• শিরোনাম


    মাহমুদুর রহমানের অর্থ ও অর্ন্তজ্বালার উৎস কী? সৈয়দ মবনু

    | ০৮ অক্টোবর ২০১৮ | ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ

    মাহমুদুর রহমানের অর্থ ও অর্ন্তজ্বালার উৎস কী?  সৈয়দ মবনু

    অধুনালুপ্ত আমারদেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান খুব ক্ষুব্ধ হয়েছেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আল্লামা আহমদ শফির প্রতি। তাঁর ক্ষোভের কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকা থেকে ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম কোনো দিনই তাদের শত্রু ছিল না।’
    মাহমুদুর রহমান আরবিএন২৪ নামের এক অনলাইন পোর্টালে ৫ অক্টোবর (২০১৮ খ্রিস্টাব্দে) এ বিষয়ে একটা লেখা লিখেছেন। এতে তিনি বলেছেন, ‘ইসলামী আদর্শে অবিচল থাকার জন্য আজ পর্যন্ত আমারদেশ পরিবারকে অসহনীয় মূল্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, হেফাজতে ইসলাম এবং আল্লামা শফী ক্ষমতাসীনদের কাছে আজ আর অচ্ছুৎ নন।’
    মাহমুদুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বাংলাদেশে তাবৎ সেক্যুলার ইসলাম বিদ্বেষীদের একচ্ছত্র নেতা’ বলে চিহ্নিত করেন এবং আল্লামা শফীসহ হেফাজতের নেতাদের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গণভবনে দাওয়াত করায় খুব রাগ দেখিয়ে বলেন, ‘একদার ‘তেঁতুল হুজুর’ আল্লামা শফীকে প্রধানমন্ত্রী প্রায় নতজানু হয়ে সালাম দিয়েছেন।’ শেখ হাসিনা কর্তৃক কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করেন, হেফাজতের ঐতিহাসিক আন্দোলন কি সনদপ্রাপ্তির দাবীতে হয়েছিল?’ ‘আলেমদের রক্তে যে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর হাত রঞ্জিত, তার কাছ থেকে সনদ কিংবা মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ অবশ্যই ইসলামের বাণীর পরিপন্থী। ভাইয়ের হত্যাকারীর কাছ থেকে কোন মুমিন মুসলমান ভিক্ষা নিতে পারে না। অবশ্য আল্লামা শফী যদি শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা অথবা ডিজিএফআই-এর কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ তার আলেম ভাইদের খুনের বিনিময়ে রক্তপণ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে আমাকে নতুন করে লিখতে হবে।’
    ‘শেখ হাসিনার মহব্বতে এবং ‘মোটা অংকের’ অনুদানে যিনি আদর্শচ্যুত হন, প্রবীণ বয়সের কারণে তাকে কেবল করুণা করা চলে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আলেমদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই প্রকৃত ইসলামী আদর্শের অনুসারী। কেবল সনদের মোহে এবং ‘মোটা অংকের’ অনুদানের বিনিময়ে তারা ইসলাম বিদ্বেষী শাসকের সাথে আপোস করতে পারেন না।’
    যেকোনো মানুষের বক্তব্যের মুটিভ বুঝতে হলে তাঁর সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকতে হয়। যারা মাহমুদুর রহমান সম্পর্কে জানেন না, তারা অনেক সময় তাঁর বড় বড় কথা শুনে কিংবা আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক তাঁর উপর জেল-জুলুম দেখে আবেগী হয়ে যান এবং ভাবেন, তিনি মনে হয় ইসলামের জন্য মরনেওয়ালা সৈনিক। তিনি নিজেও অত্যন্ত অহংকারের সাথে প্রচার করেন, ‘ইসলামী আদর্শে অবিচল থাকার জন্য আজ পর্যন্ত আমারদেশ পরিবারকে অসহনীয় মূল্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’ কিন্তু কথাটা কি সত্য?
    আমারদেশ, জামায়াত কিংবা বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের সংঘাত কি ইসলামী আদর্শগত কারণে? এখানে তো সংঘাত হলো ক্ষমতা আর পূর্বের একাত্তর ইস্যু। এখানে ইসলাম রাজনৈতিক ঢাল ছাড়া অন্য কোন বিষয় নয়। মাহমুদুর রহমান যতই বলেন না কেন, ‘ইসলামী আদর্শে অবিচলের কথা’, কিন্তু তা ঐতিহাসিক সত্য নয়। এই সত্যটুকু বুঝতে হলে আমারদেশের সাথে কিংবা মাহমুদুর রহমানের সাথে আওয়ামী লীগের সংঘাতের মূল জায়গায় যেতে হবে। এখানে আমাদেরকে একটু পিছনে গিয়ে মাহমুদুর রহমান সম্পর্কে জানতে হবে।
    মাহমুদুর রহমান একজন প্রকৌশলী। চাকুরি করতেন বৃটিশ গ্যাস কোম্পানি অক্সিজেন-এ। চাকুরি শুরু করেছিলেন অপারেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। বৃটিশ কোম্পানিতে দেশের গ্যাস পলিসি বিক্রি করে প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। তিনি যখন খালেদা জিয়ার জ্বালানী উপদেষ্টা, তখন কি বিদেশী দুর্নীতিবাজ কোম্পানী নাইকো সুনামগঞ্জের টেংরা টিলার গ্যাস খনিতে বিস্ফুরণ ঘটিয়ে এদেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি করেনি?
    আমরা জানি, মাহমুদুর রহমান মুন্নু সিরামিক, ডাকান ব্রাদার্স, বেক্সিকো গ্রুপ, পদ্মা টেক্সটাইল-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। জাপানের সুনাতের সহিত কাজ করেছেন। অর্থ আত্মসাতের কারণে বেক্সিমকো গ্রুপের শাইনপুকুর সিরামিকস থেকে তাকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি তাঁর শ্বশুর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেকমন্ত্রী হারুন-অর-রশীদ খান মুন্নুর মালিকানাধীন মুন্নু সিরামিকস কোম্পানিতে যোগ দেন। হারুন-অর-রশীদ খান মুন্নুর বিরুদ্ধেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজাকারীর অভিযোগ রয়েছে। মাহমুদুর রহমানকে মন্নু সিরামিকের বিলিয়ন ডলার মূল্যের পরিচালক বলে অনেকে উল্লেখ করেন। পরে তাঁর মন্নু সিরামিকের সাথে টাকা নিয়ে ঝামেলা হলে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে কিছুদিন বিদেশ ছিলেন। দেশে ফিরেন ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আর্টিসান সিরামিক লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন, যা সিরামিকে দেশের প্রথম প্রযুক্তিগত ‘ব্রেক থ্রো’ ও চীনা বোন কারখানা ছিল। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি তা বিক্রি করে দেন।
    মাহমুদুর রহমানের সাথে এক সময় তারেক জিয়ার ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। এই সম্পর্ক গড়তে বিএনপির ভেতরের জামায়াতি লবি বেশি কাজ করে। জামায়াতের সাথে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁর বাবা ছিলেন কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার পাঁচগাছিয়া (বর্তমান দৌলতপুর) ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান লতিফ মিয়াজী। যিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সংগঠন শান্তি কমিটির সদস্য।
    ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর রাতে পুলিশসহ জনপ্রশাসনের বেশ ক’জন কর্মকর্তাকে নিয়ে মাহমুদুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত অফিসে গোপন বৈঠকে বসেন। খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে গেলে বৈঠকে যোগ দেওয়া অনেক কর্মকর্তা মুখ ঢেকে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত জোটকে আবারো ক্ষমতায় বসাতেই ওই গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন মাহমুদুর রহমান। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোড়িত, সমালোচিত হয়।
    ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি নেতা মুসাদ্দেক হোসেন ফালু যখন দৈনিক আমারদেশ পত্রিকা নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন জামায়াতি একটি গ্রুপ এখানে টাকা বিনোয়োগ করে তাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত বন্ধু প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের মাধ্যমে। সাংবাদিকতায় তাঁর পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি হয়ে গেলেন পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। জামায়াত-বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের মদদে আমারদেশ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি রাতারাতি হয়ে উঠেন বিশাল বুদ্ধিজীবী।
    বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মাহমুদুর রহামন বঙ্গবন্ধু হত্যার মুল হোতা খন্দকার মোস্তাকের সম্পর্কে ভাগিনা হন। এখন প্রশ্ন, যার বাবা লতিফ মিয়াজী, শশুড় হারুন অর রশীদ খান মুন্নুর মতো রাজাকার, যার মামা খন্দকার মোশতাকের মতো ব্যক্তি, যিনি নিজেও বিএনপি সকরারের মন্ত্রী ছিলেন এবং জামায়াতের পঞ্চাশভাগ অর্থ বিনিয়োগকৃত পত্রিকা আমারদেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, তিনি কেন নাখোশ হবেন না শেখ হাসিনা যদি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম কোনো দিনই তাদের শত্রু ছিল না’? কারণ, হেফাজতে ইসলাম তো মাহমুদুরদের একটা ভোট ব্যাংক ছিলো, সেই ব্যাংক ভেঙে যাচ্ছে দেখে মাহমুদুর রহমানের মাথা খারাপ না হলে কার হবে? তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছেন; ‘বাংলাদেশে তাবৎ সেক্যুলার ইসলাম বিদ্বেষীদের একচ্ছত্র নেতা’। আচ্ছা, ইসলামী ফকিহরা বিচার করুন তো, শরিয়তের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপি আর আওয়ামী লীগে ব্যবধান কী? মাহমুদুর রহমানের প্রিয় দল বিএনপি কি সেক্যুলার নয়? তারা তো বারবার ক্ষমতায় এসেছে, একবারও কি ইসলামী হুকুমত কিংবা ইসলামী একটি আইন বাস্তবায়ন করেছে?
    কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির জন্য বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক চার দলীয় জোটে থাকার পরও কি রাজধানীর মুক্তাঙ্গণে অনশন করেননি? বিএনপি স্বীকৃতি দিলো না কাদের অশুভ ইঙ্গিতে? কোথায় ছিলেন সেদিন মাহমুদুর রহমান গং? মাহমুদুর রহমান প্রশ্ন করেছেন, হেফাজতের আন্দোলন কি সনদপ্রাপ্তির দাবীতে হয়েছিল?’ উত্তরে আমাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে, ১৩ দফার মধ্যে এটা ছিলো না সত্য, তবে হেফাজতের সদস্যদের একটি প্রাণের দাবী ছিলো কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি।
    মাহমুদুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলেছেন। অতপর প্রশ্ন করেছেন, ‘আলেমদের রক্তে যে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর হাত রঞ্জিত, তার কাছ থেকে সনদ কিংবা মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ অবশ্যই ইসলামের বাণীর পরিপন্থী।’ আমাদের প্রশ্ন মাহমুদুর রহমান যে যে কারণে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলে চিহ্নিত করেছেন, সেই কারণগুলো কি আমাদের সামনে বিএনপি সরকারের সময় নেই? বাবরি মসজিদ ভাঙার পর শায়খুল হাদিসের ডাকা লংমার্চে গুলি করে কোন সরকার মুসল্লি বা আলেমদেরকে হত্যা করেছিলো? সেই সরকার কি বিএনপি সরকার নয়? শায়খুল হাদিসসহ অসংখ্য আলেমদেরকে কোন সরকার দীর্ঘ দিন জেলে রেখে ছিলো? কোন সরকারের সময় জেলের গেইটে বোখারী শরিফ হাতে নিয়ে আলেমরা অনশন করে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে জেল থেকে বের করে এনেছিলো? জিজ্ঞাসা করুন, মাদরাসাগুলোতে গিয়ে কোন সরকারের সময় কওমি মাদরাসাগুলো এবং আলেম-উলামা বেশি গোয়েন্দা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন? অবশ্যই বিএনপি সরকারের আমলে। এদেশের আলেম সমাজ এগুলো আজও ভুলেননি। তবু বৃহত্তর স্বার্থে কিংবা রাজনৈতিক কারণে তারা বিএনপির সাথে জোট বেঁধেছেন। আলেমদের কিংবা মাদরাসার হিসাবে বিএনপিও ভাইয়ের হত্যাকারী, তা ঐতিহাসিক সত্য।
    মাহমুদুর রহমান, আপনার অর্থের খবর আর উৎস তো এদেশের মানুষের জানা আছে। অবশ্যই আল্লামা শফী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা অথবা ডিজিএফআই এর কাছ থেকে ব্যািক্তগত কোন স্বার্থ হাসিল করেননি। তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থে, শিক্ষার স্বার্থে, কওমি মাদরাসাগুলোর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দাওয়াত গ্রহণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর যাই করুন, কওমির আলেমদের সাথে করা ওয়াদা রক্ষা করেছেন, যা রক্ষা করতে পারেননি বেগম জিয়া কিংবা তাঁর নেতৃত্বাধীন জামায়াত-বিএনপি সরকার। আলেমরা যদি এখন শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা করেন তবে অবশ্যই তা অন্যায় নয়।

    Facebook Comments



    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম