• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ২৬ নভেম্বর ২০২১ | ৬:৫৯ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

     

    প্রথম অংশ:



    সকাল সাতটার মধ্যে বেশ ক’জন স্কাউট দলের সদস্য হাসপাতালে চলে এলো। যাদের ব্লাড গ্রুপ বি নেগেটিভ। তারা ডাক্তার রহমানের কাছে রিপোর্ট করলেন। ডাক্তার রহমান তাদের নির্দিষ্ট কক্ষে পাঠিয়ে দিলেন। ডাক্তার রহমান ও তাঁর সহকারীগণ গত রাত থেকে এখন অবধি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন অমিকে। তিনি কোনরূপ ঝুঁকি নিতে চাননি। কিন্তু এখন বেশ ক্লান্তি অনুভব করছেন। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। অফিস পিয়নকে ডেকে হালকা নাস্তা সাথে কড়া চায়ের ব্যাবস্থা করতে বলে অমির দিকে চাইলেন। কী যে এক মায়ায় পড়ে গেছেন ডাক্তার রহমান। মনে হচ্ছিল তাঁর কত যেন আপন, এই সাহসী যুবক। তাই সুযোগ থাকার পরেও আজ রাতে বিশ্রামকে বিদায় জানিয়ে এই যুবকের পাশেই রাত কাটিয়ে দিলেন। মনেপ্রাণে চাইছেন সে সুস্থ হয়ে
    সবার মাঝে ফিরে আসুক। কিভাবে যেন মনের উপর এক মারাত্বক প্রভাব বিস্তার করেছে এই উদ্যোমী তরুণ। তাই তাকে সুস্থ করাটা যেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তিনি এবং তাঁর গ্রুপ। অমির পানে চেয়ে চেয়ে এমনি কত ভাবনা তাঁকে জড়িয়ে রেখেছে। এক মায়ের হাহাকার তাঁর মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলামের আন্তরিকতা। সব মিলে ডাক্তার রহমান যেন” অমিকে বাঁচাও” কমিটির অন্যতম সদস্য, যাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে। এমন ভাবনার মাঝে বেশ কিছু সময় কেটে গেল, কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন ডাক্তার রহমান, সাথে এক ফোঁটা চোখের জল অমির গালে পড়লো। ঠিক তখনই যেন মিরাকল ঘটে গেল। অমি চোখ খুলে চাইলো। অস্ফুট ডাকলেন – মা,তুমি কোথায়,কণ্ঠ অস্পষ্ট, তবু বিশাল মেসেজ ! আবারও চোখ বুজলো অমি।

    ডাক্তার রহমান স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, তিনি মহান আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন। এই মূহুর্তে মেডিক্যাল সাইন্সকে বোকা বানিয়ে অমি নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৮-১০ ঘন্টা আগে তার ফিরে আসার ঈঙ্গিত দিয়ে আবারো চোখ বুজলো। তবে এই মুহূর্তে তার হার্ট, চেষ্ট, প্রেসার অনেকটা স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলো।

    ডাক্তার রহমান চিৎকার দিয়ে বললেন, ইয়া আল্লাহ তুমি সত্যি মহান, আমরা পেরেছি।

    এরই মধ্যে নার্স কয়েক ব্যাগ রক্ত নিয়ে হাজির হলেন। ডাক্তার রহমান রক্তের লাইন চালু করে তা এ্যাডজাস্ট করলেন নিজ হাতে। এরপর বললেন, সিস্টার আমি আমার রুমে আছি। কোনরূপ পরিবর্তন দেখলে আমাকে সংগে সংগে জানাবেন।

    অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম অমির শারীরিক উন্নত্তির বিষয় জ্ঞাত হয়ে আপাতত বাসায় ফিরেছেন। এমন একটি ভালো খবর মিসেস সুলতানাকে দিতে পেরে বেশ স্বস্তি নিয়েই ফিরেছেন তিনি। সারারাত নির্ঘুম বৃথা যায়নি। তিনি বাসায় ফিরে চা নাস্তা সেরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখনই তাঁর ফোন বেজে উঠলো। ডাক্তার রহমানের ফোন, কিছুটা দ্বিধা কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে ফোন রিসিভ করলেন মি. আমিরুল।

    -আসসালামু আলাইকুম মি. রহমান, বলুন।

    -ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো খবর আছে মি.আমিরুল।

    -অধ্যক্ষ সাহেব কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, জি মি. রহমান বলুন। আসলে আমি আপনার ফোনে কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম।

    -না না মি. আমিরুল, আসলে আপনি এতোটা কষ্ট করলেন সারারাত, ভাবলাম খবরটি আপনাকে জানিয়ে দিই। আপনিও তো কম টেনশনে ছিলেন না ! অমি কিছু আগে কথা বলেছে মি. আমিরুল ।
    -আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো লাগলো। ওর মা কি জানে?

    -জি, নার্স জানিয়েছে, উনি কিছু আগে অমিকে দেখে গেছেন। বেশ স্বস্তিকর মুডে আছেন মিসেস সুলতানা।

    -জি, মি. রহমান আপনার চরম আন্তরিকতা আর আল্লাহর রহমতে অমি এখন অনেক বেটার। ঠিক আছে, আমি ছাড়ছি এখন। আজ আমাদের কলেজে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে যেতে হবে। আপনি কি আসতে পারবেন মি. রহমান?

    -না, আমি ঠিক এই পিক আওয়ারে যেতে চাচ্ছি না, তবে অনেক শুভ কামনা রইলো।

    কলেজে অধিকাংশ শিক্ষক উপস্থিত হয়েছেন আজ কলেজের নির্দিষ্ট উপসনালয়ে, যেখানে কিছু সংখ্যক ছাত্রও উপস্থিত হয়েছেন। আজকের জমায়েতের উদ্দেশ্য অমি ও ম্যাডাম কেয়া চৌধুরীর সুস্থতা কামনা করে দোয়া মাহফিল। অধ্যক্ষ স্যার আসলেই আলোচনা শুরু হবে। এর মাঝে অনেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে আলাপচারিতা সারছেন।
    অমির বেশ কিছু বন্ধু আজ এখানে জমায়েত হয়েছে। তাদের আগমন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই। তাদের কানে এই খবরও পৌঁছে গেছে যারা অমির জন্য রক্ত দিয়েছেন, তাদের কারো রক্তের কারনে ইনফেকশন হয়ে প্রায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে অমি। তারা এও জেনেছে যে, কোন মাদকসেবির রক্তের কারনে এ সমস্যা হয়েছে। তাই যারা রক্ত দিয়েছে, তারা বেশ আতঙ্কে আছে। সোহাগ তপু সহ বেশ ক’জন অমির সহপাঠী আজ কলেজে এসেছে। তারা এই সাহসী যুবকের সাহস নিয়ে আলোচনা করছে। তারাও মনে প্রাণে চায় অমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে তাদের মাঝে ফিরে আসুক।

    -ম্যাডাম অমির কতটা, বুঝলি গর্দভ? তপু সোহাগকে উদ্দেশ্য করে বললো।

    সোহাগ বললো- হুম, আমি অমির সাথে আর শত্রুতায় জড়াতে চাই না তপু। আমি হাসপাতালে যেয়ে ওকে অভিনন্দন জানিয়ে আসবো। আমি আমার ফেসবুক
    ওয়ালে ওর এবং ম্যাডামের সুস্থতা কামনা করে পোস্ট দিয়েছি।

    -দেখেছি বন্ধু দেখেছি, সেখানে অনেকে বলেছেন” ভূতের মুখে রাম নাম! ”

    -বলুক গে, আসলে প্রকৃতি ও পরিস্থিতি হয়তো ম্যাডাম আর অমির পক্ষে গাইছে, আর গতকালের ঘটনার পর তা আরো স্বচ্ছ। আমি আর ঝামেলা চাই না তপু।
    -বাহ্ বাহ্ বাহ্, তোফা বন্ধু তোফা! একেবারে উদাসী পথিক হয়ে গেলি? এবার গেরুয়া বসনে বেরিয়ে পড় অজানার উদ্দেশ্যে। পেছন থেকে সাগর বললো।

    -সাগর শোন আমি ম্যাডামকে কেন জানি ভীষণ ফিল করি। বিষয়টা নেগেটিভলি নিবি না৷ তবে কেন এই মায়া জানি না। তবে অন্য কারো সাথে উনি আন্তরিকতা দেখালে আমার কষ্ট হয়, কেন? তাও জানি না।

    -কিন্তু এখন সব কিছু অমির পক্ষে বন্ধু । দেখলি না, বন্ধুকের নলের গুতো খেয়েও কিভাবে ম্যাডামকে বাঁচিয়ে নিজে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তপু বললো।

    -হ্যাঁ বন্ধু ঠিক তাই। আমি হয়তো পারতাম না ওভাবে উনাকে রক্ষা করতে, হয়তো পালিয়ে বাঁচতাম। তাই অমিই যোগ্য। জানিস তো, বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা!

    সোহাগের এই বক্তব্যের মাঝে হতাশা ও এক ধরনের সুস্থ আচরণে ফিরে আসার মানসিকতা স্পষ্ট। যা তপু ও সাগর সমর্থন করলো এবং অমির জ্ঞান ফিরলেই তারা তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য হাসপাতালে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো।

    এর মধ্যে দোয়া মাহফিল শুরু হয়ে গিয়েছে, তারাও সেখানে যোগদান করলো। দোয়া মাহফিলে কিছু সংখ্যক শিক্ষক সহ অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম ম্যাডাম কেয়া চৌধুরী এবং অমির সুস্থতা কামনা করে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। তবে অধ্যক্ষ সাহেব মাদকের অপব্যবহার ও তার জন্য কতরকমের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করলেন। তিনি এও উল্লেখ করলেন যে, আমাদের কলেজের কোন এক মাদকসেবি ছাত্রের রক্তের কারনে সুস্থতার পথ থেকে চরম বিপর্যয়ে পরে। আমরা আমাদের কলেজে কোন মাদকসেবিকে আশ্রয় দিব না। তাদের শেষ বারের মতো সাবধান করে দিচ্ছি। সব শেষে ঈমাম সাহেব মনোগ্রাহী বয়ান উপস্থাপন করলেন এবং মোনাজাতের মধ্য দিয়ে মাহফিলের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন।

    ফোনটা বেজেই চলেছে….. ঘুমটা এতো চেপে এসেছে যে, চোখ খুলতে তাঁর কিছুতেই ইচ্ছে করছে না। কিন্তু যিনি ফোন করছেন, তিনি নাছোড়বান্দা। বারবার ফোন করেই চলেছেন। বাধ্য হয়ে ঘুম ঘুম জড়তা কণ্ঠে কেয়া চৌধুরী ফোন রিসিভ জরলেন।

    – হ্যা….লো, কে বলছেন?

    -এই অসময়ে ঘুমিয়ে কেন কেয়া, তোমার শারীরিক অবস্থা কেমন এখন?
    -আমি ভালো আছি, রাতে ভালো ঘুম হয়নি তাই আজ সকালে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

    -আমার এক ডাক্তার বন্ধু জানালো তুমি বেশ অসুস্থ, একটা এ্যাকসিডেন্ট করেছ। তাই আজ সকালে ফোন করেছিলাম। তুমি রিসিভ করোনি, তাই খালাম্মাকে ফোন করি।

    -আমি ভালো আছি সৌমিক, সমস্যায় আছে অমি ;যে আমাকে বাঁচাতে যেয়ে নিজেই মৃত্যুর দুয়ারে। পারলে সেই সাহসী তেজী ছেলেটার জন্য দোয়া করবে।

    -হ্যাঁ শুনেছি, ছেলেটি সারারাত বেশ ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিল। ব্লাড থেকে ইনফেকশনের কারনে। এখন তাঁর বিপদ অনেকটাই কেটে গেছে। তাঁর সেন্স ফিরে এসেছে, তবে এখনও ঘুমে আছে। হয়তো আগামীকাল তাকে কেবিনে ট্রান্সফার করবে।

    -তুমি ঠিক বলছো সৌমিক? তুমি ফোনটা রাখ, আমি একটু হাসপাতালে যোগাযোগ করবো। খবরটা দিবার জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    – কেয়া, কেয়া রাখবে না। কথা আছে।

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    -বললাম না সৌমিক, পরে বলবো? আমি রাখছি এখন।

    -শোন কেয়া,অমির শরীরে ব্যাড ব্লাড দিবার কারনে বেশ ঝামেলায় পড়ে যায় ছেলেটা, তবে এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। ডাক্তার রহমান ও তোমাদের অধ্যক্ষ সারারাত জুড়ে হাসপাতালে ছিলেন।

    -তুমি এতো সব কার কাছে জানলে?

    -আমার এক বন্ধু এই হাসপাতালের ডাক্তার, তার কাছে জেনেছি। তুমি সেখানে ভর্তি ছিলে, তাও জেনেছি। এখন তুমি কেমন আছো কেয়া?

    -আমি ভালো আছি, ঠিক আছে সৌমিক আমি রাখছি।

    বলেই কেয়া চৌধুরী ফোন কেটে দিলেন এবং ডাক্তার রহমানের নম্বরে ডায়াল করলেন।

    -আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?

    -ওয়ালাইকুম আসসালাম, ডাক্তার রহমান আমি কেয়া চৌধুরী বলছি। অমির সর্বশেষ অবস্থা কী ? তা জানতে চাইছিলাম।

    -অমি এখন অনেকটা ভালো, আমরা আশা করছি আজ বিকালের মধ্যে হয়তো কথা বলবে। এখন তার সেন্স ফিরে এসেছে কিন্তু ঔষধের কারনে ঘুমুচ্ছে। তা ছাড়া ওর শরীর প্রচন্ড দুর্বল।

    -ডাক্তার রহমান, আমি কি ওকে দেখতে আসতে পারি?

    -না, আজ না আসাটা শ্রেয় মিস চৌধুরী। তাছাড়া আপনার শারীরিক কন্ডিশন ততটা ভালো নয়। প্রচুর বিশ্রাম চাই আপনার। আমরা হয়তো আজ না হলেও আগামীকাল অমিকে কেবিনে ট্রান্সফার করবো। তখন ওকে দেখে যাবেন। তার আগে না আসায় ভালো হবে।

    -জি ডাক্তার রহমান, ঠিক আছে। তবে আমি মাঝে মাঝে আপনাকে বিরক্ত করবো।

    -নো প্রবলেম এ্যাট অল মিস চৌধুরী। আপনি বিশ্রামে থাকুন। খাবারের দিকে খেয়াল রাখুন। ঔষধগুলো নিয়ম মাফিক সেবন করবেন।

    -জি ডাক্তার রহমান,তাহলে রাখছি এখন।

    কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ম্যাডাম ফোন রাখলেন, ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে ভ্রু কুঁচকে রিং টোন সাইলেন্ট করে উল্টে রেখে দিলেন কেয়া চৌধুরী। তিনি এখন ভাববেন, শান্তির ভাবনা। একটা ভালো খবর তাঁকে ভীষণ ভাবে তাড়িত করছে, তাই তিনি এই মুহূর্তে কোন কিছুকে প্রশ্রয় দিতে চান না। ভাবনা জুড়ে অমির সুস্থতা, তাকে দেখতে যাওয়া। যদি আগামীকাল কেবিনে স্থানান্তর করা হয় তাহলে বিকালে যেতে চান কেয়া চৌধুরী। ছেলেটিকে না দেখা পর্যন্ত তাঁর মনের মাঝে জমে থাকা উৎকণ্ঠার অবসান হবে না। তাঁর কাছে নতুন ভাবে আবিষ্কৃত হবে অমি নামের এক তরুণ নওযোয়ানের। নানা ভাবনা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছে, তাঁকে সেই কঠিন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের ভিডিও চিত্র যেন বারবার রিভিউ হচ্ছিল ম্যাডামের হৃদয় ও মনন জুড়ে। প্রতিবার যেন নতুন নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছিল তাঁর মস্তিষ্কের নানা তন্তুতে।

    শম্পা চৌধুরী উপরে এলেন, তুই কেমন আছিস কেয়া?

    -জি মা, আমি এখন বেশ ভালো আছি । মা তুমি বস, আমি কফি করে নিয়ে আসি। মজা করে কফির সাথে জমিয়ে গল্প করবো।
    -বাহ্, বেশ পজিটিভ মুড আমার মায়ের। বেশ তো, তো হয়ে যাক কফি।

    -জি মা, আমি আসছি।

    -তুই সৌমিকের ফোন ধরছিস না কেয়া, সে বারবার আমাকে ফোন করছে।

    – মা…., আমি ওর সাথে কথা বলেছি। অযথা কথা বলার কোন মানে হয় না মা। আমি কিন্তু ওকে স্বাভাবিক একজন পরিচিতের বাইরে ভাবতেও পারি না, পারবোও না কখনো। ওভার অল, আমরা কেউ ছোট্ট শিশুটি নই। কারো রেসপন্সের মাঝে অনেক মেসেজ থাকে মা। ওর তা বোঝা উচিৎ। সেতো একজন বিচারক, তো আমাকে সে বোঝে না?

    -বুঝেছি কেয়া, যা এবার কফি হয়ে যাক।

    -না মা, দরকার নেই। আমি এখন একটু একা থাকতে চাই।

    – মা আমার রেগে গেলো ? তাহলে কফি ভাগ্যে নেই, তাই তো ? ঠিক আছে, আমি আসছি।

    -আচ্ছা বসো, আমি আসছি। কফি করে নিয়ে আসছি।

    কফির চুমুকে হারিয়ে গেল কেয়া চৌধুরী,
    সাত বছর আগের কথা, কেয়া তখন তৃতীয় বর্ষে। একই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেম ইয়ারের ছাত্র সৌমিক। টি স্টলে দাঁড়িয়ে হালকা নাস্তা করছিল সৌমিক ও তাঁর বন্ধু। কেয়ার ট্যাক্সি পাশে এসে ক্র্যাচ শব্দ করে দাঁড়িয়ে গেলো! আগের রাতের শাওন বৃষ্টির কিছুটা জমে ছিল পাশেই। জল-কাঁদায় একাকার সৌমিক অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে দেখলো, এক অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়ে তড়াক করে বেরিয়ে দু’হাত উঁচিয়ে বললো, সরি । সৌমিক দেখলো নীল শাড়ি,লম্বা হাতের ব্লাউজ, গলায় চমৎকার নেকলেস, হাতের আঙুলজুড়ে ডায়মন্ড রিং শোভা পাচ্ছে। পেছনে কোমরের নীচ পর্যন্ত কেশরাজি, নীল কাঁচের চুড়ি,নীল ভ্যানিটি ব্যাগ সেন্ডেল, এমনকি হাতঘড়ির ফিতাও নীল! আর দেখতে? লম্বা নাক যেন বাঁশের বাঁশি, গোলাকার নীল চোখ যাকে পাহারায় টানাটানা ভ্রুযুগল, নেত্রপল্লবে এক লাজুক ছবির বিমূর্ত চলমান রাজকন্যা। জবাবে শুধু- দ্যাটস ওকে, বললো সৌমিক আর চেয়ে রইলো সেই উর্বসীর পানে। এই শুরু, তারপর মাঝে মাঝে দেখা, আর হয়তো কপালের লেখা। ক্যাম্পাসে বা ক্লাসরুমের করিডোরে গল্প-কথায় বন্ধুত্ব, তারপর মাঝে মাঝে ক্যান্টিনে সাক্ষাৎ । ধীরে ধীরে বন্ধুদের মাঝে জানাজানি। অনেকের ভাবনা, তবে হার্টথ্রব কেয়া চৌধুরী ঝুললো ঐ সাদামাটা ব্রিলিয়ান্ট সৌমিকের কাঁধে?
    পড়াশোনা শেষে বিসিএস কোচিং এবং বাজিমাৎ প্রথমবারেই। তারপর? তারপর অপেক্ষা ডাক পাবার। তবে সৌমিক কেয়া বেশ জমিয়ে বন্ধুত্ব চালিয়ে গেছে, কখনো কারো জানাও হয়নি যে এর কোন পরিণতি আদৌ আছে কি না? তবে সৌমিক বারবার কিছু বলতে চেয়েও ফিরে এসেছে। জেদি ও বেশ মেজাজি কেয়াকে সে সব সময়ই সমীহ করে এসেছে। আর কেয়া এসবের কোন ধারই ধারে নাই কখনো। তবে ভেবেছে এভাবে, যদি সৌমিক প্রস্তাব দিয়ে বসে তাহলে হয়তো হ্যাঁ বলে দিবে। তবে আমি ওসব প্রস্তাবের ধারে কাছে নেই বাবা!

    অতঃপর একদিন সৌমিক, সাথে বাবা-মার আগমণ “শান্তি নীড়ে।” হ্যাঁ শান্তি নীড়’ই নাম বটে এই বাড়িটির। প্রয়াত আর্কিটেক ইন্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী তখন জীবিত। যিনি নিজের পছন্দের ডিজাইন অনুযায়ী বাড়িটি করেছিলেন বটে, তবে সবার ইচ্ছার প্রতিফলন তিনি ঘটিয়েছিলেন। দশ শতক জমির মাঝামাঝি সিঙ্গেল ব্লকের দ্বিতল বাড়িটিতে, উপরে নীচে চারটি করে মোট আটটি রুম নিপুণ ভাবে সাজিয়েছিলেন। আর বাইরের অবশিষ্ট জায়গাজুড়ে চমৎকার নানা জাতের ফল ফুল ও গাছের প্রদর্শনী। তারই কোনে সুন্দর টিপটপ একটা গ্যারেজ। যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িটি আজও শোভা বর্ধন করে। স্ত্রী, মেয়ে ছেলে একজন করে, মহা সুখের সংসার ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরীর। মেয়ে কেয়া চৌধুরী তাঁর আত্মা, ছেলে শায়ন চৌধুরী তাঁর প্রাণ। মাঝে সমন্বয়ক স্ত্রী শম্পা চৌধুরী।

    হঠাৎ সৌমিক ও তার বাবা মায়ের আগমনে তারা ভিমড়ী খেলো। কারন কেয়ার বাবা মা হিসাবে তাঁরা জানতেন, সৌমিক তার ভালো বন্ধু। দু’একবার এখানে এসেছেও বটে। কিন্তু এবারে এভাবে হুট করে চলে আসা তাঁদের কাছে একটু আলাদা মনে হলো। এমন সময় তাঁরা এলেন যখন কেয়া বাসায় নেই। তাঁর বিসিএসের ফলাফলের পর খালার বাসায় অবস্থান করছে কেয়া। সৌমিক কেয়া দুজনের ফলাফল পজিটিভ । ছেলে হিসেবে সৌমিক চমৎকার, ওদের পরিবারের বেশ নামডাক আছে।

    যথারীতি আপ্যায়নের পর বিকালে চা চক্র ঈপ্সিত প্রস্তাব এলো সৌমিকের মায়ের মাধ্যমে।

    -মিসেস চৌধুরী আমরা আপনার মেয়েটাকে চাইছি। সৌমিক ওর ভালো বন্ধু, তবে লাজুক ছেলে আমার, মা বাবাকে বেতাল করছে, কিন্তু যাকে বলবার তাঁকে বলা তাঁর হয়ে উঠে না। তাইতো আমরা কেয়ার বাবা মার কাছেই চলে আসলাম।

    -সেতো খুব ভালো কথা। সৌমিক চমৎকার একটা ছেলে, দেখতে শুনতে লেখাপড়ায়। মোটের উপর কেয়া সৌমিক ভালো বন্ধু। তবে আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। ওরা দুজন যদি রাজি থাকে আমাদের অনাপত্তি কেন? কী বলো গো তুমি? শম্পা চৌধুরী কথাগুলো বলে স্বামীর দিকে চাইলেন।

    -হ্যাঁ একদম তাই। যদি মিঞা বিবি রাজি তো কিয়া করেগা কাজী? বলে হা হা করে হেসে উঠলেন সোহরাব চৌধুরী। তবে একজনের মতামত নিতে হবে সবার আগে। সে হচ্ছে আমার রাজপুত্র জনাব শায়ন চৌধুরীর।

    আলোচনার পরিবেশ বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল। সিদ্ধান্ত হলো কেয়া ফিরলে তাঁর সাথে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। বেশ আনন্দ চিত্তে সৌমিকের বাবা বললেন, তাহলে আমরা আজকের মতো বিদায় চাইছি জনাব চৌধুরী। আমরা কিন্তু আগামী মাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে কথাবার্তা বলে নিব, কী বলেন আপনি?

    -জি অবশ্যই, আমরা আবারো কথা বলবো। শুভ কামনা রইলো আপনাদের জন্য।

    শম্পা চৌধুরী কেয়াকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দিলো। কেয়া বললো, আমি আগে ফিরে আসি মা। সামনা সামনি কথা হবে।

     

    লেখক: আমিনুর ইসলাম, কবি ও সংগঠক। 

     

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম