• শিরোনাম


    রমজানের শেষ দশকের ফজিলত ও তাৎপর্য [] আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান হাফিজাহুল্লাহ

    সংগ্রহে : মুফতি মুহাম্মদ এনামুল হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি | ১৫ মে ২০২০ | ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

    রমজানের শেষ দশকের ফজিলত ও তাৎপর্য [] আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান হাফিজাহুল্লাহ

    الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن والاه، أما بعد،

    সম্মানিত পাঠক, একটু বলুন তো, আমাদের কোনো চাকুরীজীবি বন্ধুকে যদি বলা হয়, আপনার জন্য এই মাসে এমন একটি বিশেষ দিবস আছে, এই দিবসে আপনি যদি আপনার মালিককে আপনার কর্ম ও নিষ্ঠা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারেন তাহলে আপনাকে এই এক দিনের বিনিময়ে দশ বছরের অথবা পাঁচ বছরের বা তিন বছরের সমপরিমাণ বেতন দেওয়া হবে, তাহলে বলুন তো, সেই চাকুরীজীবি বন্ধু ঐ দিনের বিষয়ে কী পরিমাণ যত্নবান হবে?! কত ভাবে তার মালিককে সন্তুষ্ট করার প্রয়াস চালাবে?!



    এবার সম্মানিত পাঠক, আমাদের উপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দয়া ও অনুগ্রহ কত অপরিসীম, আমরা এটা কল্পনাও করতে পারি না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতভাবে যে বান্দার প্রতি মমতা ও ভালোবাসার আচরণ করেন, এসব আমরা ভেবেও শেষ করতে পারবো না।

    বছরের বারো মাসের মধ্যে একটি মাস, রমজান মাসকে আল্লাহ বিশেষভাবে মর্যাদাবান করেছেন, অন্যান্য মাসের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তেমনিভাবে রমজানের দুই দশকের তুলনায় শেষ দশকে আল্লাহ তাআ‘লা বিশেষ ফযীলত রেখেছেন। এই দশকে বান্দাদের উপর আল্লাহর দয়া ও করুণা অঝোর ধারায় বর্ষিত হয়ে থাকে।

    হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী এই শেষ দশকেই লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে আল্লাহ বলেছেন, এই শেষ দশকেরই কোনো এক রাত হয়ে থাকে। এই জন্য আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দশ দিনের আমলের বিষয়ে অত্যন্ত যত্নবান হতেন।

    আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর বিবরণটি শুনুন, কী চমৎকার অলঙ্কারমণ্ডিত প্রকাশ,

    عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ‏.‏

    রমযানের শেষ দশক যখন শুরু হতো, তখন তিনি (পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে) কোমর বেঁধে আমল-ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। রাতভর জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগী করতেন। সে সময় তো তিনি তার পরিবারের লোকদেরকেও নামাজের জন্য, ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৭৪)

    বস্তুত রমযানের শেষ দশকের ফযীলত ও উপকার লাভের জন্যই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই উদ্যোগ-আয়োজন। মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আম্মাজান আয়েশা রাযি. এরই বর্ণনা,

    كانَ رَسولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ يَجْتَهِدُ في العَشْرِ الأوَاخِرِ، ما لا يَجْتَهِدُ في غيرِهِ.

    আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ দশকে আমল-ইবাদতের এত সাধ্য-সাধনা করতেন যা রমযানের অন্য দিনগুলোতে করতেন না। সহীহ মুসলিম, হাদীস১১৭৫

    আমাদের সবারই করণীয় হলো, রমযানের বিশটি দিন তো চলেই গেলো, এখন আমরা যেন রমযানের ফযীলত অর্জনের ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হই, আরো বেশি তৎপর হই। যাদের সাধ্য আছে, আমরা ইতিকাফের নিয়ত করে মসজিদে চলে আসি।

    শেষ দশকে ইতিকাফের যে সুন্নত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দান করেছেন, তা মূলত এই শেষ দশকের ফায়দা লাভের জন্যই। লাইলাতুল কদর, যে রাতের বিষয়ে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, এই রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এই এক রাতের ইবাদতের ফযীলত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

    লাইলাতুল কদর ঠিক কোন রাত্রি, এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয় নি। তাহলে তো অনেক মানুষ অন্য কোনো দিনের ইবাদতের বিষয়ে যত্নবান না হয়ে শুধু একটি রাতের বিষয়েই যত্নবান হতে দেখা যেত। এই জন্য এই রাত্রিটিকে কিছুটা অস্পষ্ট রেখে দেওয়া হয়েছে।

    কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, কুরআন নাযিল হয়েছে লাইলাতুল কদরে। আবার অন্য এক আয়াতে এসেছে, রমযান হলো কুরআন নাযিলের মাস। তাহলে বোঝা গেলো, লাইলাতুল কদর রমযানেরই কোনো এক রাত হয়ে থাকে।
    এদিকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদীসে ইরশাদ করেন,

    تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

    তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো।

    অন্য হাদীসে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রের কথা আলাদাভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

    عَن عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ “‏‏.‏

    কোনো সৌভাগ্যবান বান্দা যদি আল্লাহর তাওফীকে লাইলাতুল কদরের রাত পেয়ে যায়, তাহলে তো সে হাজার মাসের, আশি বছরের বেশি সময়ের সওয়াব অর্জন করতে পারবে।

    তো ইতিকাফের সুন্নত এই জন্যই চালু হয়েছে, যেন শবে কদরের অন্বেষণের ক্ষেত্রে বান্দা আলাদাভাবে সচেষ্ট হতে পারে। এই সময় বান্দা দুনিয়ার সব ছেড়ে, সব ভুলে আল্লাহর ঘরে এসে পড়ে থাকবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করবে, বেশি বেশি তিলাওয়াত, যিকির ও নফল নামাজের বিষয়ে যত্নবান হবে, তাওবা-ইস্তিগফারের বিষয়ে, নিজের গুনাহের মার্জনার ব্যাপারে বেশি বেশি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবে।

    ইতিকাফের বিষয়ে ফিকহে ইসলামীতে আলাদা অধ্যায় রয়েছে। সেখানে এই বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর বিধানগুলো বিস্তৃত আকারে সন্নেবেশিত রয়েছে। একজন মু‘তাকিফ, যিনি ইতিকাফ করতে যাচ্ছেন, তাকে অবশ্যই ইতিকাফের বিধানসমূহ বিস্তারিত জানতে হবে, তাহলেই তার ইতিকাফ সুন্নাহ মোতাবেক হবে, আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার বেশি উপযুক্ত হবে।

    আল্লাহ যেন আমাদেরকে ভরপুর তাওফীক দান করেন। আমীন।

    ২০ রমজান ১৪৪১ হিজরী

    লেখক: মুহতামিম, জামিআ দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম