• শিরোনাম


    মিডিয়ার কবলে মাদরাসা: উবায়দুর রহমান খান নদভী

    | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১২:২৬ অপরাহ্ণ

    মিডিয়ার কবলে মাদরাসা: উবায়দুর রহমান খান নদভী

    বিশ্ব মিডিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে হেয় ও অজনপ্রিয় করে থাকে। এটি সভ্যতার দ্ব›দ্ব তত্তে¡র অংশ। দেশীয় মিডিয়াও এ বাতাসের বাইরে নয়। মিডিয়া সন্ত্রাস এখন সামরিক সন্ত্রাসের খালাতো ভাই। মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের শিরোনাম থাকলেও অন্তরে ছিল তার ক্রুসেড। কাশ্মীরে যেমন রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শন চললেও আখেরে বলা হচ্ছে এ নাকি ইসলামের ওপর হিন্দুত্বের বিজয়। এসব যুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর কাজ করে এম্বেডেড মিডিয়া। মিডিয়া যে কী করতে পারে তা যারা এর শিকার তারাই কেবল ভালো করে বুঝবেন।

    সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কার্টুনে দেখা যায়, এক লোক সন্ত্রাসীর ছুরি কেড়ে নিয়ে এক পথচারীকে রক্ষা করছে। অথচ ক্যামেরা লেন্স যে ছবিটি ধরেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে দরদী লোকটিই ছুরি হাতে পথচারীকে আঘাত করতে উদ্যত। কেবল এ ছবিটি একটি ক্যাপশানজুড়ে দিয়ে নিউজ করলে গোটা বাস্তবতাটিই মারাত্মকভাবে মিথ্যার আধারে ডুবে যাবে।



    যেমন ধরুন ক্যামেরার ফোকাস দর্শককে একটি বিষয়ে ষোলআনা আটকে ফেলতে পারে। চারপাশের সমান গুরুত্বপূর্ণ হাজার বিষয় থেকে তাকে করে দিতে পারে বেখবর। যেমন টাইটানিকের শেষদিককার দৃশ্যে দর্শক নায়ক-নায়িকার বিচ্ছেদ মুহূর্তটি যখন চোখের পানিতে হাপুস নয়নে দেখে ঠিক তখনই আরও শত শত মানুষের একইভাবে সলিল সমাধি হচ্ছে। দর্শকের মনে সেগুলো তেমন দাগ কাটে না। এর কারণ ক্যামেরার কাজ। এ মূল্যায়নটি একজন মুভিক্রিটিকের লেখায় পড়েছিলাম।

    পাঠকের অবশ্যই পাকিস্তানের মালালার কথা মনে থাকবে। তাকে নিয়ে পশ্চিম কীভাবে মেতে উঠেছিল। নোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত পায় মেয়েটি। আর আরাকান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও কাশ্মীরের লাখো মালালা আজ কী অবস্থায় আছে, এ নিয়ে তারা মাতামাতি করে না, না করুক। কিন্তু মুসলিম জাতি তাদের কতটুকু জানে। এসবই মিডিয়ার ক্ষমতার প্রমাণ।

    এজন্য মিডিয়ায় বিবেচনাবোধের প্রয়োজন অন্য অনেক পেশার চেয়ে বেশী। প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধের। কেননা, এখানে মানুষের জান-মালের চেয়ে তার সম্মান নিয়ে তুলনামূলক বেশী ডিল করা হয়। নীচ মন, দূষিত মানসিকতা, নিকৃষ্ট নৈতিকতা নিয়ে মিডিয়ার অঙ্গনে কেউ আসা মানে সমাজের ভালো মানুষগুলোর দুর্ভাগ্য।

    এ সপ্তাহেই দেশের এক মসজিদে ইমাম সাহেবের শিশুপুত্র, তার দুই ভাতিজাসহ এক দুর্ঘটনায় নির্মমভাবে প্রাণ হারায়। মক্তবে পড়ুয়া এ তিন শিশু নামাজের সময় ইমাম সাহেবের কক্ষে পানি মনে করে বোতলে রাখা ব্যাটারীর এসিড পান করে ফেলে। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব কক্ষে ফেরার আগেই বাচ্চা তিনটি মারা যায়।

    মিডিয়া ইমাম সাহেবের মনের অবস্থা ও সন্তানহারা কয়েকজোড়া পিতামাতার শোকতাপ অনুভব না করে নিজেদের সংবাদের টক মিষ্টি ঝাল স্বাদ বাড়ানোর জন্য শিরোনামটি এমন করে, যা অমানবিক বললেও কম বলা হবে। বলে, ইমামের কক্ষে পাওয়া গেল তিন শিশুর লাশ। পাঠক এ হেডিং থেকে কী বার্তা নেবে।

    অথচ ইমামের কক্ষে নিজ পুত্র ও দুই ভাতিজার মর্মান্তিক মৃত্যু, এমনই হওয়া উচিত ছিল এ সংবাদটির শিরোনাম। দরকারে তারা রহস্যজনক মৃত্যু বলতে পারতেন। বিষয়টি জেনে বুঝে কেউ করেছেন কি না বলা মুশকিল। তবে, অনেকে এত চিন্তা না করে যা দেখেছেন সে শিরোনামটিই অনুসরণ করে নিজের অসতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন। এখানে অসাবধানতাও সমান অপরাধ। যা সরল মনে অনেকেই করে বসেন। চিন্তাও করেন না। এ কাজটি কত অমানবিক ও নীতিবহির্ভূত।

    সম্প্রতি ইংরেজী কাগজ ‘ডন’ এ একটি আলোচনা ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের মাদরাসাগুলো নাকি শিশু ধর্ষণের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুুনিয়ার মানুষ জানে বিশ্বের উন্নত কোন কোন দেশে মিনিটে কতগুলো ধর্ষণ হয় সে হিসাব। শতশত বছর ধরে ভ্যাটিকানসহ বিশ্বব্যাপী গীর্জাসংশ্লিষ্ট ধর্মগুরুরা কেমনসব যৌন কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত। তাদের নিজেদের স্বীকৃতি, পোপের দুঃখপ্রকাশ, সংশোধনের আহ্বান, ক্ষমা প্রার্থনা, অনাচারের শিকার ছেলেমেয়েদের, বিশেষ করে ছেলেদের বড় হয়ে এসবের বর্ণনা প্রদান ইত্যাকার সংবাদ, ফিচার, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার ও পরিসংখ্যান অনলাইনের বিশ্বভান্ডার উপচে পড়ছে।

    আকস্মিকভাবে এমন একটি স্থানে মাদরাসার নামটি সেঁটে দেয়ার একটি দূরভিসন্ধি ছাড়া বিষয়টি যে আর কিছু নয় তা সবার কাছেই স্পষ্ট। নতুবা তুলনামূলক ও বিচ্ছিন্ন দু’য়েকটি ঘটনা এত ব্যাপক একটি শিরোনাম পেতে পারে না। গত কয়েকমাসে হঠাৎ দেশে ধর্ষনের মহামারী শুরু হয়। দুই বছরের শিশু কন্যা থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত যেন কেউই নিরাপদ নয়।

    এ বিষয়টি মূলত ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা অশ্লীল দৃশ্য দেখে কান্ডজ্ঞানহীন আচরণ করে। নিজের যৌন চাহিদা পূরণের বিবেকহীন উন্মাদনায় কেউ কেউ তখন শিশু বা প্রবীণা এসব চিন্তার সময় পায় না। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে শাস্তি বা অসম্মানের ভয়ে ভিকটিমকে হত্যাও করে ফেলে। মেয়েরা আগ্রাসী মনোভাব তাদের মতো করে বাস্তবে রূপ দেয়।

    পরকীয়া, কিশোরী যৌনতা, ছাত্রছাত্রীদের অবাধ মেলামেশা থেকে শুরু করে সমাজের হোমড়া চোমড়াসহ যত ধরনের নোংরামী ইদানিং দেশের মানুষকে উদ্বিগ্ন ও লজ্জায় অবনত করে ফেলেছে, এসবই রাষ্ট্র ও সমাজের পরিকল্পনা, নীতিগত উচ্চতা, সঠিক অভিভাবকত্ব না থাকার ফলেই হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে স্বাভাবিক মন্দের গতিকে কিছু স্বার্থপরের মাধ্যমে হাওয়া দেয়া হয়েছে।

    মাদক রোধ করা যায়নি। ধর্মীয় মূল্যবোধের বদনাম ও বিনাশ করা হয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠিত রীতি ঐতিহ্য মূল্যবোধকে তিলে তিলে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা প্রসারের ব্যবস্থা করে, কেউ এসবে বাধা দিলে তাকে দুর্নামের ট্যাগ লাগিয়ে কোণঠাসা করে দিয়ে, মৌলবাদী সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে, ছেলে মেয়েদের হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে তোমাদের কাপড় যেন না ভিজে।

    মানুষ হিসাবে কেউই পরিবেশের প্রভাব থেকে শতভাগ মুক্ত থাকতে পারে না। একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি, ছাত্রী হোস্টেলের ট্রাংকে অবৈধ শিশু, ভিকারুননেসায় কোচিংয়ের নামে ছাত্রী নির্যাতনসহ নারায়ণগঞ্জে ছাত্রী ও তাদের মাদেরকে পর্যন্ত গোপন ক্যামেরায় ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করে বার বার যৌন নির্যাতন পর্যন্ত বাংলাদেশ দেখেছে।

    দুষিত এ সময়ে এক আধটি নামগোত্রহীন মাদরাসা খুঁজে পাওয়া গেছে যেখানে অপরাধপ্রবণ শিক্ষক এ ধরনের অপকর্মে জড়িত। তাদের নিয়ে কোনো ইসলামী ব্যক্তিত্ব সাফাই বক্তব্য দেননি। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যক্তির শাস্তিই কাম্য। আজ পর্যন্ত মাদরাসা সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির অপরাধে আলেম সমাজ সাথ দেওয়া তো দূরের কথা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কামনা করেছেন।

    এজন্য মাদরাসা বন্ধ করে দাও, এমন পাগলের প্রলাপও ঢাকার মিডিয়ায় এসেছে। অথচ, এরচেয়ে বহুগুণ ও বহুবার একই প্রকৃতির অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্তে¡ও এসব আঁতেলরা কখনোই বলেননি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দাও, কলেজ বন্ধ করে দাও, স্কুল বন্ধ করে দাও ইত্যাদি।

    মাদরাসা পরিচালনায় যুক্ত যে সমাজ ও কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব যেসব সমস্যা আছে তা দূর করা। সমস্যা নিয়ে নিজেদের ফোরামে আলোচনা করে প্রতিবিধান করা। বর্তমান উশৃঙ্খল সমাজে তুলনামূলক যে পবিত্রতা ও সম্মান নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা প্রচলিত আছে, তা অব্যাহত রাখা।

    মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী ইসলামের শত্রুরা যেভাবে ছিদ্রান্বেষণ করছে, বাহানা খুঁজছে, তাদের লক্ষ্য পূরণের সুযোগ করে না দেওয়া। সাজানো ঘটনা, কৃত্রিমভাবে তৈরি চরিত্র ও ছদ্মবেশী মাদরাসাপ্রেমী এজেন্ট সমন্বিত যোদ্ধা দলের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। বিশেষ করে শত্রুর হাতিয়ার মিডিয়ার হাতে আংশিক সত্য ও সিংহভাগ বানোয়াট সংবাদ গল্প কাহিনী ও বিশ্লেষণ তৈরি এবং প্রচারের সুযোগ করে না দেওয়া।

    কারণ, কোনো কথাই এখন হারিয়ে যায় না। সরল বর্ণনাও শত্রুর অস্ত্রে রূপ নেয়। উদ্ধৃতি ভেঙ্গে খন্ডিতভাবে প্রচারিত হয়। একটি অসতর্ক উক্তি শত্রুর হাতে পড়ে, ধ্বংসের আনবিক বোমায় পরিণত হয়। যদিও তা উচ্চারিত হয়েছিল, পরিবেশ উন্নয়ন ও অবস্থা সংশোধনের সদিচ্ছায়। নিঃসন্দেহে সংশোধন দরকার। কিন্তু এরচেয়েও বহুগুণ বেশী দরকার মাদরাসা শিক্ষার পথ ধরে ইসলাম প্রচারের গোটা আদর্শিক যুদ্ধটি চালিয়ে যাওয়া, মিথ্যার বেড়াজাল ছিন্ন হয়ে সত্যের আলো বিশ্বব্যাপী পরিস্ফুট হওয়া পর্যন্ত।

    সূত্র ইনকিলাব

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম