন।

    ★ছবিটি ২০০৬ সালে অদের খালের মাঝে,বল্লভপুর আইডিয়াল স্কুল বরাবর নকিয়া-৩৩১০ সেট থেকে তোলা।

    💻Copyright@এস এম শাহনূর
    smshahnoor82@gmail.com
    (তথ্য সংগ্রাহক,লেখক ও গবেষক)

    তথ্যসুত্রঃ
    ★মরহুম শাহাদাৎ হোসেন চাঁন মিয়া
    ★মরহুম আবুল বাশার ভূঁইয়া।
    ★ডা.মাসুদুর রহমান (সাতমোড়া-মুন্সীবাড়ী)।
    ★অদের খাল কবিতা
    ★গুগল ম্যাপ।
    ★মাঠ পর্যায়ে ব্যক্তিগত সংগ্রশালা।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম