• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ১৯ জানুয়ারি ২০২২ | ৬:৪৯ অপরাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম অংশ:

    আজ যার নববধূবেশে নতুন স্বপ্নের জগতে পা ফেলবার কথা, সেই কেয়া চৌধুরী জীবন-মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে চলেছে। বাস্তবতা এই যে, এক সেকেন্ড পরে কী ঘটতে পারে, তা বলার ক্ষমতা বিধাতা সম্ভবত তাঁর কাছেই রেখেছেন। আমরা শুধু ক্রীড়নক হিসেবে চলেছি সেই দেখানো পথে। আজকের আয়োজন ঘিরে কত কেনাকাটা কত ব্যস্ততা, কত আশা আকাঙ্খা দুটো পরিবারের মাঝে, দুটো মনের মাঝে, সব এক মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল এক চিলতে সময়ের অসতর্কতায়। অঘোষিত ভাবে বন্ধ হয়ে গেছে শুভ বিবাহের যত আয়োজন। দু’দুটো প্রাণবন্ত চরিত্র হঠাৎ করেই নাই হয়ে গেল, কাঁদিয়ে গেল কতশত আপনজনদের। এক মা মুহূর্তে তাঁর স্বামী ও সন্তান হারা হলেন, অন্ধকার দেখছেন তাঁর আগামীর পথচলায়। নিথর নীরব ঘুমন্ত কেয়া চৌধুরীর গন্তব্য এখনো অজানা, তবে ডাক্তাররা আশার স্বপন দেখিয়ে চলেছেন এই রোগীর আপনজনদের। তাঁর জন্য করা নানা পরীক্ষা নিরিক্ষায় তেমন খারাপ কিছু পাওয়া যায়নি, শুধু মস্তিষ্কের সামান্য রক্তক্ষরণ ছাড়া। ডাক্তার সুদীপ্ত রায় জানিয়ে দিলেন আজ রাতে অর্থাৎ ছয় ফ্রেব্রুয়ারী রাতে অপারেশন করা হবে।



    দিনের বেলায় আজ না আসতে পারলেও রাত ন’টার পর ক্লিনিকে এসে হাজির হলেন আসগর সাহেব , সাথে এলেন তাঁর নাতি অমি। কি’যে এক মায়ায় জড়িয়ে গেছেন আসগর সাহেব, এই পিতৃহারা মেয়েটির জন্য, তা বিধাতায় জানেন! এসেছেন সৌমিক, তাঁর বাবা মি. জোয়ার্দার, সাথে নিকট আত্মীয় কেউ কেউ।

    আজই দুপুরের পর ঘুম ভেঙেছিল কেয়া চৌধুরীর, এদিক ওদিক চেয়ে কাউকে খুঁজছিল, তারপর আবারও চোখ বুঁজে এলো ঘুমের আবেশে। অতঃপর আরো ঘন্টাদেড়েক, স্যালাইন চলা বাম হাতের কব্জিতে যুক্ত ক্যানোলায় ডান হাত গেলো, বলে উঠলেন আমার কি হয়েছে? চিৎকার দিয়ে বললো- মা, বাবা, দাদা ভাই কোথায় তোমরা ? আমার মাথা প্রচন্ড ব্যথা করছে, ছিঁড়ে যাচ্ছে! দায়িত্বরত নার্স, ডাক্তার সুদীপ্তকে ডাকলেন, মিসেস চৌধুরীও আসলেন।

    ডাক্তার বললেন- মিস চৌধুরী, আপনি এখন বেশ আছেন। এইতো আপনার মা আছেন আপনার পাশে। আমরাও আছি, আপনি এখন অনেকটা স্বাভাবিক । খুব শিঘ্রই আপনি বাসায় ফিরবেন।

    -ডাক্তার আমার মনে পড়েছে, আমি, বাবা, দাদা ভাই বাসায় ফিরছিলাম, দাদা ভাই খুব ভেঙে পড়েছিল। আমার বিয়ের পর আমাকে শান্তি নীড় ছাড়তে হবে, এই ভাবনায়। বাবাও কেমন জানি হয়ে গেল, ঠিক তখনই কী যে হয়ে গেল…. ডাক্তার আমার দাদা ভাই, বাবা কোথায় ? আমার ভীষণ ভীষণ মাথা ব্যথা করছে, আমি কিছুতেই সইতে পারছি না।

    ডাক্তার সুদীপ্ত অনেক অনেক স্বস্তি পেলেন, রোগীর সেন্স এখন স্বাভাবিক, এটি একটি বড় রকমের এচিভমেন্ট। ডাক্তার সুদীপ্ত কেয়া চৌধুরীর দিকে চাইলেন।

    – মিস চৌধুরী আপনি আরো একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন, আপনার ঘুম দরকার। আপনার মাথায় কিছুটা আঘাত আছে, একটা ছোট্ট অপারেশন করবো আমরা, তাহলে আপনি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবেন।

    -ডাক্তার আমার বাবা, দাদা ভাই কোথায় ?

    – মিস চৌধুরী, আমরা এই বিষয় নিয়ে পরে কথা বলি। আগে আপনাকে পুরোপুরি সুস্থ হতে হবে ।

    অদূরে দাঁড়িয়ে মিসেস চৌধুরী মনোকষ্টের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছিলেন। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঘটছিলো, কী এক নিদারুণ শোকের আঁধারে নিমজ্জিত তাঁর পরিবার! কী বলবে তাঁর মেয়েকে ? কোথায় তাঁর বাবা, দাদা ভাই? এর মাঝেও তাঁর অনেকটা স্বাভাবিক কথাবাত্রা কি মেয়ের উন্নতির লক্ষণ ? ইয়া-রব তুমি রহম করো। মেয়ের কিছুটা স্বাভাবিক কথা তাঁর মনে স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দিলো।

    কিছুক্ষণের মধ্যে আবারও ঘুমিয়ে গেলেন মিস চৌধুরী।
    ঘুম থেকে জাগলেন রাত আটটায়। ইতি মধ্যে ডাক্তারগণ অপারেশনের প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। নয়টায় ক্লিনিকে এ্যানেসথেসিয়ার জন্য ডাক্তার এলেন। ঠিক রাত সাড়ে দশটায় অপারেশন শুরু হলো সাড়ে বারোটায় শেষ হলো এই জটিল অপারেন। মস্তিষ্কে জমাট বাঁধা রক্ত বের করা হলো। ডাক্তাররা তাঁদের প্রাথমিক সফলতার ঘোষণা দিলেন। আসগর সাহেব ক্লিনিকের এক কোনায় এশার নামাজ আদায় করলেন। বিধাতাকে ডাকলেন, কেয়ার জন্য দোয়া করলেন। নামাজ শেষে মিসেস চৌধুরীর পাশে এসে বললেন, আমি জানি কেয়া মায়ের অপারেশন ঠিকঠাক মতো হয়েছে, আল্লাহ ভরসা সে কয়েক দিনের মধ্যে বাসায় ফিরবে।

    – মহান আল্লাহর মেহেরবানী আসগর সাহেব। কিন্তু আপনি এতো দিশেহারা কেন ?

    – দেখুন, আমার চোখের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে, আমার কেন যেন মনে হয় ঐ অটোটা কিছুটা হলেও দায়ী এই দুর্ঘটনার জন্য। তাই বিবেকের তাড়নায় ছুটে আসি। মেয়েটার সুস্থতা কামনায়।

    – না না আসগর সাহেব, এভাবে ভাববেন না। হয়তো আমাদের ভাগ্যে এমন লেখা ছিল, না হলে এতো বড় দুর্যোগ কেন আসবে আমাদের জীবনে?

    আসগর সাহেব হাত উঁচিয়ে সালাম করে বেরিয়ে এলেন। পরের দিন কেয়ার জ্ঞান ফিরলো এবং স্বাভাবিক ভাবেই কথাবার্তা বললো। বারবার সে বাবা ও ভায়ের খোঁজ নিচ্ছিল। ডাক্তার, আত্মীয়স্বজনরা নানা উসিলায় এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তবে মাঝে মাঝে তাঁর মাথার ব্যথা বেড়ে যাচ্ছিল , কখনো সীমার বাইরে চলে যাচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে ডাক্তাররা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তবে পাঁচ ছয় দিনের মধ্যে কেয়া হাঁটাচলা শুরু করলো এবং দশম দিনে শান্তি নীড়ে তাঁর নিজের বেড রুমে আসবার জন্য উতলা হয়ে গেলো। মাঝে মাঝেই তিনি তাঁর বাবা ও দাদা ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করছিলো। মিসেস চৌধুরী বুঝে উঠতে পারছিলেন না, ঠিক কী ভাবে মেয়েকে সত্যি উপস্থাপন করবেন।

    ডাক্তার সুদীপ্ত রায় এলেন কেয়ার বেডের পাশে। তার প্রেসার চেক করলেন, চোখ জিহ্বা দেখলেন, অতঃপর অপারেশনের স্থানটি পরীক্ষা করলেন এবং বেশ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন- মিস চৌধুরী ইউ অ্যার কোয়াইট ওকে, ইউ ক্যান গো ব্যাক ইউর ওন বেড নাউ।

    -ডাক্তার আমার বাবা, দাদা কোন বেডে আছেন, আমি কি তাদের সাথে কথা বলতে পারি?

    – মিস চৌধুরী যখন ঝড় আসে তখন সে এমনি এমনি যায় না। কিছু আলামত সঙ্গে করে তবেই যায়। আপনাদের জীবনে একটা চরম ঝড় এসেছিল মিস চৌধুরী, আপনাকে বুঝতে হতে, ধৈর্য ধরতে হবে । তা না হলে আপনার মা আপনার ভবিষ্যৎ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে !

    – ডাক্তার আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন ? পরিষ্কার জানতে চাই আমি।

    মিসেস চৌধুরী মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর বুকের মাঝে গুমড়ে গুমড়ে কান্নারা খেলা করছে। মেয়ে বোধ হয় কিছুটা আঁচ করলেন। মাকে বললেন- মা তাহলে কি আমার বাবা, দাদা ভাই নেই ! সত্যি করে বলো মা, ওরা কি আমাদের ছেড়ে চলে গেলো ? ডাক্তার সুদীপ রায়, মা মেয়ের এই কষ্টের মুহূর্তে কিছুটা আবেগ তাড়িত হয়ে গেলেন, তাঁর অগোচরে চোখ লাল বর্ণ ধারণ করলো। তিনি আবারো ঘুরলেন কেয়া চৌধুরীর দিকে, বললেন- আসলে আপনার বাবার জন্য আমাদের কিছুই করার ছিলো না, ক্লিনিকে আসবার পূর্বেই উনি বিদায় নেন! আপনার দাদা ভাইকে বাঁচিয়ে রাখবার যথেষ্ট চেষ্টা করেছি মিস চৌধুরী, পরিশেষে আমরা ব্যর্থ হই। তার এতো ব্লাড চলে যায়! সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দুর্ঘটনায়!

    কেয়ার দু’চোখ বেয়ে শুধু অশ্রুর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল, তিনি যেন বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন। মিসেস চৌধুরী বললেন- আমরা বড্ড একা হয়ে গেলাম রে মা। আল্লাহ তবু তোকে আমার জন্য উপহার সরূপ রেখে দিলেন। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে মা!

    – এক্সএ্যাক্ট মিস চৌধুরী আপনাদের শক্ত হতে হবে। মনে রাখবেন আপনি বেশি চাপ নিবেন না, আপনার মস্তিষ্কের আঘাতটা বেশ খারাপ ছিলো। আমরা আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি, এটি বিশাল পাওয়া।

    অতঃপর তাঁরা ক্লিনিক ছাড়লেন। বাবা-দাদার কবর দেখে তবেই বাসায় ফিরলেন কেয়া। সাথে ছিলেন মিসেস চৌধুরী, সৌমিক ও তাঁর বাবা মি. জোয়ার্দ্দার। দু’দিনের মধ্যে কুলখানির আয়োজন হলো। অনেক আত্মীয় স্বজন এলেন, তারপর ধীরে ধীরে সবাই বিদায় নিলেন। ফেরার আগে সৌমিক কেয়ার কাছে গেলো, সে বললো- কেয়া ভাগ্যের লিখন খন্ডানো যায় না। যা হবার তাতো হয়েছে। আমি আছি তোমাদের সাথে। জানো কেয়া? দশ তারিখে আমি জয়েন করেছি, তুমি অসুস্থ আছো তাই তোমার পক্ষে আমি লিখিত দিয়েছি। আজ পনের তারিখ। আগামী কুড়ি তারিখের মধ্যে তুমি জয়েন করতে পারবে। আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাবো, কি বলো তুমি?

    সৌমিক আমি এ চাকরিতে জয়েন করছি না। আমি এর বেশি এখন কথা বলতে পারবো না। তুমি এখন আসতে পারো।

    – কিন্তু কেয়া, এতো সুন্দর একটা সম্ভাবনাময় কেরিয়্যার তুমি নষ্ট করবে?

    – শোন সৌমিক এর চেয়েও বড় কিছু আমি হারিয়েছি। আমার অতি ভালো বাবা, আমার আদরের ছোট দাদা, আমার আদরের ধন ঐ দাদাকে আমি হারিয়েছি সৌমিক! কোন কেরিয়্যার আমাকে এ সম্পদ ফিরিয়ে দিবে, বলতে পারো ? শোন আমার মাথা প্রচন্ড ব্যথা করছে, তুমি আসতে পারো। হ্যাঁ আরেকটা কথা শুনে যাও সৌমিক, আমি তোমাকে বিয়ে করছি না! বিয়েটা আমি ভেঙ্গে দিলাম।

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    সৌমিক কেয়ার অদ্ভুত আচরণ এবং অনভিপ্রেত বক্তব্যের আকস্মিকতায় স্তম্ভিত, হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমুঢ়! কেয়া যে হঠাৎ করে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, তা তাঁর ভাবনার অতীত ছিল। কথাগুলো হজম করতে বেশ কিছু সময় নিল সৌমিক। কেয়া এমন কথা যে বলার জন্য বলেননি, তা তাঁর বলবার ভঙ্গি এবং কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট। সৌমিক এও জানে কেয়া এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। কয়েক দিন আগে সে ক্লিনিক থেকে ফিরেছে, এর আগের কয়েকদিন জীবনমৃত্যুর মাঝ দিয়ে তাঁর সময়গুলি অতিবাহিত হয়েছে। হারিয়েছে সবচে আপনজনদের । তাই সৌমিক কেয়ার কথাগুলোর তেমন জোড়ালো কোন প্রতিবাদ না করে আলতো স্বরে বললো- তুমি কী বলছো কেয়া? আমাদের পরিবারের কাছের আত্মীয়স্বজনরা সবাই জানে, আমাদের বাগদান সম্পন্ন হয়েছে। আমরা বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সব কিছু নিয়ে এগোচ্ছি। এমন সময়ে তুমি এ কী বলছো ?

    -সৌমিক আমি জানিয়ে দিয়েছি আমার সিদ্ধান্ত, এ বিষয় নিয়ে কোনরূপ কথা বলতে চাই না। তুমি আসতে পারো। আমি এখন একটু ঘুমাবো। আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে।

    -কেয়া, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো, এভাবে বলা যায় না।

    -দেখো সৌমিক এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেটার ডিশিসন কিছুই হতে পারে না। আমি ভেবেচিন্তে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এই মুহূর্তে চাকরি ও বিয়ে কোনটিই সঠিক নয় বলে আমি মনে করছি।

    -কেয়া, এই সিদ্ধান্ত তুমি একক ভাবে নিতে পারো না। এটি শুধু তোমার আমার সম্পর্ক নয় বরং দুটো পরিবারের মান সম্মান জড়িত। তুমি একাএকা তা করতে পারো না।

    -স্যাট আপ সৌমিক, ইউ মে গো নাও এ্যাট ওয়ান্স, প্লিজ প্লিজ গো, আই ডন্ট টক এ্যাবাউট দিস ম্যাটার এনি মোর! আই টেক মাই ডিশিসন, আই নো হোয়াট টু ডু মাইসেল্ফ। সিদ্ধান্ত নিবার মতো যথেষ্ট ম্যাচিউরিটি আমার হয়েছে। আমার সামনে এখন অনেক অনেক দায়িত্ব। আমার মাথা ব্যথা করছে ভীষণ। তুমি এখন যাও সৌমিক, যাও…যাও…।

    মিসেস চৌধুরী কেয়ার উচ্চস্বরের কথোপকথন নীচে থেকে শুনে ত্বড়িৎ উপরে এলেন। এসে দেখলেন কেয়া তাঁর মাথা দু’হাতে চেপে ধরে নীচের দিকে তাকিয়ে উত্তেজনায় কাঁপছে। সৌমিক কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মিসেস চৌধুরী কেয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো- কি হয়েছে কেয়া মা?

    -আন্টি আমি বলছি।

    -সৌমিক আমি তোমাকে যেতে বলেছি। আমি এখন ঘুমাতে চাই, বড্ড মাথা ব্যথা করছে। তোমরা বোঝ না? আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে….!

    কথাগুলো বলে কেয়া হাফাতে শুরু করলো। মিসেস চৌধুরী বললেন- সৌমিক বাবা, তুমি নীচে চলো, চা খাবে। তোমার বাবা নীচে আছেন। কেয়াকে ঘুমাতে দাও। বলেই মিসেস চৌধুরী নীচে গেলেন, সাথে বিষন্ন হতাশ বিচলিত সৌমিক নীচে এলো।

    -আন্টি কেয়া চাকরিতে জয়েন করবে না, বিয়েটাও ভেঙ্গে দিতে চাইছে।

    -সৌমিক, চাকরির চেয়ে আমার মেয়ের সুস্থতা, ভালো থাকা আমার কাছে বেশী জরুরি। তোমাদের বিয়ের ব্যাপারটা চাইলেও এখন সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে পরে ভাবা যাবে। ও আপাতত সঠিক বলছে।

    -কিন্তু আন্টি!

    -কোন কিন্তু নয় সৌমিক। ডাক্তার সুদীপ্ত আমাকে ফোন করেছিলেন। উনি বলেছেন, কেয়ার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করতে। সে বেশ কিছু জটিলতায় আছে। যে কোন প্রেসারে হিতে বিপরীত হতে পারে। সব সময় তাকে সহযোগিতা করে যেতে হবে আমাদের।

    -জি আন্টি বুঝেছি। আমি যোগাযোগ রাখবো। আমাকে কর্মস্থলে যেতে হবে। মাঝে মাঝে খোঁজ নিব। ওর সাথে একটু কথা বলে আসি আন্টি।

    – না সৌমিক, তুমি ওর কাছে এখন আর যেও না বরং ওকে আমরা একা থাকতে দিই।

    – জি আন্টি। তাহলে আমরা আজ আসছি। আমি ফিরে ফোন করবো। বাবা চল, ওকে; বাই আন্টি।

    সৌমিক ও মি. জোয়ার্দ্দার বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সৌমিকের তাড়া ছিল। কারন, তাঁর কর্মস্থলে যোগদানের বাধ্যবাধকতা ছিলো।

    এরপর থেকে কেয়া তেমন একটা ঘর থেকে বেরোতো না। মাঝেমাঝে শায়নের ছবির সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতো। তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতো। মাঝে মাঝে তাঁর বাবার শখের অর্কিডের চারাগুলোর কাছে যেত। নিবিড় পরিচর্যা করতো। এই পরিচর্যায় তাঁর বাবার স্পর্শ পেত কেয়া। কি আহ্বান তাঁর বাবার-

    -তুই কিন্তু গুরুত্ব দিলি না আমার কথার!

    এইতো সেই অর্কিডের চারা। কিন্তু সেই মানুষটি? কোথায় আজ? কেয়ার বুক ফেঁটে যায় , চোখজুড়ে বর্ষা নামে। দিনে অন্তত একবার বাগানের এই অর্কিডের কাছে তাঁর আসা চাইই চাই। তানাহলে যেন কিছু দায়িত্ব অপূর্ণ থেকে যায়, যেন তাঁর বাবাকে কষ্ট দেওয়া হয়।আবার ঘরে ফিরে হাস্যোজ্জ্বল বাটিংরত দাদা ভাইয়ের ছবি দেখলেও তাঁর এমন অনুভূতির উদ্রেগ হয় । বারবার যেন শায়নের কণ্ঠ তাঁকে ব্যাতিব্যস্ত করে রাখে!
    দিদি ভাই চল জেলা স্টেডিয়ামে যাই…ছবি উঠাতে হবে না?
    এতো এতো তাড়া ছিলো তোর, দাদা ? চলে যাবি তাই… নারে ভাই? শায়নের সেই বিখ্যাত ছবির সামনে দাঁড়ালেই, কেয়ার মাথা ঘুরতো আর চোখে অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত। এই অল্প ক’দিনে অজস্র স্মৃতির বন্যা বয়ে অবশেষে বিদায়! কেয়ার সময় কাটে না, অবসরে বাবা আর ভাই শায়নের স্মৃতি হাতরে সময় কাটে। হঠাৎ একদিন মনে হলো তাদের বাসার দ্বিতীয় তলার চারিদিকের ঝুল বারান্দাজুড়ে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুলের চাষ করবে। বাবার শখ যেন তাঁকে পেয়ে বসলো। তাঁকে সহায়তা করে ছক্কু মিঞা। কিছু মাসের মধ্যে তাদের বাগানের মতো তাদের বাসার ঝুলবারান্দার চারিদিকে ফুলময় হয়ে উঠলো। কত আদর ভালোবাসায় আদরযত্নে ফুলেফুলে ভরে উঠলো তাঁর শখের টবগুলি। এতোকিছু ছাঁপিয়ে তাঁর চোখ চলে যায় বাবার অর্কিড আর শায়নের ছবির দিকে। এর মাঝে একদিন অমি এবং তার মা, সালেহা সুলতানা এলেন। অমিকে দেখে কেয়া চৌধুরী বললেন- তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি ?

    -জেলা স্টেডিয়ামে, আমি বল করেছিলাম।

    কেয়া চিনতে পারলো, তাঁর কণ্ঠ ভারি হয়ে আসলো। অমিকে লক্ষ করে বললো- অমি সেই ব্যাট’স ম্যান আমার দাদা ভাই শাওন আর নেই। ও কখনো ব্যাট উঁচিয়ে তোমার বলকে তাড়া করবে না। সারাজীবনের জন্য ছবি হয়ে গেছে আমার দাদা ভাই!

    অমি কেয়া চৌধুরীর কথা শুনছিলো, তার বয়সই বা কত? মাত্র সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। কেয়া চৌধুরীর কথাগুলোর মর্ম না বুঝলেও হয়তো কিছুটা অনুধাবন করেছিল। তাই শুধু বলেছিলো- আপনাদের এ্যাকসিডেন্টের সময় আমি আমার নানুর সাথে সেই রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম। আমি সেইদিন দেখেই আপনাদের চিনতে পেরেছিলাম। তাইতো নানু ভাইয়া সব সময় নার্সিং হোমে আসতো। আমি এসেছিলাম দু’দিন।

    এরপর সালেহা সুলতানা বেশ কিছু সময় ছিল সেখানে। সন্ধ্যার আগেই তারা ফিরে এসেছিলো। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এভাবে প্রায় ছয় সাত মাস কেটে গেলো, বিভাগীয় কমিশনারের অফিস থেকে কেয়ার চাকুরিতে জয়েন করবেন কি না এমন বিষয় উল্লেখ করে পত্র এলো। সেখানেও কেয়া জয়েন না করার বিষয়ে জানিয়ে দিলো। সৌমিক বেশ চেষ্টা করেছে কেয়াকে রাজি করানোর, সম্ভবত এই কারনে সৌমিকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আরো বেড়ে গেলো। বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেলো এভাবেই। কান্না-হাসির সম্মলনে মা মেয়ের জীবন অতিবাহিত হচ্ছিলো। কিন্তু এভাবে জীবন চলে? এরই নাম কি পরিপূর্ণতা? এক সময় মনে হলো কিছু অন্তত করা উচিত। কেয়ার সেকেন্ড চয়েজ ছিলো শিক্ষা বিভাগের চাকুরি করার। বিশেষ করে শিক্ষক হিসাবে। দেড় দু’বছর অতিবাহিত হবার পর হঠাৎ আবেদন করে বসে কেয়া। কিছু দিনের মধ্যে রিপ্লে আসে বিভাগীয় পদ্মা পাড়ের শহরের সরকারী কলেজে বাংলার লেকচারার হিসেবে নিয়োগপত্র । ঝোঁকের বসে করা আবেদনে ডাক আসায় মিসেস চৌধুরী মেয়েকে বলে, এভাবে বাসা বাগান নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেয়ে ছক্কুকে বাসার দায়িত্ব দিয়ে আমরা মা মেয়ে ওখানে যাই। নতুন জায়গায় গেলে তোরও ভালো লাগবে। সত্যি বলতে এই বাসার প্রতিটা ইঞ্চিতে তোর বাবা আর শায়নের স্মৃতি, তাতো ভুলবার নয় মা। তোর কথা ভেবে আমিও মুষড়ে পড়ি। চল না মা, জয়েন কর এই চাকরিতে। যদি ভালো না লাগে তো বাদ দিবি। আমার মনে হয় আমাদের দু’জনের জন্যই স্থান পরিবর্তন বেশ জরুরি । মাঝে মাঝে এসে এখানে থেকে যাবো। কিছুদিন পর চেষ্টা করলে লোকাল সরকারি কলেজে বদলি করে নেওয়া যাবে। মায়ের কথা যোক্তিক মনে হলো কেয়ার কাছে। অবশেষে বিভাগীয় শহরের নাম করা কলেজে জয়েন করলো কেয়া এবং শিক্ষক হিসেবে তাঁর যোগ্যতার যথাযত প্রমাণ দিলো স্বল্প সময়ের মধ্যে। সৌমিক খবর পেয়ে বেশ খুশি হলো এবং নতুন এ দায়িত্বে কেয়ার জন্য শুভ কামনা জানালো। সৌমিক একবার তাদের বাসায় আসে, কিন্তু কেয়া তাঁর সাথে দেখা করবার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। কেয়া নিজেও ভেবেছে তাঁর কথা। সত্যি বলতে সৌমিকের জন্য তাঁর মনে এতোটুকু জায়গাও তৈরি হয়নি কখনো। বন্ধুত্বের যে মেলবন্ধন ছিল, তাও বিয়ে বিয়ে খেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। তাই মনের বিরূদ্ধে কোন সিদ্ধান্ত নিতে চায় না কেয়া। একই কলেজে তিন বছর চাকরি করবার পর একবছরের ট্রেনিং অর্ডার এলো কেয়ার।

     

     

    লেখক: আমিনুল ইসলাম, কবি ও সংগঠক। 

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম