• শিরোনাম


    শায়খুল হুফফাজ আল্লামা নূহ কাসেমী (রাহঃ) এর জীবন ও কর্ম

    | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:৪৫ অপরাহ্ণ

    শায়খুল হুফফাজ আল্লামা নূহ কাসেমী (রাহঃ) এর জীবন ও কর্ম

    আজ থেকে আঠারো বছর পূর্বে, ২০০০ সালের কোনো এক মুহূর্তে, একজন স্বপ্নচারী শিক্ষক তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি শুরু করেছিলেন। এক পড়ন্ত বিকেলে কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে তিনি আরম্ভ করেছিলেন কুরআন পাঠের এক অবিরাম অনুশীলন; “কুরআন মশক” বলে যা আমাদের কাছে সহজেই পরিচিত। তার শিক্ষাদানের মাধ্যমে কুরআন হিফজের পাশাপাশি বিশুদ্ধরূপে কুরআন তিলাওয়াত করে হাজারো হাফেজে কুরআন পৃথিবীব্যাপী নির্মল তিলাওয়াতের সুর ছড়িয়ে দিয়েছেন। রেডিও চ্যানেল থেকে দেশী-বিদেশী কারীদের কিরাত রেকর্ড করে, এবং একক সাধনায় তাজভীদের বিভিন্ন কায়দা রপ্তের মাধ্যমে সেই মহান শিক্ষক ‘মশক’-এর যে রীতিনীতি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন, এর সুফল ভোগ করে আজ অগণিত কুরআন-পাঠক বিশুদ্ধভাবে কুরআন অধ্যয়ন করে যাচ্ছেন।

    কিছু মানুষ সাধারণ পরিচয়ে অনেক অসাধারণ কাজ করে যান। কতিপয়ের কাছে তাদের কাজ অস্বীকৃত থাকলেও, মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন- সেই মহান সত্ত্বার কাছে তারা হন অমূল্য-বরণীয়। জান্নাত এবং স্রষ্টার সন্তোষের মাধ্যমে সে মানুষগুলোর চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হয়। আমাদের আলোচ্য কীর্তিমান মানুষটিও সরল জীবন-যাপনে স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টিকে আপন করে নিয়েছিলেন। অন্ধকারে হোঁচট খেলে যেমন চাঁদের অভাব অনুভূত হয়, তেমনি গুণীজনের মৃত্যুতে তাঁদের কীর্তিগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠে। সে-কারণে একাধারে বিশ বছর কুরআনের সেবা করে যাওয়া একজন অনবদ্য হাফেজে কুরআন বারবার আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে উঠেন। তাঁর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কার্যভার আমাদের জন্য প্রেরণা ও শক্তির উৎস বনে যায়। শিক্ষা ও জ্ঞানাহরণে আমাদের জীবনে তাঁর যে অবদান- সেটিকে আমরা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি।



    ১৯৭৩ সালের ১৫ই জুলাই, রোজ শুক্রবার তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পূর্ণ নামঃ যুবাইর আহমদ নূহ কাসেমী। পিতাঃ আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক (রহ)। মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর পবিত্র কুরআন-হিফজ সম্পন্ন হয়। নূরানি-মক্তব ও কুরআন-হিফজের সকল পাঠ তিনি তাঁর পিতার নিকটই গ্রহণ করেন। অতঃপর ধর্মীয় ও আবশ্যিক জ্ঞান লাভের ইচ্ছায় তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলুম ভাদুঘর’-এ ভর্তি হন। “জামাতে তাইসীর” থেকে “নাহবেমীর” পর্যন্ত উক্ত প্রতিষ্ঠানেই তিনি পাঠ লাভ করেন। অতঃপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান “সানী জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া সৈয়দাবাদ” মাদরাসায় ফিকহে হানাফীর গুরুত্বপূর্ণ কিতাব “হিদায়া” পর্যন্ত অধ‍্যয়ন করেন। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন শ্রেণীতে পড়াশোনার জন্য তিনি ঢাকার অভিজাত দ্বীনী প্রতিষ্ঠান “জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া’তে ছুটে যান। দু’টো বছর সুনাম ও কৃতিত্বের সঙ্গে সেখানে “জালালাইন” ও “মিশকাত” জামাতে অধ্যয়ন করে সবশেষে নিজের পরম স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে পা বাড়ান। কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর “দাওরায়ে হাদিস” সম্পন্ন করার জন্য তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ ভারতের “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নিষ্ঠা ও আনুগত্যের মাধ্যমে উক্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভে ধন্য হন। “দাওরা” বা “তাকমীল” শেষে পিতার আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদে তিনি দেশে চলে আসতে বাধ্য হন।

    মা-বাবা, চার ভাই, চার বোনের সংসারে নূহ কাসেমী (রহ) ছিলেন পরিবারের তৃতীয় সন্তান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন। জিব্রাইল, নাবিল, জামিল- তাঁর আদরের তিন পুত্র। হুমায়রা, হুযায়মা ও বারীরা তাঁর প্রিয় তিন কন্যা। কর্মজীবনে যুবাইর আহমদ (রহ) “জামিয়া কাসেমুল উলূম মাদানিয়া, কাশিপুর’ মাদরসায় সর্বপ্রথম শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। অতঃপর “জামিয়া ইসলামিয়া মদীনাতুল উলূম, সোনারামপুর” মাদরাসায় আগমন করেন। মূলত এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তাঁর নিয়মতান্ত্রিক পাঠদান শুরু হয়। বছর তিনেক এ প্রতিষ্ঠানে তালিম দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিদ্যাপীঠ “জামিয়া ইসলামীয়া ইউনুসিয়া”র হিফজ বিভাগের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। মৃত্যুবধি এখানেই তাঁর নিবিড় শিক্ষাদান চলতে থাকে। তিনি একাধারে শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু ও পথের দিশারী ছিলেন। দেশ-বিদেশের সুপরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর ছাত্রদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। ছিলেন একজন পরোপকারী কোমল হৃদয়ের মানুষ। লোকদেখানো সফলতার চেয়ে সততার সঙ্গে কর্ম পালনেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।

    সারা দেশের হিফজ বিভাগ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হিফজ জগতে তিনি ছিলেন দীপ্তিমান আশার আলো। “হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন, চট্রগ্রাম বিভাগ”-এর শিক্ষা সম্পাদক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন মাওলানা যুবাইর আহমদ নূহ কাসেমী (রহ)। জনপ্রিয় ইমাম ও খতিব হিসেবে “জামিয়া ইউনুসিয়া”তে একনাগাড়ে তিনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁর নানাবিধ কর্ম-কৃতিত্বে চারপাশের মানুষগুলো সহজেই তাঁর অনুরক্ত হয়ে উঠে। বর্তমানে প্রচলিত “কুরআন মশক”-এর অন্যতম পথপ্রদর্শক হাফেজ যুবাইর আহমদ কাসেমী (রহ) সগোত্রীয় শিক্ষক মহলের বেতন-বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মানব কল্যাণে নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিতে কখনোই কার্পণ্য করেন নি এই দরদী আলেম। ২০১৭ সালের ৫ই মার্চ, রবিবার দিবাগত রাত সোয়া এগারোটায় অগণিত ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মাওলায়ে কারীমের দরবারে উপস্থিত হন।

    আমি অধম (সম্পাদক) হযরতের কাছে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে হিফজুল কোর-আনের দাওর শুনিয়ে নিজেকে তাঁর ছাত্রদের কাফেলায় নাম লেখানোর সুযোগ হয়েছিল।

    সবার প্রিয় এই শিক্ষককে রাব্বে কারীম জান্নাতের উঁচু মকাম দান করুন। আমিন!!

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম