• শিরোনাম


    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    | ০৪ জানুয়ারি ২০২২ | ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

    ম্যাডাম [] আমিনুল ইসলাম

    প্রথম অংশ:

    হঠাৎ বর্তমানে ফিরে এলেন কেয়া চৌধুরী। শখের কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। বেড টেবিলে কফির কাপ রেখে দিলেন। তাঁর মা কখন উঠে গেছেন বুঝতেও পারেননি ম্যাডাম কেয়া চৌধুরী। নীচে থেকে মা ডাকলেন, কেয়া মা আয় নাস্তা করবি না? কেয়া বললো- আসছি মা। কেয়া ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এলো। বাগানের দিকে চোখ পড়তেই দেখলো লাল, সাদা, হলুদ রঙের ফুল! পরাশ্রয়ী এই অর্কিড আশ্রয়ীকে নানা রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। তাঁর বাবা থাকলে আজ কতোই না আনন্দিত হতো। বিশেষ ব্যাবস্থাপনায় মি. চৌধুরী এই চারা বপন করেছিলেন এই আলো, বাতাস ও বায়ু ভোগী ফুল গাছের। তাঁর গন্ড বেয়ে অশ্রুর ধারা। ভাবনায় হঠাৎ যেন তাঁর বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো! আয় মা আয়, দেখবি না? আমার শখের অর্কিডের বাহার দেখে যা!



    কেয়া আবারও হারিয়ে গেলো অতীতের স্মৃতি রোমন্থনে; গাড়ি চলছে, মি. চৌধুরীর লিমুজিন। এই এলাকার রাস্তা পরিপাটি কিন্তু মনে হয় পাহাড় কেটে রাস্তা করলে যেমন হয় আর কি! কোথাও বেশ উঁচু আবার কোথাও বেশ নীচু। আর দুপাশে ঘন সবুজ গাছ গাছালিতে ভরা। কোথাও সবুজ ফসলের অবারিত ভুমি , আবার খরস্রোতা নদীর পাড়ি ধরে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে চলার মজায় আলাদা। তবুও মি. চৌধুরীর মনটা বেশ ভারাক্রান্ত, মেয়ে ও ছেলের চোখ লালচে, মাঝে মাঝে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে আজকের চালক মি. চৌধুরীর। মেয়ে বিদায় নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাবে, যা প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু কষ্ট? কষ্টটা পাওয়াও বোধ হয় প্রকৃতির নিয়ম। কষ্ট পাবার জন্যই এতো আদরে বড় করা, আর চোখের জল ফেলে বিদায় দেওয়া! সামনে মাত্র তিন কিলোমিটার বাকি, প্রায় এসে গেছেন আর্কিটেক ইঞ্জিনিয়ার জনাব সৌহরাব চৌধুরীর গাড়ি। “শান্তি নীড়” আর পাঁচ মিনিটের পথ। পকেটে রাখা রুমাল টিস্যু নিয়ে চোখের জল মুছে নিলেন, সামনে খরস্রোতা নদী, তীরে বেশ ঘন গাছ গাছালির সবুজ এখন গোধূলি বেলায় কালচে রং ধরেছে। আন্মনা মি. চৌধুরীর হাত গাড়ির হুইল থেকে কিছুটা সরে গেলো। বিপরীত দিক থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো এক অটোরিক্সা, মি. চৌধুরী খেই হারিয়ে ফেললেন। রিক্সাকে বাঁচাতে গাড়ি বামদিকে সরিয়ে নিলেন, হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই নিলেন বোধ হয়! বুঝতে পেরে আবার ডানে ঘোরাতে গেলেন মি. চৌধুরী, কিন্তু বেশ দেরী হয়ে গেছে! গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো মি.চৌধুরীর। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো এক শতবর্ষী বটবৃক্ষে সরাসরি ধাক্কা লাগলো ঘন্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার বেগে চলা গাড়িটি। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত অটোরিক্সা চালক বেশ কিছু দূরে যেয়ে থেমে গেলো। ঐ রিক্সার আরোহীরা দেখলেন লিমুজিনটি বটবৃক্ষে ধাক্কা লেগে অন্তত দু’তিনটি পলট খেয়ে সারিবাঁধা সোনালু গাছের সাথে প্রবল বারি খেয়ে থেমে গেলো। এক যুবকের আর্তচিৎকার শোনা গেলো, কেয়া তাঁর স্বরে বলছিলো বাঁচাও বাঁচাও…..দাদা ভাই… বাবা….! অতঃপর সব স্তব্ধ! অটোরিক্সার আরোহী দু’জন ও ড্রাইভার তাঁদের সাধ্যমত উদ্ধার কাজে নেমে পড়লো। মূহুর্তে আশেপাশের লোকজন জমায়েত হয়ে গেলো। সবাই মিলে গাড়িকে স্বাভাবিক করে ভিতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করলো। মি. চৌধুরীর মাথা থেতলে গেছে, সিট এবং লিমুজিনের সিটের চাপে দেহ আটকে আছে। শায়ন চৌধুরী শান্ত স্নিগ্ধ যেন ঘুমিয়ে,তার শরীরের অন্য কোথাও আঘাত লেগেছে কি না তেমন বোঝা গেলো না, শুধু মাথার পেছন দিক থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কেয়া চৌধুরী সিট থেকে নীচে পড়ে আছে, তাঁর এক হাতে শায়নের একহাত শক্ত করে ধরে আছে, প্রতিজ্ঞা- যে কোন মূল্যে তাঁর দাদা ভাইকে তাঁকে ছেড়ে যেতে দিবে না! অটোরিক্সার দুই আরোহীর বয়স্ক একজন আগত অন্যদের বললো – আপনারা যদি সহযোগিতা করেন প্লিজ , তাহলে আমরা উনাদের হাসপাতালে বা কোন ক্লিনিকে নিয়ে যেতে পারি। গাড়ির মাঝের আরোহীদের সবাই অচেতন এবং চালক সময়ের সেরা আর্কিটেক ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী সম্ভবত স্পট ডেট, দূর্ঘটনাস্থলে যারা সমবেত হয়েছেন তাদের এমনই ধারনা। তারা সবাই মিলে আহতদের গাড়ি থেকে বের করে অটোরিক্সাতে উঠালেন এবং দ্রুতগতিতে পাশের নামকরা এক ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন । মি. চৌধুরীর মুঠোফোনের শেষ ডায়ালিং নম্বরে রিং করলেন অটোরিক্সার আরোহী একজন। মিসেস চৌধুরী ফোন ধরলেন। তাঁর সাথে কথোপকথনে নিশ্চিত হলেন দূর্ঘটনাকবলিতরা তাঁরই আপন জন। আরোহী ভদ্রলোক মিসেস চৌধুরীকে দ্রুত “সামিনা কিয়ার হোম এ্যান্ড নার্সিং “এ আসতে বলে লাইন কেটে দিলেন। ডাক্তারদের অধিকাংশই মি. চৌধুরীকে চিনতে পারলেন এবং তাঁর নাড়ী দেখে এবং কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে নিশ্চিত হলেন যে তিনি বেশ কিছু আগেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন ! অন্য দুজন আহতকে দ্রুত ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হলো। এ বছরের আন্তঃকলেজ ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের ম্যান অব দ্যা সিরিজ টগবগে যুবক সকলের মায়া কাটিয়ে বিদায় নিলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। ডাক্তারগণ তাঁকে তেমন কোনও চিকিৎসা দিবার সুযোগ পেলেন না।

    কেয়া চৌধুরী ও শায়ন চৌধুরীকে যখন নার্সরা দ্রুত ইমার্জেন্সিতে নিচ্ছিলেন করিডোরের আলোতে তাঁদের মুখ দেখে চমকে উঠলেন অটোরিক্সার দু’জন আরোহীর অন্যজন কিশোর ছেলেটি। তার বুকের মাঝে ধক করে উঠলো, কয়েকটি বিট মিস করলো । অতঃপর আরো ক্লোজ দেখে নিশ্চিত হলেন, এরা জেলা স্টেডিয়ামে দেখা সেই ভাই বোন। যাদের একজন অপরূপা এক বোন আর চমৎকার বাটিং পারদর্শী সেই ভাই। কিশোরের মনে ভীষণ কষ্টের অবতারণা হলো। মাত্র তিন চার মাস আগের ঘটনা, ভুলে যাবার কথা নয়। কিশোর হন্তদন্ত হয়ে তাঁর সঙ্গী বয়স্ক আরোহীকে বললেন- নানু ভাইয়া, আমি ঐ দুজনকে চিনি! কয়েক মাস আগে ওদের সাথে আমার জেলা স্টেডিয়ামে দেখা হয়েছিলো। আমি বল করেছিলাম, ঐ ভাইয়াটি ব্যাটিং করেছিলো। খুব সুন্দর খেলোয়াড় নানু ভাইয়া! আমার না, ভীষণ খারাপ লাগছে নানু ভাইয়া।

    -বলিস কি ভাই? তুই এদের চিনিস?

    -জি নানু ভাই, আমাকে উনাদের বাসায় যাবার জন্য ইনভাইট করেছিলেন। আমার সাথে উনারা দু’জনে ছবিও উঠিয়েছিলেন।

    – কি বলিস অমি ? তাহলে এরা তোর পরিচিত?

    এখনোতো এদের কেউ আসলো না, এদিকে এদের বাবা মারা গেছেন। তাহলে এই পরিবারের বিপদে আমাদের পাশে থাকা উচিৎ অমি।

    -জি নানু ভাইয়া, একদম তাই। চলো আমরা ওদের খোঁজ খবর নিই।

    এরই মধ্যে মিসেস চৌধুরী ছুটে এলেন নার্সিং হোমে, সাথে কয়েকজন আত্মীয় এবং বাড়ির গার্ড ছক্কু মিঞা। মিসেস চৌধুরী পরিস্থিতির আকর্ষিকতায় মূর্চ্ছা গেলেন। একই সঙ্গে স্বামী সন্তান হারানোর ব্যথা এবং মেয়েও মুমূর্ষু! যার বিয়ের তারিখ মাত্র দুদিন পরেই নির্ধারিত হয়ে আছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্যিই কারো জীবনে যেন না আসে। মিসেস চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর সাথে আসা কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

    ওদিকে ডাক্তার আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়ে দিলেন মি. চৌধুরীকে ক্লিনিকে নিয়ে আসবার পূর্বেই মৃত্যু হয়েছে। দূর্ঘটনায় তাঁর মাথা সহ শরীরের নানা অংশ ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারনে তাঁর মূলত মৃত্যু হয়েছে, তবে বিস্তারিত পোস্টমর্টেমের পরে জানানো সম্ভব। অপরজন শায়ন চৌধুরী মাথার পেছন দিকে সম্ভবত কোন লোহা বা ঐ জাতীয় কোন কিছুর আঘাতে ফুটো হয়ে যায়। এর ফলশ্রুতিতে প্রচুর ব্লেডিং হয়,পেছনের সুক্ষ্ণ তন্তুগুলো বেশ ক্ষতিগ্রস্ত । আমরা সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু আমাদের আন্তরিকতাকে ব্যর্থ করে সে মৃত্যুকে বরণ করে নেয় । কেয়া চৌধুরী বেশ আশংকাজনক অবস্থায় আছেন। তবে ডাক্তারগণ সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সময় বলবে ঘটনা কোন দিকে মোড় নেয়। তবে আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি থাকবে না।

    আসসগর সাহেব মিসেস চৌধুরীর কাছে গেলেন। ক্লিনিকের সিটিং রূমের সোফায় বসে বিলাপ করছিলেন। তিনি তাঁর কাছে গেলেন এবং বললেন- দেখুন আমি এবং আমার নাতি দূর্ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, গাড়ি তেমন কোন কারণ ছাড়া পাশের গাছে ধাক্কা দেয়। আমি এবং আমার নাতি বিপরীত দিক থেকে অটোতে বাসায় ফিরছিলাম। ঠিক তখনই এই দূর্ঘটনা ঘটে। পরে অন্যদের সহযোগিতায় ঐ অটোতেই উনাদের এখানে নিয়ে আসি। মি. চৌধুরীর ফোন থেকে আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।

    মিসেস চৌধুরী কথাগুলো শুনলেন কি না, বোঝা গেল না ; শুধু ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলেন। তবে তাঁর অন্য আত্মীয়রা আসগর সাহেবের কাছ থেকে আরো কিছু বিষয় জেনে নিলেন। কেয়া চৌধুরীর চিকিৎসা এবং তাঁর সার্বিক পরিস্থিতি জেনে লাশ দুটি বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ক্লিনিক কতৃপক্ষ পোস্টমর্টেম ছাড়া এবং পুলিশের কনফার্মেশন ছাড়া লাশ নেওয়া উচিত হবে না বলে জানালেন।

    ক্লিনিক কতৃপক্ষের কথা যৌক্তিক মনে হওয়ায় সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তে এলেন যে, তারা পুলিশ প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে আগামীকাল বরং লাশ দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। বেশ কিছু আত্বীয় স্বজন ইতিমধ্যে ফিরে গেলেন, সৌমিক ও তাঁর বাবা মিসেস চৌধুরীর সাথে ক্লিনিকে রয়ে গেলেন।

    আসগর সাহেব ও অমি তাঁদের সাথে কথা বললেন এবং আগামীকাল আবারও আসবেন বলে বিদায় নিলেন। পরদিন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় লাশ গ্রহণে বিকাল হয়ে গেল, মাগরিবের পর অসংখ্য গুণগ্রাহী মানুষ।আপনজন ও আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে জেলা কবরস্থানে পাশাপাশি সমাহিত করা হলো সাদা মনের মানুষ সময়ের সেরা আর্কিটেক ইঞ্জিনিয়ার সোহরাব চৌধুরী এবং অন্তঃজেলা কলেজ টুর্ণামেন্টের ম্যান অব দ্যা সিরিজ, বোনের আদরের দাদা ভাই শায়ন চৌধুরীকে!

     

    দ্বিতীয় অংশ:

    “শান্তি নীড়” জুড়ে ভয়াবহ রকমের কষ্টকর আবহ বিরাজ করছে। সৌমিকের মা, বাবা সহ মি. চৌধুরীর অনেক আত্মীয়স্বজনরা এসেছেন। এসেছেন অমি ও তার মা সালেহা সুলতানা। আসগর সাহেব অমির নানু ভাইয়া মানসিক কষ্টে ভুগছেন। তাঁর ভাবনা হয়তো তাঁদের বহন করা অটো রিক্সা এই দূর্ঘটনার একটা অন্যতম নিয়ামক। অটো চালক চলে যেতে চেয়েছিলেন, আসগর সাহেব থামিয়ে দিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। তারপর থেকেই তাঁর মনে হচ্ছে, এই পরিবারের পাশে থাকা উচিৎ। ভদ্রলোক ক্লিনিকের বারান্দা ছাড়ছেন না, তাঁর বিবেক বোধে মারাত্বক এক অপরাধবোধ চেঁপে বসেছে। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় বিধাতার কাছে মেয়েটির প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। সৌমিক আসগর সাহেবকে বললেন, আপনি কি এই পরিবারের আত্বীয়? আসগর সাহেব ভেবে পাচ্ছিলেন না, কী জবাব দিবেন?

    শুধু আমতা আমতা করে বলেছিলেন – না মানে, হ্যাঁ ঐ আত্মীয় আর কী! আসলে আমার নাতি ঐ শায়ন চৌধুরীকে চিনে। দুজনেই ক্রিকেট খেলে কী না!

    তবে দূর্ঘটনা যে তাদের সামনে সংঘটিত হয়েছিল, তা কেন যেন এড়িয়ে গেলেন , এমনকি তাঁরা যে আহতদের এই ক্লিনিকে নিয়ে এসেছিলেন, তাও এড়িয়ে গেলেন!

    সৌমিক বলেছিলো ওআচ্ছা তাই বলুন। আসগর সাহেব বারবার আই সি ইউ তে রাখা কেয়ার খোঁজ নিচ্ছিলেন। সর্বশেষ ফলোআপ তাঁর জানা চাইই চাই। মহান যেন এই মেয়েটিকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে না নেন। সৌমিক ও তাঁর বাবা মি. জোয়ার্দার ডাক্তারদের সাথে কথা বলছিলেন।

    ডাক্তার সুদীপ্ত রায় বললেন- আমরা আগামী চব্বিশ ঘন্টা রোগীকে পর্যবেক্ষণ করবো, এর মধ্যে যদি রোগীর জ্ঞান ফিরে তো ভালো। না হলে হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য কোমায় চলে যেতে পারে। আমরা আশা করছি এমন কিছু ঘটবে না। আমরা সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। রোগী মাথায় বেশ আঘাত পেয়েছে এবং ভিতরে কিছুটা রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। আগামীকাল একটা অপারেশন করতে হবে। তাঁর আগে জ্ঞান ফিরাটা জরুরি।

    সৌমিক বললো- আপনারা কতোটুকু আশাবাদী? যদি অনেক বেশি ক্রিটিক্যাল হয় তো, প্রয়োজনে বাইরে নিতে পারি আমরা।

    – না, তাঁর প্রয়োজন হবে না, সবচে বড় কথা এই অবস্থায় বাইরে নেওয়া কিছুটা রিস্ক আছে। কারণ রোগীর নার্ভ বেশ দুর্বল। হিতে বিপরীত হতে পারে।

    -ওকে ডক্টর আপনারা সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান। আমরা যে কোন মূল্যে তাঁকে সুস্থ দেখতে চাই। ভাবুন ডক্টর, এই পরিবার তাদের দু’জনকে হারিয়েছে। আর যেন কোন চাপ না পড়ে এই পরিবারের সদস্যদের উপর।

    -আমরা আমাদের সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি মি. সৌমিক। চেষ্টার কোন ত্রুটি হচ্ছে না।

    এদিকে শান্তি নীড় থেকে আগত আপনজনেরা বিদায় নিতে থাকলো। সালেহা সুলতানা মিসেস চৌধুরীর পাশে গেলেন। বললেন- আমি অমির মা। আমার ছেলে জোর করে নিয়ে আসলো, ওর ভীষণ খারাপ লাগছে শায়ন ও ওর বাবার মৃত্যুতে। আমরা আপনার ব্যথায় সমব্যথি। আল্লাহর দরবারে দোয়া করছি, আপনার কন্যা যেন সম্পুর্ণ সুস্থ হয়ে আপনার বুকে ফিরে আসে।

    মিসেস চৌধুরী যেন মূক ও বধির! কথা বলবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। শুধু দুই চোখের অশ্রুবন্যা বলে দিচ্ছে উনার মানসিকতা কোন পর্যায়ের। অমি ও তাঁর মা বিদায় নিলেন। এভাবে অতি নিকট আত্মীয় ছাড়া মোটামুটি সবাই চলে গেলেন। শান্তি নীড় যেন একাকীত্বের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। যে বাড়িতে আজ আনন্দের সম্মেলনে মূখর হবে সবাই, যেখানে হাসিমুখে আত্মীয়স্বজনের আসবার কথা, যেখানে ছোট ছোট খোকাখুকিরা আনন্দ হিন্দোলে মাতবে, যেখানে এক ভাই এক বোনের বিদায়ে আবেগী শব্দের ফুল ফুটাবে, যেখানে এক বাবা হাসি আনন্দের ফল্গুধারায় ব্যস্ত থাকবে ; তাঁর আদরের কন্যার বিয়ে বলে কথা! সেখানে আজ কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সকালের হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত আপনজন চিরসাথীরা চিরবিদায় নিলেন আর আরেকজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে ! মিসেস চৌধুরীর চোখের জল হয়তো নিঃশেষ, তাই শুধু নির্বাক বসে আছেন। তিনি কষ্টের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত দিশাহীন অসহায় এক নারী ছাড়া নিজেকে কিছুই ভাবতে পারছেন না। এতো কষ্ট একজীবনে, এক সুখকর অনুভূতির মৃত্যু ঘটিয়ে হঠাৎ উদয় হবে, তা মেনে নেওয়া বোধ হয় তাঁর জন্য অসম্ভব! তাই হয়তো উনি বাক প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন।

    যাইহোক সবচে কষ্টের রাতেরও শেষ আছে, রাত শেষে সকাল এলো। শান্তি নীড়েও রাত পোহালো, সকাল হলো আর ক্লিনিক থেকে খবর এলো, কেয়া চৌধুরীর জ্ঞান ফিরেছে। মিসেস চৌধুরী সংগে সংগে ক্লিনিকে চলে আসলেন। তবে এসে যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখলেন, তাতে আনন্দের চেয়ে কষ্টের মাত্রাটায় বাড়লো। কেয়া চৌধুরী অনবরত শায়ন… দাদা ভাই… বাবা…বাবা.. বলে অনর্গল চিৎকার করে যাচ্ছেন। অবশেষে ডাক্তারগণ ইনজেকশন পুশ করে তাঁকে আবারও ঘুমিয়ে দিলেন। তবে সুখের বিষয় এই যে, উনার সেন্স ফিরে এসেছে এবং খুব শিঘ্রই তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার সম্ভব হবে।

    আসগর সাহেব কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরবার জন্য উদগ্রীব হলেন। উনার কিছু দায়িত্বও আছে বৈকি। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর এই অপেক্ষা। তিনি মুলতঃ মিসেস চৌধুরীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। উনি ধীরে ধীরে মিসেস চৌধুরীর কাছে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে বললেন- মিসেস চৌধুরী আমি জানি আপনার মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ের। তবু আমাকে কিছু কথা বলতে হবে, কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। দয়া করে আমার কথাগুলো শুনুন এবং আমার দায়িত্ব পালন করতে দিন।

    মিসেস চৌধুরী আসগর সাহেবের কথার ধরনে কিছুটা উৎসুক দৃষ্টিতে উনার দিকে চাইলেন এবং ধরা গলায় বললেন- জি, আসগর সাহেব আপনি বলুন।

    -দেখুন মিসেস চৌধুরী, অমি আমাকে বলেছে, সে শায়ন ও কেয়া মাকে চিনে। এমনকি তাদের সাথে অমির ছবি উঠিয়েছে কয়েক মাস আগে। অমি বল করেছে আর শায়ন ব্যাটার।

    -মিসেস চৌধুরী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন এসব আমি পরে শুনবো। আমার মানসিকতা কেমন আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন?

    – আমাকে ক্ষমা করবেন মিসেস চৌধুরী, আসলে সেদিন যখন দুর্ঘটনা ঘটে ঠিক তখন বিপরীত দিক থেকে আমি এবং আমার নাতি অমি এক অটোতে বাসায় ফিরছিলাম। ঠিক তখনই ঐ দুর্ঘটনা ঘটে।

    এইবার মিসেস চৌধুরী কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তিনি অন্তত জানতে চান কি ভাবে এমন ঘটনা ঘটলো। একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে যেহেতু পাওয়া গেছে, তাহলে জানার সুযোগ হলো, কি ভাবে তাঁর এতোবড় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি আসগর সাহেবকে বললেন- আপনার চোখের সামনে দুর্ঘটনা ঘটে?

    – জি, মিসেস চৌধুরী। আরো সঠিক করে বলতে গেলে বলতে হয়, বাঁকের মুখে আমাদের অটো দেখে উনি বিচলিত হোন! অন্তত আমার তাই মনে হয়েছিল। তখন উনার গাড়ি হঠাৎ বাঁক খেয়ে যায়, ঠিক তখনই রাস্তার পাশের বটবৃক্ষে ধাক্কা খায়। আমাদের অটো চালককে আমি থামিয়ে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে আসি এবং উদ্ধারে সচেষ্ট হই। বেশ কিছু লোকজন জমায়েত হয়ে যায়। তাদের কারো কারো সহায়তায় আমি উনাদের অটোতে উঠিয়ে এই ক্লিনিকে নিয়ে আসি।

    মিসেস চৌধুরী আবারও ফুঁফিয়ে কান্না শুরু করলেন, তিনি বললেন- উনার গাড়ি এমনিতেই রাস্তা থেকে নেমে গেল?

    -আমার তাই মনে হয়েছিলো মিসেস চৌধুরী। তবে এননও হতে পারে হঠাৎ সামনে অটো দেখাতে হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন। ক্লিনিকে নিয়ে এসে ভর্তি করানোর পর আমিই মি. চৌধুরীর ফোন থেকে আপনাকে ফোন করি।

    বলে, আসগর সাহেব তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটি বের করলেন এবং মিসেস চৌধুরীর সামনে রাখলেন।

    মিসেস চৌধুরী ফোনটি হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আসগর সাহেব বললেন- মিসেস চৌধুরী আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে, শক্ত হতে হবে। আমাদের চাওয়া কেয়া মায়ের সুস্থতা, যারা চলে গেছেন তাঁরা আর ফিরবেন না, যে আছে তাকে বাঁচাতে হবে মিসেস চৌধুরী। বলেই আসগর সাহেব তাঁর পাঞ্জাবির অন্য পকেট থেকে আরো দুটি ফোন বের করলেন এবং বললেন- এই দুটো সম্ভবত শায়ন ও কেয়া মায়ের। সবশেষে তিনি তাঁর ব্যাগের মধ্য থেকে একটি সুদৃশ্য ম্যানিব্যাগ বের করলেন এবং বললেন- মিসেস চৌধুরী, আমার মনে হয় এটি মি. চৌধুরীর। আমি আপনাদের গাড়ির সিটের নীচে পেয়েছি। এর মাঝে কি আছে আমি জানি না, তবে আমি এভাবেই পেয়েছি। সিটের পাশে একটা ব্রিফকেস ছিল, বলে তাঁর পাশে রাখা ব্রিফকেস মিসেস চৌধুরীর দিকে এগিয়ে দিলেন।

    মিসেস চৌধুরী কিছুটা বিস্মিত হলেন, একজন মানুষ কতোটা সৎ ও আন্তরিক হলে এভাবে কারো আমানত নিজ দায়িত্বে রেখে মালিকের জন্য অপেক্ষা করেন। কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি আসগর সাহেবের দিকে চাইলেন এবং বললেন- আমি সত্যিই আপনার দায়িত্বশীলতা ও সততায় মুগ্ধ। আমি আপনার প্রতি কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেছি, তাঁর জন্য ক্ষমা চাইছি।

    -না না মিসেস চৌধুরী, আমি জানি আপনার কতটা ক্ষতি হয়েছে, কতটা কষ্টে আপনি দিনাতিপাত করছেন।
    আমি এই দোয়া করছি, বিধাতা এই শোক সইবার ক্ষমতা আপনাকে দিন !

    লেখক: আমিনুল ইসলাম, কবি ও সংগঠক

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম