• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫:২৪ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    ১ম অংশ:

    ম্যাডাম রিক্সায় বসলেন, অমি তাঁকে সালাম জানিয়ে তড়িৎ গতিতে সাইকেল চালিয়ে দিল সবজিওয়ালার খোঁজে । বেশ দ্রুত সেই স্থানে এলো, যেখানে সকালে সবজিওয়ালার সবজিভ্যান উল্টে দিয়েছিল। সাইকেল পাশে স্টান্ড করে এদিক ওদিক চাইলো। কারো কাছে খোঁজ নেওয়া যায় কি না? রাস্তা ঘেষে এক টঙের দোকান চোখে পড়লো। সেখানে সামনে রাখা বেঞ্চিতে বেশ ক’জন বসে আড্ডা দিচ্ছিল। অমি তাদের একজনকে বললেন-আমি অমি- আজ সকালে এক সবজির ভ্যান উল্টে যায় আমার সাইকেলে ধাক্কা লেগে। আমি ঐ সবজির দোকানিকে খুঁজছি। কেউ কি সাহায্য করতে পারেন?



    লোকগুলো তাদের কথা থামিয়ে অমির কথা শুনছিলো।

    একজন বললেন, ও তাহলে তুমি সেই ছেলে? কিন্তু কেন তাকে খোঁজ তুমি? তখন তো বেশ দ্রুত পালিয়ে গেলে!

    অমি বললো, না মানে পালাইনি, আমার ক্লাস ছিল, তাই চলে যাই। এখন ক্লাস শেষ হলো তো, তাই উনাকে খুঁজছি। আসলে আমি উনার সাথে কথা বলতে চাই।

    লোকটি বললো, ও, তাই? তা কেন খোঁজ ? কী করবে তুমি তার জন্য?

    অমি বললো, আমি উনার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে চাই। আর আমি তা না করলে, নিজের কাছে নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছে,কাজটা অমানবিক ছিল। আমার অসতর্কতার জন্য উনার এতো বড় ক্ষতি হয়ে গেল।

    লোকগুলো এবার কিছুটা আশ্চর্য হলো, অপর একজন বললো, সবাইতো পালিয়ে বাঁচতে চায়। তুমি নিশ্চয় ভদ্র ঘরের ভদ্র সন্তান । তা তোমার কথা শুনেই বোঝা যায়। আচ্ছা চলো, আমি তোমাকে সবজিওয়ালার বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। বলেই অমিকে বললো, আসো আমার সাথে।

    রাস্তা পেরিয়ে একটা সরু গলিতে ঢুকলো তারা। বেশ কিছুদূর এগোবার পর দু’চালা একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালো লোকটি। অমি দেখলো বাড়ির সামনে এক চাকা চ্যাপ্টা ভ্যানগাড়ি দাঁড়ানো। অমির ভীষণ খারাপ লাগলো। ভাবলো হয়তো আজ লোকটার বেচাকেনা কিছুই হয়নি, হয়তো রান্নাও হয়নি আজ তাঁর বাড়িতে।

    তার সাথে আসা লোকটি বললো, সেলিম বাড়িতে আছো না’কি?
    কেডা ? ভিতর থেকে আওয়াজ এলো।
    একটু বেরিয়ে আস দেখি- লোকটি বললো।

    অমি দেখলো সেলিম নামের সবজিওয়ালা চল্লিশোর্ধ্ব লোকটি বেরিয়ে এলো, সাথে দু’টি মেয়ে। বাবা সহ মেয়ে দুটি চোখ কুঁচকে অমি ও আগত লোকটির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলো। অমি লোকটিকে চিনলো , সাথে খালি গা,পা, ছেঁড়া প্যান্ট পড়া মেয়ে দুটিকে দেখে বেশ কষ্ট পেল ।
    বললো, এ্যাংকেল সরি, আমিই আপনার ভ্যান উল্টে দিয়েছি। আমি সত্যি দুঃখিত, বড্ড ভুল করেছি। আমি আপনার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে চাই।

    সেলিম বললো, আজ কোন সবজি বিক্রি হয়নি, ড্রেনের পঁচা কাদা-পানিতে নষ্ট হয়েছে, তাই আমাদের উপোস থাকতে হবে। ভ্যানটিও নষ্ট হলো, কপাল মন্দ হলে যা হয়।

    অমি আবারও দুঃখ প্রকাশ করলো এবং বললো, এর জন্য আমিই দায়ী, আপনাকে সামান্য কিছু দিয়ে যাচ্ছি আর আমার মাকে বলে, আগামীকাল আপনার ভ্যান মেরামতের টাকা দিয়ে যাব।

    সেলিম স্ব-কৃতজ্ঞ চিত্তে অমির দিকে চাইলো। অমি তার পকেটে থাকা মায়ের জন্য ঔষধ কেনার ২৫০ টাকার সমুদয় সেলিমের হাতে দিল।আর বললো, আপনার ভ্যান মেরামতের টাকা আমি কাল দিব। কত লাগবে বলতে পারেন?

    সেলিম বললো, আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ, আর দিতে হবে না। আপনার এই টাকাও নিতাম না, কিন্তু না নিলে আমার এ বাচ্চা দুটি সহ আমার পরিবারের সবাইকে উপোস থাকতে হতো, তাই নিচ্ছি। মহান আল্লাহ আপনার ভালো করবেন।
    অমি বললো, আসলে আমার ভুলে আপনার পরিবার সহ আপনি অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। ঠিক আছে আজ আমি আসছি, কাল আবার দেখা হবে।

    অমি বাড়ির পথ ধরলো। আর তখনই মনে পড়লো, মায়ের ঔষধ কেনার টাকা তো দিয়ে আসলাম, এখন উপায়? হয়তো মা সত্যিটা জানলে কিছুই বলবেন না, তবুও অমির হঠাৎ অস্থিরতা পেয়ে বসলো, একটু আগে ভালো কিছু করতে পারা আনন্দিত সোপানে একটা অশান্তি ভর করলো মায়ের কথা ভেবে। মা’কে জানালে স্মিত হেসে বলবে, আমার জনহিতৈষী ছেলে ! কিন্তু অমির কাছে মা ও তার সুস্থতা দুটোই বড় গুরুত্বপূর্ণ।

    মা, অমির জীবনের সবচে বড় অবলম্বন,কোন কিছুতেই সে তার মা কে এতোটুকু আঘাত দিতে চায় না, ভুল মেসেজ দিতে চায় না, চায় না হতে মায়ের মনোকষ্টের কারণ। তাহলে এমন ভালো কাজ করলো অমি, কিন্তু মায়ের ঔষধ ? ভাবতে ভাবতে আন্মনা অমি সাইকেল ঠেলে পায়ে চলা পথে এলোমেলো চলতে শুরু করলো। সামনে জেলা পার্ক, গেটের সামনে সাইকেল জমা দিয়ে পার্কে প্রবেশ করলো পড়ন্ত দুপুরে। কেন এখানে আসলো অমি? তা জানে না। তবে তার সবচে প্রিয় এবং কষ্ট নিবারণের স্থান এই পার্ক। সারিসারি নানা ফুলের গাছ, সেখানে ফুটে থাকা নানা রঙের ফুল, নাম না জানা অসংখ্য দেশী বিদেশি গাছের সারি, তার হৃদয় ও মন সব সময় কেড়ে নেয়। দেয় অনেক কষ্টকর অনুভূতির বিদায়। এতো কিছুর পরেও সে তার মাথা থেকে একটা বিষয় সরাতে পারছে না, তার মায়ের ঔষধ কিনবে কি দিয়ে? ভাবতে ভাবতে আবার অমি হারিয়ে গেল পার্কের অপরূপ রূপের মাঝে। অসময় হলেও কিছু দর্শনার্থী আসছেন যাচ্ছেন।
    পার্কের মাঝে সুদৃশ্য শান বাধানো বেশ কটি ঘাটযুক্ত একটি পুকুর। লেখা আছে কেউ কৌতুহলী হয়ে মাছেদের খাবার দিবেন না। কিন্তু কে শোনে কার কথা, আগত দর্শনার্থীরা অবাধে বাদাম, পপকর্ণ, পাউরুটি সহ নানা খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছে। আর ঝাঁকে ঝাঁকে নানা রঙের মাছ এসে ভিড় জমাচ্ছে ঐ সব খাবার খেতে। অমি ভাবলো অবাধে এ অন্যায় চলছে, শুধু বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যারা দায় সারছেন, তাদের বলছি, মুহূর্তে এই অনিন্দ্য সুন্দর মাছগুলোর ভবলীলা সাঙ্গ হতে পারে কোন বেরসিক দর্শনার্থীর ছিটানো বিষাক্ত খাবার খেয়ে। তাই সচেতনতা দরকার কতৃপক্ষের।

    অমি পার্কের বেঞ্চে পড়ে থাকা বাদামের খোসা ছুঁড়ে দিলো পুকুরের পানিতে, তাতেই ছুটে এলো হলুদ রঙের বেশ কটি মাছ। আর প্রতারিত হয়ে ফিরেও গেল। তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো, এভাবেই কতজনে কাউকে না কাউকে প্রতারিত করছে বা কেউ প্রতারিত হচ্ছে। সে তার পকেট হাতড়িয়ে কয়েকটি টাকা বের করলো, একটি পপকর্ণের প্যাকেট কিনে কিছু পপকর্ণ পানিতে ছুঁড়ে দিলো, আর মানসিক প্রতারণা থেকে রক্ষা পেল অমি, তবে কতৃপক্ষের টানানো নোটিশবোর্ডের আহ্বানকে এড়িয়ে আরেকটি অন্যায় করলো।

    সে পার্ক থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো, সামনে নানা বয়সী শিশু কিশোর খেলা করছে পার্কের বিভিন্ন রাইডে। বেশ মজা পাচ্ছিল অমি,কল্পনার রাজ্যে সেও উড়াল দিল নাগরদোলায়! তখনই প্রতিবেশী বন্ধু অনিক তার সামনে দাঁড়ালো!
    বললো, অমি বাসায় যাসনি এখনো, খালাম্মা খুব চিন্তা করছিল। তাই আমি আসলাম। জানতাম তোকে হয়তো এখানেই পাব।
    আজ আবার কী অঘটন ঘটালি বল্, হিরো সাহেব!
    অমি বললো-না তেমন কিছু নয়, তবে মায়ের ঔষধ নেওয়া হয়নি, তাই চিন্তায় আছি।

    ওহো, তার অর্থ কাউকে দান করেছিস ঔষধ কেনার টাকা, তাইতো? অনিক বললো।

    আচ্ছা অনিক তুই কিছু টাকা দিতে পারিস, আমাকে?

    ঠিক আছে বন্ধু দিব, চল্ তুই। বলেই অনিক কিছু টাকা অমিকে দিল, অমি ২৫০/ টাকা রেখে অবশিষ্টটা ফেরত দিল।
    তারপর দুই বন্ধু পার্ক থেকে বেরিয়ে যাবার আগেই রজনী গন্ধার জীবন্ত স্টিক দেখে মোহিত হল। তার বড্ড ইচ্ছে করছিল এর কিছু তাজা স্টিক যদি ম্যাডামকে দিতে পারতাম, তাহলে হয়তো উনি বেজায় খুশি হতেন। অমি পার্কের গেটে বসা কেয়ারটেকারকে বিনীত বললেন, কয়েকটা রজনীগন্ধার স্টিক কি পেতে পারি?
    কেয়ারটেকার বললেন, না। যাকে দিতে চান, বরং একদিন তাকে এখানে দেখিয়ে যাবেন। এই ফুলগুলো নির্দিষ্ট কারো জন্য নয়, সবার জন্য। ঠিক, কিন্তু ম্যাডামকে ফুল দিতে চায় কেন, অমি ? সে প্রশ্নের জবাবও জানা নেই অমির।
    অমি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে শুকনো মুখে ঔষধের দোকানের দিকে হাঁটা দিল বন্ধুর সাথে।

     

    ২য় অংশ:

    অমি, অনিক দুই বন্ধু পার্ক থেকে বেরিয়ে এল। রাস্তার স্বাভাবিক যানবাহনের শব্দ, সাইকেল রিক্সার টুংটাং, ফেরিওয়ালার হাঁক ডাক, সবাই ব্যস্ত গন্তব্যমুখী।
    অনিক বললো- অমি? এভাবে হ্যাংলামো করে ফুল চাইলি যে? কারো প্রেমে পড়েছিস? আর আজ এভাবে অসময়ে পার্কেই বা কেন এলি? শোন অমি এমন ঘটনা ঘটাবি না, যাতে খালাম্মা কষ্ট পান। এখন চল ঔষধ কিনে বাসায় যাই।

    অমি বলল – নারে ভাই, অমন কিছুই ঘটেনি, তবে আজ সকালে একটা অঘটন ঘটে, একজনের ক্ষতি করে ফেলি,তাকে টাকাটা দিয়েছি। মায়ের ঔষধের টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে আনন্দের সাথে সাথে অসহায়ত্ব ভর করে।

    আর ফুল – ফুল কেন নিতে চাইলি?

    অমি হাসলো, ওহো তাই? একজনকে দিতে চাইছিলাম তরতাজা সুন্দর রজনীগন্ধার স্টিক। বুঝেছ বন্ধু ?

    বলিস কি? কাকে দিবি? আর তার জন্য কি বাজারে ফুল নেই? অনিক বললো।

    বাজারে তো ফুল আছে অনিক, বাসি কিন্তু এই ফুল ছিল তাজা প্রাণবন্ত। যাকে দিব ঠিক তার মতোই অনিন্দ্য সুন্দর! বুঝলি গর্দভ ? বলেই অমি হেসে উঠলো।

    ওহো! তাই নাকি বন্ধু? তা কে সেই মহাসুন্দরী, অপ্সরী, যাকে পার্কের ফুল ছাড়া বাজারের ফুল দেওয়া যায় না?

    অমি আবারও মুচকি হাসলো, ভাবলো – আচ্ছা ম্যাডাম কি তার দেওয়া ফুল নিত? উনিতো ফুল অনেক পছন্দ করেন, উনি কি খুশি হতেন ফুল পেয়ে? নাকি রাগান্বিত হয়ে, যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটাতো? না, মোটেই তা নয়, ম্যাডাম তো ক্লাসে ফুল এবং এর সৌন্দর্য নিয়ে প্রায়ই কথা বলেন। এমন কি তাঁর বাসার টবে নানা ফুলের বাহারি উপস্থিতির গল্প শোনান।

    অনিক বললো – কিরে? চুপ হয়ে গেলি যে?

    অমি বললো- আরে না আমার এক ম্যাডামকে দিতাম। উনি ফুল ভীষণ পছন্দ করেন, তাই উনাকে ফুল দিতে চাইছিলাম।

    অনিক বললো- তাই বুঝি! শোন অমি, আবার কোন অনাসৃষ্টি ঘটিয়ে বসিস না। তাহলে কিন্তু তোকে নিয়ে তুলকালাম ঘটে যাবে কলেজময়। ম্যাডাম বলে কথা। আর তুই তাঁর ছাত্র, ভুলে যাস না।

    হয়েছে অনিক থাম, চল বিজয় মেডিক্যালে চলে এসেছি, ঔষধ নিয়ে বাসায় যাই। দুই বন্ধু ঔষধ নিয়ে দ্বিচক্রযানে করে বাসার দিকে রওনা হলো।
    বাসায় ফিরেই ভেবেছিল মায়ের জেরার মুখে পড়বে অমি।কিন্তু তেমন কিছু ঘটলো না। তবে মায়ের মুখমন্ডলে শান্ত মেঘের আনাগোনা! অমি দ্রুত কাপড় ছেড়ে বাথরুমে ঢুকলো, দ্রুত সাওয়ার সেরে অজু করে নিয়ে সোজা জায়নামাজের দিকে গেল। এসব অদূরে অবস্থান করে লক্ষ্য করছিলেন সালেহা সুলতানা, আর মিটিমিটি হাসছিলেন। ডাইনিং এ খাবার সাজাতে সাজাতে সালেহা সুলতানা হারিয়ে গেলেন অতীতে……ঠিক যেন বাবার ডুপ্লিকেট কপি, রক্ত যে কথা বলে তার যথাযথ প্রমাণ চোখের সামনে ! যেদিন টুকটাক ভুল করে বাসায় ফিরতেন বা কোন কারনে দেরি করতেন, সেদিনের ভদ্র রুটিন সবার কাছে মনোমুগ্ধকর হতো। যেন অতীতের আমিন ইসলামকে দেখছেন সালেহা সুলতানা। কত নিপুন ভাবে গৃহে কার্যে নিযুক্ত হয়ে যেতেন ভদ্রলোক। নামাজ, ধর্মকর্মে সে সময় টনটনে, টিভির ধারেকাছে না যাওয়া, মোবাইল যেন কত বিরক্তির একটা বিষয়। কোন ফোন আসলেও বলে উঠতো, কি বিরক্তিকর! একটু পরিবারের কাজ আর পরিবারকে সময় দিবারও উপায় নেই!
    বিষয়গুলো স্মৃতিপটে বেশ সজীব আজও, ভাবতে ভাবতে বেশ নষ্টালজিক হয়ে পড়েন সালেহা সুতাতানা।
    ঠোঁটের কোনে কষ্টকর হাসিও ফোটে তাঁর।

    মা, খেয়েছ ? আমার কিন্তু বেশ ক্ষুধা পেয়েছে-অমি বলে।

    মা বললো- বেশ বস, আমি খাবার রেডি করছি। আমিও খাবো তোর সাথে।
    তুমি এখনো খাওনি মা? এতো দেরি হয়ে গেল আমার।

    বেশতো অমি সমস্যা নেই, বস আমিও বসছি, একসাথে খেয়ে নিবো।

    সালেহা সুলতানা বেশ গম্ভীর মুখে পরিবেশন করছিলেন, অমি লক্ষ্য করছিল, কিছু না বলে ছোট মাছের তরকারী, ডাল আর ডিমের ভুনার ভূয়সী প্রশংসা করছিল। মা শুনছিল ছেলের প্রশংসা আর বার বার অন্য একজন মানুষের হুবহু রূপ দেখতে পাচ্ছিল। খেতে খেতে সালেহা সুলতানা বললো, আর একটু তরকারি দিই অমি?
    অমি বললো- দিবে? দাও; যা চমৎকার হয়েছে! আর ক্ষুধাও ছিল মা।

    সালেহা সুলতানা বেশ কিছু তরকারি আর ডাল উঠিয়ে দিল অমির প্লেটে।

    তবে অমি ভুল করেও মায়ের চোখের দিকে চাইছিল না, আসলে খাবার সময় অমি মায়ের কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চায় না।
    খাওয়া শেষ করে অমি তার পড়ার ঘরে গেল, আজকের পত্রিকা খুলে হেড লাইনগুলোতে চোখ বুলালো, ঘুম থেকে দেরিতে ওঠায় সম্ভব হয়নি আজ পত্রিকায় চোখ বুলানো। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে, কিন্তু টিকসই উন্নয়নের জন্য চাই সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা। হেড লাইন বেশ, আর দুর্ণীতি, ধর্ষণ সহ বেশ কিছু মোটা দাগের খবর ছিল। শেষে খেলার পাতায় চোখ বুলিয়ে পত্রিকা রেখে দিল অমি। কী ভেবে পত্রিকা নিয়ে মায়ের কাছে গেল অমি। মা ডাইনিং টেবিল গোচাচ্ছিল।

    অমি ডাকলো- মা, ওমা। কিছু বলবে না আমাই? একটু বকা দাও অন্তত! তুমি চুপ করে থাকলে আমার মোটেই ভালো লাগে না। বেশ তো, আমি অন্যায় করেছি, ভুল করেছি, কিন্তু কী করেছি জানতেও চাইবে না? জানো মা, আজ পত্রিকায় দারুণ রান্নার রেসিপি দেখলাম, দেখবে তুমি?

    সালেহা সুলতানা বললেন- রেখে যা আমি দেখে নিব।

    মা জানো? আজ একটা অন্যায় করেছি আমি। তোমাকে বলতে চাই। জানো মা, দ্রুত সাইকেল চালাতে যেয়ে সবজিভ্যান উল্টিয়ে দিয়েছিলাম।
    সালেহা সুলতানা তড়িৎ ছেলের দিকে চাইলেন, বললেন মানে কী অমি? তুই কি একটুও সচেতন হবি না?

    অমি বললো – মা দ্রুত সাইকেল চালাতে অকস্মাৎ ঘটনাটা ঘটে যায়। ক্লাস ধরবার তাড়া ছিল, জানোই তো।

    মা বললেন- ও, ম্যাডামের ক্লাস তাইতো? আমি যা ভেবেছি তাই, আমাকে তুই কি একটুও স্বস্তিতে থাকতে দিবি না অমি? আমি আর কোন কষ্ট পেতে চাই না!

    মা,জানো? আমি ঐ সবজিওয়ালাকে ২৫০/ টাকা ফিরবার পথে দিয়ে এসেছি মা। তা না হলে ওরা অভুক্ত থাকতো মা। আর জানো? তোমার ঔষধের টাকা দিয়ে দেওয়াতে পরে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যাই। তাইতো ফিরতে দেরি হলো।

    অমি মায়ের গলা জড়িয়ে বললো, মা, ওমা বলো তুমি রাগ করোনি।

    সালেহা সুলতানা বললেন, তো আমি আমার ছেলেকে এই শিখিয়েছি, যে কাউকে সাহায্য করলে রাগ করবো? ঠিক বাবার হাত পেয়েছিস তুই অমি। তুই ঠিক কাজটায় করেছিস।
    অমি বললো- মা জানো, লোকটার দুটি মেয়ে, ওদের ছেঁড়া প্যান্ট, উদোম গা, আর দেখতে বড্ড ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছিল মা। ওদের ভ্যানটাও নষ্ট হয়েছে । আমি ভ্যানটা মেরামত করে দিব বলেছি।

    মা বললেন- ঠিক আছে অমি, তুই কোন ভুল করিস নি। কিন্তু আমাকে কথা দে, আর কখনো বেপরোয়া সাইকেল চালাবি না। এর জন্য আমাকে আমার জীবনে অনেক দাম দিতে হয়েছে রে!
    ঠিক তখনই সালেহা সুলতানার চোখ আদ্র হয়ে আসলো।
    অমি মাকে আলতো জড়িয়ে বললো- সরি মা, আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো আমি অসতর্ক হব না।

    সালেহা সুলতানা বললেন – অমি কাল আমি ঐ সবজিওয়ালার বাড়িতে যাব। আমাকে নিয়ে যাবি?

    কেন নয় মা ? অবশ্যই নিয়ে যাব। আমার গ্রেট মা!

     

    লেখক: আমিনুল ইসলাম
    কবি ও সংগঠক

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম