• শিরোনাম


    মানবিক সংকটে একজন ড. সালেহা কাদের

    আলিশা আরিয়ান : অতিথি লেখক | ১২ জুন ২০২০ | ৮:১৯ অপরাহ্ণ

    মানবিক সংকটে একজন  ড. সালেহা কাদের

    বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস এখন মানুষের অভিন্ন শত্রু। এই ভাইরাস গত পাঁচ মাসে বিশ্ববাসী কে অতিষ্ঠ করে তুলেছে, কেড়ে নিয়েছে লাখো লাখো প্রাণ। চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই প্রাণঘাতী ভাইরাস এখন দুনিয়াজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। ধনী-গরীব, রাজা- প্রজা সকলের মাঝে নিরবে ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। একবিংশ শতাব্দীর এই পৃথিবীতে চিকিৎসাশাস্ত্রের চরম উৎকর্ষতার যুগে, প্রযুক্তির বিপ্লবের লগ্নে, একটি অনুজীব পৃথিবীর সমস্ত মানুষের প্রাণনাশের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ। এ ভাইরাসের মরণ-ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি প্রিয় মাতৃভূমি। গ্রামে-গ্রামে, অঞ্চলে-অঞ্চলে পরিবার-পরিজনদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য বিধি অনুযায়ী যাকে বলা হয় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এই ভাইরাসের মারণঘাতী শক্তি মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বন্ধন ও ভাতৃত্বের আর মাতৃত্বের জীবনধারণেও চিড় ধরাতে পেরেছে। অর্থাৎ যদি আরেকটু সহজ করে বলি সেটি হচ্ছে ভাইরাস সন্দেহে পরিবার-পরিজনদের মধ্যে আতঙ্ক এবং দূরত্ব প্রতীয়মান হয়েছে।



    অনেকেই প্রিয়জনের কবরে দিতে পারে না মমতায় ভরা মাটির শেষ টুকরাটাও। পৃথিবীতে বিদ্যমান সব ধর্মের স্ব-স্ব রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর পর সম্মানজনক শেষকৃত্যর বিধান আছে। কিন্তু দুনিয়াতে এ কেমন মৃত্যুর বিধান এলো যে, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায় না। মানুষ মানুষকে ফেলে চলে যায়। এটা এমন এক মৃত্যু যেখানে প্রিয়জন কাছে আসেনা। মৃতদেহ মেঝেতে পড়ে থাকে। সিঁড়িতে পড়ে থাকে প্রিয়জনের নিথর মরদেহখানি। আপনজন ভয়ে দূরে চলে যায়। কেউ লাশ নিতে আসে না। হাসপাতালে, রাস্তায় লাশ ফেলে চলে যায়। এগিয়ে আসে না নিজ স্বামী, স্ত্রী, পিতা, পুত্র, কন্যা বা কোনো আত্মীয়স্বজন। সুনামগঞ্জে অন্য জেলা থেকে আসা গার্মেন্টসকর্মীর বাড়িতে যাওয়ায় করোনা হয়েছে সন্দেহ করে বৃদ্ধা মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন সন্তানরা। টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা সন্দেহে পঞ্চাশ বছরের একজন নারীকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার স্বামী-সন্তানেরা। পাবনার বেড়া উপজেলার দুর্গম চর চরসাফুল্যা গ্রামে করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় অজ্ঞাত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধকে (৬৫) ফেলে রেখে যায়। গত ২১ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত সন্দেহে নারায়ণগঞ্জ থেকে এনে মাথার চুল কেটে সাভারে এক বৃদ্ধাকে ফেলে পালিয়েছে তার সন্তানরা।

    এই করোনা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমরা কতটা অসহায় আর কতটা নির্মম। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আমাদের মাঝে সুপ্ত মানবিক অনুভূতিগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। সামাজিক দূরত্বের নামে আমরা মানসিক মানবিকবোধ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে ফেলেছি। এছাড়াও স্বামী স্ত্রী করোনা সন্দেহে দূরত্ব,এমনকি শেষ যাত্রায় সঙ্গে থাকছে না আপনজনরা। অবিশ্বাসে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই ভাইরাসের রাজত্বের কারণে পৃথিবীর অর্থনীতি থমকে গেছে। পৃথিবীর বড় বড় নামজাদা কোলাহলপূর্ণ রাতজাগা শহরগুলো এখন ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। পৃথিবীর রাজধানী নিউইয়র্ক, যেখানে রাতদিন লাখো লাখো মানুষের ভিড়, এখন সেখানে নিয়ন বাতির পরিবর্তে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা আর স্বজন হারানোর করুণ সুর। আলোহীন আলেয়ার মতো এই তিলোত্তমা শহর ঢাকার নিভে গেছে আলো জলমলে বাতি। ভূতুরে বাতিগুলো জ্বলছে মিটমিট করে। কোলাহল পূর্ণ শহরগুলো লাশের শহর এখন আতঙ্কে রূপ নিয়েছে।

    সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর জীবন হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। যেন পেটের ক্ষুধা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। এই মানবিক সংকটে দেশের প্রায় কয়েক কোটি মানুষ খাবারের সংকটের জন্য ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। সাহায্য-সহযোগিতার জন্য সামর্থ্যবান বিত্তবানদের কাছে যেতে হচ্ছে। সরকার দেশের প্রায় চার কোটি মানুষকে দফায় দফায় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। ৫০ লক্ষ মানুষকে মোবাইলে অ্যাপস এর মাধ্যমে টাকা পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রাতদিন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। নিতান্তই আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে,এদেশে বিত্তবানদের চেয়ে মোটামুটি সামর্থ্যবান মানুষদের মানবিকতা ফুটে উঠেছে। যেখানে দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ থেকে শুরু করে রুই কাতলা হাত গুটিয়ে রেখেছিল সেখানে কেবল মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষদের সাহায্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

    আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে দেখেছি, যখন এদেশের ধনকুবের ব্যবসায়ীরা সরকারের প্রণোদনা ঘরে তুলতে ব্যস্ত ছিলেন ঠিক সেই সময় এদেশের পথে-প্রান্তরে অসংখ্য মানুষ নিরবিচ্ছিন্নভাবে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর মানবিক সম্ভাবনাগুলো উঁকি দিয়েছে দারুণভাবে কারণ কোন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এমন মানবিক সংকট মানবসেবা থেকে দূরে থাকতে পারছে না। আমরা যদি কয়েকটি উদাহরণ প্রত্যক্ষ করি তাহলে দেখবো মানুষগুলোর মানবিকতা কতটা প্রশংসনীয়।

    নিজের সঞ্চিত সব অর্থ করোনা দুর্গতদের জন্য করোনা তহবিলে দান করেন ভিক্ষুক নাজিম উদ্দীন। আমরা দেখেছি,বহু শিশু তাদের সঞ্চিত মাটির ব্যাংকের অর্থ ডিসিকে জমা দিয়েছেন। যেখানে প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ ও অবুঝ শিশুরা এ ক্রান্তিকালে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেখানে এদেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা তথা সুবিধাভোগীরা যাদের রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল খুব বেশি, তারা বিভিন্ন শিল্প কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে তালবাহানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনিয়ম শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো অনেক বিষয়ে দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে।

    অন্যদিকে এই সংকট মুহূর্তে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় উপজেলায় ছাত্রলীগ কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছেন ।এছাড়াও করোনার এ আতঙ্কজনক সময়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা বিভিন্ন লাশের কবর খনন, কাফনের কাপড় কিনে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে।অতীতের মতোই ছাত্রলীগ জনগণের পাশে দেবদূত হিসেবে কাজ করে চলছে।

    করোনাকারে প্রশাসন, চিকিৎসক, গণমাধ্যম কর্মীরাও করোনা মোকাবিলায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম