• শিরোনাম


    লাইলাতুল কদর ও আমাদের করণীয়ঃ এস এম শাহনূর

    | ০১ জুন ২০১৯ | ৮:২৪ অপরাহ্ণ

    লাইলাতুল কদর ও আমাদের করণীয়ঃ এস এম শাহনূর

    লাইলাতুল কদর আরবি শব্দ।আরবি : ﻟﯿﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুল’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ ছাড়া এর অন্য অর্থ হলো—ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা।শবেকদর হলো ‘লাইলাতুল কদর’-এর ফারসি পরিভাষা।পবিত্র মাহে রমজানের কোন রাত্রিতে ‘লাইলাতুল কদর’ তা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাত গুলোতে কদরের রাত খোঁজ করো” (বুখারী)।
    প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত উবাই ইবনে কাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, তা হল রমজানের ২৭ তম রাত” (মুসলিম)।
    অন্যদিকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমজানের ২৭ তম রজনীতে অনুসন্ধান করে” (আহমাদ)।
    প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ইমাম আ‘যম আবু হানিফা নোমান বিন সাবেত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সহ প্রাজ্ঞ ইসলামিক স্কলারগণ বলেন, সূরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয় ৩বার এসেছে, আর ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি আরবিতে লিখতে ৯টি অক্ষর ব্যবহার হয়। তাই ৩×৯=২৭, তথা ‘লাইলাতুল কদর’ রমজানের ২৭ তম রমজান (২৬তম রমজান দিবাগত রাত্রি)।
    মুসলিম বিশ্বের সকলেই ঐক্যমত যে, রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রজনীগুলোতে ‘লাইলাতুল কদর’ তালাশ করতে হবে ও এ উদ্দেশ্যে বিশেষ ইবাদত করতে হবে (তাফসীরে মাযহারী, আনওয়ারুল মিশকাত)।

    মোট কথা এ মহামান্বিত ‘লাইলাতুল কদর’ এর পরিপূর্ণ নেয়ামত আমাদের অর্জন করতে হবে। কোনো ক্রমেই এ রজনী তে হেলায়-খেলায় আর খোশগল্পে কাটানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।



    এ রাত্রিতে বেশি বেশি নফল নামায, ইস্তিগফার, সালাতুস তাসবিহ, সালাতুল হাজত, জিকির-আজকার, কুরআন তিলাওয়াত, দুরূদ শরীফ পাঠ, কবর জিয়ারত ও দান-সদকা গুরুত্বপূণ আমল। হাদিসে লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থাকাকে সুন্নাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

    আল্লাহতাআলা বলেছেন:
    ১. নিশ্চয়ই আমি এটি নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে।
    ২. তোমাকে কিসে জানাবে লাইলাতুল ক্দর কি?
    ৩. লাইলাতুল ক্দর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।
    ৪. সে রাতে ফেরেশতারাও রূহ (জিবরাইল) তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন।
    ৫. শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।” [সূরা আল কদর, ৯৭: ১-৫]

    আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে এবং প্রতিদানের আশায় লাইলাতুল ক্দরে নামায পড়বে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”[সহীহ বুখারী (১৯০১) ও মুসলিম (৭৬০)]
    হাদিসে“ঈমান সহকারে”কথাটির অর্থ হচ্ছে- এই রাতের মর্যাদা ও বিশেষ আমল শরিয়তসম্মত হওয়ার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। আর “প্রতিদানের আশায়” কথাটির অর্থ হচ্ছে- নিয়্যতকে আল্লাহ তাআলার জন্য একনিষ্ঠ করা।

    এ রাতে আমাদের করণীয়ঃ
    কুরআন অধ্যয়ন :
    সমগ্র মানব জতির মহা মুক্তির সনদ পবিত্র কুরআন এ রাতেই নাজিল হয়েছে। এ বিরাট নিয়ামতের কারণেই এ রাতের এত মর্যাদা ও ফজিলত। এ কুরআনকে ধারণ করলেই মানুষ সম্মানিত হবে, দেশ ও জাতি মর্যাদাবান হবে; গোটা জাতির ভাগ্য বদলে যাবে। কাজেই এ রাতে অর্থ বুঝে কুরআন পড়তে হবে।

    কিয়ামুল লাইল :
    ‘কিয়ামুল লাইল’ অর্থ হলো রাত্রী জাগরণ। মহান আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় হারাম করে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুণ। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাহদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে- ‘তারা রাত্রি যাপন করে রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে’ (সূরা-ফুরকান-৬৪)।
    ‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক থাকে (অর্থাৎ তারা শয্যা গ্রহণ করে না; বরং এবাদতে মশগুল থাকে)। তারা (গজবের) ভয়ে এবং (রহমতের ) আশায় তাদের রবকে ডাকতে থাকে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করে থাকে। কেউ জানে না। তাদের আমালের পুরস্কারস্বরূপ (আখিরাতে) তাদের জন্য কী জিনিস গোপনে রাখা হয়েছে’ সূরা-সিজদা-১৬-১৭)

    নফল নামাজ :
    ন্যূনতম ১২ রাকাত থেকে যত সম্ভব পড়া যেতে পারে। এ জন্য সাধারণ সুন্নতের নিয়মে দুই রাকাত নফল পড়ছি। এ নিয়তে নামাজ শুরু করে শেষ করতে হবে। এ জন্য সূরা ফাতেহার সাথে আপনার জানা যেকোনো সূরা মিলাইলেই চলবে। এ ছাড়া সালাতুল তওবা, সালাতুল হাজত, সালাতুল তাসবিহ নামাজও আপনি পড়তে পারেন। রাতের শেষভাগে কমপে আট রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করব। কারণ এ নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ নফল নামাজ। আর রাতের এ অংশে দোয়া কবুল হয়।

    জিকির ও দোয়া :
    হাদিসে যে দোয়া ও জিকিরের অধিক ফজিলতের কথা বলা হয়েছে সেগুলো থেকে কয়েকটি নির্বাচিত করে অর্থ বুঝে বার বার পড়া যেতে পারে। ইস্তেগফার (মা প্রার্থনা) ও দরুদ আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার ও ১০০ বার দরুদ পড়া যেতে পারে।
    হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি বলে দিন, আমি যদি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?
    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলবে-
    ﺍﻟﻠَّﻬُﻢَّ ﺇِﻧَّﻚَ ﻋُﻔُﻮٌّ ﺗُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻌَﻔْﻮَ ﻓَﺎﻋْﻒُ ﻋَﻨِّﻲ
    উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওয়ুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।
    অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালো বাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

    আত্ম সমালোচনা :
    মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদার লোকেরা, আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য (পরকাল) সে কী প্রেরণ করেছে তা চিন্তা করা’(সূরা হাশর-১৮)।
    রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের জন্য আত্মমূল্যায়নসহ লাইলাতুল কদরে জাগ্রত হয়ে ইবাদত করবে, তার পূর্বেকার সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে” (বুখারী)।জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল্লাহর কতগুলো হুকুম অমান্য করেছেন, আল্লাহর ফরজ ও ওয়াজিবগুলো কতটা পালন করেছেন, ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় কী কী বড় গুনাহ আপনি করে ফেলেছেন, আল্লাহর গোলাম হিসেবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আপনি কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন- এগুলো ভাবুন, যা কিছু ভালো করেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, আর যা হয়নি তার জন্য আল্লাহর ভয় মনে পয়দা করুন, সত্যিকার তওবা করুন।

    মুনাজাত :
    মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি এতটাই অনুগ্রহশীল যে, তিনি তাঁর কাছে না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। ‘যে আল্লাহর কাছে কিছু চায় না আল্লাহ তার ওপর রাগ করেন।’ (তিরমিজি)। ‘দোয়া ইবাদতের মূল’- (আল-হাদিস)। ‘যার জন্য দোয়ার দরজা খোলা তার জন্য রহমতের দরজাই খোলা রয়েছে’- (তিরমিজি)। কাজেই আমরা কায়েমনোবাক্যে আল্লাহর দারবারে মুনাজাত করব, মা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব। মনের আবেগ নিয়ে চাইব। চোখের পানি ফেলে চাইব। আল্লাহ আমাদের খালি হাতে ফেরাবেন না ইনশাআল্লাহ। রাসূল সা:-এর বাণী আশার আলো জ্বেলেছে হৃদয়ে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের পরোয়ারদিগার লজ্জাশীল ও দাতা; লজ্জাবোধ করেন যখন তাঁর বান্দা তার কাছে দুই হাত ওঠায় তখন তা খালি ফিরিয়ে দিতে’- (তিরমিজি, আবু দাউদ, বায়হাকি- দাওয়াতে কবির)।

    হে আল্লাহ আমাদের সকলকে লাইলাতুলকদর নসীব করুন।আমিন।

    💻এস এম শাহনূর
    (উইকিপিডিয়ান,লেখক ও গবেষক)

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম