• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ১৮ নভেম্বর ২০২১ | ৬:২৪ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম অংশ:

    ওয়াস রুমের স্বচ্ছ আয়নায় নিজেকে বেশ ম্লান মনে হলো কেয়া চৌধুরীর। যেন অচেনা মনে হচ্ছে নিজের দৃশ্যমান অবয়বকে, এই মুহূর্তে। আজকের সারা দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে হলে, বেঁচে আছি ভাবতে তাঁর আশ্চর্য মনে হলো। তাইতো জীবন বুঝি এমনই। কত ঘাত প্রতিঘাত, উত্থান পতন মুহূর্তে সকল হিসাব নিকাশ পাল্টে দিতে পারে। সকালের ভাবনাগুলো গোধূলিতে কেমন ঝাপসা এলোমেলো। আজকের সকাল জুড়ে শুধু এক যুবক, যে তাঁরই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর এক উঠতি নওজোয়ান। যে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ছিনিয়ে আনলো তার ম্যাডাম কেয়া চৌধুরীকে। অমিত তেজে বুলেট বুকে নিয়ে সে তার আন্তরিকতার বহিপ্রকাশ ঘটালো। কতোটা ত্যাগ থাকলে এতোটা এগ্রেসিভ হওয়া যায়? বুঝতেও দিলো না, সে কতোটা কষ্ট সয়ে তার ম্যাডামকে বয়ে চলেছে শুধু মনোবলে। ঠিকানায় পৌঁছা অবধি মনে হয়েছে সে পারবে এবং সে পেরেছে নিজেকে ও তার ম্যাডামকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে ! কিন্তু হায়, গোধূলিতে সে মৃত্যুর মুখোমুখি আইসিইউ তার ঠিকানা, আর আমি? কী ভাবে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে, ভাবনাগুলো তাকে কেন্দ্রীক করে নিতে বাধ্য করলো ঐ অমিত তেজী যুবক। প্রতিটাক্ষণ তাকে ভাবতে, তার মঙ্গলে দোয়া করতে বাধ্য কেয়া চৌধুরী, তার ম্যাডাম। সত্যি সময়, তোমাকে সালাম, তুমি এক মুহূর্ত স্থির নও, অস্থির কিন্তু অবশ্যম্ভাবি। ম্যাডাম ভাবতে ভাবতে কিছুটা আন্মনা হয়ে পড়েছিলেন, তিনি তাঁর অবচেতন মনে অমির নিথর নিস্তব্ধ দেহ দেখতে পেলেন। অমি ম্যাডামের ওয়াস রুমের আয়নার মাঝে দৃশ্যমান হলেন! এ আয়না যেন আই সি ইউ এর সেই আয়না! যার মধ্য দিয়ে অমিকে দেখা যাচ্ছে। সে বলছিল, ম্যাডাম আমি পেরেছি আপনাকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে। আমার আর কোন চিন্তা নেই।



    কেয়া চৌধুরীর ভাবনাজুড়ে অমির অসুস্থ, অসহায় বাস্তব মুখায়ব দৃশ্যমান। কত অসহায় দৃষ্টিতে অমি অপলকে ম্যাডামের দিকে চেয়ে রয়েছে। কেয়া চৌধুরী বললো, অমি তুমি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। এটি আমাদের চাওয়া অমি। কিন্তু অমি যেন ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে….. ম্যাডাম বললো- অমি তুমি চলে যেতে পারো না, আমাদের ছেড়ে।

    যেন এক ধাক্কা খেয়ে ম্যাডাম স্বাভাবিক ভাবনায় ফিরে এলেন এবং কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, স্বগত বলে উঠলেন, এসব কী ভাবনা আমাকে ঘিরে ধরছে? তিনি দ্রুত সাওয়ার সেরে বেরিয়ে আসলেন। মাকে বলে হালকা নাস্তা করলেন। শরীর ক্লান্তিতে ছেয়ে আসছিলো কেয়ার, কখন ঘুমিয়ে পড়লো বুঝতেও পারলো না।

    স্বপ্নের মাঝে আবার এলো অমি! তাঁর ছাত্রদের নিয়ে কলেজ ট্যুরে কেয়া চৌধুরী, এমন স্বপ্ন অবাস্তব , কিন্তু স্বপ্নে কি হাত থাকে? অবচেতন মনে রেখাপাত করা ঘটনাগুলো ঘুমের মাঝে ভিড় জমায়। তারই মাঝে কোন বিষয় ঘুমের জগতে নানা ভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। ট্যুরের বিরতিতে নদীর ধার ধরে হাটছিলেন ছাত্র (অমি) ও ম্যাডাম, সামনে একটি টিলা। ম্যাডাম বললো, অমি আর সবাই কোথায়? এই তো ম্যাডাম আশেপাশে হয়তো।
    -চল অমি আমরা ঐ টিলাতে উঠবো, চারদিকটা দেখতে অনেক ভালো লাগবে।

    -চলুন ম্যাম।

    তারা সরু পথ দিয়ে এঁকেবেঁকে টিলার কিনারে এলো। সোজা উপরে উঠা সহজ নয়, ছাত্র-শিক্ষিকা পাশাপাশি হাঁটছিল।

    অমি, জি ম্যাম।

    এই টিলার শীর্ষে উঠলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাবে, দেখবে পৃথিবী কত সুন্দর!

    জি ম্যাম, অবশ্যই। তারা এগোচ্ছিলেন হঠাৎ অমির পা কোন গর্তে পড়ে হড়কে গেলো, তার পুরো শরীর ভারসাম্যহীন হয়ে টিলার উপর পড়ে গেলো।

    চিৎকার দিয়ে ডাকলো, ম্যাম আমি পড়ে যাচ্ছি। কেয়া চৌধুরী দেখলো অমি গড়িয়ে যাচ্ছে। উনি অমির হাত ধরলো এবং চিৎকার দিলো, বাঁচাও…….

    ম্যাডামের ঘুম ভেঙে গেলো, উনার সম্পুর্ণ শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। সামনে বেড টেবিলে রাখা জাগ থেকে এক গ্লাস পানি পান করলেন। বেড সুইচ অন করে সময় দেখলেন রাত চারটা পনের। ম্যাডামের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা, দুঃচিন্তা ভর করলো। এমন স্বপ্ন কেনো দেখলেন? অমি কেমন আছে, তা জানার ভীষণ আগ্রহ হচ্ছে। কিন্তু কাকে ফোন করবেন এতো রাতে? কেয়া চৌধুরী তাঁর মাকে ডাকলেন, বললেন মা খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছি, অমিকে নিয়ে। ছেলেটা কেমন আছে জানতে ইচ্ছে করছে।

    -এতো রাতে কেমনে খোঁজ নিবি মা ? আমার মনে হয় নানা দুঃচিন্তার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলি, তাই ওমন স্বপ্ন দেখেছিস, দেখবি সব ঠিক আছে।

    শোন্ আমি এক কাপ কফি করে দিচ্ছি। খেয়ে ঘুমিয়ে যা মা। কাল সকালে অমির খোঁজ নেওয়া যাবে, দেখবি সব ঠিক আছে।

    সালেহা সুলতানা, অনিক আই সি ইউ এর সামনে এলেন। সেখানে ডাক্তার রহমান দু’জন নার্স পাশাপাশি দাঁড়ানো, তাঁদের কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছিল। ডাক্তার রহমান বললেন- মিসেস সুলতানা আপনি?

    -না, মানে একটা বাজে স্বপ্ন দেখলাম, তাই ভাবলাম ছেলেটার একটু খোঁজ নিয়ে আসি।

    -জি মিসেস সুলতানা, হ্যাঁ, মানে অমি ভালো আছে, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা তো আছি।

    -কিন্তু আপনি আমতা আমতা করছেন ডাক্তার রহমান, আমি সঠিকটা জানতে চাই।

    -দেখুন, এমন ক্রিটিক্যাল রোগী, ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়, নানা উপসর্গ কাজ করে। তাই আমরা পুরোটা সময় অভজারভেশনে আছি মিসেস সুলতানা।

    ঠিক তখনই অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলামের মটর বাইক হাসপাতালের গেটে দেখা গেলো। সালেহা সুলতানা অধ্যক্ষকে দেখে আতঙ্কিত হলেন। এই অসময়ে উনি এলেন কেন? মায়ের মন কু গেয়ে উঠলো। তাঁর মনোরাজ্যে চরম ভয় ভর করলো, তিনি অধ্যক্ষ সাহেবের দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন- আপনি এ সময়ে?

    মি. ইসলাম বেশ ধাক্কা খেলেন, মিসেস সুলতানা কি তাহলে সব জেনে গেছেন? উনি ডাক্তার রহমানের দিকে চাইলেন। ডাক্তার চোখ ও মুখের অঙ্গভঙ্গিতে না সূচক ধারনা দিলেন। এই আলো আঁধারিতে বেশ অসহায় অনুভব করছিলেন সালেহা সুলতানা।

    তিনি ডাক্তার রহমানের দিকে চাইলেন। ডাক্তার রহমান অধ্যক্ষের দিকে চাইলেন। অধ্যক্ষ সাহেব মাথা ঝাঁকিয়ে জানাতে বললেন।

    মিসেস সুলতানা আপনি জানেন আমরা দিন রাত অমির পাশে আছি, আমরা প্রতিনিয়ত তার সুস্থতার জন্য সর্ব্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নানা ঔষধ প্রয়োগ করছি, রক্ত দিতে হয়েছে। রোগীর শরীর এই উপাদানগুলো গ্রহণে কিছু পজিটিভ নেগেটিভ রিয়াক্ট করে। তাই ভালো মন্দের মধ্য দিয়ে তাকে এগোতে হচ্ছে। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে অপেক্ষা করতে হবে। ডাক্তার রহমান এ পর্যন্ত বলে থামলেন।
    সালেহা সুলতানার উৎকণ্ঠা বেড়ে গেল। তাঁর অসহায়ত্ব সবাইকে স্পর্শ করলো।
    অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম বললেন – দেখুন মিসেস সুলতানা অমিকে বেশ কিছু ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে, রক্তগুলো আলাদা ছাত্রদের কাছে নেওয়া। হয়তো কোন রক্ত অমি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। তাই কিছু নেগেটিভ অবস্থা ফেস করছে তার শরীর। তবে ডাক্তার রহমান আশাবাদী, অমি দ্রুত এ নেগেটিভ অবস্থা কেটে উঠবে।

    – জি মি. ইসলাম ঠিক তাই, যে রক্ত দিতে যেয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছিল, সে ব্যাগ আমরা ক্যান্সেল করেছি। আর এর প্রতিরোধী চিকিৎসা আমরা দিয়েছি, হয়তো আমরা শিঘ্রই তার উন্নতি লক্ষ্য করবো।

    সালেহা সুলতানা সত্যি অসহায়ত্ব অনুভব করছেন, তিনি ক্ষণে ক্ষণে আলো আঁধারির এক বিশেষ অবস্থার মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করছেন।কেন তাঁর সাথে এমন হচ্ছে ? আর কত পরীক্ষা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। এ সময় কোন মসজিদে ফজরের আজান চলছে। মোয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছিল, আস সালাতু খাইরুম মিনান নাওম, সালেহা সুলতানা দ্রুত কেবিনে ফিরে আসলেন। ওজু সেরে নামাজে দাঁড়ালেন, নামাজ শেষে ভরসার শেষ স্থল মহানের কাছে সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন। তাঁকে যেন একা নিঃস্ব না করে মাবুদ, সেই প্রার্থনা করলেন। মোনাজাতে তার দু’গন্ড বেয়ে জলের ধারা প্রবাহিত হলো।

    ডাক্তার রহমান ও অধ্যক্ষ সাহেব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালেহা সুলতানাকে যেতে দেখলেন। নার্স বললেন স্যার একটু এদিকে আসবেন? হ্যাঁ সিস্টার অবশ্যই, বলে ডাক্তার রহমান আই সি ইউ বেডের দিকে এগিয়ে গেলেন। নার্সকে খুব উৎকণ্ঠিত দেখা যাচ্ছিল। কিছু সময় ধরে অমির পাল্স এতো স্লো যে, ডাক্তারগণ এই পরিস্থিতিকে ক্লিনিক্যালি ডেড বলে থাকেন। ডাক্তার রহমান সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, রোগীকে কামব্যাক করানোর।
    অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম আই সি ইউ এর বাহিরে উত্তেজিত অবস্থায় পায়চারি করছেন। নার্স আরো একটি ইনজেকশন তৈরী করছেন। যা পুশ করতে বাধ্য ডাক্তার রহমান। সালেহা সুলতানা ঐ যে হাত উঠিয়েছেন,আর নীচে নামেনি, যেন খালি হাতে কিছুতেই ফিরবেন না তিনি।

    ঠিক তখনই ডাক্তার রহমান বললেন নার্স আপনি অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলামকে ডাকুন… ।

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    কেয়া চৌধুরীর ঘুম আজ বেশ তাড়াতাড়ি ভেঙে গেল। ঘুম না বলে, ঘুমঘুম অবস্থা বলা যায়, এক কথায় –
    ঘুমেরা সুদূরে অচেনা নগরে,অস্বস্তি মননে বসতি !

    মাথা বেশ ভারি, সমস্ত শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। তিনি বিছানা থেকে নেমে সোজা কিচেনে গেলেন, এক কাপ কফি করে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালেন। ভোরের আলো আঁধারি কিছুটা রয়ে গেছে, হেমন্তের মাঝামাঝি সময়, সামনের বাগানের পাশ দিয়ে মূল গেট পর্যন্ত হালকা কুয়াশার চাঁদর। বাগানে নানা জাতের ফুল ফুটে আছে, তার মনমাতানো সৌরভে হৃদয়ে কিছুটা স্বস্তির দোলা দিয়ে গেল। একটু দূরে সারিবদ্ধ কয়েক জাতের অর্কিড তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। যখন গাছগুলি নানা রঙের ফুলে হিন্দোলিত হয়, তখন তাদের রূপ দেখার মত। কিন্তু কেয়া চৌধুরীর হৃদয়ে তখন কষ্টরা সুদৃঢ় বাসা বাঁধে। গাছগুলো তাঁর ফুল প্রেমী বাবা সময়ের সেরা আর্কিটেক ইন্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী নিজ হাতে বপন করেন। তিনি বাইরে থেকে নিয়ে এসেছিলেন এর বীজগুলি। সেগুলো সযতনে বড় করে তুলেছিলেন,চারার ফুল ফুটবার আগেই তিনি নিজেই ঝরে গেলেন!
    কেয়া চৌধুরী ফিরে এলেন তাঁর কামরায়, কী মনে করে হাসপাতালের ল্যান্ড ফোনে ডায়াল করলেন।

    অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন রিসিভ করে ঘুম ঘুম কণ্ঠে সালাম দিলেন। কেয়া চৌধুরী সালামের প্রতিউত্তর দিয়ে ডাক্তার রহমানের মোবাইল নম্বর চাইলেন।

    ফোন রিসিভকারি নম্বর দিলেন এবং বললেন স্যারকে এখন ফোন করবেন না, এখন উনি ভীষণ ব্যাস্ত আছেন। মানে? উনি কি এখন হাসপাতালে?

    – জি ম্যাম।

    -আচ্ছা, গতকাল যে কলেজ স্টুডেন্ট আহত হয়ে ভর্তি হয়েছিল, তার কী অবস্থা জানেন কিছু?

    – আপনি ঠিক কে বলছেন, ম্যাম?

    – আমি ঐ ছাত্র, অমির টিচার বলছি। আমার নাম কেয়া চৌধুরী।

    -ওহো, বুঝেছি। আপনি গতকাল এখানে ভর্তি ছিলেন ম্যাম। আপনি এখন কেমন আছেন?

    -আমি ভালো আছি, অমির ব্যাপারে আমি জানতে চাইছি।

    -আমি ঠিক বলতে পারছি না, তবে স্যার ঐ রোগীর পাশেই আছেন। এমন কী অধ্যক্ষ স্যার কিছু আগে এসেছেন।

    -অধ্যক্ষ স্যার, কেন? – জানিনা ম্যাম।

    হঠাৎ এক ধাক্কা খেলেন ম্যাডাম, তাঁর শরীর মন অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো, ফোন তাঁর হাত থেকে পরে গেল বিছানার উপর। তিনি ধপাস করে বসে পড়লেন । নিজের উপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে গেলেন কেয়া চৌধুরী। নিজের কামরার সব কিছু চোখের সামনে বনবন করে ঘুরছে, একযোগে পার্থিব সব কিছু তাঁর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হল। তিনি নিশ্চিত ধরে নিলেন অমির খারাপ কিছু হয়ে গেছে, না হলে এমন সময়ে অধ্যক্ষ স্যার হাসপাতালে কেন ? এমন কিছু ঘটলে তিনি নিজেকেই দায়ী করবেন। অমির সাথে এমন ঘটতে পারে না, তিনি কোন ভাবেই মানতে পারছেন না। তাঁর কাছে পৃথিবীর সব কিছু অর্থহীন মনে হলো, তাঁর শরীর মন কোন কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই, বিছানার উপর শরীর এলিয়ে পড়লো!

    অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম এগিয়ে গেলেন আই সি ইউ এর দরজার পাশে, ডাক্তার রহমান তাঁর কাছে এলেন, তাঁর চোখে কিছুটা স্বস্তির চিহ্ন দেখতে পেলেন মি. ইসলাম।
    -বলুন মি. রহমান, কী অবস্থা? নিশ্চয় ভালো কিছু?

    -আমি আশাবাদী, আমার মনে হয় ডুবতে ডুবতে তরী তীরে ভিড়ার একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমি নিশ্চিত ব্লাডের নেগেটিভ রিএ্যাকশনের কারণে রোগীর এমন অবনতি হয়েছে। তবে রোগীকে আবার ব্লাড দিতে হবে আগামী দেড় দুই ঘন্টার মধ্যে। কারন, আগের রক্তের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে গেছে দুটি ইনজেকশন পুশ করবার কারনে।

    -জি ডাক্তার বুঝেছি। এখন ব্লাড নেওয়া রিস্ক নয় , তাই তো? আগে একবার ধাক্কা খেয়েছি তো!

    -অসুবিধা নেই আমরা পরীক্ষা করে নিব।

    -জি মি. রহমান আমি ব্যাবস্থা করছি।

    নিথর নীরব অমির অজান্তে তার শরীরে নানা খেলা চলছে। তার শরীরের সাথে সংযোগ শুধু স্যালাইনের ফোটা ফোটা পানি আর তার সাথে প্রয়োজনীয় ঔষধ, ইনজেকশন। এখনো অনিশ্চিত আগামীর গন্তব্য। ডাক্তার রহমান তাঁর কলেজের স্কাউট লিডারকে ফোন করে রক্ত ডোনেটকারী কয়েকজনকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে বললেন জরুরি ভিত্তিতে। সহকারী অধ্যক্ষকে জানালেন অমি ও ম্যাডাম কেয়া চৌধুরীর সুস্থতাকল্পে কলেজে দোয়ার আয়োজন করতে।

    সালেহা সুলতানা নামাজ শেষ করে অনিককে বললো, বাবা তুমি অমির ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছ?

    -না অ্যান্টি, তবে পরিস্থিতি ভালো না হলেও সঙ্কট অনেকটা কেটে উঠেছে মনে হয়। কারন অধ্যক্ষ স্যার স্কাউট সদস্যদের ব্লাড ডোনেট করে এমন কয়েকজনকে ডাকলেন। অনিক আরো বললো- আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, ইনশাআল্লাহ অমি শিঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবে। আমি নাস্তার ব্যাবস্থা করি। আপনি গতকাল থেকে কিছু মুখে দেননি। সারারাত চোখের পাতা এক করেননি। এমন চলতে থাকলে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

    এমন সময় অধ্যক্ষ সাহেবের কণ্ঠ কেবিনের বাইরে শোনা গেল। উনি অনিককে ডেকে বললেন- মিসেস সুলতানাকে ডাকো অনিক।

    সালেহা সুলতানা তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেলেন, তাঁর বুকের মাঝে এক অজানা দুঃখ কষ্টের হিন্দোল বয়ে গেল। কী শুনবেন জানেন না, তবুও তা জানতে উদগ্রীব হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

    মি. ইসলাম বললেন- মিসেস সুলতানা আমরা এক কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছি। পরিস্থিতি বড্ড ভয়ঙ্কর ছিল। মহান আল্লাহর দয়ায় সেখান থেকে আমাদের অমি এখন বেশ ভালো। বড্ড তেজী সন্তান আপনার। ওর আগের খারাপ সিচুয়েশনের জন্য আমাদের অসতর্কতাও কিছুটা দায়ী। যাই হোক আপনি আর টেনশন করবেন না। ডাক্তাররা আশা করছেন আজ দিনের মধ্যে ওর বেশ উন্নতি হবে ইনশাল্লাহ।

    সালেহা সুলতানা এতোক্ষণ মি. ইসলামের কথাগুলো গোগ্রাসে গিলছিলেন, মনে হচ্ছিল এই কথাগুলো তাঁর জন্য, জীবনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণের বিশেষ মুহূর্ত।
    তিনি মানসিক ভাবে এতোটায় ভেঙে পড়েছিলেন যে, কোন কিছুতেই ভালো কিছুর হদিস পাচ্ছিলেন না। অধিক শোকে তিনি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। যেন দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়া রোগীর বাগ ক্ষমতা ফিরে এলো। এক বড় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে, তিনি ইয়া আল্লাহ তুমি আছো, তুমি মহান বলে, হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, যেন তাঁর জীবনে এর চেয়ে বড় এবং ভালো খবর কিছুই হতে পারে না। তিনি বারবার মহানের দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলামের কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন।
    অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম বললেন- জি মিসেস সুলতানা আমাদের আরো কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে, আমরা বড় নিষ্ঠুর টিলাময় পথ হয়তো পেরিয়ে এসেছি। এখন অপেক্ষা একটা সুন্দর প্রভাতের।

    সৌমিকের ফোন এলো বেশ সকালে। শম্পা চৌধুরী কিছুটা দ্বিধা কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে ফোন রিসিভ করলেন।

    -সৌমিক তুমি এ সময়ে?

    -অ্যান্টি, গতকাল জানলাম কেয়া বেশ অসুস্থ, হাসপাতাল থেকে আমার এক ডাক্তার বন্ধু জানালো।

    -ও আচ্ছা, তাই বলো। ওতো উপরে আছে।

    -জি অ্যান্টি, ওকে ফোন করলাম বেশ ক’বার রিসিভ করলো না। ও তো এতো সময় ঘুমোয় না। ওর অবস্থা এখন কেমন অ্যান্টি?
    – ও ভালো আছে। আমি দেখছি, এখন কোথায় কেয়া।

    শম্পা চৌধুরী উপরে এলেন কেয়া চৌধুরীর কামরায়। দেখলেন দরজা হা করে খোলা। আর কেয়া চৌধুরী বেডের উপর আড়াআড়ি শোয়া, শম্পা চৌধুরী কিছুটা ধাক্কা খেলেন। তিনি দ্রুত মেয়ের কাছে গেলেন। তাঁকে আলতো করে ডাকলেন। কিন্তু সাড়া দিল না। বেড টেবিলে রাখা জাগ হতে জল নিয়ে চোখেমুখে ছিটিয়ে দিলেন। কেয়া ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। মায়ের পানে চেয়ে বললেন, মা আমার কী হয়েছিল?

    -কী হয়েছিল, তুই বল আমাকে। তোর এমন আলুথালু অবস্থা কেন মা?

    – মা আমি ভোরেই উঠেছিলাম। কী মনে করে হাসপাতালে ফোন করেছিলাম, বোধ হয় অমির অবস্থা ভালো নয় মা। নার্সের কথা শুনে তাই মনে হলো। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
    -আমি খোঁজ নিব অমির। দয়া করে তুই আর ফোন করবি না কেয়া। তুই নিজেও সুস্থ না মা। তোর অনেক রেস্ট দরকার, তা কি বুঝিস না? সৌমিক ফোন করেছিল, তোকে। তুই রিসিভ করিস নি, তাইতো জানতে পারলাম তোর এই অবস্থা।

    -ঠিক আছে মা, আমাকে এক কাফ কফি করে দিবে? আর হাসপাতালে ফোন করে অমির খবর নিবে মা। আমার মনে হচ্ছে ছেলেটা ভালো নেই। (চলবে)

    লেখক: আমিনুল ইসলাম, কবি ও সংগঠক। 

     

     

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম