• শিরোনাম


    মাতৃভাষার মর্যাদা আমরা কীভাবে রক্ষা করি! -: প্রফেসর ড.মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন

    লেখকঃ প্রফেসর ড.মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১:০০ অপরাহ্ণ

    মাতৃভাষার মর্যাদা আমরা কীভাবে রক্ষা করি!  -: প্রফেসর ড.মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন

    পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা আমাদের জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রতীক। এ ভাষা আমাদের গৌরবের ও অহংকারের। আমাদের পুরো স্বাধীনতার আন্দোলন জুড়ে আমাদের ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের প্রথম ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ভাষা আন্দোলন আমাদের অনেক সাহস যুগিয়েছে, আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস ও সাহস জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হয়েছি।

    পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর একশ’ বছর কোম্পানির শাসন ও একশ’ বছর ব্রিটিশের প্রত্যক্ষ শাসন থেকে ধর্মের ভিত্তিতে দু’টি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। শুধুমাত্র ধর্মগত কারণে ভৌগোলিক সীমারেখায় অনেক দূরে অবস্থান করেও আমরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হই। তারপরও তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদের মেনে নিতে পারেনি। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান সেই স্বাধীনতার পর থেকে। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতার পর পাকিস্তান একটি সংবিধান রচনা করতে পারেনি। জোড়াতালি দিয়ে সংবিধান রচনা করতে সময় লেগেছিল নয় বছর, যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান রচনা করতে আমাদের সময় লেগেছিল মাত্র নয় মাস।



    যে সব কারণে পাকিস্তান সরকার সর্বসম্মতভাবে একটি সংবিধান রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে, সেই বিষয়টি। পাকিস্তানিরা বোকা ভেবে প্রথমত আমাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে চিরতরে বিলীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সংবিধানে উল্লেখ করার পায়তারা করেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা রুখে দেয়। এজন্য দিতে হয়েছিল শহীদ সালাম জব্বার রফিক বরকতের বুকের তাজা রক্ত। পাকিস্তানের সংবিধানে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। বাঙালিরা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনো বাঙালির অধিকারের মূল্যায়ন করবে না। তাই ভাষা আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে এক ধরনের জাতীয়তাবোধ জন্ম লাভ করে। ভাষা আন্দোলনে জয়লাভ এই জাতীয়তাবোধের অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করে।

    পরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালায়। আমাদের একটি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিল। পৃথিবীর বুকে আমরা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারি, সে ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত হয়েছিল।

    বাঙালিরা বীরের জাতি, সহজে হার মানে না। রুখে দাঁড়ায় তাদের সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। আমাদের অধিকারের অমর্যাদা থেকে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

    স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদের অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাস যোগায় আমাদের ভাষা আন্দোলন। পৃথিবীতে আমাদের মত জাতি বিরল, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। প্রমাণ করেছে, বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের অহংকার। আমরা পৃথিবীর অন্যদের থেকে আলাদা।

    কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পর আমরা আরো একটি ভাষা আন্দোলনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। যে স্পৃহা ও যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানি কলোনিয়াল গোষ্ঠী থেকে রক্ষা করা হয়েছিল, যে কারণে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম, আজকে মনে হয় আমরাই আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছি না। আমরা নতুন একটি ভাষাগত উপনিবেশবাদের সম্মুখীন। ভাষার প্রশ্নে আজ আমরা বিভক্ত। আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলিত। আমরাই আমাদের মাতৃভাষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির একটি ভাষায় রূপান্তর করছি। কাগজে-কলমে মাতৃভাষা রক্ষায় অনেক প্রণোদনা দিলেও বাস্তবে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

    বিশ্বায়নের ফলে নব্য ও শংকর সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটে। সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও ভাষাগত হাইব্রিডাইজেশন আমাদের ওপর আবির্ভূত হয়েছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইংরেজি ভাষার প্রতি আমাদের দুর্বলতা দিন দিন বাড়তে থাকে। জাতীয়ভাবে ইংরেজি ভাষার প্রতি কেন জানি অতিরিক্ত দরদ পরিলক্ষিত হয়। ২-৪ লাইন ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারলে যেন জ্ঞানী হওয়া যায়। পুরো জ্ঞান যেন ইংরেজি ভাষার মধ্যেই লুকায়িত। আমাদের মধ্যে এমন এক ধরনের বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে যত বেশি ইংরেজি জানেন, তিনি ততো বেশি জ্ঞানী।

    ইংরেজি জানা দোষের কিছু নয়। এটি অতিরিক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতা। কিন্তু নিজের মাতৃভাষা না জেনে, শুদ্ধভাবে মাতৃভাষার চর্চা না করে ইংরেজি ভাষার চর্চা ও দক্ষতা অর্জন শুধু অন্যায়ই নয়, বড় ধরনের অপরাধও।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম