• শিরোনাম


    রবীন্দ্রনাথের মরণ ভাবনা [] মো: শাহ আলম শিকদার

    | ০৯ আগস্ট ২০২১ | ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

    রবীন্দ্রনাথের মরণ ভাবনা [] মো: শাহ আলম শিকদার

    জমিদার নন্দন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্যকালে মাতৃহারা হয়ে ঝি-চাকরদের নজরদারীতে লালিত পালিত হন। অকালে মাতৃস্নেহ হতে বঞ্চিত রবির মনে তাই মৃত্যু সম্পর্কে একটা তিক্ত অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার কথা। এতদসত্বেও মাত্র পনের/ষোল বছর বয়সে তিনি ভানু সিংহ ছদ্মনামে ‘ মরণ’ নামক যে কবিতাটি রচনা করেন তার প্রথম চরণটি হল, “মরণরে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।”
    এত অল্প বয়সে মরণকে আহ্বান করে তাঁর এ লেখাটি আশ্চর্যজনক (!) অভিব্যক্তিজ্ঞাপক।

    কিন্তু এর কয়েক বছর পরই ‘প্রাণ’ নামক কবিতায় তিনি লিখলেন-
    “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে,
    মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
    এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
    জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্হান পাই।”



    এটি তাঁর রসময় জীবনবোধের সাথে যথার্থভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপূর্ব ব্যাঞ্জনাময়।

    পরবর্তীকালে তাঁর অনেক নিকট আত্মীয়- স্বজনের বিচ্ছেদ বেদনাও তাঁকে সইতে হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়া তাঁর অনেক কবিতা ও গানে ফুটে উঠেছে। তন্মধ্যে ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায় মৃত্যুর অনিবার্য রূপ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,
    “মৃত্যু হাসে বসি। মরণপীড়িত সেই
    চিরজীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই
    অনন্ত সংসার, বিষন্ননয়ন-‘পরে
    অশ্রুবাষ্প-সম, ব্যাকুল আশঙ্কাভরে চিরকম্পমান।”
    আবার #মৃত্যু কবিতায় লিখলেন-
    “মৃত্যুও অজ্ঞাত মোর। আজি তার তরে
    ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে।
    সংসারে বিদায় দিতে আঁখি ছলছলি
    জীবন আঁকড়ি ধরি আপনার বলি দুই ভুজে।।”

    মৃত্যু কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুভয়কে এভাবেই তুলে ধরেছেন। কিন্তু একই কবিতায় তিনি আবার লিখেছেন–
    “জীবন আমার
    এত ভালবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়
    মৃত্যুরে এমনি ভালো বাসিব নিশ্চয়।।”
    অর্থাৎ জীবনকে অত্যন্ত ভালবাসা সত্বেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতেও তার মনে ছিল না সংশয়।

    #মরণমিলন কবিতায় কবি মৃত্যু সম্পর্কে লিখেছেন-
    “অত চুপিচুপি কেন কথা কও
    ওগো মরণ, হে মোর মরণ,
    অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,
    ওগো একি প্রণয়েরই ধরণ!”

    তাঁর রচিত বিভিন্ন গানেও স্রষ্টার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের মাধ্যমে নিজকে সমর্পণ করেছেন অনিবার্য মৃত্যুর কোলে। যেমন-
    “জীবন মরণের সীমানা পারায়ে
    বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে”
    অথবা-
    “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
    তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।”
    জীবনে মৃত্যু ও দুঃখের বহমান বিরহ দহন সত্বেও মৃত্যুকে তিনি চিরশান্তি ও আনন্দময় অনিবার্য পরিনতি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
    মৃত্যুকে তিনি কত সহজভাবে মেনে নিয়েছেন তা নিম্নে উল্লেখিত ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতার অংশটুকু পড়লেই বুঝা যায়।
    “মৃত্যু যেদিন বলবে ‘জাগো’ প্রভাত হল তোমার রাতি,
    নিবিয়ে যাব আমার ঘরের চন্দ্র সূর্য দুটো বাতি।”
    আবার #বিদায় কবিতায় তিনি লিখেছেন:
    “ক্ষমা করো, ধৈর্য ধরো, হউক সুন্দরতর
    বিদায়ের ক্ষণ,
    মৃত্যু নয়, ধ্বংস নয়, নহে বিচ্ছেদের ভয়,
    শুধু সমাপন-”

    জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আশি বছর বয়সে তিনি লিখলেন, “ধূসর গোধূলিলগ্নে” নামক কবিতা।
    “ধূসর গোধূলিলগ্নে সহসা দেখিনু একদিন
    মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত
    রক্ত সূত্রগাছি দিয়ে বাঁধা-
    চিনিলাম তখনি দোঁহারে।”

    মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি রচনা করেন শেষ বিদায় সঙ্গীত- “সমুখে শান্তি পারাবার,
    ভাসাও তরণী হে কর্ণধার-”
    গানটি রচনা ও সুরারোপের পর এটি তাঁর জীবদ্দশায় গাইতে বারণ করেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁরই শবযাত্রার পথে প্রথম গীত হয় এই শেষ বিদায়ের সুর।

    লেখক: মোঃ শাহ আলম শিকদার-
    অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
    ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম