• শিরোনাম


    মুজিব বর্ষ কি,তাৎপর্য ও প্রত্যাশা: এস এম শাহনূর

    | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯:৪০ অপরাহ্ণ

    মুজিব বর্ষ কি,তাৎপর্য ও প্রত্যাশা: এস এম  শাহনূর

    “একটি বজ্র কণ্ঠ, তর্জনীর একটি বজ্র নিনাদ
    মিটিয়ে দিলো পলাশীর পরাজয়ের অপবাদ।
    টুঙ্গি পাড়ার দামাল ছেলে জাতির জনক বঙ্গবীর
    শোষিত বাঙালীর নেতা তিনি চির উন্নত শির।
    খোকার হাতে বাঙালী লিখল বিজয়ের ইতিহাস,
    অবাক পৃথিবীর সবাক কথন সাবাস সাবাস।”

    শেখ মুজিবুর রহমান। ‘শেখ মুজিব’ নামেও পরিচিত। সংক্ষিপ্তরূপে বলা বা লেখার জন্য অনেকে ‘শেখ মুজিব’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির ব্যবহার আরও বেশি। যারা বঙ্গবন্ধু বা শেখ মুজিব শব্দ ব্যবহার করে, তারা শেখ মুজিবুর রহমান শব্দ বা নাম ব্যবহার করে না। এমনকি একই সঙ্গে দুটি নাম ব্যবহারের প্রয়োজন থাকে না। আরও একটি সম্প্রদায় ‘শেখ সাহেব’ শব্দ ব্যবহার করে। শেখ সাহেব শব্দ ব্যবহারের আরেকটি তাৎপর্য আছে। বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমানের সামসময়িক (সমসাময়িক শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও ভুল) রাজনীতিকরা শেখ সাহেব শব্দটি বেশি ব্যবহার করে থাকেন। এটি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশা থেকে এখনও প্রবীণ রাজনীতিকদের মধ্যে চালু আছে।



    মুজিব নামটা শুনলে চোঁখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা পরনে পাঞ্জাবি-পায়জামা সাথে কালো ওয়েস্ট কোট, চোঁখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। যাঁর মধ্যে দিয়ে দেখা যায় চকচকে ঝকঝকে শানিত একজোড়া চোঁখ। অতি সাধারণ পোশাক পরিহিত একজন অসাধারণ মানুষের ছবি। সেই মানুষের ছবি জেগে ওঠে যাঁর হৃদয় ছিল আকাশের মত বিশাল, যাঁর সকাল হত দেশের মানুষের কথা মনে নিয়ে, যে চোঁখে ঘুম নামতো দেশের আপামর মানুষের প্রতি ভালবাসা নিয়ে।

    সেই মানুষটা আমাদের বাঙ্গালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, আপামর জনতার ভালবাসা তাঁকে শুধু জাতির পিতাই করেনি করেছে বন্ধু,বাংলার বন্ধু, বাংলার মানুষের বন্ধু, তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু। যাঁর প্রেরণায় বিনা অস্ত্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সমুখ সমরে নেমে ছিল বাঙলার আমজনতা। সাথে ছিল শুধু একবুক সাহস, আর এই সাহস জুগিয়েছিলেন আমাদের বাঙ্গালার বন্ধু আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ঋণ কেউ শোধ করতে পারবে না।

    যাঁর চিন্তা চেতনায় সবার আগে এসেছে দেশ, দেশের মানুষ, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, পেট ভরে ভাত খেতে পাবে, দুর্নীতিমুক্ত সমাজে বাস করবে, দেশের মানুষ শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত হবে। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটা দেশ উপহার দিতে চেয়েছে, সেই লক্ষ্যে কাজ করছিলেন তিনি, একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশেকে উনি সাড়ে তিন বছরে সোজা করে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্ত সে হাসি হাসতে পারেন নি। কারণ ৭১’এর দোসররা রয়ে গিয়েছে আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, সমাজে, সরকারে। আর তারাই নির্দ্বিধায় খুন করে দেশের একমাত্র বন্ধুকে, বঙ্গবন্ধুকে।

    ➤মুজিব বর্ষ কি?

    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৭ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ পর্যন্ত ২০২০-২০২১ খ্রিস্টাব্দকে মুজিব বর্ষ হিসাবে জাতীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপকার, কিংবদন্তি এই নেতা ১৭ মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ২৬ মার্চ ২০২১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে। জাতিসংঘের অন্যতম একটি অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো। মুজিব বর্ষ উদযাপনের জন্য ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে মুজিব বর্ষ পালন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাছাড়া ২০১৯ সালের১২ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর অধিবেশনে ইউনেস্কোর সকল সদস্যের উপস্থিতিতে ২৫ নভেম্বর মুজিব বর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। শেখ মুজিব ও বাংলাদেশ – এরা একে অপরের পরিপূরক অর্থাৎ, একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে চিন্তা করা যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা, শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব বর্ষ – এসবই একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই মুজিব বর্ষ উদযাপন এত তাৎপর্যপূর্ণ।

    সৈয়দ শামসুল হক নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকে যেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথাই লিখে রেখেছেন:
    ‘দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ,
    নবান্নের পিঠার সুঘ্রাণে দ্যাশ ভরি উঠিতেছে।
    দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ,
    হামার গাভীন গাই অবিরাম দুধ ঢালিতেছে।
    দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ,
    মানুষ নির্ভয় হাতে আঙিনায় ঘর তুলিতেছে।
    দেখিবার অপেক্ষায় আছোঁ,
    নিশীথে কোমল স্বপ্ন মানুষের চোখে নামিতেছে।…
    সুখে দুঃখে অন্নপানে সকলেই একসাথে আছে
    সোনার বাংলার সোনা বাংলাদেশে আছে।’

    প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে
    ১৭ মার্চ ২০২১, অর্থাৎ জাতির পিতার এক জন্মদিন থেকে আরেক জন্মদিন পর্যন্ত বছরটি উদযাপিত হবে মুজিব বর্ষ হিসেবে। সে হিসাবে ক্ষণগণনার দিনক্ষণ থেকে মুজিব বর্ষ শুরু হতে বাকি ছিল ৬৮ দিনের কিছু বেশি।আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী।১৭ মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হবে বছরব্যাপী এ অনুষ্ঠান মালা।
    জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে প্রাণ না হারাতেন তবে আজ ১৬ ফেব্রুয়ারী তাঁর বয়স হতো ৯৯ বছর ১১মাস ১দিন এবং ২০২০ সালের ১৭ মার্চ তিনি শতায়ু হতেন। আবার কাকতালীয়ভাবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে বাংলাদেশ তাঁর স্বাধীনতার অর্ধ-শত বার্ষিকীতে পদার্পণ করবে।

    কি আশ্চর্য এক মিলের সেতু বন্ধন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর স্বপ্নের গড়ে ওঠা বাংলাদেশের। কিন্তু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালিকে জাতি হিসেবে আমরা মাত্র ৫৫ বছর ৪ মাস বাঁচতে দিয়েছি। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে শতায়ু তিনি হতেন না, তা কে বলতে পারে! যদি তিনি তাঁর অতি প্রিয় বাংলার মাটিতে শতবর্ষ বেঁচে থাকতেন তবে এই দিনটি জাতি তখন কীভাবে পালন করত, তা ভাবলে মনেপ্রাণে শিহরণ জাগে।

    সেই উপলব্ধি থেকেই হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সে দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০২০-২০২১ খ্রীস্টাব্দকে মুজিব বর্ষ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এই হলো পটভূমি। যে দেশটির জন্য তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন, যে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের কথা নিয়েই যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঘোষিত “মুজিব বর্ষ”টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

    বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদযাপনে দুটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ১০২ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’। এ কমিটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে সভাপতি ও কবি কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে প্রধান সমন্বয়কারী করে গঠন করা হয়েছে ৬১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’।

    বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিগত ৮ জানুয়ারি, ২০২০ সালে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে চতুর্থবারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, “২০২০ সাল আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর উদযাপিত হতে যাচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী।”

    প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই উদযাপন শুধু আনুষ্ঠানিকতা-সর্বস্ব নয়, এই উদযাপনের লক্ষ্য জাতির জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চারিত করা; স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে জাতিকে নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়া।”

    আগামী ১৭ই মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মুজিববর্ষের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার সূচনা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠানমালা যুগপৎভাবে চলতে থাকবে।মুজিববর্ষ’ উদযাপনে বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের ১৯৫টি দেশে অনুষ্ঠানমালা আয়োজনের পাশাপাশি ঢাকার আয়োজনে যোগ দিতে আসবেন বিশ্বনেতারা।

    ➤মুজিব বর্ষের ক্ষণগণনা:

    জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষণগণনার উদ্বোধন ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ১০ জানুয়ারি থেকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যান বঙ্গবন্ধু। সেখান থেকে ভারতে স্বল্প সময়ের যাত্রাবিরতি দিয়ে ১০ জানুয়ারি দুপুরে তিনি তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে আরো স্মরণীয় করতে ১০ জানুয়ারি থেকেই মুজিব বর্ষের ক্ষণ গণনা শুরু হয়।
    জয় বাংলা- এ শ্লোগান আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাইতো গত ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা দেন মহামান্য হাইকোর্ট। আর এই স্লোগান যাঁর মুখে মুখরিত ছিলো সে আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয়সংগ্রামী বাঙালীর প্রিয় নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।এই দিনটিতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত সেই মহামানব হানাদার শত্রুদের দুর্ভেদ্য লৌহপ্রকোষ্ঠ ছিন্নভিন্ন করে হিমালয়ের মতো শির উঁচু করে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে অশ্রুসজল নয়নে সহাস্য বদনে বিমান থেকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিলেন। নয় মাস পর তিনি এলেন, সমবেত লাখো মানুষের হৃদয় উদ্বেলিত করে খোলা ট্রাকে করে রেসকোর্স ময়দানে তাঁরই জন্য তৈরি মঞ্চে যাওয়ার পথে নয়নভরা জলে রাস্তার ধারের হাজারো জনতার চোঁখেও জল বইয়ে দিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টাকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বরণ করে নিল জাতির পিতা হিসেবে। ১০ জানুয়ারিতে (১৯৭২) আপন মানুষদের সাহচর্যে এসে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিতে গিয়ে নিজে আবারও কাঁদলেন আর কাঁদালেন লাখো জনতাকে। আজ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তিনি জীবিত থাকলে দেখতেন তাঁর সেই প্রাণপ্রিয় সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পূর্বসূরিরা বেড়ে হয়েছে সংখ্যায় ১৭ কোটি। আর ১৭ কোটি বাঙালির ৩৪ কোটি হাত আজ ঊর্ধ্বে উঠিয়ে আনন্দের ফানুস উড়িয়ে দুহাতে করতালি দিয়ে আরেকবার আবেগঘণ হৃদয়ে মনের কোঠরে গেঁথে নিয়েছেন জাতির পিতাকে; যাঁর অপরিসীম আত্মত্যাগের ফল হিসেবে আমরা পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ, একটি পতাকা আর একটি নতুন মানচিত্র। আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সবুজের মাঝে উদীয়মান তরুণ সূর্য। তাঁরই সম্মানে সবাই পালন করবে তাঁর শততম জন্মশতবার্ষিকী একটি দিনে নয়, সারা বছর ধরে প্রতিদিন, যা পরিচিতি পাবে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে। মুজিববর্ষ নাম হয়েছে তাঁরই নামানুসারে, যাঁর নামটি ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলার ইতিহাসে, ইতিহাসের পাতায় প্রোথিত হওয়া যে নাম ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’-এর গায়ে খোদিত হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে সুনীল আকাশে।তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সবার প্রিয় ‘শেখ মুজিব’।

    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষণগণনার উদ্বোধন করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ৫৩ জেলা, ২টি উপজেলা, ১২টি সিটি কর্পোরেশনের ২৮টি পয়েন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর ৮৩টি পয়েন্টে বসানো কাউন্টডাউন ঘড়ি চালু হয়।

    ➤এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শত বার্ষিকী আমরা উদযাপন করবো। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি। আমরা ২০২০ থেকে ২০২১ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছি। আমরা এই সময়টাকে এমন ভাবে কাজে লাগাতে চাই- বাংলাদেশ যেনো ক্ষুধা মুক্ত, দারিদ্র মুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে ওঠে।’

    সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মুজিব বর্ষ উদ্‌যাপনের নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, বেশ একটা কর্মযজ্ঞ চলছে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যদি জীবনে কাজে লাগানো যায়, তা হবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার শ্রেষ্ঠ উপায়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই শুধু এই লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে।’

    বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আমাদের কর্তব্য হবে তাকে অর্থবহ করে তোলা। সে জন্য কী করতে হবে, তা–ও তিনি বলে গেছেন, ‘যিনি যেখানে রয়েছেন, তিনি সেখানে আপন কর্তব্য পালন করলে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে না।’ (১৫ জানুয়ারি ১৯৭৫)
    ২০২০ সালের অঙ্গীকার হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, যা মূর্ত আছে আমাদের ১৯৭২-এর সংবিধানের মৌল চার নীতিতে—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতায়।

    যদি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে তা আমাদের জীবনে কাজে লাগাতে পারি, তা হবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার শ্রেষ্ঠ উপায়।বঙ্গবন্ধু সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে ইতিহাসের মহানায়কে পরিণত হওয়ার কোনো পর্যায়েই তাঁর সব শক্তির উৎস গণমানুষের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরেনি। জনতা ও নেতার এই রসায়ন ও এই বন্ধন কেবল মুখে প্রকাশ করার বিষয় নয়, এটি জীবনযাপনের অঙ্গীভূত বিষয়।
    বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই শুধু এই লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে।’ এই কথাটা কিন্তু গভীরভাবে ভাবার মতো। প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা খুব জরুরি। এই কথাটার মানে কি আমরা বুঝি? রবীন্দ্রনাথেরই কথা যে, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!’ মানুষকে যেন আমরা অপমান না করি।
    বঙ্গবন্ধু মুজিব সারাটা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই দুটি অসমাপ্ত আত্মজীবনী আর
    কারাগারের রোজনামচা আমাদের অবশ্যপাঠ্য। শুধু পড়লেই চলবে না, তাঁর কথাগুলো আমাদের মেনে চলতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না।’ বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচা য় লিখেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে তো কিছুই নাই। এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেছে। পাকিস্তানকে শাসকগোষ্ঠী কোন পথে নিয়ে চলেছে, ভাবতেও ভয় হয়। আজ দলমত-নির্বিশেষে সকলের এই জঘন্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত।’ (৩০ জুন ১৯৬৬) ১৯৭২ সালের ৯ মে রাজশাহীতে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন,
    ‘আমি কী চাই?
    আমি চাই আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কী চাই?
    আমার বাংলার বেকার কাজ পাক।
    আমি কী চাই?
    আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক।
    আমি কী চাই?
    আমার বাংলার মানুষ হেসেখেলে বেড়াক।
    আমি কী চাই?
    আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।’

    নারীর প্রতি আস্থা ও সম্মান বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবার আমার জীবনের ১০/১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে। পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না। সে জন্য আজকে আপনাদের কাছে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। যাতে পুরুষ ভাইরা আমার, যখন কোনো রকমের সংগ্রাম করে নেতা হন বা দেশের কর্ণধার হন তাদের মনে রাখা উচিত, তাদের মহিলাদেরও যথেষ্ট দান রয়েছে এবং তাদের স্থান তাদের দিতে হবে”।

    ছাত্রলীগ ও ছাত্রদের প্রতি তিনি বলেন, “ছাত্র ভাইয়েরা, লেখাপড়া করেন। আপনাদের লজ্জা না হলেও আমার মাঝে মাঝে লজ্জা হয় যখন নকলের কথা আমি শুনি। ডিগ্রি নিয়ে লাভ হবে না। ডিগ্রি নিয়ে মানুষ হওয়া যায় না। ডিগ্রি নিয়ে নিজের আত্মাকে ধোঁকা দেওয়া যায়। মানুষ হতে হলে লেখাপড়া করতে হবে। আমি খবর পাই বাপ-মা নকল নিয়া ছেলেদের-মেয়েদের এগিয়ে দিয়ে আসে। কত বড় জাতি। উঁহু! জাতি কত নিচু হয়ে গেছে।”

    বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় দেওয়া ভাষণে বলেন, “রাস্তা নেই ঘাট নেই, রেলওয়ে ব্রিজ এখন পর্যন্ত সারতে পারি নাই। চরিত্র এত জঘন্য খারাপ হয়ে গেছে যেই ধরি পকেটমাইর ধরি, চোর-গুন্ডা ধরি, লজ্জায় মরে যাই ছাত্রলীগের ছেলে, ভাই-বোনেরা। পুলিশ দিয়া নকল বন্ধ করতে হয় আমার এ কথা কার কাছে কবো মিয়া? এ দুঃখ! বলার জায়গা আছে মিয়া? তোমরা নকল বন্ধ করো। ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়ন নিয়া সংগ্রাম পরিষদ করেছ, তোমরা গার্ড দিয়া নকল বন্ধ করো। তোমাদের আমি সাহায্য করি। পুলিশ দিয়া আমাদের নকল বন্ধ করতে দিয়ো না তোমরা। পুলিশ দিয়ে আমি চোর সামলাব”।

    ১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট, ঢাকায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া ভাষণ দান কালে তিনি বলেন, আমি দেখতে চাই যে, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ফার্স্টক্লাস বেশি পায়। আমি দেখতে চাই, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ওই যে কী কয়, নকল, ওই পরীক্ষা না দিয়া পাস করা, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলো।

    বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শের ছিতে ফোঁটা যদি দলের সব নেতা-কর্মী পালন করে তাহলে দেশে যে উন্নয়ন চলছে তা হবে টেকসই, মজবুত ও দীর্ঘমেয়াদী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ দলের আদর্শবান সৎ নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে তাদের সঠিক মর্যাদাদান ও সুযোগ সন্ধানী, হাইব্রিড, ন্যায়-নীতি বর্জিত কর্মীদের শাস্তি প্রদান করুন।

    বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা, আদর্শ, ন্যায়-নীতি, জীবন, চিন্তা, শিক্ষা ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি সরকার পরিচালিত হয় এবং তার যথাযথ পালন হয় তা হলেই মুজিব বর্ষ সফল হবে বলে দৃশ্যত। আর সেই লক্ষ্যে যদি অটুট থাকা যায় তাহলে বাংলাদেশ অচিরের একটা সোনার দেশ হয়ে গড়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

    আমার ব্যক্তিগত অভিমত যে, বঙ্গবন্ধু যা করতে চেয়েছিলেন, যেভাবে চেয়ে ছিলেন দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, সেইসব পদক্ষেপ নিয়ে বাস্তবায়ন করলে তাঁকে সঠিক শ্রদ্ধা জানানো হবে। তাঁর জীবন ও কর্মের থেকে ছিটেফোঁটা শিক্ষা নিলেও দেশের মানুষের জীবন উন্নত হতে পারে। উনাকে চর্মচোঁখে না দেখলেও, পরিবারের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি, ইতিহাস পাঠে যতটুকু জেনেছি বা তার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী আর কারাগারের রোজনামচা পড়ে যতটুকু জেনেছি, তা আমার যাপিত জীবনে যদি অনুসরন করতে পারি তা হবে উনাকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার সমান ।

    বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি মূল কারিগর ও স্বাধীনতা অর্জনের পর ’৭৫ সালে ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে বিশ্ব ইতিহাসের কলংকময় সেই রাতে শহীদ হওয়ার আগে পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পরতে পরতে যে সকল সমস্যা ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তিনি তাঁর বক্তৃতায় ও তাঁর লেখা বই এ তুলে এনেছেন যার অধিকাংশ থেকে আমরা আজো মুক্তি পাইনি।আসুন দৃষ্টভঙ্গি বদলাই,বদলে যাবে সমাজ,বদলে যাবে দেশ।নিজেরা সংশোধিত হয়ে তাঁর দেখানো পথে চলি। মুজিব বর্ষ কে সাফল্য মন্ডিত করি।

    মুজিব মানে বিশ্ব নেতা
    মুজিব মানে স্বাধীনতা
    মুজিব মানে জাতির পিতা
    ঝরুক মুজিব বর্ষের বার্তা।

    💻লেখক: এস এম শাহনূর
    (কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক)

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম