• শিরোনাম


    ব্যাংক চেক ডিজঅনার: ভুক্তভোগীর আইনি করণীয়

    | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫:০২ অপরাহ্ণ

    ব্যাংক চেক ডিজঅনার: ভুক্তভোগীর আইনি করণীয়

    ব্যাংক লেনদেনের প্রায় গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত চেক। কিন্তু চেক হারিয়ে যাওয়া, চেক ডিজঅনার হওয়া এবং চেক নিয়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে একজন ভুক্তভোগীর আইনি করণীয় কী হতে পারে? এ বিষয়ে সবিস্তারে তুলে ধরেছেন আইন গবেষক ড. শরীফ আব্দুল্লাহ হিস সাকী

     চেক হারিয়ে গেলেঃ চেক হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ব্যাংকের মাধ্যমে চেক স্টপ করাতে হয়। হারানো চেক উদ্ধারের জন্য মামলা করা যায়। চেকের মামলা সংক্রান্ত কিছু সহজ বিষয় না জানার কারণে আমাদের অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কেননা চেকের বিষয়ে আইনে স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকাতে এর বাইরে কিছু করার থাকে না।
    নিয়মানুযায়ী, যে কোনো ব্যাংক প্রদত্ত চেক বই হারিয়ে গেলে বিষয়টি নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করে সেটার সত্যায়িত কপিসহ হিসাবধারী ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংক এর সংশ্লিষ্ট শাখায় উপস্থিত হয়ে একটি নতুন চেক বই ইস্যু করার জন্য লিখিত অনুরোধপত্র দাখিল করবেন। কোনো অবস্থাতেই হারানো চেক বইয়ের পরিবর্তে নতুন চেক বই গ্রাহক ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তির নিকট (হিসাবধারী কর্তৃক লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও) হস্তান্তর করা হয় না। উক্ত অনুরোধপত্রে প্রদত্ত স্বাক্ষর শাখা ব্যবস্থাপক কর্তৃক নিরীক্ষান্তে সঠিক প্রতীয়মান হলে তিনি নিজ স্বাক্ষরে সত্যায়িত করে থাকেন। শাখার কোনো মূল্যবান গ্রাহকের ক্ষেত্রে শাখা ব্যবস্থাপক ব্যক্তিগতভাবে চেক হারানোর বিষয়ে সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলে থানায় জিডি এন্ট্রির এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতির শর্ত শিথিল করা হয়ে থাকে।



     চেক ডিজঅনার হওয়া:
    চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা একাউন্টে না থাকলে ব্যাংকের পক্ষে টাকা দেয়া সম্ভব হয় না এবং চেক প্রত্যাখ্যান করা হয় যা চেক ডিজঅনার হওয়া নামে পরিচিত। চেক ডিজঅনার হওয়া চেকের বাহক একাউন্টধারী নিজে হলে সেটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, একাউন্টধারী অন্য কাউকে চেক লিখে দিলেন এবং সেটি ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হলো তবে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
    অনেকেই মনে করেন, শুধু তহবিল অপর্যাপ্ততা’ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে চেক ডিজঅনার না হয়ে অন্য কোনো কারণে যেমন রেফার টু ড্রয়ার, সিগনেচার ডিফারস, সিগনেচার ইনকমপ্লিট, পেমেন্ট স্টপড বাই ড্রয়ার, অ্যাকাউন্ট ক্লোজড, অ্যাডভাইস নট রিসিভড প্রভৃতি যা চেকদাতার প্রতারণাপূর্ণ মনোভাব প্রমাণ করে, ডিজঅনার হলেও এ ধারার অপরাধ হবে।

     চেক নিয়ে প্রতারিত হলে:
    পাওনাদারের নিকট হতে যদি চেকের মাধ্যমে প্রতারিত হন, তাহলে চাইলেই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এই অপরাধের বিচারের জন্য হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন- ১৮৮১ নামের একটি আইন রয়েছে। এই আইনের ১৩৮/140 নম্বর ধারায় আপনি প্রতারক ব্যক্তি/ কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে পারেন।
    তবে মনে রাখতে হবে, চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে কিছু সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলে আর প্রতিকার পাওয়া যায় না। যেকোনো চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপন না করলে চেকটির কার্যকারিতা আর থাকে না। এক্ষেত্রে মামলা করার কিছু শর্ত রয়েছে।

     আইনি নোটিস ও মামলা:
    চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকের ড্রয়ারকে (চেকদাতা) চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ৩০ দিনের সময় দিয়ে চেকে উল্লিখিত অঙ্কের টাকা প্রদানের দাবি জানিয়ে নির্ধারিত নিয়মে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিস প্রদান করতে হবে। চেকের প্রাপক বা যথানিয়মে ধারক নিজেও ওই নোটিস প্রদান করতে পারে। তবে আইনজীবীর মাধ্যমে করাই ভালো। কোনোভাবেই নোটিস প্রেরণ না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। চেক প্রদানকারী নোটিসপ্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেকের প্রাপক বরাবরে চেকে উল্লিখিত অঙ্কের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যেই মামলা করতে হবে।

    তিন পদ্ধতিতে নোটিস দেওয়া যাবে-

    এক. চেক ইস্যুকারীকে সরাসরি নোটিস প্রদান করে। তবে এক্ষেত্রে নোটিসের অনুলিপিতে প্রাপ্তি স্বীকারস্বরূপ নোটিসগ্রহীতা চেকদাতার স্বাক্ষর রাখতে হবে,
    দুই. নিয়মিত বাসস্থানের ঠিকানায় অথবা বাংলাদেশের যে স্থানে সর্বশেষ বসবাস করেছেন বা ব্যবসা করেছেন, সেই ঠিকানায় রেজিস্টার্ড এডি ডাকযোগে,

    তিন. বহুল প্রচারিত যেকোনো একটি জাতীয় দৈনিক বাংলা পত্রিকায় নোটিস প্রকাশ করে।

     মামলা করার আগে অবশই মনে রাখতে হবে

    • চেকটি ইস্যুর তারিখ থেকে ছয় মাস সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ক্যাশ করার জন্য জমা দিতে হবে।
    • চেক ডিজঅনার হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে একাউন্টধারীকে চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা প্রদানের দাবি জানাতে হয়। আর ত্রিশ দিনের মধ্যে দাবি না জানালে সেটি আইনের দৃষ্টিতে গ্রাহ্য হয় না।
    • সরাসরি প্রাপক বরাবর অথবা তার সর্বশেষ বসবাসের ঠিকানা কিংবা বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক ঠিকানা বরাবর প্রাপ্তি স্বীকারপত্রের ব্যবস্থাসহ রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ পাঠাতে হয়। এছাড়া যদি সম্ভব না হয়,অন্তত একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকে নোটিশটি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হয়। কোনোভাবেই নোটিশ প্রেরণ না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হলে এই আইনের ১৩৮ ধারার পাশাপাশি ১৪০ ধারা উল্লেখ করে মামলা করতে হবে। এ ধরনের নোটিশ জারি ও মামলা করার জন্য আপনি একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে পারেন।

     মামলার প্রক্রিয়া:

    এ ধরনের অভিযোগ নালিশি মামলা বা সিআর মামলা হিসেবে মহানগর এলাকা হলে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অথবা মহানগরের বাইরে হলে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করতে হবে। চেকটি যে ব্যাংকে ডিজঅনার হয়েছে, সেই ব্যাংকের এলাকা যে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে, সেই আদালতে করতে হবে।
    তবে এ অপরাধের মূল বিচার হবে দায়রা আদালতে। দায়রা আদালত ইচ্ছা করলে যুগ্ম দায়রা আদালতে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠাতে পারেন।

    মামলা করার সময় আদালতে মূল চেক, ডিজঅনারের রসিদ, আইনি নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তির কপি, পোস্টাল রসিদ, প্রাপ্তি রসিদ আদালতে প্রদর্শন করতে হবে। এসবের ফটোকপি ফিরিস্তি আকারে মামলার আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হবে ।

    মনে রাখতে হবে, একবার চেক ডিজঅনার হলে একবার অপরাধ সংঘটিত হয়। কোনো কারণে যদি প্রথমবার চেকটি ডিজঅনার হওয়ার পর ৩০দিনের মধ্যে নোটিশ না পাঠাতে পারেন, তাহলে দ্বিতীয়বার চেকটি ডিজঅনার করাতে পারেন। এভাবে একাধিকবার ডিজঅনার করিয়ে নোটিশ পাঠাতে পারেন। তবে চেক ডিজঅনার হলে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা করা হলে এক অপরাধের জন্য বারবার মামলা করা যাবে না।

     চেক ডিজঅনার অপরাধের শাস্তি:
    চেক ডিজঅনার অপরাধের শাস্তি হচ্ছে, এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিন গুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ আছে। তবে আপিল করার পূর্বশর্ত হচ্ছে, চেকে উল্লেখিত টাকার কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ যেআদালত দণ্ড প্রদান করেছেন, সেই আদালতে জমা দিতে হবে। একাউন্টধারী চেকে উল্লিখিত অর্থের ৫০ ভাগ পরিশোধ করতে সক্ষম না হলে আপিল করা যায় না।
    চেকের গ্রহীতা বা ধারক চেকে বর্ণিত সম্পূর্ণ বা আংশিক অনাদায়ী টাকা আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা (মানি স্যুট) করতে পারবেন। তবে চেকের গ্রহীতা বা ধারক চাইলে এনআই অ্যাক্টে মামলা চলাকালে বা এনআই অ্যাক্টে মামলা করার আগে-পরেও মানি স্যুট করা যাবে। কারণ দুই আদালতের মামলাই স্বতন্ত্রভাবে পাশাপাশি চলতে পারে। তবে সর্বশেষ ডিজঅনারের তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে মানি স্যুট করতে হবে।

     চেক নিয়ে প্রতারিত হয়ে যথাসময়ে মামলা করতে না পারলে:
    নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে মামলা দায়ের করতে না পারলে দণ্ডবিধির ৪০৬ এবং ৪২০ ধারা অনুসারে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা যায়। তবে এক্ষেত্রে টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। দোষী সাব্যস্ত হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।

     মৃত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে মামলা:
    কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার শাস্তি হওয়ার সুযোগ নেই । তবে চেকের টাকা অবশ্যই তার সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে । ২৩বিএলসি(২০১৮)২৪৭

     চেক ডিজঅনারের শাস্তি আরো কঠোর হচ্ছে:
    চেক ডিজঅনারের মামলায় নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। (১৫ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে বিনিময়যোগ্য দলিল আইন, ২০২০ এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্টে চেক ডিজঅনারের মামলায় এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট যে পরিমাণ টাকা উল্লেখ করা হয় তার তিনগুণ জরিমানা করা হয়। অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। নতুন আইনে অপরাধীকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে লিখিত অর্থের চারগুণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।

    বিশিষ্ট আইন গবেষক মানবাধিকার কর্মী

    চেক ডিজঅর্নার মামলা আরো কঠোর হচ্ছে :
    ব্যাংক লেনদেনের প্রায় গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত চেক। কিন্তু চেক হারিয়ে যাওয়া, চেক ডিজঅনার হওয়া এবং চেক নিয়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে একজন ভুক্তভোগীর আইনি করণীয় কী হতে পারে?

     চেক হারিয়ে গেলেঃ চেক হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে ব্যাংকের মাধ্যমে চেক স্টপ করাতে হয়। হারানো চেক উদ্ধারের জন্য মামলা করা যায়। চেকের মামলা সংক্রান্ত কিছু সহজ বিষয় না জানার কারণে আমাদের অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কেননা চেকের বিষয়ে আইনে স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকাতে এর বাইরে কিছু করার থাকে না।
    নিয়মানুযায়ী, যে কোনো ব্যাংক প্রদত্ত চেক বই হারিয়ে গেলে বিষয়টি নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করে সেটার সত্যায়িত কপিসহ হিসাবধারী ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংক এর সংশ্লিষ্ট শাখায় উপস্থিত হয়ে একটি নতুন চেক বই ইস্যু করার জন্য লিখিত অনুরোধপত্র দাখিল করবেন। কোনো অবস্থাতেই হারানো চেক বইয়ের পরিবর্তে নতুন চেক বই গ্রাহক ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তির নিকট (হিসাবধারী কর্তৃক লিখিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও) হস্তান্তর করা হয় না। উক্ত অনুরোধপত্রে প্রদত্ত স্বাক্ষর শাখা ব্যবস্থাপক কর্তৃক নিরীক্ষান্তে সঠিক প্রতীয়মান হলে তিনি নিজ স্বাক্ষরে সত্যায়িত করে থাকেন। শাখার কোনো মূল্যবান গ্রাহকের ক্ষেত্রে শাখা ব্যবস্থাপক ব্যক্তিগতভাবে চেক হারানোর বিষয়ে সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলে থানায় জিডি এন্ট্রির এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতির শর্ত শিথিল করা হয়ে থাকে।

     চেক ডিজঅনার হওয়া:
    চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা একাউন্টে না থাকলে ব্যাংকের পক্ষে টাকা দেয়া সম্ভব হয় না এবং চেক প্রত্যাখ্যান করা হয় যা চেক ডিজঅনার হওয়া নামে পরিচিত। চেক ডিজঅনার হওয়া চেকের বাহক একাউন্টধারী নিজে হলে সেটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, একাউন্টধারী অন্য কাউকে চেক লিখে দিলেন এবং সেটি ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হলো তবে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
    অনেকেই মনে করেন, শুধু তহবিল অপর্যাপ্ততা’ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে চেক ডিজঅনার না হয়ে অন্য কোনো কারণে যেমন রেফার টু ড্রয়ার, সিগনেচার ডিফারস, সিগনেচার ইনকমপ্লিট, পেমেন্ট স্টপড বাই ড্রয়ার, অ্যাকাউন্ট ক্লোজড, অ্যাডভাইস নট রিসিভড প্রভৃতি যা চেকদাতার প্রতারণাপূর্ণ মনোভাব প্রমাণ করে, ডিজঅনার হলেও এ ধারার অপরাধ হবে।

     চেক নিয়ে প্রতারিত হলে:
    পাওনাদারের নিকট হতে যদি চেকের মাধ্যমে প্রতারিত হন, তাহলে চাইলেই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এই অপরাধের বিচারের জন্য হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন- ১৮৮১ নামের একটি আইন রয়েছে। এই আইনের ১৩৮/140 নম্বর ধারায় আপনি প্রতারক ব্যক্তি/ কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে পারেন।
    তবে মনে রাখতে হবে, চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে কিছু সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলে আর প্রতিকার পাওয়া যায় না। যেকোনো চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপন না করলে চেকটির কার্যকারিতা আর থাকে না। এক্ষেত্রে মামলা করার কিছু শর্ত রয়েছে।

     আইনি নোটিস ও মামলা:
    চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেকের ড্রয়ারকে (চেকদাতা) চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ৩০ দিনের সময় দিয়ে চেকে উল্লিখিত অঙ্কের টাকা প্রদানের দাবি জানিয়ে নির্ধারিত নিয়মে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিস প্রদান করতে হবে। চেকের প্রাপক বা যথানিয়মে ধারক নিজেও ওই নোটিস প্রদান করতে পারে। তবে আইনজীবীর মাধ্যমে করাই ভালো। কোনোভাবেই নোটিস প্রেরণ না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। চেক প্রদানকারী নোটিসপ্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেকের প্রাপক বরাবরে চেকে উল্লিখিত অঙ্কের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যেই মামলা করতে হবে।

    তিন পদ্ধতিতে নোটিস দেওয়া যাবে-

    এক. চেক ইস্যুকারীকে সরাসরি নোটিস প্রদান করে। তবে এক্ষেত্রে নোটিসের অনুলিপিতে প্রাপ্তি স্বীকারস্বরূপ নোটিসগ্রহীতা চেকদাতার স্বাক্ষর রাখতে হবে,
    দুই. নিয়মিত বাসস্থানের ঠিকানায় অথবা বাংলাদেশের যে স্থানে সর্বশেষ বসবাস করেছেন বা ব্যবসা করেছেন, সেই ঠিকানায় রেজিস্টার্ড এডি ডাকযোগে,

    তিন. বহুল প্রচারিত যেকোনো একটি জাতীয় দৈনিক বাংলা পত্রিকায় নোটিস প্রকাশ করে।

     মামলা করার আগে অবশই মনে রাখতে হবে

    • চেকটি ইস্যুর তারিখ থেকে ছয় মাস সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ক্যাশ করার জন্য জমা দিতে হবে।
    • চেক ডিজঅনার হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে একাউন্টধারীকে চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা প্রদানের দাবি জানাতে হয়। আর ত্রিশ দিনের মধ্যে দাবি না জানালে সেটি আইনের দৃষ্টিতে গ্রাহ্য হয় না।
    • সরাসরি প্রাপক বরাবর অথবা তার সর্বশেষ বসবাসের ঠিকানা কিংবা বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক ঠিকানা বরাবর প্রাপ্তি স্বীকারপত্রের ব্যবস্থাসহ রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ পাঠাতে হয়। এছাড়া যদি সম্ভব না হয়,অন্তত একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকে নোটিশটি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হয়। কোনোভাবেই নোটিশ প্রেরণ না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হলে এই আইনের ১৩৮ ধারার পাশাপাশি ১৪০ ধারা উল্লেখ করে মামলা করতে হবে। এ ধরনের নোটিশ জারি ও মামলা করার জন্য আপনি একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে পারেন।

     মামলার প্রক্রিয়া:

    এ ধরনের অভিযোগ নালিশি মামলা বা সিআর মামলা হিসেবে মহানগর এলাকা হলে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অথবা মহানগরের বাইরে হলে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করতে হবে। চেকটি যে ব্যাংকে ডিজঅনার হয়েছে, সেই ব্যাংকের এলাকা যে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে, সেই আদালতে করতে হবে।
    তবে এ অপরাধের মূল বিচার হবে দায়রা আদালতে। দায়রা আদালত ইচ্ছা করলে যুগ্ম দায়রা আদালতে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠাতে পারেন।

    মামলা করার সময় আদালতে মূল চেক, ডিজঅনারের রসিদ, আইনি নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তির কপি, পোস্টাল রসিদ, প্রাপ্তি রসিদ আদালতে প্রদর্শন করতে হবে। এসবের ফটোকপি ফিরিস্তি আকারে মামলার আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হবে ।

    মনে রাখতে হবে, একবার চেক ডিজঅনার হলে একবার অপরাধ সংঘটিত হয়। কোনো কারণে যদি প্রথমবার চেকটি ডিজঅনার হওয়ার পর ৩০দিনের মধ্যে নোটিশ না পাঠাতে পারেন, তাহলে দ্বিতীয়বার চেকটি ডিজঅনার করাতে পারেন। এভাবে একাধিকবার ডিজঅনার করিয়ে নোটিশ পাঠাতে পারেন। তবে চেক ডিজঅনার হলে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা করা হলে এক অপরাধের জন্য বারবার মামলা করা যাবে না।

     চেক ডিজঅনার অপরাধের শাস্তি:
    চেক ডিজঅনার অপরাধের শাস্তি হচ্ছে, এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিন গুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ আছে। তবে আপিল করার পূর্বশর্ত হচ্ছে, চেকে উল্লেখিত টাকার কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ যেআদালত দণ্ড প্রদান করেছেন, সেই আদালতে জমা দিতে হবে। একাউন্টধারী চেকে উল্লিখিত অর্থের ৫০ ভাগ পরিশোধ করতে সক্ষম না হলে আপিল করা যায় না।
    চেকের গ্রহীতা বা ধারক চেকে বর্ণিত সম্পূর্ণ বা আংশিক অনাদায়ী টাকা আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা (মানি স্যুট) করতে পারবেন। তবে চেকের গ্রহীতা বা ধারক চাইলে এনআই অ্যাক্টে মামলা চলাকালে বা এনআই অ্যাক্টে মামলা করার আগে-পরেও মানি স্যুট করা যাবে। কারণ দুই আদালতের মামলাই স্বতন্ত্রভাবে পাশাপাশি চলতে পারে। তবে সর্বশেষ ডিজঅনারের তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে মানি স্যুট করতে হবে।

     চেক নিয়ে প্রতারিত হয়ে যথাসময়ে মামলা করতে না পারলে:
    নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে মামলা দায়ের করতে না পারলে দণ্ডবিধির ৪০৬ এবং ৪২০ ধারা অনুসারে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা যায়। তবে এক্ষেত্রে টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। দোষী সাব্যস্ত হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।

     মৃত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে মামলা:
    কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার শাস্তি হওয়ার সুযোগ নেই । তবে চেকের টাকা অবশ্যই তার সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে । ২৩বিএলসি(২০১৮)২৪৭

     চেক ডিজঅনারের শাস্তি আরো কঠোর হচ্ছে:
    চেক ডিজঅনারের মামলায় নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। (১৫ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে বিনিময়যোগ্য দলিল আইন, ২০২০ এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্টে চেক ডিজঅনারের মামলায় এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট যে পরিমাণ টাকা উল্লেখ করা হয় তার তিনগুণ জরিমানা করা হয়। অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। নতুন আইনে অপরাধীকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে লিখিত অর্থের চারগুণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।

    💻লেখক: ডক্টর আলহাজ্ব শরীফ সাকী

    বিশিষ্ট আইন গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৯ অক্টোবর ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম