• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম পর্ব (১ম অংশ)
    মা মা আমি চললাম।
    কি বলিস খোকা? নাস্তা রেডি, টেবিলে সাজানো আছে, খেয়ে যা।
    তোমার নাস্তা খেতে গেলে ম্যাডামের ক্লাস মিস হয়ে যাবে মা। আমি উনার ক্লাস মিস করতে পারবো না !
    হয়েছে এক ম্যাডাম, ম্যাডাম, ম্যাডাম ! মা বলে,
    তো ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠলেই পারিস? তাহলে এমন তাড়াহুড়ো হতো না, দেরি করিস কেন অমি ?
    মা, পড়তে পড়তেই একটু বেশি রাত হয়ে গিয়েছিল। তাই উঠতে দেরি হয়ে গেল।

    যাই হোক বাছা, না খেয়ে যাবি না, বলেই পরোটায় ডিম মিশিয়ে অমির মুখে অনেকটা জোর করেই চালান করলো মা। নিরুপায় অমি অনিচ্ছায় চিবুতে চিবুতে ভোঁ দৌড়। মা পেছন থেকে ডাকছিল, দ্যাখ দেখি জ্বালা, পানি মুখে দিয়ে যা অমি, ওহো রে ছেলে আমার। ঐ ম্যাডামের ক্লাস ক্লাস করেই ওর মাথাটা যাবে দেখি।



    অমি ওর সাইকেল বের করতে করতে বললো, থাক মা, কলেজে ক্যান্টিন আছে না? বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে পড়লো অমি। পেছনে মা এসে দাঁড়ালো একটু উদ্বিগ্নতা কিছুটা স্মিত হাসি নিয়ে, চেয়ে রইলো একদৃষ্টে ছেলের গমন পথের পানে, আর হঠাৎ হারিয়ে গেলেন যেন অজানার পথে… চেনা অদূরের মায়াময় ধূসরে রাঙা অতীতে…..!

    ঠিক এভাবেই সদা চঞ্চল এক মানুষ আসতো যেতো, মাতিয়ে রাখতো পুরো পরিবারকে, যেন পৃথিবী জুড়ে সুখ, সুখ আর সুখ, অন্য কিছুর স্থানই নেই তাঁর অভিধানে। তাঁর উপস্থিতি, তাঁর আত্মবিশ্বাস, ভালোবাসা, ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা, আপনজনের চাওয়া পাওয়া সব, সব বিষয়ে এক নিপুণ, উচ্ছল প্রাণবন্ত মায়াবী কারিগর ছিলেন মানুষটা। তাঁর বোঝপড়া ছিল অসাধারণ। কতদিন চুপিচুপি এসে পেছন থেকে চোখ চেঁপে ধরে আতঙ্কিত করেছে, আর ভীত বউকে শত আদরে পাগল করে দেওয়া…. তাঁর আত্মত্যাগ, কর্তব্যপরায়নতা, বাবা মার কাছ থেকে দূরে থেকেও বুঝতে পারেনি সালেহা সুলতানা । আর একদিন হঠাৎই নাই হয়ে গেলেন…. ভাবতে ভাবতে হাসিমাখা মুখমন্ডলে বিষাদের কালো ছায়া দেখা দিলো ! এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো অচম্বিতে। মহানের কাছে ফরিয়াদ জানালেন সালেহা সুলতানা, যেন তাঁর সন্তান ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন। সেই তো তার নয়নের মনি, বিধাতার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।

    বেশ কিছু রিক্সা, ভ্যানকে পেরিয়ে তার সাইকেল চলছিল পঙ্খিরাজের গতিতে। যে কোন মূল্যে তার ম্যাডামের ক্লাস শুরুর আগে পৌঁছা চাই। হাতে বাকী দশ মিনিট। রাস্তার পাশে বাচ্চাদের হাঁক ডাক, রাস্তার পাশঘেষে পায়ে চলা স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের গমনাগমনে ব্যস্ততা। ভাসমান দোকানিদের ফুটপাথে পসরা সাজানো চলছে। এরই মধ্যে অঘটন, এক তরকারিওয়ালার ভ্যানে ধাক্কা লাগলো সাইকেল। তরকারিওয়ালার সবগুলো সবজি রাস্তায় ও ড্রেনের পঁচা কাদায় লুটোপুটি খাচ্ছে। সাইকেল সহ সেও রাস্তার উপরে পড়ে গেল। কিন্তু ভাবার বা দেখার সময় কই ? হয়তো এতোক্ষণে ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন। কোন ভাবেই ম্যাডামের ক্লাস মিস করতে চায় না অমি। তড়িৎ সাইকেল টেনে তুলে দ্রুতবেগে সামনে এগোতে থাকল। যদিও পেছন থেকে তরকারিওয়ালার আর্তচিৎকার তার কানে আসছিল।
    রাস্তায় চলার সময় চোখ কি আকাশে থাকে? আমার কী সর্বনাশ করে গেলো গো? আজ আমার কী করে দিন যাবে? বাচ্চাদের কী খাওয়াবো?

    আর পথচারীরা বলাবলি করছিল, কী যুগ আসলোরে বাবা, আজকালকার পোলাপানরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। এই ধর ধর ছেলেটাকে, কিন্তু অমির মাথায় ছিল কলেজ আর ম্যাডামের ক্লাশ। সে তখন সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    কলেজ করিডোরে ঢুকে ডানে মোড় নিল সাইকেল, পাশে কলেজ ক্যান্টিনে তড়িঘড়ি একগ্লাস পানি পান করে সাইকেল পাশে স্টান্ড করে ক্যান্টিনবয়কে বললো, দেখিস ভাই সাইকেলটা,ক্যান্টিন বয় অবাক চোখে চেয়ে রইলো। কারন, কলেজের সব ছাত্ররা সাইকেল কলেজ গ্যারেজে মামার জিম্মায় রাখেন। আর অমি ভাইয়া এমন অনিয়ম করছে? সে ডাকলো, ভাইয়া….. অমি ভাইয়া….। অমির সময় কোথায়? ক্যান্টিন বয়কে বলেই সে কলেজের লবিতে পৌঁছলো, পরে সিঁড়িতে। লক্ষ্য তৃতীয় তলার তিন’শ তিন নম্বর, তড়াক করে তিনটি করে সিঁড়ি ডিঙোতে ডিঙোতে তিন তলার ৩০৩ তিন নম্বর রুমের পেছনে আসতেই হার্টবিট দ্বিগুণ হলো ! যেন সে স্পাইডার ম্যান, উড়ে চলেছে গন্তব্যে। কিছুটা স্বস্তিও বটে, অবশেষে পেরেছে অমি, হ্যাঁ যা ভেবেছিলাম তাই, তাহলে ম্যাডাম এসে পড়েছেন ক্লাসে ? ম্যাড্যাম বলছেন, রোল নম্বর দুই রনি ইসলাম, রনি বললো ইয়েস ম্যাম।অমি হ্যাঁপাচ্ছে, দৌড়াতে দৌড়াতে ৩০৩ নম্বর কামরার দরজার সামনে দাঁড়ালো, উত্তেজনায় আবেগে তাঁর কালচে বর্ণের সুগঠিত মুখায়ব থিরথির করে কাঁপছে। সে দেখল, ম্যাডাম নেভি ব্লু বোরকা পড়েছেন চমৎকার কাজ করা,মাথায় পড়া ডিজাইন করা ম্যাচিং স্কার্ফ, ম্যাচিং বাহারি ক্লিপ দিয়ে নিপুনভাবে আটকানো। তাঁর যেন সব কিছুই অপরূপ!

    ওদিকে ম্যাডাম বলছেন, রুল নম্বর তিন, অমি ইসলাম…… বলেই ম্যাডাম সামনে চাইলেন! অমি বললো.. ই..য়ে….স ম্যা…ম ! যেন নিজের কণ্ঠ নিজেকেই অচেনা মনে হলো, যেন স্বাভাবিক নয়, এ ছিল যেন আর্তচিৎকার !

    ম্যাম প্রথমে ক্লাসের দিকে, পরে দরজার দিকে চাইলেন, দেখলেন ঘেমে নেয়ে একাকার অমিকে, বললেন, অমি কি ব্যাপার? তোমার কী সমস্যা ?

    অমির নিজেকে বেশ বোকা বোকা লাগছিল। তাইতো, তার কী হয়েছে? কিছুই তো হয়নি, তাহলে এতো উত্তেজনা, এতো বেয়াড়াপনা, এতো বাড়াবাড়ি করে, তাড়াহুড়ো করে কেন কলেজে আসা ? তার কি কোন জবাব আছে? কী সেই জবাব? যার জন্য তার মন এতো উতলা, এতো টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে হৃদয় ও মন জুড়ে ?

    অমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে, তার তামাটে মুখ হঠাৎ ধূসর বর্ণ ধারণ করল। ওদিকে ম্যাডাম বলছেন, অমি বলো? কি হয়েছে তোমার? সত্যি কোনও সমস্যা কি? কথা বলছো না কেন? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

    অমি ভাবছে, তাকে কি খুব বাজে দেখাচ্ছে? তার খুব ইচ্ছে করছিল, আয়নাতে নিজেকে এক ঝলক দেখে নিতে, ঠিক তাকে কেমন লাগছে ! যদি দেখা যেত, কিন্তু কি করে সম্ভব? তার কাছে তো পকেট আয়নাও নেই। যদিও রনির কাছে সব সময় একটা আয়না থাকে। যদি অমির কাছে একটা আয়না থাকতো! তাহলে কি চট করে দেখে নেওয়া যেত? ওহু, মোটেই না, তাহলে ম্যাডাম কী ভাবতো? কিন্তু অবশেষে সে ক্লাস শুরুর মুহূর্তেই আসতে পেরেছে, এই তো বড় সান্ত্বনা!

    ম্যাডাম আবার বললো, অমি তুমি কি সাধারণ ভদ্রতা জ্ঞান হারিয়েছ ? আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমায় ? জবাব দাও না কেন?

    অমি নিথর নিস্তব্ধ, মূক ও বধিরতা পেয়ে বসেছে তাকে। কি জবাব দিবে অমি ? আমার কী আদৌ কিছু হয়েছে? নাতো, তাহলে?

    অমি বললো, ইয়েস ম্যাডাম! না মানে, কিছুই হয়নি আমার।
    বলেই ক্লাসে ঢুকতে উদ্যোত হলো। আর বললো, আমি ঠিক আছি ম্যাডাম।

    তাহলে এমন অপ্রস্তুত আচরণ কেন তোমার? তুমি কি এও ভুলে গেছ? এখন রোল কল চলছে, তুমি ক্লাসের বাইরে, ভিতরে আসতে চাইলে মিনিমাম অনুমতি চাইতে হয়?

    জি ম্যানে, ইয়েস ম্যাম, মানে হ্যাঁ ম্যাম, চাইতে হয়।
    মানে আমি বুঝতে পারিনি ম্যাম, রোল কল চলছিল, তাই ম্যাম, ইয়েস ম্যাম….. বলেছি ম্যাম !

    ক্লাসে সবাই অমির অসহায়ত্ব আর অপ্রস্তুত অবস্থায় মজা পাচ্ছিল, এবার হো হো করে হেসে উঠলো।

    অমি নিজেকে অসহায় অনুভব করছে, যেন সার্কাসের জোকার সে! সে ভাবলো- হাতি কাঁদাতে পড়লে চামচিকাও মজা মারে!

    ম্যাডাম বললো, এই সবায় চুপ করো, কোন কথা নয়।

    অমি এবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো অনেকটা এবং বললো, মে আই ক্যাম ইন ম্যাডাম?

    এতে আবারও সবাই একযোগে হেসে উঠলেন।

    ম্যাডাম বললো- স্টুডেন্টস, হোয়াই ইই অ্যার ল্যাফিং? সাইলেন্ট প্লিজ!

    এইবার ম্যাডাম অমির দিকে চেয়ে বললেন, ইয়েস অমি ক্যাম ইন….।

    ২য় অংশ
    অমি ক্লাসে ঢুকলো, তার মেরুণ রঙের ফুলসার্ট ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে কালো রঙ ধারণ করেছে। ম্যাডাম বললেন, অমি তুমি কিন্তু ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছ।

    অমি বললো- জি ম্যাডাম, আমি কি একটু ওয়াশরুমে যেতে পারি?

    অবশ্যই অমি, কেন নয়? ম্যাডাব বললেন।

    অমি ওয়াস রূমে গেল। ম্যাডাম রোল কলে ফিরে গেলেন, রোল নম্বর চার ইপ্তি রানি, রোল নম্বর পাঁচ সোহাগ খান, রোল নম্বর ছয় নাজমা পারভিন…………! ওদিকে অমির ওয়াস রুমের টানানো অপরিষ্কার আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে নিবার চেষ্টা। ঠিকই তো, অমি যেন নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না। এতোটা বাড়াবাড়ি কেন? কি জন্য ? তার কি একটা ক্লাসের জন্য এতোটা বাড়াবাড়ি করা উচিৎ ? ম্যাডামের জন্য কিসের এতো টান? কার জন্য এতো তাড়াহুড়ো? ক্লাশ নাকি ম্যাডাম? হঠাৎ মনে পড়লো, সেই সবজিওয়ালার কথা, তাইতো বড্ড অন্যায় হয়ে গেছে বেচারার সাথে। আমার মা তো এমন শিক্ষা দেয়নি আমাকে। ওদিকে কানে ভেসে আসছে ম্যাডামের কণ্ঠ, রোল নম্বর পঁচিশ লাভলী আকতার, অমি ভাবলো আজ ক্লাস শেষে খুঁজে বের করবে সবজিওয়ালাকে। ম্যাডাম বলছিল রোল নম্বর ষাট তরিকুল ইসলাম। অমি ওয়াস রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তার সিটে বসলো।

    ম্যাডাম বললো, কি অমি, এখন ঠিক আছো তো? অমি শুধু মাথা ঝাঁকালো । ম্যাডাম তাঁর ক্লাসের নিয়মিত আলোচনায় চলে গেল। সোহাগ অমির দিকে কটমট করে চাইছিলো! যেন যত রাগ ওই অমির প্রতি! ব্যাটা রোমিও! ম্যাডাম যেন তার সম্পত্তি! তার ধারনা, যদি অমি না থাকতো তাহলে ম্যাডাম হয়তো তার প্রতি আন্তরিক হতো। শুধু সোহাগ কেন? আরো অনেক ছাত্র অমির প্রতি বেশ জেলাস ফিল করে। তাদের ধারনা, ম্যাডাম অমির প্রতি একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব ও আন্তরিকতা পোষণ করেন।

    শুধু কি ছাত্ররা ? অমিও ম্যাডামকে নিয়ে এমন ভাবনায় ভাবে, ম্যাডামের আন্তরিকতা , ভালোবাসা, স্নেহ সবই যেন অমির জন্য নির্ধারিত। কিন্তু কেন? কী’ই বা সেটা ? তা আজ অবধি বুঝে উঠতে পারেনি অমি নিজেও। তার নিজের মাঝে ম্যাডামের জন্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা সব মিলে যেন এক অমিত অধিকারবোধের জায়গা তৈরী হয়েছে। সেই অধিকারবোধ কী ভাবে বা কী কারনে একান্ত তার, সে প্রশ্নের জবাব তার জানা নেই। হয়তো খোঁজার চেষ্টাও করেনি অমি। কিন্তু দিনে দিনে ম্যাডাম যেন তার, একান্তই তার হয়ে গেছে ! এইতো ক’দিন আগে বন্ধুরা এক সঙ্গে খেলছিল। হঠাৎ তাদের সামনে দিয়ে এক নবাগতা মেয়ে লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছিল।
    সোহাগ বলে বসলো, আহা যেন কেয়া চৌধুরী ম্যাম !

    ঠিক তখনই সোহাগের গালে এতো জোরে এক থাপ্পড় দিয়ে বসে অমি, সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শেষ অবধি বিচার অধ্যক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

    অধ্যক্ষ অমিকে বলেছিল, হাউ স্ট্রেঞ্জ অমি ? তুমি সোহাগকে মারলে কেন বল?

    অন্য একজনকে, কেয়া ম্যামের সাথে তুলনা করছিল সোহাগ৷ বলুন তো স্যার কেউ কি কেয়া ম্যাডামের মতো হতে পারে?

    আবারো গুঞ্জন সবার মাঝে, অধ্যক্ষ সাহেব বললেন, এই সবাই থামুন। শোন ছাত্ররা, তোমরা আমাদের মা-বোন, মেয়েদের সবার প্রতি সম্মান দেখিয়ে কথা বলবে। মনে থাকে যেন।
    অমি, সোহাগকে সরি বলো, সোহাগ ম্যাডামকে সরি বলো।

    সোহাগ ম্যাডামকে সরি বললো, যেন বলতে পেরে অনেক খুশি!
    ম্যাডাম বললো, দ্যাটস ওকে সোহাগ। গুড ম্যান্যার ইজ অলওয়েজ ইসেনসিয়াল, ইয়ং বয়।

    অধ্যক্ষ সাহেব অমিকে বললো, অমি এবার তোমার পালা। গো এ্যান্ড টেক প্যারডন।

    অমি মাথা নীচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়েছিল, কোন জবাব নেই। যখন অধ্যক্ষ সাহেব তার মাকে ডেকে নালিশ জানাতে চাইলো, তখন সে বলেছিল, না স্যার মাকে ডাকতে হবে না। আমি ভুল করেছি, তবে সোহাগকে বলে দিবেন, কখনো যেন কেয়া ম্যাডামকে তুলে কোন বাজে কথা না বলে!

    অফিস রুমে কেয়া ম্যাডাম বসেছিলেন, হঠাৎই তিনি অমির দিকে তাকালেন, কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে, তারপর নীচের দিকে চেয় রইলেন। একটা হালকা অস্বস্তি বোধ, সাথে অন্তর্নিহিত পুলক সম্ভবত তাঁকে তাড়া করছিল!

    অধ্যক্ষ দেখলেন, অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে হালকা গুঞ্জন। অধ্যক্ষ বললেন, সোহাগ তার ভুল স্বীকার করেছে অমি। তুমি সরি বলে, তার সাথে মিলে যাও।

    অমি একবার ম্যাডামের দিকে চাইলেন, তারপর অধ্যক্ষ সাহেবের দিকে চেয়ে, সোহাগ কে বললো, সোহাগ সরি। তবে কী বলেছি মনে থাকে যেন তোমার!

    এভাবেই মিটেছিল সেদিনের বচসা।

    ক্লাসে দারুণ আন্তরিকতা, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি চরম দায়িত্বশীলতা, কার কেমন সমস্যা সেই বিষয়গুলো নিয়ে অত্যন্ত বন্ধুসুলভ ম্যাডাম কেয়া চৌধুরীর জুড়ি মেলা ভার।

    তাছাড়া তাঁর পোষাক পরিচ্ছদ, তাঁর রুচিবোধ, সব কিছুর মাঝে আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে, যার কারনে সহজেই অন্যদের ম্যাডামের প্রতি আকৃষ্ট করে। এমন কী কিছু নারী সহকর্মীরাও কেয়া ম্যাডামের রূপগুণ, বেশ ভূষাতে বেশ ইর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। বাঁকা চোখে দেখে কিন্তু এড়িয়ে চলতে পারে না। কারন, দায়িত্বশীলতা, সময় জ্ঞান এবং পাঠদানে তাঁর গভীরতায় অন্যরা রীতিমত সমীহ করতে বাধ্য।

    তাঁর লম্বা চওড়া গড়ণ, বৈচিত্র্যময় পোষাক, ম্যাচিং এ অনন্য সচেতনতা, অন্যদের চোখে সহজেই পড়ে যায় এবং সহকর্মীরা বেশ মজা করে ম্যাডামের রূপগুণের প্রশংসা করে থাকেন। এমনকি ম্যাচিং এর ছাতাখানির প্রশংসাও তাঁর নজর এড়ায় না, হয়তো এই প্রশংসার মাঝে কিছুটা শ্লেষও ছড়ানো থাকে কখনো কখনো।

    এইতো সেদিন অংকের স্যার বলছিলেন, ম্যাডাম আপনি যে বেতন ড্র করেন, তা দিয়ে পোষাকের ব্যয় মিটে তো?

    ম্যাডাম জানে সে প্রশ্নের কারন, তবুও হাসি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, আপনি অংকের স্যার অংক কষে হিসাবটা বুঝিয়ে দিন স্যার। অংক স্যার আর না বাড়িয়ে থেমে গেলেন।

    ভিন্ন মানসিকতার ম্যাডাম ওসব এক কানে শোনেন আর অন্য কানে বের করে দেন অথবা কিছুটা স্মিত হেসে উপভোগ করেন। এক কথায় তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে সবাই ধরাশায়ী। অদম্য চুম্বকীয় শক্তির কাছে অন্যরা পরাভূত হতে বাধ্য।

    ম্যাডাম বাড়ি ফেরার জন্য বেরোলেন।
    কলেজ গেটে বেশ কয়েকটি অটোরিক্সা দাঁড়িয়েছিল, সবাই ম্যাডামকে ডাকছিলেন।

    ঠিক তখনই অমি একটি অটোরিক্সা নিয়ে হাজির। বললো, ম্যাডাম এই রিক্সায় যাবেন আপনি।

    ম্যাডাম বললেন- না অমি, যাবো না। তোমার বাড়াবাড়িতে আমি বিরক্ত। মহাবীরত্ব দেখাও তাই তো? এমনটা আমি মোটেই টলাইট করি না অমি? তোমার সাইকেল কোথায়?

    অমি বললো, আছে তো ম্যাম, আপনার জন্য এই রিক্সা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি এই রিক্সায় উঠুন, আমি আমার সাইকেলে যাবো। সত্যি ম্যাম আমি ভীষণ ভুল করেছি। এমনটি আর হবে না।

    ম্যাডাম বললো, আজ কলেজে এতো দেরি কেন তোমার, অমি?
    না, মানে ম্যাডাম, ঘুমোতে দেরি হয়েছিল, তাই তাড়াতাড়ি উঠতে পারি নি।

    মনে রাখবে, সময় মতো ঘুমোতে যাওয়া আর ঘুম থেকে উঠা। এর ব্যত্যয় ঘটাবে না কখনো।

    জি ম্যাডাম, ঠিক তাই। আর ভুল হবে না কখনো।

    ম্যাডাম অমির দেওয়া রিক্সায় উঠে বাড়ির রাস্তা ধরলেন, আর অমি তার সাইকেলে উঠে সবজীওয়ালার বাড়ির খোঁজে গেল। চলবে…

    লেখক: আমিনুল ইসলাম
    কবি ও সংগঠক।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম