• শিরোনাম


    মেয়ে তোমাকেই বলছি [] ড. শরীফ সাকী

    | ০৯ অক্টোবর ২০২০ | ২:৫১ অপরাহ্ণ

    মেয়ে তোমাকেই বলছি [] ড. শরীফ সাকী

    তুমি কারো কন্যা, কারো ভাতিজি, কারো ফুফু, কারো ভগ্নি,কারো ভাগনি, কারো মাসি,কারো পিসি (ফুফু) ইত্যাদি এমনি আরো কত কিছু।
    অতঃপর এই তুমিই কারো স্ত্রী, কারো মা, কারো চাচীমা,জ্যাঠাইমা, ঠাকুমা বা দিদা ঠাকুর, দিদিমা ইত্যাদি।

    এ সকলই তোমার জীবনের একেকটি পবিত্র ও প্রিয় সম্বোধন ও জীবনের পর্যায়’গো মেয়ে। নিশ্চয়ই তুমি জানো ও মানো।



    তুমি মানব সমাজের সমান সমান দু’টি অংশের একটি।তুমি “নারী” আর ওরা হলো “নর” ।

    পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে শারীরিক শক্তির দিক থেকে তুমি “নর” হতে সামান্য দুর্বল হলেও- সম্মানের দিক থেকে ” নারী” হিসেবে কখনোই “নর”-এর চেয়ে কম শক্তিশালী নও।
    বরং কখনো কখনো “নর”-এর ও ঊর্ধ্বের কেউ। যেমন “মা” কিংবা “জননী”। খুবই সম্মানের স্তর।

    এই “মা” বা “জননী” শব্দের ওজন যে কত, বিশ্বে তা মাপার কোনই যন্ত্র নেই। এটি কেবল অনুধাবনের জিনিস।
    সুতরাং এ ক্ষেত্রেও “নারী” তুমি “নর”-এর চেয়েও ঊর্ধ্বে স্হান পেয়েছো।

    আবার দেখো, তুমি যদি “নর”-এর সাথে সাথে- উচ্চ শিক্ষা লাভ করো, উচ্চ কোনো কর্মপদে অধিষ্ঠিত হও, সে ক্ষেত্রেও তুমি শারীরিক শক্তিতে “নর”-এর চেয়ে কিয়দ কম শক্তিশালী হলেও, সামাজিক মর্যাদায় অনেক ঊর্ধ্বের কেউ হয়ে গেলে।
    এটাও তোমার শক্তি। এ শক্তি শারীরিক শক্তির চেয়েও বেশী। তোমার পজিশন ও কলমের প্রতি পুরুষেরাও তখন অনুগত (submissive) থাকতে বাধ্য ।

    এতসব মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েও, কোনো কোনো সময়- তোমার সংসার ভাঙ্গছে, তুমি পুরুষের হাতে নিগৃহীত হচ্ছো, অবহেলিত হচ্ছো, এমনকি নির্যাতিত হচ্ছো।

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কেনো…? কেনো সেটা হচ্ছে…?

    এবার নিরপেক্ষ বিবেচনায় তুমি খেয়াল করো মেয়ে- হয় তুমি আচরণে পুরুষটির সাথে তাল মেলাতে পাচ্ছো না, নয়তো ব্যবহার দিয়ে তাঁকে জয় করতে পাচ্ছো না, কিংবা তুমি তাঁর দৃষ্টিতে- সীমা ছাড়ানোর মতো কিছু একটা আচরণ করছো, যা পুরুষটির অভিপ্রেত নয়, মনের মতো নয়।
    অথবা পুরুষটির আত্মীয় স্বজনের সাথে এডজাস্ট করতে হিমসিম খাচ্ছো। কিংবা তুমি পুরুষটি বা তাঁর স্বজনদের কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে এসেছো।
    এক্ষেত্রে পুরুষটি তোমার এ ব্যর্থতাকে পুঁজি করেই কলহ করছে। তোমার সংসার ভেঙ্গে আরেকটি সংসার গড়তে উদ্যত হচ্ছে। দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিয়ে করে ফেলছে। (……. তুমিও হয়তো করছো ।)

    এসময় পুরুষটি বা তুমি কোথাও বিচার পেতে ধর্ণা দিলে- তোমাদের উভয়কে শুনতে হচ্ছে “এক হাতে তালি বাজেনা” ইত্যাদি ইত্যাদি বাক্য।

    এ সময়টিতে নিজের নিজের ভুল গুলো ডিটেক্ট করে তা শুধরানোর একটা সুযোগ আসে। কিন্তু নিজের একগুঁয়েমি চিন্তা চেতনার কাছে ভালো দিকটা বেমালুম পরাজিত হয়। তখন সেই সুযোগটিও হাতছাড়া হয়।

    আর এ ভাবেই তোমার গরম মস্তিষ্ক প্রসূত বিবাহ বিচ্ছেদ গুলোর পরিস্থিতি বা বাতাবরণ এগিয়ে আসে। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তোমার দেশেই ভুরি ভুরি প্রমান আছে’গো মেয়ে ।

    তবে বিবাহ বিচ্ছেদ যদি হতেই হয়, উভয়পক্ষের মিল মহব্বতে তা করো। তাঁকে শত্রু বানিয়ে রেখে এসে- বিবাহ বিচ্ছেদ করা যাবেনা। এতে উভয় পক্ষ, বিশেষ করে মেয়ে- তোমার, তোমার পক্ষটাই বেশী অনিরাপদ হবে’গো…হা!

    আর যদি শত্রু বানিয়ে রেখেই আসো, তখনি অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি গুলো তোমার এ দুর্বলতার সুযোগে তোমায় চারপাশ হতে সাড়াশি আক্রমণ করার সুযোগ পাবে।

    এতে তোমার জীবন ও চলার পথ বিপন্ন হবেই হবে ।

    কারণ মরদ’টার দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থতম হাংগা করা বউটি, কখনোই তোমাকে মেনে নিতে চাইবে না।
    তুমিও চাইবে না..!

    তোমায় মনে রাখতে হবে মেয়ে, এটি কোনো নবী-রসুল বা কোনো দেব-দেবীর যুগ নয়।
    এটি কলির যুগ। মোবাইল ফোনের যুগ। ভিডিও, ফেসবুকের যুগ। ইমু, হোয়াটস অ্যাপের যুগ। এমনি আরো কত ডিজিটাল কিছুর যুগ।
    এ যুগে, ফোনে ফোনেই বিয়ে হচ্ছে, আবার ফোনে ফোনেই বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে ।

    তো কেনো? কি দরকার তোমার…, তুমি বেহায়াটাকে ভিডিও কলে রেখে, হাতের আঙ্গুল কাটবে, ফাঁসিতে ঝুলবে? তোমার নিজের নিয়ন্ত্রণ এতো লুজ হবে কেনো, কেনো’গো মেয়ে…?

    সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করে দেখো মেয়ে, “নর” ও “নারী” কী করে একে অপরের শত্রু হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় – কে কাকে ঘায়েল করবে, কে কাকে হেনস্তা করবে।
    দেখোনি, শোনোনি, এসব প্রকাশ্য বিরোধ ও লড়াই-এর সাতকাহন…?
    অবশ্যই এতে তোমারও ত্রুটি আছে মেয়ে।

    তোমার একগুঁয়েমি, হঠকারিতা, অর্বাচীন কর্মকাণ্ড, এ ভাবে এসব পরিস্থিতির জন্যই তুমি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছো দিন দিন। কিংবা কেউ ধাবিত করাচ্ছে। এভাবেই কত শত অবাঞ্ছিত ঘটনার জন্ম হচ্ছে প্রতিনিয়তই ..!

    তাই শান্তির প্রয়োজনেই আত্মনিয়ন্ত্রিত হও। সমঝে চলো মেয়ে। একটু সমঝে চলো।
    সমঝে চলবে কেনো..? কারণ এ সমাজে তুমি যে মানুষ নও, তথাকথিত “মেয়ে মানুষ”, মেয়েছেলে.!
    এই নষ্ট সমাজ ও সমাজের পালস্ বুঝে তোমায় চলতে হবে।

    নইলে, হিংসে আর ক্রোধের বিষে এসব ঘটনায়- কেউ আত্মহত্যা করছো। আর- কেউ কেউ একে অপরের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছো।

    ( তবে নিরীহ কোনো নারী, কাকতালীয় ভাবে কোথাও হেনস্তা হলে- এটা নিশ্চয়ই ভাগ্যের দোষ নয়, এটা তথা কথিত পুরুষ নামক হায়েনার/হায়েনাদের দোষ, এতে কোনই সন্দেহ নেই।
    কারণ পুরুষ হলেও, সবাই’তো ধোয়া তুলসি পাতা হয়না।
    প্রবাদ আছে,সুযোগ পেলে বা সুযোগ দিলে, কাঠের পুতুলও নাকি হা করে…! )

    তাই, এ সময়টির আগেই- একটু ভাবতে হবে, অমুকের ভাগ্যে তো এটা হচ্ছে না, তমুকের ভাগ্যে তো এটা হচ্ছে না, তাহলে- আমার ভাগ্যে কেনো এ দুর্যোগ নেমে আসে, বা আসলো?
    …মেয়ে,নিশ্চয় কোথাও না কোথাও,তোমার ত্রুটি হচ্ছে।
    আর এটাই তোমার ভাববার বিষয়….!

    তুমি নারী, তোমার সর্বত্র বেড়ানোর অধিকার আছে। আছে ঘোরাঘুরি করার অধিকার,……তা ঠিক ।

    তবে এদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিষয়টিও তো তোমার মাথায় রাখতে হবে’গো। , তুমি’যে এ সমাজে মানুষ নও, মেয়েমানুষ, তথা মেয়েছেলে!কতবার বলব!

    এ বেকারদের দেশে তুমি কাশবনে, নিপবনে, হাওরে- বাওরে একা একা বেড়াতে যাওয়ার সাহস কেনো করবে’গো মেয়ে..?
    কেনো… একদিন দু’দিনের পরিচয়ে- কারো সাথে ভারত যাবে, থাইল্যান্ড যাবে অথবা বাড়ির কাছেই দৌলতদিয়া বা ওপারের সোনাগাছি বেড়াতে যাবে …!!!???

    …কিংবা তোমার এক বা একাধিক বন্ধুদেরকে নিয়ে, সাঁঝে বা ঘোর-সন্ধ্যায় নৌকোয় করে- কেনো বিলে- ঝিলে বা চরে ভ্রমনে যাওয়ার সাহস করবে..?
    রাতকরে একা একা কোথাও বের হওয়ার চিন্তা করবে কেনো..? যদি এদেশ ও এ সমাজের হাল হকিকত তোমার জানাই থাকে…!

    মনে রাখতে হবে মেয়ে- এদেশ এখনো কোনো পরিপূর্ণ সভ্য দেশে পরিণত হয়নি।

    কারণ এদেশে আইন আছে, তার প্রয়োগে শিথিলতা আছে। আইন আছে,তার যথার্থ প্রয়োগ নেই। আইন আছে, আইনের বেড়াজালের ফুটোও আছে শত সহস্র।

    নইলে প্রতিদিন, প্রতিনিয়তই এতো মেয়েছেলে অপহরণ, ধর্ষণ, খুন, পতিতালয়ে বিক্রি, বিদেশ পাচার হয়-কি করে…? কোথা হতে এতো সাহস পায় দুর্বৃত্তরা ?

    য়্যুরোপ, আমেরিকায় বিকিনি পড়ে কেউ সমুদ্রতটে বা রাস্তায় একা একা ঘুরলেও, সেখানে তাঁকে টিজ করার সাহস কারো হয় না।
    কারণ ওখানে আইন আছে। আইনের প্রয়োগও আছে।

    রাস্তাঘাটে বেলেল্লাপনা বা ইভ্ টিজিং খুব বিপদজনক সেইসব দেশে। এটা ওদের সবারই জানা আছে। বউ পেটানো…আরো অসম্ভব ব্যাপার!
    জীবন বরবাদ হয়ে যাবে, তা সেসব দেশের মানুষেরা ভালোই জানে।
    তাইতো তাঁরা আইন মানে, আইনের প্রতি তাঁরা এতো শ্রদ্ধাশীল।
    এইতো- ২০২০ সনের করোনার সময়-ই অস্ট্রেলিয়ার এক যুবতী সাড়ে ছয়শত কিলোমিটার পথে ট্রেনজার্ণি করেছে একদমই একা একা। অই ট্রেনে পাঁচজন রেলের পুরুষ কর্মচারী ছাড়া মেয়েটির নিজের বলে আর কোনো যাত্রী সঙ্গে ছিলো না।

    ওটা সম্ভব হয়েছে- কারণ ওদেশে আইন আছে, আইনের যথার্থ প্রয়োগও আছে।
    তাইতো, রেলকর্মীরা বরং সমীহের সাথেই তাঁকে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে।

    মেয়েটিও একদমই কোনো বিপদ আশঙ্কায় কাতর ছিলো না। সে বই পড়তে পড়তেই তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।
    ভাবুনতো, ভারত বা বাংলাদেশের রেলগাড়ীতে এটা কী কস্মিনকালেও সম্ভব হতো…? নাকি কল্পনা করা যায়.?

    যাহোক্, অবশ্যই পুরুষের পাশাপাশি- নারী তোমাকেও ভাবতে হবে। এটা বেকার যুবকে ঠাসা একটি দেশ।
    এ দেশে ধর্ম আছে, ধর্মের নিখাঁদ অনুশীলন নেই।

    মেয়ে,যদি তুমি তোমার ত্রুটি বের করে, নিজের সঠিক আচরণটা কি হবে- তা আইডেন্টিফাই করতে পারো, তাহলে -তুমি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। জয়ী হতে পারবে। কেবল,তখনই তোমার জীবন হবে অনাবিল।

    নইলে- তোমার ব্যর্থতার দায় পুরুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, শুধু পুরুষটিকে অপরাধী করাও ঠিক হবে না। তখন অই মাতব্বরদের কথাই ঠিক হবে- “এক হাতে তো, তালি বাজে না।”
    অথবা নিজের ভুলত্রুটির জন্য ভাগ্য বিড়ম্বিতা হয়ে, পুরুষকে একচেটিয়া দোষ দিলে চলবে না। তোমারও ভেবে চিন্তে পা ফেলতে হবে’গো,মেয়ে ।

    কিশোর, যুবক, বা প্রৌঢ় এ দেশে সবাই ধোয়া তুলসি পাতা নয়। ( নিশ্চয়ই তুমিও ধোয়া তুলসি পাতা নও..)

    হবেই বা কী করে- আইনের কঠোর অনুশীলন এদেশে ফস্কা গেরোর মতো, এটা সবাই ভালো করে জানে। অন্যায় করে সবাই ফাঁসে না, অনেকেই পার পেয়েও তো যায়, নাকি..?

    সুতরাং মেয়ে, তোমাকেই বলছি—-
    তুমি ধর্মীয় দিক থেকে নিরাপদ কোনো নারী নাগরিক হলেও, পুরুষ শাসিত সমাজে অই ধর্মীয় পরাকাষ্ঠার ঘেরাটোপেই কোনো কোনো পুরুষের কাছে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা ভুক্ত মেয়েমানুষ ছাড়া আর কেউ নও তুমি..!

    যেহেতু তোমার মতামত, ইচ্ছে,বাকস্বাধীনতা, চলাফেরা ও আচরণ পুরুষের অনুগ্রহের ঘেরাটোপে বন্দী, সেহেতু- যতদিন পুরুষদের এ ধারণার অবগুণ্ঠন হতে তুমি ষোলোআনা বিমুক্ত হতে পারোনি, ততদিন মেয়ে তোমাকেই একটু সমঝে চলতে হবে।

    কারণ, তুমি তো এ সমাজে মানুষ নও, মেয়েমানুষ, মেয়েছেলে…!
    অনেকের পরিভাষায় তেঁতুলসম। জিহ্বায় জল আনার কোনো সুলভ বস্তু।

    তাইতো তোমার চেনা-জানা এ সমাজে, তোমাকেই সমঝে চলতে হবে।
    তবু বলি, তোমারো সুমতি হোক্ মেয়ে। সমঝে চলো।

    বিধাতা যেনো- সার্বক্ষণিক তোমার সহায় হয়, অনুসঙ্গী হয়, এই কামনা করি।

    লেখক: ড. আলহাজ্ব শরীফ আব্দুল্লাহ হিস সাকী
    আইন গবেষক ও মানবাধিকার কর্ম।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম