• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ৫:১১ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম অংশ:

    কেয়া চৌধুরী সেদিন বেড়াতে গিয়েছিল, সাথে ছিল খালাত ভাই ও বোন। শম্পা চৌধুরী যখন ফোন করলেন, তখন তিনি একটি রেষ্টুরেন্টে হালকা নাস্তা করছিল। কেয়া চৌধুরী ভ্রমনকালে সাধারণত লাঞ্চ করেন না। তাঁর ভাই, বোন, ড্রাইভারকে লাঞ্চ করাচ্ছিল। হঠাৎ ফোন এবং ফোনে আসা প্রস্তাব তাঁকে বেশ নাড়া দিলো। তিনি ভাবছিলেন এমন একটা প্রস্তাব আসতে পারে। মানুষ হিসাবে সৌমিক পারফেক্ট। আন্তরিক, ওবিডিয়েন্ট, ব্রিলিয়ান্ট, ভদ্রতা অসীম। কিন্তু লাইফ পার্টনার? জানি না, কেমন হবে? তবে অনেক চেষ্টা করেও তাঁর কোন ক্রুটি খুঁজে পাওয়া গেলো না। তবুও কেয়া চৌধুরী একবারের জন্য অতীতে বা বর্তমানে, কখনোই এভাবে ভাবেন নাই যে, সৌমিককে সে ভালোবাসে বা জীবন সঙ্গী হিসাবে তাঁকেই চাই। তবে একজন ভালো মানুষ যদি কারো জীবনে দরকার মনে হয় অবশিষ্ট জীবনের সাথি হিসাবে,তবে সৌমিক যথেষ্ট আদর্শ। অন্য কেউ কখনোই কেয়া চৌধুরীর হৃদয়ে এতোটুকু নাড়া দিতে সক্ষম হয়নি। এমন কি সৌমিকও নয়। তারপরেও এ প্রস্তাব তাঁকে ভাবনার খোরাক যোগাচ্ছে বৈকি। অন্তত সৌমিককে সে চিনে, জানে এবং ভালো বন্ধুও বটে৷ বন্ধু থেকে জীবন সাথি, মন্দ কী, হোক না। কেয়া সিদ্ধান্ত নিলো প্রস্তাবের পক্ষে । রেষ্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলো তাঁরা। কেয়ার মস্তিষ্কে কিছু এলোমেলো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। গাড়ির কাঁচ নীচে নামিয়ে নিল কেয়া চৌধুরী। হুঁ হুঁ করে বাতাস এসে তাঁর হৃদয় ও মনকে সজীব করে তুললো। বেশ উঁচু নীচু রাস্তা, পাশে বহমান খরস্রোতা নদী, তাঁর তীর জুড়ে নানা গাছ গাছালি পেরিয়ে যাচ্ছিল তাঁদের গাড়িটি। মনটা বেশ ফুরফুরে অনুভূতির ছোঁয়া পেল। তাঁর মুখে একটা গানের সুর নিপুন তালে ভেসে উঠলো-



    এলোমেলো বাতাসে সুখের সুবাস,
    এলো খবর টেলিফোনে মন উদাস।
    একা থাকা জীবনে সহযোগী তুমি,
    পেলো মন হঠাৎ দেখা নব ভুমি।…

    তাঁর সেল ফোন বেজে উঠলো, ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো যার নাম, তাঁর ফোন অনেক অনেক বার রিসিভ করেছেন কেয়া চৌধুরী, কিন্তু আজ বড্ড অস্বস্তি, সাথে কিছু লজ্জাবোধ তাড়া করছে কেয়া চৌধুরীর। কী বলবে সৌমিক? তার জবাবে আমিই বা কী বলবো? ফোন বেজেই চলেছে……..অবশেষে রিসিভ করলো কেয়া।

    -হ্যালো ম্যাম, কি পোষাক পড়া হয়েছে আজ ? নিশ্চয় গোলাপী রঙের শাড়ির কালো পাড়, সাথে ম্যাচিং অল অবজেক্ট, নয় কি?

    কেয়া কিছুটা ধাক্কা খেলো আজ। সৌমিক কখনো এভাবে কথা বলে না তার সাথে। সবচে আশ্চর্য ব্যাপার, তাঁর পোষাকের রঙ কী করে সঠিক বলে দিল সৌমিক? কেয়া ম্যাচিং পোষাক পড়ে, তা সৌমিক কখনো বলেও নি, কেয়ার মাথা কাজ করছে না। রাতারাতি সৌমিক তাঁর কথার স্টাইল পরিবর্তন করেছে, কিছুটা অধিকারবোধও মনে হচ্ছে তাঁর মধ্যে। অথচ তাঁর মনে আছে, একবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সারসানে সুন্দর বোন ট্যুর। সৌমিক ফোন করে বললো- কোথায় কেয়া এখনো দেখছি না যে ; কেয়া বলেছিল, সৌমিক আমি এখনো তৈরী হতে পারিনি।

    -কেন কেন, কী সমস্যা?

    -আসলে একডজন শাড়ি সামনে, কোনটা পড়বো বুঝতে পারছি না। একটু সাহায্য করবে? জবাবে সৌমিক বলেছিলো, জানি না বাবা, ওসব আমি বুঝি না। তোমার যা খুশি একটা পড়ে আসো। আর আজ ? গোলাপি রঙের পোষাক পড়া, তাও ঠিকঠাক বলে দিলো ?

    কেয়া সৌমিকের প্রশ্নের জবাবে বললো- হঠাৎ পোষাক নিয়ে এতো আগ্রহ যে?

    তাইতো, সৌমিকও ভাবলো। পোষাক নিয়ে তাঁর কোন সংস্কার নেই, কিছু একটা হলেই হলো। তাই কেয়া অনেক সময় তাঁর পোষাক নিয়ে জানতে চাইলেও সৌমিক তেমন আগ্রহ দেখাতো না।

    জবাবে সৌমিক বললো- না মানে, কিছু ভেবে নয়। হঠাৎ মনে হলো তাই। তুমি কি বেড়াতে বেরিয়েছো কেয়া?

    – হ্যাঁ, তুমি কেমনে জানলে?

    – ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয় ম্যাম। তাইতো জেনে গেলাম।

    – ও, তাই বুঝি ? তুমি কোথায় সৌমিক?

    – এই যে, বাসার ছাদে দোলনায় দুলছিলাম। তখন মন চাইলো তোমার সাথে কথা বলি। তোমার কি ফিরতে দেরি হবে?

    – কেন? বলতো সৌমিক?

    -না, মানে এমনি। আচ্ছা রাখছি, আবার কথা হবে।

    কেয়া চৌধুরী লক্ষ্য করলো আজ সৌমিকের কথায় কিছুটা জড়তা, সচরাচর যেভাবে বন্ধু সুলভ কথাবার্তা তাদের হতো, আজ তা উধাও। তাঁর নিজেরও তো একই রকম অবস্থা। মনে হচ্ছিল কোন কথায় নেই আজ সৌমিকের সাথে। কিন্তু উল্টোটায় বরং হওয়ারর কথা। তাহলে বিয়ের আলোচনা, যা দুজনে জ্ঞাত; তার জন্য সৌমিক ও কেয়ার মাঝে কোন আড়ষ্টতা নিয়ে আসলো? হবে হয়তো। তবে কেয়ার পোষাক ঠিক ঠিক বলে দিবার বিষয়টি কেয়া দারুণ উপভোগ করেছে। হয়তো নারি সুলভ একটা সংস্কার এটি।

    আজ খালামনি বলেছিল- গোলাপি শাড়ি পড়ে যা কেয়া। তোকে অনেক বেশি কিউট লাগে এই পোষাকে। গোলাপী সেন্ডেল ছাড়া আর সবই ছিল তাঁর কাছে, তাই যাত্রা এক ঘন্টা পিছিয়ে গোলাপি সেন্ডেল বাজার থেকে নিয়ে এসে তারপর বেরনো। গাড়ির সামনে রিয়ার ভিউ মিররে চাইলো কেয়া। তাঁকে চমৎকার লাগছে নিজের কাছেই। বিশেষ করে গোলাপি পাথর বসানো ইমিটেশনের কানের দুল অপূর্ব লাগছে। তাঁর লম্বা মুখমন্ডলের সাথে কী সুন্দর মানিয়েছে। গোলাপি ফিতার ঘড়িটি গত জন্মদিনে বাবার দেওয়া উপহার। আর তখনই গোলাপি শাড়ি, ব্লাউজ, ভ্যানিটি ব্যাগ সব কিছু নিয়ে নেয় কেয়া।

    আজকের বেড়াতে আসা মূলত তাঁর খালাত ভাই অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ইপ্তির অতি আগ্রহে, সাথে তাঁর সদ্য এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ করা বোন শিউলীর চাপাচাপি। তবে বেশ উপভোগ্য ছিলো আজকের বেড়ানো। না শীত না গড়মের হেমন্তের আবহাওয়া, সাথে প্রকৃতির সৌন্দর্য দারুণ উপভোগ করেছে তারা আজ। বিশেষ করে নদী তীরঘেষা চমৎকার আঁকাবাঁকা রাস্তা, সারিসারি নানা প্রজাতির গাছে, নদীর জলে নানা পাখির কিচির মিচির কলকাকলীতে অসাধারণ দৃশ্য চাক্ষুষ দর্শনে হৃদয় ও মন বেশ উচ্ছল। সামনে একটা বিশাল ব্রিজ পেরিয়ে এলো ওরা গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যার আবহ ফুটে উঠেছে, তাই ব্রিজটার আলোর কিরণ পানিতে মিশে চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করছে। কি মনে করে সৌমিককে ফোন করে বসলো কেয়া! সৌমিক রিসিভ করে বললো, কি পৌঁছে গেছ বাসায়?

    -কেন না পৌঁছলে কী ফোন করা নিষেধ?

    – না না, তা হবে কেন? আমি এমনি জানতে চাইছিলাম।

    – আচ্ছা রাখো, ফিরে কথা বলবো।

    -কেন ফোন করলে বলবে না? অন্তত কিছু বলো।

    – না, কিছুই বলবো না। বলতামতো ফিরে কথা বলবো।

    ফোন রেখে বেশ রেগে গেল কেয়া। সৌমিক ওভাবে কথা বললো কেন? আচ্ছা কেন ফোন করলাম সৌমিক কে? কোন কথা ছিল কি? নাতো, তাহলে? এটি কি এই নতুন সম্পর্ক হতে যাচ্ছে জন্য কোন অধিকারবোধ? তাঁর বেশ লজ্জা লাগলো, তাই তো কোন কারন ছাড়া ফোন করা তাঁর মোটেই উচিৎ হয়নি। এমন মানসিক টানাপোড়েনের ভাবনায় মধ্যে কখন বাসায় এসে পড়েছে, তা বুঝতেও পারেনি কেয়া। ড্রাইভার বললো- ম্যাম আমরা এসে পড়েছি। ইপ্তি, শিউলী ঘুমিয়ে পড়েছিল, ওদের আলতো ডাক দিল কেয়া, এই তোমরা উঠে পড়, আমরা এসে গেছি বাসায়।

    খালা বাড়িতে আরো বেশ কয়েকদিন থেকে গেলো কেয়া। মাঝে মধ্যে সৌমিক ফোন করেছে কেয়াকে। ফরমাল কথা হয়েছে। শম্পা চৌধুরী তাঁর মা বেশ তাগাদা দিচ্ছিলেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসবার জন্য । এর মধ্যে শায়ন বললো, দিদি ভাই আমার একমাসের ছুটি বাড়ি আসছি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে। আমার রুম কি ঠিকঠাক আছে দিদি ভাই ?

    -কেন নয় সোনা? তুমি চলে আসো, আর কী চাই বলো, সব ঠিকঠাক পেয়ে যাবে।

    শয়ন বলেছিল আমার ভালোমানের ক্রিকেট ইন্সট্রুমেন্ট চাই দিদি ভাই। সব কিছু, যে ভাবে টেস্ট ক্রিকেটাররা ব্যবহার করে ঠিক তেমন।

    -কেন দাদা ভাই? তুমি কি ক্রিকেটার হবে শেষ পর্যন্ত?

    – দিদি জানো আমাদের আন্তঃ কলেজ টুর্নামেন্টে মান অব দ্যা সিরিজ হয়েছি।

    – ওহো- কনগ্রাচুলেশন দাদা ভাই। ঠিক আছে, তোমার তো তাহলে ঐ সব পাওনা হয়েই গেছে।

    -অনেক অনেক ধন্যবাদ দিদি ভাই।

    – ও দাদা আমার, ফরম্যালিটি হচ্ছে?

    মাকে জানিয়ে দিলো কেয়া, মা আমি কালই আসছি। গাড়ি পাঠিয়ে দাও। তাঁর আদরের ছোট ভাইটি আসবে। কতো যে দায়িত্ব!

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    কেয়া চৌধুরী ফিরবার পথে সবচে সুখকর খবর পেয়ে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তাঁর বিসিএস ভাইভার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল আগেই, কৃতিত্বের সহিত টিকে গেছে। টিকে গিয়েছিল তাঁর উডবি সৌমিক। এবার ডাক পড়েছে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের । উভয়ের প্রথম চয়েজ প্রশাসন, দ্বিতীয় শিক্ষা। ডাক এলো প্রশাসনে। তাদের অন্তত কুড়িজনের ট্রেনিং এর তারিখ ঘোষিত হয়েছে একই সাথে। তারপরই ম্যাজিষ্ট্রেড হিসেবে যোগদান। এমন খবরে কার না মনে বিজয়ের হাসি ফোটে? তাঁর তর সইছিলো না কখন বাসায় পৌঁছবে? বন্ধু বান্ধব আত্বীয় স্বজনের ফোনের পর ফোন আসছিলো। কেয়াকে অভিনন্দনে অভিনন্দনে সিক্ত করছিলো। মনে মনে আরেক জনের ফোনের অপেক্ষা করছিলো কেয়া কিন্তু এলোনা। তাহলে কি কেয়া করবে? না, করবে না। নিজের কোন সাফল্যের খবর কেয়া ওভাবে জানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না বরং লজ্জাবোধে ভোগে। যারা ফোন করে অভিনন্দিত করলো তাদের অনেক সাধুবাদ জানালো কেয়া। শম্পা চৌধুরীর ফোন এলো-
    -এই যে মা তুমি কখন পৌঁছবে? আর তো তর সইছে না। জানিস? সৌমিক সবাইকে ফোন করে জানিয়েছে তোর ফলাফল।
    -ও, তাই নাকি মা? বেশ তো, মা আমি কিছু সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাব। জানো মা শয়ন কি করেছে?

    -জানি তো, আর পুরষ্কার কি পাচ্ছে তাও জানিয়েছে।

    – ওহো, তাই নাকি মা? ঠিক আছে মা রাখছি।

    কেয়া বেলা দুটোর মধ্যে পৌঁছে গেলো বাসায়। বাবা বাগানে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। মেয়েকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন, অভিনন্দন অভিনন্দন অভিনন্দন আমার মায়ের জন্য।

    – বাগানে কী করছিলে বাবা?

    -অর্কিডগুলো দু সপ্তাহ আগে রোপন করেছি মা, আজও চারার মুখ দেখছি না।

    -এবার উঠবে বাবা, চলো ভিতরে যাই।

    -হা হা চল, ভিতরে যাই। গেলে সারপ্রাইজ আছে, চল চল।
    -অভিনন্দন মিস চৌধুরী, হাভ এ্যা গুড টাইম এভরি মোম্মেন্ট।

    -থ্যাঙ্ক য়্যুঁ এ্যা লট সৌমিক, অলসো কনগ্রাটুলেশন টু ইউ।

    -ইট’স ওকে কেয়া।

    -তা কখন আসা হলো এখানে?
    -খবরটা নিয়ে চলে এসেছি ম্যাম, ইচ্ছে করেই ফোন করিনি, ভাবলাম সামনা সামনি দেখা করে অভিনন্দন জানিয়ে আসি। অবশ্য খালাম্মা বুদ্ধিদাতা!

    -আচ্ছা, তাই বলো। সবাইকে মেসেজটা পৌঁছানো হলো, শুধু আমাকে ছাড়া? বেশ তো আমার বন্ধু একজন।

    – হা হা হা, কেন খবর কি পৌঁছেনি ? আসলে আমি সামনে বসে খবরটা দিতে চেয়েছি ম্যামকে। একটু অন্যভাবে।
    – জি মশায় বুঝেছি, তা বসে কই দাঁড়িয়ে দিলে তো খবরটা। আচ্ছা সৌমিক আমি একটু ফ্রেস হয়ে আসছি। এক সাথে বসে লাঞ্চ করবো। ঠিক আছে?

    -ওকে ম্যাম, ডান!
    কেয়া তাঁর রুমে এসে কাপড় পরিবর্তন করে ফ্রেস হয়ে নীচে আসলো। ততক্ষণে ডাইনিং এ খাবার সার্ভ করা হয়েছে। অনেক পছন্দের রেসিপি থাকলেও কেয়া এক পিচ লবস্টার আর কই মাছ ছাড়া অন্য কিছু ছুঁয়েও দেখলো না। সার্ভ করছিলেন শম্পা চৌধুরী। মেয়ের কম খাওয়া নিয়ে উনি যেন অজ্ঞাত কারো কাছে অনেক অভিযোগ করলেন। সৌহরাব চৌধুরী হো হো রবে হেসে বললেন –
    – অভিযোগ কার কাছে একটু জানতে পারি?

    – শোন ওভাবে হাসবে না। সৌমিক এসেছে, মেয়েটাও কতোদিন পর এলো বাড়িতে। কত আশা করে ওর পছন্দের খাবার রান্না করালাম। কই, ছুঁয়ে দেখলো?

    – বেশ তো বাবা থামো দেখি এবার। এই দাখো আমি তাঁর পছন্দের পদ খেয়ে নিচ্ছি।
    বলেই এক টুকরা ইলিশের পেটি নিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। সৌমিক কেয়া সহ জনাব চৌধুরী একযোগে হেসে উঠলেন। মিসেস চৌধুরী রাগে হুম হয়ে বেরিয়ে গেলেন ডাইনিং রুম থেকে।
    বিকালে সৌমিক বাড়ি যাবে, কেয়া চৌধুরী তাঁকে এগিয়ে দিতে মূল রাস্তা পর্যন্ত এলো।

    -তাহলে? আমি কি এখন আসতে পারি?

    -জি পারেন?
    -আপনার কি কিছুই বলবার নেই আমাকে?

    – নাতো, আমি আবার কি বলবো? এই রাস্তা পর্যন্ত এসেছি এই তো ঢের! নয় কি? মি. সৌমিক রায়হান আলম?
    -জি, জি মিস চৌধুরী একদম তাই? তবে!

    – কী তবে বলে ফেলুন মশাই, কী তবে?
    – তবে, মানে আমি আর এভাবে একা থাকতে চাই না মিস চৌধুরী, আমি আপনাকে মিসেস আলম হিসেবে দেখতে চাই শিঘ্রই!
    – বাহ্ বাঃ, এতো সাহস? তা এখানে একা পেয়ে এভাবে সাহস দেখানো হচ্ছে? যে ভাবে বাড়িতে এসে আমার বাবা মাকে বলা হলো, তাঁদের বললেই বেটার হতো না? আমাকে ডিস্টার্ব করা কেন?

    -ওহো, তাই তো! বড্ড ভুল হয়ে গেল। আসল কথা হচ্ছে এই রণ রঙ্গিনীকে বলার সাহস পাইনি আগে, বুঝলে দাঙ্গা রানি?

    – কী, আমি দাঙ্গা রানি? কি হচ্ছে এসব? আমি কিন্তু হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো, বলে দিলাম।

    -ওরে বাবা, সরি, সরি, সরি ম্যাম সরি! আর হবে না এমন। সত্যি কেয়া আমি আর এতোটুকু দেরি করতে চাই না। ট্রেনিং শেষে ঘরে উঠাতে চাই, তারপর একসাথে অফিসের বারান্দায় হাত ধরাধরি করে…..!

    – এইবার কেয়ার সাদা ধবধবে মুখন্ডল লালচে বরণ ধারণ করলো।

    ঢোক চিপে বললো- আমাকে কেন সৌমিক? এসব বাড়ির কর্তাদের ব্যাপার, তারাই কথা বলুক।

    -জি ম্যাম, তাই হবে ৷ অতি তাড়াতাড়ি একটা দিন নির্ধারণ হবে। তবে ট্রেনিং শেষে মাই ডিয়ার বাগদত্তা! ঠিক আছে? আমি আসছি, বাই বাই কেয়া, ভালো থাকো।

    শায়ন আসলো, বাড়িতে যেন আনন্দের বন্যা। ক্যাডেট কলেজের কড়া নিয়ম কাননে অভ্যস্থ শায়ন চৌধুরী, পরের বছর এস এস সিতে বসবে। মেধাবী শায়ন বরাবর ভালো ফলাফল করে আসছে। যদিও চার বছর আগে যখন সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়, তখন শায়ন ও বাসার পরিবেশ বেশ বিষাদময় ছিল। কন্যা ছেলে আর মা বাবার একটা অকাট্য বন্ধণ এই পরিবারের। তবে সময়ের সাথে এবং আগামীর সুন্দর বাসনায় অবশেষে সব ঠিক হয়ে যায়। তবে ছুটি পায় কালে ভদ্রে। কিন্তু এবার শীতের ছুটি বেশ লম্বা, তাই চৌধুরী পরিবারে আজ খুশির বন্যা। শায়ন চৌধুরীর আগমন কেয়ার ম্যাজিষ্ট্রেড হবার চেয়ে কম আনন্দের নয় এই পরিবারের জন্য।

    বিকালে বাসার সামনে লনে বাডমিন্টন খেলা বেশ জমে উঠলো। কিন্তু কেবল কিশোর উত্তীর্ণ শায়নের সাথে কেউ পেরে উঠছিলো না। বোনের পরে এবার বাবার আগমন, কিন্তু তিনিও ধরাশায়ী ছেলের কাছে। অতঃপর চা চক্রের আয়োজন লনের পাশে কৃত্রিমভাবে সাজানো চারটি চেয়ার মাঝে টেবিল আর উপরে সুদৃশ্য ছাদ। সেখানে শায়ন চৌধুরীর বিজয়ী মুচকি হাসি।

    -তা ইয়ংম্যান, তুমি এতোটা বড় হয়ে উঠেছো, তা আজ বুঝতে পারলাম। অভিনন্দন মাই ডিয়ার সন।

    – ওহো, এখন সব প্রশংসা ছেলের জন্য নাকি? আমরা বুঝি কেউ না, কিছুই না? মা চলো আমরা ভিতরে যাই। বলেই কেয়া উঠে দাঁড়ালো…!
    -হা হা হা, এইবার আমার মা রেগে গেলো। রাগলে তো হারলে আম্মাজান, তা বুঝি জানো না? আমার মা কম কিসে? হয়তো খেলায় হেরেছে আমাদের শায়ন সাহেবের কাছে। বলেই আরো জোরে হেসে উঠলেন মি. চৌধুরী।

    – কেয়া বেশ আর্তনাদ করে উঠলো, আবার? বাবা ভালো হবে না বলছি।
    – শায়ন মুচকি হেসে বললো, দিদি ভাই আমার সাথে হিংসা হচ্ছে ? ওহো তাহলে কানে কানে বলতে, ভাইটু একটু হেরে যা ভাই। তাহলে হেরে যেতাম ! হা হা হা।

    – ওহো, শায়ন দিদির সাথে ইয়ার্কি হচ্ছে? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। বলেই শায়নের কান আলতো করে টেনে ধরলো কেয়া।
    শায়ন হা হা হা করে হেসে বললো, দিদি ভাইয়ের কানমলা এতো মিষ্টি ? আরো একটু কানমলে দাও দিদি ভাই। কেয়া আলতো জড়িয়ে ধরে বললো, আমার সোনা ভাই্। সত্যি অনেক বড় হয়ে উঠেছিস। শোন দাদা কাল তোকে নিয়ে মার্কেটিং করবো, ওকে?

    মি. এবং মিসেস চৌধুরী বড় আত্মতৃপ্তি সহ চা পান করছেন। আর ভাবছেন কতো সুখের পরিবার তাঁদের। দুই মেধাবী ছেলে মেয়ের আন্তরিকতা সত্যি তাদের পরিবারকে পূর্ণতা দিয়েছে। এই সুখের জোয়ারে ভাটার টান নেয় যখন ওরা যার যার মেসে চলে যায়। পরিবারের চার সদস্য নানা গল্পে জড়িয়ে গেলো, মাঝে মাঝে উচ্চস্বরের হাসির আওয়াজ বলে দিচ্ছিল, ওরা কতোটা সুখি। এমন সময় অদূরে কোন মসজিদে মাগরিবের আজান দিলো, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার… মিসেস চৌধুরী বললেন – চলো চলো সবাই ভিতরে যাওয়া যাক।

    লেখক: আমিনুল ইসলাম, কবি ও সংগঠক। 

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম