• শিরোনাম


    বড়দিন বা ক্রিসমাস হযরত ঈসা (আঃ)এর জন্মদিন নয়: এস এম শাহনূর

    | ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

    বড়দিন বা ক্রিসমাস হযরত ঈসা (আঃ)এর জন্মদিন  নয়: এস এম  শাহনূর

    সকল প্রশংসা সমগ্র পৃথিবীর স্রষ্টা -যিনি দয়াবান, করুণাময়, সঠিক পথের পথপ্রদর্শক, যিনি বিচার দিবসের মালিক।শান্তি বর্ষিত হোক আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও প্রেরিত যীশু ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর; তার সঙ্গী-সাথী ও উম্মতের ওপর এবং সকল মানুষের ওপর।

    আজ ২৫ শে ডিসেম্বর বা বড় দিন বা ক্রিসমাস (Christmas)
    খ্রীষ্টানদের এক সম্প্রদায়ের নিকট এই দিনটি স্রষ্টার জন্ম দিন আবার অপর সম্প্রদায়ের নিকট রবের সন্তানের জন্ম দিন হিসেবে পরিচিত।এই দিনটিতে তারা বিভিন্ন রকম উপহার আদান প্রদান, আলোক সজ্জা,বিভিন্ন রকমের খাবার, বিশেষ চা পান,চার্চে গমন ইত্যাদির মাধ্যমে অতিবাহিত করে থাকে।
    ইংরেজী Christmas শব্দটির দুটি অংশ একটি Christ অপরটি mas,
    Christ এটি ঈসা (আঃ) এর একটি উপাধি, আর mas অর্থ জন্ম দিন বা জন্মোৎসব। তাহলে Christmas এর মাধ্যমে ঈসা (আঃ) এর জন্মোৎসব বোঝানো হয়ে থাকে।
    অর্থগত দিক থেকে ক্রীসমাস শব্দটিই একটি শিরকী শব্দ কারণ শব্দটির অর্থ “রবের জন্মদিন বা রবের পুত্রের জন্ম দিন” নাউজু বিল্লাহি মিন জালিক, মহান আল্লাহ এথেকে পুত পবিত্র। আল্লাহর বাণীঃ
    ﻟَﻢْ ﻳَﻠِﺪْ ﻭَﻟَﻢْ ﻳُﻮﻟَﺪْ
    অর্থঃ“তিন কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি“ (সূরা এখলাস -৩)
    অতএব একজন মুসলমানের জন্য এই কথাটি মুখে উচ্চারণ করাই হারাম।



    ইংরেজি খ্রিস্টমাস (Christmas ) শব্দটি ” খ্রিস্টের মাস (উৎসব)” শব্দবন্ধটির যুগ্ম অর্থ থেকে উৎসারিত। শব্দটির বুৎপত্তি ঘটে মধ্য ইংরেজি Christemasse ও আদি ইংরেজি Cristes maesse শব্দ থেকে। শেষোক্ত শব্দটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৩৮ সালের একটি রচনায়। “Cristes” শব্দটি আবার গ্রিক Christos এবং “mæsse” শব্দটি লাতিন missa (পবিত্র উৎসব) শব্দ থেকে উদগত। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Χ (চি) হল Christ বা খ্রিষ্ট শব্দের প্রথম অক্ষর। এই অক্ষরটি লাতিন অক্ষর X -এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তাই এই অক্ষরটি খ্রিষ্ট শব্দের নামসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়।
    [২] এই কারণে খ্রিষ্টমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস কথাটি চালু হয়।
    আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধানে যিশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসব উৎসবটিকে বাংলায় বড়দিন আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: “২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড়ো এবং রাত ছোটো হতে আরম্ভ করে”। [৩]

    ➤হযরত ঈসা আঃ এর বিভিন্ন নাম ও উপাধি
    মসীহ্‌ বলতে কি বোঝায়?

    প্রথমে ‘মসীহ্‌’ শব্দটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেটা আসলে কোন নাম না বরং একটা উপাধি। যেটা ইঞ্জিল, কোরআন এবং আগেকার কিতাবে পাওয়া যায়। ইঞ্জিলে অনেক জায়গায় এটা ঈসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং কোরআনে সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৪৫ এবং আন-নিসা ৪:১৭১ আয়াতে তার এই উপাধি দেখা যায়। “মসীহ্‌” শব্দের অর্থ “মনোনীত” বা “অভিষিক্ত”। আগেকার কিতাবে আল্লাহ্‌ ওয়াদা করেছিলেন যে শয়তানকে পরাজিত করার জন্য এবং শয়তানের কাজকর্ম বন্ধ করে আল্লাহ্‌র রহমত মানব জাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য একজনকে পাঠানো হবে। এই ওয়াদাকৃত ব্যক্তিকে বলা হয়েছে ‘মসীহ্‌’, বা আল্লাহ্‌ মনোনীত ব্যক্তি।

    ‘ঈসা’ নামের অর্থ
    তার দ্বিতীয় নাম “ঈসা” তার মা এবং বিপিতা তাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে সেটা তাদের পছন্দ কর নামও নয় বরং ঈসার জন্মের আগে একজন ফেরেশতা বিবি মরিয়মের কাছে প্রকাশ করেছিলেন যে পাক-রূহের কুদরতীতে যে সন্তান হবে তার নাম “ঈসা” রাখা হবে। এই নাম দেওয়ার কারণ নিয়ে কোন সন্দেহ নাই, কারণ ফেরেশতা এইভাবে বলেছিলেন—

    “তুমি তাঁর নাম ঈসা রাখবে, কারণ তিনি তাঁর লোকদের তাদের গুনাহ্ থেকে নাজাত করবেন।” (মথি ১:২১)

    আল্লাহ্‌র কালামে নবীদের নামের অর্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময়ে আল্লাহ্‌ মানুষকে ডাক দেওয়ার সময়ে তাদের একটি নতুন নাম দিয়েছিলেন – যেমন হযরত ইবরাহিম বা হযরত ইয়াকুব। তাদের নামে তাদের ভূমিকা বা কাজ জানা যায়। যেমন ‘আদম’ মানে ‘মানুষ’, ‘ইবরাহিম’ মানে ‘অনেক জাতির পিতা’, ‘মূসা’ মানে ‘বের করে আনা’ (মিসরের গোলামি থেকে তিনি বনি-ইসরাইল বের করে এনেছিলেন), ইত্যাদি। হযরত ঈসার ক্ষেত্রে, তার নামে তার জীবনের কাজ জানা যায়, কারণ ‘ঈসা’ শব্দ হিব্রু থেকে এসেছে এবং হিব্রুতে এর অর্থ ‘নাজাত করা’ বা ‘নাজাতদাতা’। তাই ‘ঈসা’ এবং ‘মসীহ্‌’ এই দুই নাম যোগ করলে অর্থ হয় “মনোনীত নাজাতদাতা”।

    আল্লাহ্‌র কালাম
    উপরোক্ত দুই নাম যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। কিন্তু ঈসার তৃতীয় নাম আরও বেশী বিস্ময়কর। সেটা “কালিমাতুল্লাহ্‌” বা “আল্লাহ্‌র বাণী”। এই ক্ষেত্রেও ইঞ্জিল এবং কোরআন উভয় কিতাবে এই উপাধি ঈসার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কোরআনে সূরা আলে-‘ইমরান ৩:৩৯,৪৫; সূরা নিসা ৪:১৭১, এবং সূরা মার্‌ইয়াম ১৯:৩৪ আয়াতে এই উপাধি পাওয়া যায়।

    ➤২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন যীশুর জন্ম তারিখ। তারিখটি শুধু খ্রিস্টান বিশ্বেই নয়, পৃথিবীর যে কোনো দেশের, যে কোনো ধর্মমতে মানুষের কাছেই যীশু খ্রিস্টের জন্মদিনের বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে আছে। কিন্তু সত্যসন্ধানী ঐতিহাসিক কিংবা গবেষকদের মধ্যে অথবা বাইবেলের নতুন নিয়মের ইতিহাসে এর কোনো সমর্থন নেই।

    বড় দিনের ইতিহাস সম্বন্ধে merit students encyclopaedia (vol.4,p477-478) বলে:
    “খ্রিস্টান ধর্মের প্রথম দিকে সাধুসন্ত, সহীন এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তাদের জন্মবার্ষিকীর পরিবর্তে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার একটি প্রথা চালু ছিল। জন্মতিথি প্রতিপালন ছিল নীচুজাতের প্রথা। তাই প্রাথমিক যুগের খ্রিস্টান ধর্মবেত্তারা এর প্রতি চরম বিরোধিতা পোষণ করতেন। কিন্তু এরূপ বিরোধিতা সত্বেও ২০০খ্রিস্টাব্দের দিকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনেকেই খ্রিস্টের জন্মদিন উদযাপন করতে শুরু করে।
    যেহেতু যীশুর জন্মের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানা নেই এবং ২০০খ্রিস্টাব্দেও জানা ছিল না, তাই বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায় বিভিন্ন সময়ে যীশুর জন্ম উপলক্ষে ভোজের আয়োজন করতো। ৩৫০ খ্রিস্টাব্দে পোপ প্রথম জুলিয়াস ঘোষণা করলেন যে, যীশুর জন্মের আসল তারিখ হলো ২৫শে ডিসেম্বর। চতুর্থ শতাব্দীর শেষ নাগাদ পশ্চিমের প্রায় সব সম্প্রদায়ই দিনটিকে স্বীকার করে নেয়। পূর্বদেশে জেরুজালেম এবং আর্মেনিয়ার খ্রিস্টান সম্প্রদায় তবুও যীশুর জন্মদিন হিসেবে ৬ জানুয়ারীকে উদযাপনের প্রথা চালু রাখে। বস্তুত ৬ই জানুয়ারী যীশুর অভিসিঞ্চন তিথি। আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের কাছে আজও ঐ দিনটিই হল বড় দিন। পূর্ব দেশীয় আরও কিছু সম্প্রদায়ের মাঝে ৬ জানুয়ারী উদযাপনের প্রথা চালু আছে।

    খ্রিস্টধর্মের উদ্ভবের বহু পূর্বেও ২৫শে ডিসেম্বর একটি বিশেষ ছুটির দিন ছিল। রোমানরা একে অজেয় সূর্যের জন্মদিন বলে জানতো। এই দিনে তারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত দিনের আলোর জন্য ধন্যবাদ জানাত এবাং একে সূর্যের পূনর্জন্ম বলে চিহ্নিত করত। অজেয় সূর্যের জন্মদিনের এই উৎসবটি রোমানদের শীতকালীন মহান উৎসব স্যাটারনালিয়ার অন্তুর্ভূক্ত ছিল। এটি ছিল আদি খ্রিস্টানদের প্রধান শত্র“-মিত্ররা ধর্মের অনুসারীদের বিশিষ্ট ভোজন উৎসবের দিন।

    গোড়ার দিকের খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ২৫শে ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য দিন বলে গ্রহণ করে এই জন্য যে, এতে খ্রিস্টানদের উৎসবকে বর্বরদের উৎসবের স্থলাভিষিক্ত করা যাবে এবং নীচুজাতের বিধর্মীদের দেবতাদের স্থলে পূজোর ধারাকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন না করেও যীশুকে স্থাপন করা যাবে।

    আধুনিক ইউরোপে টিউটোনিক গোত্রের লোকেরাও ডিসেম্বরের শেষে শীতের উৎসব পালন করে। পরবর্তীতে ঐ গোত্র খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে তাদের অনেকগুলো আচার-পদ্ধতি খ্রিস্টানদের উৎসববের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। ”

    Merit students Encyclopaedia Gi gZ the Macmillan family Encyclopaedia (vol.4,p415)

    খ্রিস্টমাস সম্বদ্ধে বলেন:
    “যীশুর জন্মবৃত্তান্তের প্রতি আস্থাবান থাকা সত্বেও চতুর্থ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা এই ঘটনাকে উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করতো না। সম্্রাট আরেলিনের আমলে ২৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে নীচুজাতের লোকদের শীতকালীন অয়নান্ত উৎসবের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানের জন্য ঐ দিনটিকে নির্ধারিত করা হয়। রোমানরা ‘অজেয় সূর্যের দিন’ হিসাবে ২৫শে ডিসেম্বরকে উদযাপন করতো এবং ভোজের আয়োজন করতো পূর্বদেশীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মাঝে ৬ই জানুয়ারী দিনটিকে অয়নান্ত দিন হিসেবে ধরা হতো এবং উৎসবের জন্য প্রাথমিকভাবে ভাল মনে করা হতো। যাহোক, কালক্রমে পশ্চিমারা পূর্বদেশীয়দের ঐ দিনটিকে ‘প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানীদের আগমনের দিন’ হিসেবে ধরে নেয় এবং ভোজের আয়োজন করে উদযাপন করে আর পূবদেশীয়রা পশ্চিমাদের বড়দিনকে উদযাপন করতে শুরু করে। এভাবে পশ্চিমারা বড়দিনের উৎসবকে দু’ভাগে ভাগ করে নিয়ে ২৫শে ডিসেম্বর (যীশুর জন্ম এবং মেষপালকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন) এবং ৬ই জানুয়ারী (প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানীদের প্রতি সম্মান উদযাপন করে।

    মধ্যযুগে এসে ইউরোপে শীতকালীন অয়নান্ত উৎসব খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোর মাঝে চিরস্থায়ী আসন লাভ করে। ইংল্যাণ্ড এবং নিউ ইংল্যাণ্ডের পিউরিটানরা বড়দিন উদযাপন প্রথার বিলোপ সাধনের চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তাদের সে প্রচেষ্টা গণসমর্থন না পাওয়ায় বড়দিনের উৎসব টিকে যায়, আর শিল্প-বিপ্লবের সময় থেকে এর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে বড় দিনের উৎসবটি সত্যিকার বড়দিন থেকে পিছিয়ে নিয়ে যায়। চিরাচরিত খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জী অনুসারে খ্রিস্টের আবির্ভাব-পূর্ব বড় দিন আসলে বার দিন ধরে (২৫শে ডিসেম্বর থেকে ৬ই জানুয়ারী পর্যন্ত) উৎসব পালনের পথ পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করে। ”

    যীশুর জন্ম সম্বন্ধে বাইবেলের নতুন নিয়েমে (লুক লিখিত সুসমাচারে ) বর্ণিত হয়েছে যে “যীশু যেদিন ভুমিষ্ঠ হন, সেদিন ঐ অঞ্চলে (বেৎলেহেমে )মেষ পালকেরা মাঠে অবস্থান করছিল এবং নিজ-নিজ মেষপাল পাহারা দিচ্ছিল” (২:৮)। কিন্তু বেৎলেহেম নগর যে রাজ্যের অন্তর্গত সেই শুষ্ক মরুময় জুডিয়া রাজ্যে ডিসেম্বর মাসের প্রচণ্ড শীতের রাতে রাখালদের পক্ষে মেষপালা পাহারা দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণ তখন তাপমাত্রা এত নীচে নেমে যায় যে বরফ না পড়ে পারে না। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ঐ অঞ্চলে গরমের মৌসুমেই রাতের বেলায় মেষ চরানো হয়ে থাকে। কারণ, দিনের বেলায় প্রচণ্ড রৌদ্র উত্তপ্ত মরুভূমিতে মেষ চরানো কখনও সম্ভব নয়।

    উপরোল্লেখিত লুকের বর্ণনার উপর আলোচনা করতে গিয়ে বিশপ বার্ণস তার Rise of Christianity’ পুস্তকের ৭৯ পৃষ্ঠায় বলেন:…অর্থ, “এমন কোনো সূত্র নেই যার মাধ্যমে ২৫শে ডিসেম্বরকে যীশুর আসল জন্মদিন বলে বিশ্বাস করা যায়। যদি আমরা লূক বর্ণিত জন্ম বৃত্তান্তের প্রতি কোনোরূপ বিশ্বাস স্থাপন করি এবং সেই সূত্রে রাতের বেলায় বেৎলেহেমের নিকট মাঠে মেষপালকদের মেষচারণের কথাকে বিশ্বাস করি, তাহলে অবশ্যই শীতকালে যীশুর জন্ম হয় নি, কারণ পার্বত্য এলাকা জুডিয়ায় রাতের বেলায় তাপমাত্রা এত নিচে নেমে যায় যে, তখন বরফ না পড়ে পারে না। এখানে বিশপ বার্ণস লূকের বর্ণনানুসারে যীশুর জন্ম ২৫শে ডিেিসম্বর তথা শীতকালে হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ লুকের বর্ণনায় আছে যে, যীশুর জন্মকালে মেষপালকেরা রাতের বেলায় তাদের মেষপাল চরাচ্ছিল। কিন্তু জেরুজালেমের পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে রাতের বেলায় এমন শীত নামে যে তখন বরফ পড়ে থাকে এবং বরফ পড়া ওই শীতের রাতে রাখালদের পক্ষে মেষ চরানো কোনোমতেই সম্ভব নয়। এই অভিমত শুধু সাধারণ মানুষদের দ্বারাই নয়, বিশ্বাবিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটেনিকা এবং চেম্নারস এসাইক্লোপিডিয়া’র খ্রিস্টমাস শীষক প্রবন্ধ লেখকদের দ্বারাও সমর্থিত।

    যীশুর জন্ম তারিখ সম্বন্ধে ব্রিটেনিকা বিশ্বকোষ বলে. … অর্থ, খ্রিস্টের জন্মদিন ও বছর সন্তোষজনকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি; কিন্তু গীর্জাধিকাররা ৩৪০ খ্রিস্টাব্দে যখন এই ঘটনার স্মৃতি-তর্পন উদযাপনের স্থির করলেন তখন তারা অতি বিজ্ঞানোচিতভাবে মকরক্রান্তিতে সূর্যের অবস্থান দিনকে নির্ধারণ করে ছিলেন যে, দিনটি তাদের অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ আনন্দোৎসবের দিন হিসেবে জনসাধারণের মাধ্যে পুর্বাহ্নে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। মানব প্রণীত পঞ্জিকার পরিবর্তনের কারণে নক্ষত্র থেকে সূর্যের দূরতম স্থানে অপস্থঅনকালে এবং খ্রিস্টমাসের মধ্যে অল্প কদিনের তফাত হয়।

    (Encyclopaedia 15th edition,vol.5.p.p-642&642A)

    চেম্বার্স এনসাইক্লোপিডিয়া বলে, ……অর্থ. দ্বিতীয় স্থানে মকর-ক্রান্তি সূর্যেও জন্মদিন হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল এবং রোমে ২৪শে ডিসেম্বর সূর্যদেবের জন্মতিথি উপলক্ষে পৌত্তলিক উৎসব পালিত হয়। (খ্রিস্টান ) চার্চ এই জনপ্রিয় প্রচলিত আনন্দোৎসবকে বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে এক আধ্যাত্মিকতার অভিষেক দিয়ে ন্যায়পরায়ণ সূর্যদেবের উৎসব হিসেবে পালন করতে শুরু করে।
    ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে বড় দিন সংখ্যা ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ঢাকার বিশপ জমস লিখেন, চতুর্থ শতাব্দীর আগে ২৫শে ডিসেম্বর প্রভুর জন্মদিন বলে উল্লেখিত হয়নি। … তবে ২৫শে ডিসেম্বার কেন ধার্য করা হলো তা আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। আমাদের পূর্বের তারিখগুলো আসল তারিখ নয় পুনরুত্থান দিন নিস্তার পর্বের তারিখের সাতে মিলে না। ”
    (যীশু খ্রিস্টের অজানা জীবন-৩৫-৩৮)
    মোটকথা কোনোভাবেই প্রমাণ করা যায় না যে ২৫শে ডিসেম্বর যীশু জন্ম দিন। আসুন আমরা জন্ম দিন ছেড়ে যীশুর শিক্ষার উপর আমল করি।
    বাইবেলে এমন কোনো বাক্য নেই যেখানে আপনি পাবেন যে,২৫ ডিসেম্বর যিশু খৃষ্টের জন্ম হয়েছে।”ক্রিসমাস” বা “সান্তা” সম্পর্কে এমনকিছু বাইবেলের কোথাও কোনো আয়াত নেই।বাইবেলে এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে লেখা আছে ঈসা মসিহ হলেন ঈশ্বর।
    ঈশ্বরের খাওয়াদাওয়ার প্রয়োজন হয়না,যিশু খাওয়াদাওয়া করেছে।ঈশ্বরের ঘুমানোর প্রয়োজন নেই,যিশু ঘুমিয়েছে।ঈশ্বরের ইবাদতের প্রয়োজন নেই,যিশু ইবাদত করতেন।ঈশ্বর ইবাদত থেকে স্বাধীন কিন্তু যিশু ইবাদত করতেন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে!স্বয়ং ঈশ্বর কিভাবে নিজেই নিজের ইবাদত করতেন!
    যিশু ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ইবাদত করতেন,মুসলমানরাও তা-ই করে।যিশু রোযা রাখতেন,মুসলমানরাও তা-ই করে।যিশু দাড়ি রাখতেন,মুসলিমরাও দাড়ি রাখে।যিশুর মাতা যাকে খৃষ্টানরা মাতা মেরি বলে মুসলমানরা তাকেও সম্মান করে এবং মরিয়ম তিনিও মুসলমান নারীদের ন্যায় মাথা ঢেকে রাখতেন,ঢোলাঢালা পোশাক পড়তেন।অপরদিকে তথাকথিত খৃষ্টানরা যিশুর কোনো কিছুকেই অনুসরন করেনা!
    আমরা মুসলিমরা প্রত্যেক খৃষ্টান ভাইকে ইসলাম সম্পর্কে আরো জানতে আমন্ত্রন জানাচ্ছি।ইসলাম অন্যকোনো ধর্ম নয়,বরং আপনার আমার প্রভুর মনোনীত একমাত্র গ্রহনযোগ্য ধর্ম।ইসলাম আপনাকে সেই একই বার্তা পৌছায় যা পৌঁছেছেন মুসা (আঃ),যিশু/ঈসা (আঃ) ও ইব্রাহীম (আঃ)।ইসলামের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পন করে দেওয়া’ এবং এটি আমাদেরকে ঈশ্বরের সাথে সরাসরি সম্পর্ক বজায় রাখতে শেখায়। এটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেছেন, কেবলমাত্র ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করা উচিত নয়। এটি এমন একটি শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর মানুষের মতো নয় অথবা এমন কিছু যা আমরা কল্পনা করতে পারি।
    আল্লাহর ধারণাটি কুরআনে যেমন সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে: বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক। আল্লাহ, পরম নির্ভরস্থল।তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কিছুই নেই। {সূরা ইখলাস: ১-৪}

    আর স্মরন করো! মরিয়ম্পুত্র ঈসা বলেছিলেন,-হে ইসরাঈলের বংশধরগণ! আমি নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল,আমার সম্পর্কে তাওরাতে যা রয়েছে আমি তার সমর্থনকারী,আর সুসংবাদ দাতা এমন এক রাসূল সম্পর্কে যিনি আমার পরে আসবেন ,তার নাম আহমদ।তারপর যখন তিনি তাদের কাছে এলেন স্পষ্ট প্রমানাবলীসহ,তারা বললো- এ তো স্পষ্ট জাদু!
    আর তার চাইতে কে বেশি অন্যায়কারী যে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা রচনা করে,অথচ তাকে আহ্বান করা হচ্ছে ইসলামের দিকে?আর আল্লাহ অন্যাকারী জাতিকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।{সূরা আস সাফঃ ৬-৭}

    ➤ঈসা (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য সমূহ :
    (১) তিনি ছিলেন বিনা বাপে পয়দা বিশ্বের একমাত্র নবী (আলে ইমরান ৩/৪৬ প্রভৃতি)।
    (২) আল্লাহ স্বয়ং যার নাম রাখেন মসীহ ঈসা রূপে (আলে ইমরান ৩/৪৫)।
    (৩) তিনি শয়তানের অনিষ্টকারিতা হ’তে মুক্ত ছিলেন (ঐ, ৩/৩৬-৩৭)।
    (৪) দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি ছিলেন মহা সম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর একান্ত প্রিয়জনদের অন্যতম (আলে ইমরান ৩/৪৫)।
    (৫) তিনি মাতৃক্রোড়ে থেকেই সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন (মারিয়াম ১৯/২৭-৩৩; আলে ইমরান ৩/৪৬)।
    (৬) তিনি বনু ইস্রাঈলগণের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন (আলে ইমরান ৩/৪৯) এবং শেষনবী ‘আহমাদ’-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেন (ছফ ৬১/৬)।
    (৭) তাঁর মো‘জেযা সমূহের মধ্যে ছিল- (ক) তিনি মাটির তৈরী পাখিতে ফুঁক দিলেই তা জীবন্ত হয়ে উড়ে যেত (খ) তিনি জন্মান্ধকে চক্ষুষ্মান ও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে পারতেন (গ) তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারতেন (ঘ) তিনি বলে দিতে পারতেন মানুষ বাড়ী থেকে যা খেয়ে আসে এবং যা সে ঘরে সঞ্চিত রেখে আসে (আলে ইমরান ৩/৪৯; মায়েদাহ ৫/১১০)।
    (৮) তিনি আল্লাহর কিতাব ইনজীল প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। তবে তওরাতে হারামকৃত অনেক বিষয়কে তিনি হালাল করেন (আলে ইমরান ৩/৫০)।
    (৯) তিনি ইহুদী চক্রান্তের শিকার হয়ে সরকারী নির্যাতনের সম্মুখীন হন। ফলে আল্লাহ তাঁকে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন (আলে ইমরান ৩/৫২, ৫৪-৫৫; নিসা ৪/১৫৮)। শত্রুরা তাঁরই মত আরেকজনকে সন্দেহ বশে শূলে চড়িয়ে হত্যা করে এবং তারা নিশ্চিতভাবেই ঈসাকে হত্যা করেনি’ (নিসা ৪/১৫৭)। (১০) তিনিই একমাত্র নবী, যাকে আল্লাহ জীবিত অবস্থায় দুনিয়া থেকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে তিনি পুনরায় সশরীরে দুনিয়াতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জাল, ক্রুশ, শূকর প্রভৃতি ধ্বংস করবেন। অতঃপর ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সারা পৃথিবীতে ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী শান্তির রাজ্য কায়েম করবেন।

    ➤তথ্যসূত্রঃ
    ১. ↑পবিত্র কোরআন
    ২. ↑ Oxford English Dictionary
    ৩. ↑ আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ২০০৯, পৃ. ৫৬৪
    ৪. ↑ উইকিপিডিয়া

    💻এস এম শাহনূর
    (উইকিপিডিয়ান, কবি ও গবেষক)

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    নিয়ত অনুসারে নিয়তি ও পরিনতি

    ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম