• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ | ৩:২৮ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম অংশ:

    জনতা খেলা ঘর শহরের সবচে বড় স্পোর্টস সামগ্রী বিক্রেতা। কেয়া চৌধুরী শায়ন চৌধুরী সহ সকাল দশটার মধ্যে চলে এলেন সেই দোকানে। তাঁর আদরের ছোট ভাই শ্রীমান শায়ন চৌধুরীর পছন্দের ক্রিকেট সামগ্রী, জার্সি, ট্রাউজার, ব্যাট, বল, স্কেট’স, প্যাড, হেলমেট সহ যাবতীয় প্যাকেট করে বেরিয়ে আসলেন পাশের গ্যারেজে রাখা গাড়িতে।
    তখন শায়ন বললো – দিদি ভাই চল, আমরা জেলা স্টেডিয়ামে যাই।



    -কেন গো দাদা? কী হবে সেখানে?

    -শায়ন হেসে বললো, দিদি ভাই এই সবগুলো পড়ে একটা ছবি উঠাবো। সবাই যেন বুঝতে পারে আমার দিদি ভাই কতোটা সৌখিন। তার দাদার জন্য একজন টেস্ট খেলোয়াড়ের যা লাগে কোনটায় বাদ দেয়নি! ছবিটা উঠবে ক্রিকেট পিচের বাইশ গজে ব্যাট হাতে!

    -ওহো আমার ভাইটার এতো বড় প্রাকটিকাল ভাবনা, তাতো বুঝতেই পারি নি।

    -দিদি ভাই শোন না। আমি ব্যাট’সমান, কেউ বল করছে, আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বলের দিকে চেয়ে আছি, বোলার বল করবে, আমি সট খেলবো! এমন একটা ছবি তোমার কাছে থাকলে কেমন হয় দিদি ভাই?

    -চমৎকার হয় দাদা! বেশ দাদা চল।

    বলেই গাড়ি টান দিলো কেয়া নিজেই। শহরের সবচে বড় স্টুডিও মর্নিং সান এ যেয়ে ক্যামেরা, ক্যামেরাম্যান সহ তারা জেলা স্টেডিয়ামে আসলেন। সেখানে দায়িত্বরত তত্বাবধায়কের সহায়তায় ড্রেসিং রুমে ড্রেস আপ করে বেরিয়ে এলো অল স্কুল টুর্ণামেন্টে এবারের ম্যান অব দ্যা টুর্ণামেন্ট শায়ন চৌধুরী। কেয়া দেখলো কী সুন্দর লাগছে তাঁর দাদা ভাইকে। এইতো সেদিনের পুচকে ভাই আমার, সদ্য কৈশোর পেরিয়েছে, অথচ কত্তো বড় হয়ে গেল তাঁর দাদা শায়ন। বেশ কটি ছবি উঠানো হবে, নানা এ্যাংগেলে নানা ভঙ্গিমায়। সে উদ্দেশ্যে মাঠে গমন তাদের। একজন বোলার চাই, পাশের ক্রিজে অনুশীলনে ব্যস্ত শায়নের চেয়ে বয়সে কিছু কম হবে ওরা। অনুশীলনের ফাঁকে চোরা চোখে দেখে নিচ্ছিল ওরা, হঠাৎ আগমন ঘটা এক অতীব সুন্দরীর, তাঁর সাথে একেবারে পারফেক্ট ক্রিকেটীয় ড্রেসে তাদের কিছু সিনিয়র এক কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক। কেয়া চৌধুরী হাত উঁচিয়ে বললো, এই যে ভাই তোমাদের বলছি, কেউ একজন আসবে? যে ভালো ফাস্ট বোলিং করতে পারো? এক কিশোর এগিয়ে এলো ধীরে ধীরে, এলো না বলে, বলতে হয় তাকে অন্যরা পাঠিয়ে দিলো। কারন, ছেলেটি এবার আন্তঃ কলেজ টুর্ণামেন্টে সর্ব্বোচ্চ উইকেটধারী। ছেলেটি এলো এবং পর্যায়ক্রমে বোলিং করে গেল। প্রতিবার ছবি উঠলো বাটিং করে যাওয়া শায়ন চৌধুরীর। কিশোর বুঝলো বাটিং করে যাওয়া যুবক শক্তিশালী ব্যাট’সম্যান এবং বাটিংরত শায়ন চৌধুরী বুঝলো, এক শক্ত বোলারের হাতেই সে পড়েছে আজ। প্রতিবার তারা ছবিগুলো চেক করে একটা ছবি ওকে করলো। শায়ন এগিয়ে এসে বোলার কিশোরকে বললো, তুমি বেশ ভালো বল কর, অনেক শক্ত তোমার বল। কেয়া চৌধুরী এগিয়ে এলেন তাদের কাছে। বললেন – বাহ্ বেশ বল কর ভাই তুমি। তোমার বাসা কোথায়? কী পড় তুমি?

    – জি, আমার বাসা কাজী পাড়া। সেখানে আমি আমার মায়ের সাথে থাকি। আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি।

    – বোলার ও ব্যাটসম্যানের একটা ছবি উঠানো হোক। বলে ক্যামেরাম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ছবি উঠানোর পর কিশোরকে বললো-তোমার নাম কি?

    -আমার নাম অমি!

    -ও আচ্ছা, বেশ বেশ। তুমি এসো আমাদের বাসায় একদিন।

    -আমি তো কোথাও যাই না, আমার মা আমাকে কোথাও যেতে দেয় না।

    -আচ্ছা, তো মাঠে এলে যে আজ?

    -স্কুল ছুটির পরে বাসা ফিরার আগে আসলাম, মায়ের অনুমতি নেওয়া আছে, স্কুল ছুটির পর এখানে আসি।

    -বাহ্ চমৎকার, অনেক ভালো লাগলো তোমার মায়ের প্রতি আন্তরিকা ও ওবিডিয়েন্সির কথা শুনে। আচ্ছা, তোমার মাকে নিয়ে একদিন আসবে।

    অমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, জি আচ্ছা। বলে বিদায় নিলো।

    জেলা স্টেডিয়াম থেকে ভাইবোন এলো মর্নিং সান স্টুডিওতে। ছবিগুলো প্রিন্ট করবার অর্ডার দিলো কেয়া চৌধুরী। এ্যাডভ্যান্স পেমেন্ট করে দুই ভাইবোন এক চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে এলো। শায়নের পছন্দের খাবারের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছিলো। শম্পা চৌধুরীর ফোন এলো।
    -তোরা কখন ফিরবি মা?
    – এইতো মা শায়নকে নিয়ে চাইনিজে এসেছি। খেয়ে ফিরছি মা।
    – বেশ মা, তাড়াতাড়ি আয়, কথা আছে।

    বাড়ি ফেরার পরে মি. ও মিসেস চৌধুরী ছেলে মেয়েকে নিয়ে বসলেন। মিসেস চৌধুরী বললেন সৌমিকের বাবা ফোন করেছিলেন, উনারা সৌমিক,কেয়া ট্রেনিং এ যাবার আগে বিয়ের তারিখ নিশ্চিত করতে চান।
    মি. চৌধুরী ছেলেকে বললেন, কি ছোট চৌধুরী তোমার মতামত কী দিদির বিয়ের ব্যাপারে!

    শায়ন বেশ বিজ্ঞ ভাব নিয়ে এসে বললো- তা বিষয়টা কী ? আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে!

    শায়ন ছাড়া অন্যরা বেশ জোরে হেসে উঠলেন। কেয়া শায়নকে জড়িয়ে চুমু দিয়ে বললেন- আমার দাদা ভাই না, বলতেই হবে। বাবা, মা এখন বলো। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনার পর অবশেষে সৌমিকের বাবা মা সহ তাদের গুরুত্বপূর্ণ আত্বীয়দের আসতে বলে দিলেন মি. চৌধুরী। শায়ন তার দিদি ভাইকে বললো- তাহলে তুমি বিয়ে করছো দিদি ভাই?

    কেয়া চৌধুরী বললেন – তুই কি রাজি নস দাদা? শায়ন তার দিদিকে জড়িয়ে ধরে বললো- না দিদি ভাই আমি রাজি, কিন্তু এরপর মেস থেকে ফিরে যখন তোমাকে দেখবো না, তখন আমার ভীষণ কষ্ট হবে।

    হঠাৎ পরিবেশ বেশ গুমট হয়ে গেলো। বাবা, মা ও কেয়ার চোখ রক্তিম আকার ধারণ করলো। মিসেস চৌধুরী বললেন- এই তো নিয়ম বাবা। দিদি কি একেবারে চলে যাচ্ছে? আসবে যাবে, আমরাও যেতে পারবো যখন মন চাইবে।

    শায়ন মাথা ঝাঁকিয়ে শুধু সম্মতি জানালো, মনটা বোধ হয় বিষাদের আড়ালে ঢেকে গেল।

    শুক্রবার সৌমিক, তাঁর বাবা এক সময়ের দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে রিটায়ার্ড, সাথে কয়েকজন মুরব্বি সহ “শান্তি নীড়ে” আগমন ঘটলো। কেয়ার অনামিকায় ডায়মন্ড রিং পড়িয়ে দিলেন আগামীর হবু ম্যাজিট্রেড জনাব সৌমিক রায়হান আলম। পাঁচ লক্ষ্য পাঁচ টাকা দেনমোহরে উভয়পক্ষের সম্মতিতে বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বাগদান সম্পন্ন হলো। শুভ বিবাহের তারিখ নির্ধারিত হলো তিন মাস ট্রেনিং শেষে কর্মস্থলে যোগদানের আগমুহূর্তে যে ছুটি পাওয়া যাবে, ঠিক তখন। আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে সর্বশেষ প্রক্রিয়া ছিলো ভূরিভোজ। অবশেষে বিদায় পর্ব। সৌমিক ছটফট করছিলো কারো সাক্ষাতের। তাঁর বডি লাঙ্গুয়েজ অদূরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিল হবু মিসেস আলম। শায়ন চৌধুরী বিষয়টি লক্ষ্য করলো। সে সৌমিকের কাছে এগিয়ে এসে বললো- কাউকে খুঁজছেন ভাইয়া ? সৌমিক জবাবে বললো- কই কই নাতো! শায়ন বললো- ওহো, তাহলে আর দরকার নেই! ভেবেছিলাম একটু কথা বলার সুযোগ করে দিব। যার বিয়ে তাঁর ইচ্ছা নেই, আমি বাপু কী আর করি? সৌমিক বোকা বোকা কণ্ঠে বললো- শায়ন শায়ন শোন শোন, না না ঠিক আছে, ডাকো না একটু তোমার আপুকে! শায়ন হাসতে হাসতে বললো- আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি, আমিই তাহলে ঠিক! আসুন আমার সাথে।
    -আমরা এখন যাব, ভালো থেকো কেয়া।

    -খারাপ থাকবো কেন? আমি সব সময় ভালো থাকি মশায়।
    শায়ন বললো, আমি আসছি বাবা এসব কঠিন কথাবাত্রা আমি আবার কম বুঝি। তার কথার ভঙ্গিতে কেয়া ও সৌমিক হো হো করে হেসে উঠলো। কেয়া বললো- যাবি না দাদা, বস আমাদের সাথে। জবাবে শায়ন বললো- না দিদি ভাই তখন থেকে মা ডাকছিলো একটু জেনে আসি, কেন ডাকছিলো। বলেই শায়ন বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

    – শালাবাবু সুযোগ করে দিলো দিদির সাথে কথা বলার। কী বলো হবু বউ?
    -হবু বউ মানে? এসব কী? বাজে কথা বলবে না সৌমিক, শুনলে না? মা ওকে ডাকছিলো?
    -জি, জি ম্যাম ঠিকঠাক শুনেছি। তো আমারও ডাক পড়লো বলে, আমার মেজাজি রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার বাবা বলে কথা। উনার যাবার বড্ড তাড়া দেখলাম।

    – ও বুঝেছি, তা কে আসতে বললো এখানে? যাও যাও সভ্য ছেলের মতো বাবার ডাক আসার আগেই চলে যাও। কেন এসেছো দেখা করতে?
    – হা হা হা, রাগলে কি অপরূপ লাগে তোমাই কেয়া। আশা করছি বিয়ের পর এই রাগ অব্যাহত থাকবে। তাহলে আলাদা রূপের বউ সব সময় মন্দ না! কী বলো?

    – তাই বুঝি মি. আলম? আমাকে রাগলে সুন্দর লাগে আর এমনি বান্দর তাইতো? তো এই বান্দরকে বিয়ে করবার জন্য এতো উতলা কেন হয়েছিলে? বলো বলো, কেন কেন?
    -সে আরেক গল্প, সময় করে বলবো ম্যাম। তবে এতোটুকু বলছি, এই রাগি মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছিলাম। আজ তাঁর শুভারম্ভের দিনক্ষণ ঠিক হলো, বুঝলে ম্যাম। আজ আসছি, বাবা ডাকছে।

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    পরদিন কেয়া শায়ন গেল স্টুডিও মর্নিং স্যান এ। ছবিগুলো সংগ্রহ করে ফিরে এলো বাসায়। শম্পা চৌধুরী ছবি দেখে বললেন, বাহ্ চমৎকার সবগুলো ছবি, কেয়া তোর আর শায়নের মাঝে এই ছেলেটি কে?

    কেয়া বললো- ও এক ফাস্ট বোলার, কি বলিশ শায়ন?

    – একদম তাই, ওর বলের যে গতি মা! ওর নাম অমি, বাবা নেই মায়ের সাথে থাকে। কাজী পাড়ায় ওদের বাসা মা।
    -বেশ বেশ, বেশ মায়াবী ছেলেটি। তা মা ছবিগুলো কোথায় রাখবি?

    – দুটো ড্রইং রুমে আর আমার দাদার একটা অসাধারণ ছবি হয়েছে, ক্ষুধার্ত সিংহের মতো ছুটন্ত বলের দিকে চেয়ে আছে, যেন বল ব্যাটের মাঝে লাগলেই সীমানা পার! কী যে ভালো লাগছে আমার দাদাকে!

    ছবিগুলো অনেক যত্ন করে ড্রইংরূমে আর কেয়ার পছন্দের ছবি তাঁর শোবার ঘরের ওয়ালে টানানো হলো। বেশ আনন্দের মাঝেই চলছিল, এর মাঝে আবার বিদায়ের দিন ঘনিয়ে এলো দুই ভাইবোনের। শায়ন চলে গেল তাঁর ক্যাডেটের চেনা ঠিকানায়, আসবে তার দিদিভায়ের বিয়ের সময়। কেয়া গেল তাঁর ট্রেনিং এর জন্য। দেখা হবে আবার ট্রেনিং শেষে কেয়া ও সৌমিকের বিয়ের আসরে। বাড়িটা আবার একলা হয়ে গেলো। এই বুঝি প্রকৃতির নিয়ম, জোয়ার আর ভাটার নিয়মে চলে হাসিকান্না, সুখের উত্থান পতন। ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী তাঁর নিয়মিত কাজ আর অবসরে বাগানের পরিচর্যায় ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। এক সকালে তিনি দেখলেন তাঁর শখের পরাশ্রয়ী অর্কিডগুলোর উদ্বোধনী ঘোষণা হয়েছে। তখনই মেয়েকে ফোন করে বসলো।
    কেয়া বললো- বাবা এখন ক্লাশ চলছে, বেরিয়ে ফোন করছি। কিছু পরেই ফোন করলো কেয়া, বললো-বাবা বলো, জরুরি কিছু?

    মি. চৌধুরী বললেন- সুখবর বলে কথা মা? জানিস অর্কিডের চারাগুলো গজিয়েছে।

    -ওহো তাই? তা তুমি যে ভাবে কথা বলছিলে, ভাবলাম না জানি কী ঘটেছে!

    – তুই কিন্তু গুরুত্ব দিলি না মা, জানিস না অর্কিডগুলো আমার কত আদরের?
    -জি বাবা জানি, ইট’স ওকে। এবার আসলে ওদের সাথে আমারও দেখা হবে বাবা। বাবা মেয়ে মিলে মজা করে দেখবো, ওদের সাথে আলাপ করবো।

    -ঠিক আছে মা, আমার এখন অপেক্ষা,কবে ওরা বড় হবে আর ফুল ফুটবে।

    – একদম তাই বাবা। রাখছি বাবা ভালো থেকো, আমার ক্লাশ শুরু হয়েছে।

    সময় বয়ে যায়, এগোতে থাকে কেয়া-সৌমিকের ট্রেনিং, সৌমিক মাঝে মাঝে বেড়ানোর প্রস্তাব দিলেও এড়িয়ে যায় কেয়া। তবে ট্রেনিং সেন্টারের ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে কথা হয় বৈকি। তবে বিয়ের কথাবার্তা হয়ে যাবার পর, কেয়া ইচ্ছে করেই আগের মতো এতোটা মিশে না। তাঁর মানসিকতার গঠণ প্রণালী হয়তো অন্যদের থেকে আলাদা প্রকৃতির। একদিন সৌমিক ট্রেনিং সেন্টারের ক্যান্টিনে চা এর আমন্ত্রণ জানালো কেয়াকে। কেয়া তা গ্রহণ করে এবং যথা সময়ে উপস্থিত হয়। বিশেষ পোষাকে বিশেষ স্টাইলের জন্য ইতিমধ্যে কেয়া ট্রেনিং সেন্টারে অনেকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে সৌমিকের সাথে তাঁর বাগদান ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে যা জেনে অনেকটা রক্ষা। আজ কেয়া মেজেন্ডা কালারের শাড়ি এবং ম্যাচিং সহ অনন্যরূপে আভির্ভূত হলেন। সৌমিক বসে ছিলো দরজামুখি এক টেবিলে। কেয়া ধীর গতিতে এগিয়ে আসছিল, সৌমিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলো তাঁর বাগদত্তার পানে। পাশে এসে বসবার পর শুধু বললো অপূর্ব। কি সৌমিক? সৌমিক বললো- আমার হবু বউ! বলে তাঁর হাতে হাত ছোঁয়ালো। কেয়া বললো- সৌমিক বি কেয়ারফুল, এটি পাবলিক প্লেস। আমি তোমার প্রেমিকা নই, বন্ধু। বিবাহের দিন ধার্য হয়েছে দুই পরিবারের ইচ্ছায়। আগে কবুল বলি মশাই! তাঁর পর স্পর্শ, তাও পাবলিক প্লেসে নয়। ওহো, ইট’স ওকে কেয়া। আই এ্যাম রিয়েলি সরি। তারপর কিছু সময় কাটালো তাঁরা, হালকা কিছু খেয়ে শেষে কোল্ড কফি পান করে বেরিয়ে এলো।

    এদিকে এগোতে থাকে দুই পরিবারের বিবাহ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাবলী। ওদের ট্রেনিং শেষ হবে ফ্রেব্রুয়ারী মাসের তিন তারিখ, সাতদিন ট্রানজিট ছুটি নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য। দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ফ্রেব্রুয়ারী মাসের ছয় তারিখ বিবাহের দিন ধার্য হলো। সে অনুযায়ি কেনাকাটা সহ যাবতীয় কার্যাবলী এগোতে থাকলো। এদিকে মি. ও মিসেস চৌধুরী অপর পক্ষে জনাব জোয়ার্দার ও মিসেস জোয়ার্দার। এমনকি কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত বুকিং কনফার্ম হয়ে গেলো। কিছু নির্দিষ্ট কেনাকাটা যা কেয়া আসবার পরে ওকে নিয়ে করতে হবে জন্য বাবা-মা ওর অপেক্ষায় রইলো। এরই মধ্যে শায়ন চৌধুরী বোনের বিবাহ উপলক্ষে ১৫ দিনের ছুটি নিয়েছে, সে ফ্রেব্রুয়ারীর এক তারিখে বাসায় চলে এলো। মি. চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নিজে ড্রাইভ করে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসবেন। শায়ন জেদ ধরলো, দিদি ভাইকে নিতে বাবার সাথে সেও যাবে। কী আর করার ? বাবা ছেলে ফ্রব্রুয়ারীর তিন তারিখে রওয়ানা হয়ে গেলো কেয়া চৌধুরীর ট্রেনিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে। যদিও সৌমিক কেয়াকে বলেছিলো যে, সে নিজে কেয়াকে তাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে তারপর নিজ বাসায় ফিরবে। কিন্তু কেয়া এবং তাঁর পরিবারের কেউ তা মেনে না নেওয়ায় সৌমিক একদিন আগেই তাঁর বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়।

    সেদিন ছিল তিন ফ্রেব্রুয়ারী, বাবা-ছেলে বেশ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লো তাঁদের প্রাইভেট কার যোগে। ড্রাইভিং সিটে সে সময়ের নামী আর্কিটেক ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী বেশ জাদরেল চালক। ড্রাইভিং এ তাঁর বেশ নাম আছে। পাশে বসা জুনিয়র চৌধুরী। বেশ পজিটিভ মুডে আছেন। কিছু সময় পরে তাঁর দিদি ভায়ের সাক্ষাৎ পাবে। আসলে দিদিভাই অন্তপ্রাণ ছেলেটির। তেমনি কেয়া চৌধুরী তাঁরচেয়ে সাত বছরের ছোট ভাইকে কত যে ভালোবাসে তা কোন কিছুর তুলনা দিয়ে বোঝানো ভার। গাড়ি ছুটে চলেছে সামনের দিকে, বেশ আঁকাবাঁকা রাস্তা কিন্তু চালক যে মি. চৌধুরী ; কুচপরোয়া নেহি! নদী খাল জমি সবুজ বনানীর পাশ দিয়ে নিপুণ ভাবে এগিয়ে চলেছে মি. চৌধুরীর আদরের লিমুজিন । ঠিক চার ঘন্টা পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে গেল নির্ধারিত ঠিকানায়। পিতা পুত্র কন্যার আনন্দ সম্মেলন, কিছু দরকারী কেনাকাটা, মাত্র দুদিন পর বিয়ে, সে ইমেজ চলছে গত ক’মাস জুড়ে। ছোট চৌধুরীর কিছু দাবি দাওয়া পূরণ হলো, মি. চৌধুরী নিজের পছন্দের বেশ কিছু পোষাক আশাক মেয়ের জন্য নিলেন, মিসেস চৌধুরীর ফরমায়েশ অনুযায়ী কিছু কেনাকাটা হলো। অবশেষে নামকরা এক হোটেলে তাঁরা লাঞ্চ করলো। যদিও কেয়া হালকা কিছু খাবার খেলো, কিন্তু সিনিয়র ও জুনিয়র চৌধুরী বেশ আয়েশ করে খেয়ে নিলেন। বেশ ক্ষুধার্ত ছিলেন বাপ ছেলে। অবশেষে শহরের পাশ বেয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে গেলেন কিছু সময়ের জন্য । মি. চৌধুরী মিসেস চৌধুরীকে ফোন করে জানালেন, শোন বাচ্চাদের নিয়ে পদ্মার পাড়ে এসেছি, বেশ মজা করছি। ছবি উঠাচ্ছি, তাই ফিরতে কিছু দেরি হবে। তুমি কোন টেনশন নিও না শম্পা। ততক্ষণে অদূরে দুই ভাইবোনের চঞ্চলতায় মুগ্ধ হচ্ছিলেন আগত দর্শনার্থীরা। যেন নতুন প্রাণে ঢালিছে তারা মনের যত আগল! ছবি উঠানো হলো, নৌকায় উঠে বেশ ঘোরাঘুরি করলো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে সার্ভ করা চটপটি, ফুসকা কোনটায় বাদ গেলো না! যা তাদের জন্য সত্যি বেমানান। অবশেষে ফিরবার পালা। কেয়া গাড়ির মাঝের সীটে আর চালক বাবা ও জুনিয়র চৌধুরী বসলেন সামনে। গাড়ি রওয়ানা হলো চৌধুরীর প্রিয় “শান্তি নীড় ” এর উদ্দেশ্য।
    বাবা, মেয়ে ও ছেলে বেশ খোশগল্পের মধ্য দিয়ে ফেরার পালা। শায়ন বললো- আপু জানো? এতো আনন্দের মধ্যেও আমার কেমন জানি লাগছে। তুমি দুদিন পরে অন্য বাড়ির সদস্য, ভাবতে বুকের মাঝে কেমন করছে।

    -বাবা, এইতো দুনিয়ার নিয়ম। সময় তো সেই আবহমান কাল থেকে এভাবেই গড়িয়ে যাচ্ছে। দিদি কি একেবারে চলে যাবে? সব সময় আমাদের যোগাযোগ থাকবে। কি বলিস মা?

    -ঠিক তাই বাবা। তবে আমারও তোমাদের জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বাবা। বিশেষ করে আমার দাদা ভায়ের জন্য। ও যখন বাসায় ফিরে, কে দেখবে ওকে?

    -দিদি ভাই, তোমাকে ছাড়া শান্তি নীড় আমি ভাবতেও পারছি না। আমার কিছুতেই সময় কাটবে না। হয়তো বাসায় আসতেই ইচ্ছে করবে না। আচ্ছা দিদি ভাই, বিয়ের পর তোমরা আমাদের সাথে থাকতে পারো না? কত বড় আমাদের বাসা।

    -তা কি হয় বাবা? ওরা মানবে কেন? ওরা কি ওদের একমাত্র ছেলেকে আমাদের কাছে রাখবে? তোমার দিদি ভাই, তোমার আসবার সময় চলে আসবে শান্তি নীড়ে। কি বলিস মা?

    মি. চৌধরী বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে পড়লেন। শায়নের কথাগুলো তার মস্তিষ্কে ভীষণ ভাবে আঘাত করছে। দুটো সন্তান একে অপরের পরিপূরক। এভাবে বিয়ের পর আলাদা হবে প্রকৃতির নিয়মে, কিন্তু কখনো তা মাথায় আসেনি কারো হয়তো। মি. চৌধুরী দেখলেন কেয়া একদৃষ্টে বাহিরের পানে চেয়ে আছে, সে দৃষ্টিতে বিষন্নতা ভর করেছে, শায়নের চোখে চিকচিক করছে জল, সেও অজানায় চেয়ে আছে। মি. চৌধুরীর প্রিয় লিমুজিন কি বুঝলো? কতটা বিষাদ ভর করেছে গাড়িতে বসা বাসিন্দাদের মাঝে ? হঠাৎ গাড়ি থেমে গেলো, মি. চৌধুরী কোন মতে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে নেমে পড়লেন গাড়ি থেকে। ইঞ্জিনটা বেশ গরম হয়েছে গাড়ির, পানি নেই বললেই চলে। ইঞ্জিন কভার উঠিয়ে কিছুটা পানি ঢাললেন মি. চৌধুরী। অতঃপর ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট দিলেন আবারও। কেমন জেদি সন্তানের মতো স্টার্ট নিয়ে আবারও শব্দ করে থেমে গেল গাড়ি। আবারও স্টার্ট দিলো মি. সোহরাব চৌধুরী। এবার আর প্রতিবাদ নয়, স্টার্ট নিলো গাড়ি এবং গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চললো। তবে গাড়িটি এমন আচরণ করেনি কখনো এর আগে!

     

    লেখক: আমিনুল ইসলাম, কবি ও সংগঠক 

     

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম