• শিরোনাম


    শিশু-তরুণদের মানসিক সমস্যার জন্য দায়ী স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট

    | ০৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ

    শিশু-তরুণদের মানসিক সমস্যার জন্য দায়ী স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট

    বর্তমানে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি নির্ভরশীলতা বেশ লক্ষণীয়। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্করা এই ডিভাইসের প্রতি আসক্ত। এতে করে যেমন সময়ের অপচয় হয় ঠিক তেমনি এর প্রভাবে শারীরিক বিভিন্ন ক্ষতির শিকার হন ডিভাইস ব্যবহারকারীরা। বিশেষ করে শিশুরা স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। অনেক সময় দেখা যায় যে, শিশুরা কিছু খেতে চায় না যদি তাকে ডিভাইস না দেয়া হয়। টেলিভিশনের পর্দা, মোবাইলের ডিসপ্লে, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের ডিসপ্লের প্রতি শিশুরা অধিক সময় দেয়। শিশুদের এমন আকৃষ্টতাকে বিশেষজ্ঞরা আসক্তি বলে অবিহিত করেছেন। এটি একটি আসক্তিকর বিষয়ই নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। আমাদের এবারের আয়োজন শিশু-তরুণদের মানসিক সমস্যার জন্য স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের ভূমিকা নিয়ে। বিস্তারিত লিখেছেন মাহবুব শরীফ

    শিশু থেকে তরুণরা মানসিক ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠছে। এই সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ট্যাবলেট ও স্মার্টফোন। সমস্যাটির জন্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। ডিজিটাল স্ক্রিনে মাত্র এক ঘন্টা সময় ব্যয় করলে বাচ্চারা উদ্বিগ্ন ও বিষন্ন হতে পারে। ফলে, তাদের নিজেদের প্রতি নিয়ন্ত্রণ, কাজ করার প্রবণতা, মানসিক স্থিতিশীলতা কমে যায়। যদিও এই সমস্যাগুলোতে সাধারনত তরুণরাই বেশি আক্রান্ত। তদুপরি, ১০ বছরের নিচে বাচ্চাদের মস্তিস্কের জন্য এটি মারাত্মক ক্ষতিকর। একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ব্রিটিশ শিশুরা প্রতিদিন প্রায় ৫ ঘন্টা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহারে পিছনে সময় দেয়। সানদি ইয়োগো স্টেট ইউনিভার্সিটি ও জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা যৌথভাবে বলেন, ‘স্মার্টফোনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ যা, পরিহারযোগ্য।’



    মানসিক ও স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কিত বিষয়গুলো সনাক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এর কারণ হলো এই সমস্যা চিহ্নিত করা কঠিন ও ঝামেলার। কীভাবে শিশু ও কিশোররা তাদের অবসর সময় কাঁটায়। তাদের এমন অভ্যাসজনিত বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মা-বাবা ও শিক্ষকদের শিশুদের জন্য অনলাইনে থাকার সময়, টেলিভিশন দেখার সময়, খাবার সময় এবং খেলা-ধুলার সময় নির্ধারন করে দিতে হবে।

    অধ্যাপক টোয়েন তার গবেষণায় বলেন, ‘দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য প্রতি দিন এক ঘন্টা করে ডিজিটাল পর্দার জন্য নির্ধারন করে দেয়া প্রয়োজন।’ তার সবগুলো উক্তির মধ্যে অন্যতম। তিনি তার গবেষণায় আরো বলেছেন, ‘স্কুলে যাওয়া শিশুদের, কিশোরদের ও প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে নির্ধারন করে দেয়া উচিত্।’

    ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য জড়িপের জন্য দেশব্যাপী ৪০ হাজার ২ থেকে ১৭ বছরের বয়সীদের বাবা-মায়ের প্রদত্ত মন্তব্যের বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। জড়িপে, শিশুদের চিকিত্সা, মানসিক সমস্যা, ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয়কৃত সময়, উন্নয়মূলক ও আচরণগত দিক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।

    চলতি বছরের আগস্ট মাসের হিসেব অনুযায়ী বছরে এক তৃতীয়াংশ কিশোর একটি বইও অনলাইনে পড়েনি। অন্যদিকে, কিশোররা সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেক বেশি গ্রহণ করছে। ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোররা মাত্র ১৬ শতাংশ প্রতিদিন একটি করে বই পড়ে। ১৯৭০ সালের জড়িপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ কিশোর শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ছিল। ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী মাত্র ২ শতাংশ প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়ে যা ১৯৯০ সালের দিকে ৩১ শতাংশ ছিল। গবেষণাটিতে আরো বলা হয়েছে, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের প্রবনতা বেড়েছে। তারা প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে।

    স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় আরো দেখা যায়, তরুণরা বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় দিলেও শিক্ষামূলক সাইট, বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিনের প্রতি কম সময় দিচ্ছে। সময় এখন ডিজিটাল মিডিয়ার! অনলাইনে সময় কাঁটাতে হলে বই অথবা টিভি দেখেও তা কাঁটানো যায়। শিক্ষামূলক সাইটগুলোতে ভিজিট করলে কিশোর বয়সীদের জন্য তাদের পঠ্যবইগুলো আয়ত্ব করতে সহায়তা হবে।

    আমেরিকান একাডেমি অব পেডিকক্ট্রিকস ২ থেকে ৫ বছরের শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি সময়সীমা ৬০ মিনিট নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাদের মতে, সকল শিশু বা ছোটদেরকে যেকোনো উপায়ে প্রযুক্তির আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে।

    একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম ঘুমায় এবং স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে তারা অধিক সময় ব্যায় করে। এই আচরণগুলো রাতেও প্রভাব ফেলে সঙ্গে সঙ্গে দিনেও এর অধিক প্রভাব লক্ষণীয়। যা একটি মানুষের জন্য স্বাভাবিক ঘুম চক্রের জন্য উপযুক্ত নয়। গবেষণায় আরো দেখা গিয়েছে প্রতি এক ঘন্টায় প্রায় ১৫ মিনিট স্মার্ট ডিভাইস শিশুদের দখলে থাকে এ কারণে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের ঘুম নষ্ট করে। অবশ্যই এই ধরণের আচরণের ভাল ফলাফল আশা করা যায় না।

    অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ সময়ই শিশুরা স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আসক্ত থাকে। এই ধরণের শিশুরা অনেক দেরীতে কথা বলতে শিখে। ডা. ক্যাথেরিন বির্কেন সিএনএন-এ তার গবেষণার কথা জানিয়েছেন এবং এবিষয়ে আরো গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন। বস্তুত; তার এই গবেষণা কার্যের শেষে এটির নাম দিয়েছে স্ক্রিন নির্ভরতা ব্যাধি। এই উপাধিটি নিঘুরভাবে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তদেকেও দিয়েছেন।

    বর্তমানে শিশুদের এমন আসক্তির বিষয়ে আমরা সবাই জানি। প্রথমে তারা স্মার্ট ডিভাইস পেলে তা আবিষ্কার করতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে এই ডিভাইসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। মাল্টি ফাংশন অ্যাপস ও অ্যাপভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগের মাত্রা বেড়ে যায়।

    যে শিশুরা এই ব্যাধিকে ভোগে, আস্তে আস্তে তাদের শরীরের ওজন কমতে থাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। এছাড়াও অনিদ্রা, মাথা ব্যাথা, পুষ্টিহীনতা, দৃষ্টি শক্তির সমস্যাসহ অনেক রোগেই শিশুদের আক্রমণ করতে পারে। এই ধরণের শিশুরা উদ্বিগ্নতা, একাকীত্ববোধ করা, অপরাধজনিত ও অপ্রত্যাশিত আবেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। যাদেরকে এই ব্যাধিতে আক্রমণ করেছে তাদের মধ্যে স্ব-বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ ও একঘেয়েমী কাজ করে।

    এই উপসর্গগুলো সাধারণত ডিভাই ব্যবহারের ফলেই বেশি হয়ে থাকে। আপনি তাদের নির্ভরশীল ও আসক্তিমূলক আচরণ লক্ষ করতে পারেন। এড়াও তাদের গ্যাজেট পরিচালনার ব্যায় ও সময় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য শুনতে পারেন। শিশুরা ডিভাইসের বাইরের বাস্তবতা সম্পর্কে আগ্রহ হারাতে শুরু করতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ গ্রহণের পরও তাদের ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত রাখা কষ্টকর হতে পারে।

    অধিকাংশ বাবা-মায়ের জন্যই এর ফলাফলা হবে ভয়াবহ। যেকোনো শিশুই হোক; যে নিয়মিত পরিবারকে সময় দিতে পারে না ধরে নিতে হবে ওই শিশুটিই এই ধরণের ব্যাধিতে আক্রন্ত। এই ধরণের আচরণ দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। আপনার পারিবারিক ডাক্তার এর আগেও হয়তো এই ধরণের সমস্যা সম্পর্কে জেনেছেন। ডাক্তার আপনার শিশু সম্পর্কে আরো কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে আপনাকে যা আপনার শিশুর অস্বাভাবিক অচরণের অংশও হতে পারে।

    যেহেতু গ্যাজেটের অতিরিক্ত আসক্তি অ্যালকোহল আসক্তির মতো প্রভাব ফেলে। এ কারণে মস্তিকে ব্যপক প্রভাব পরতে পারে যা মস্তিষ্ক বিকাশে বাধাদানও করতে পারে। শিশুদের বিকাশ নির্ভর করে তার নিয়ন্ত্রণের ওপর। মস্তিষ্কের যে অংশটি সহমর্মিতা ও সমবেদনার জন্য ভূমিকা রাখে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ডিজিটাল স্ক্রিন আসক্তির ফলে।

    বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি নতুন ধারণা। এই সমস্যাকে আর সামনের দিকে এগুতে দেয়া যাবে না। কম বয়সীদের জন্য গ্যাজেট ব্যবহারের উপযোগী বেশ কিছু ডাউন সাইট রয়েছে। অন্যদিকে এটিও বলা হয়েছে যে, বর্তমান শতাব্দিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে সক্ষম হবে। লেখার দক্ষতায় সবাই সমান নয়। লেখার ক্ষেত্রে একটি স্মার্ট কলমের চেয়ে একটি পেন্সিল বেশি ভূমিকা পালন করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনিটরিং ফর ফিউচার স্টাডি নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণার ফলাফলে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটি প্রতি বছর আমেরিকাতে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৫০ হাজার শিক্ষার্থীদের নিয়ে গবেষণা করে। গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় ব্যয় করা ও সুস্থতার দিক দিয়ে শিশুদের তুলনায় কিশোররা বেশি আক্রান্ত।

    অধ্যাপক টুয়েন বলেন, ‘প্রথমে আমি অবাক হয়েছি এই ভেবে যে, কিশোরদের জন্য বড় আসঙ্কা ছিল। তবে, তরুণ ও কিশোররা স্মার্টফোনে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাঁটায়। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গিয়েছে শিশু ও কিশোররা ডিজিটাল স্ক্রিনে টেলিভিশন এবং ভিডিও দেখার কাজে বেশি সময় ব্যয় করে।’

    সূত্র :ডেইলি মেইল

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম