• শিরোনাম


    “ব্যবসা” (গল্পেগল্পে ধর্মানুভতি -২) -ম. কাজী এনাম

    | ১০ মার্চ ২০১৯ | ১:০৩ অপরাহ্ণ

    “ব্যবসা” (গল্পেগল্পে ধর্মানুভতি -২) -ম. কাজী এনাম

    আচ্ছা জনাব আসাদুজ্জামান সাহেব, একটা কথা ক্লিয়ার করে বলেন তো, ব্যবসায় দুই নাম্বারি করে আপনি কতটুকো সুখ পান? তাছাড়া এতো টাকার পাহাড় গড়েই বা জীবনে কি করবেন??
    আসাদুজ্জামান আমার দিকে কাঁচুমাচু হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। হয়তবা হুজুর ভেবে বসে আছে যে, বর্তমান সময়ের সম্পর্কে আমি একদমই বেওয়াকিফহাল। টাকার পাহাড় চাই না এমন লোক বর্তমান যামানায় বিরল। হয়তবা বিলুপ্তির পথে দুনিয়াবিমুখ শ্রেণির মানুষ।
    কিছুক্ষণ পর নিরবতার দেয়াল ভেঙ্গে শহরের বিশিষ্ট আড়ৎদার আসাদুজ্জামান খান আমাকে বললেন, বাবা তোমার জন্মকর্ম আমার সব কিছুই দেখা। দুনিয়ায় এসেছো বেশিদিন হয় নাই, বয়স হলে বুঝবে! টাকাই দুনিয়ার সব। টাকা নাই ত তোমার অস্তিত্ব দুনিয়ায় নাই। যশ-ক্ষমতা যা দেখছো না? সবই টাকার কাছে জিম্মি!
    পরিবার, সমাজ, দেশ-জাতি এমন কি ধর্মীয় প্রতিষ্টানগুলোও আজকাল টাকার কাছে নত-অবনত!

    বাস্তবিক উপাখ্যানের শত আবরণ মেশানো টাকার বেশ কিছু কথা শুনবার পর মনেমনে মেনে নিলাম। অতঃপর বলতে শুরু করলাম, আচ্ছা? তাই বলে কি একজন মুসলিম হয়ে বাছবিচারহীন ইনকাম করতেই থাকবেন? জনগণের উৎপাদিত ফসল মৌজুদ, ফরমালিন মিক্সড, কালোবাজারি, ওজনে কম দেয়া, এসব তো ইসলামে কঠিনভাবে নিষেধ আছে! আপনি জানেন না??
    উনি বলেন, আরে বাবা; তুমি এতসব বুঝবেনা!



    আমি এবার সরাসরি হাদিসের দিকে ছুটিলাম ; আংকেল একটা হাদিস বলি শুনুন! রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
    হাশরের ময়দানে যে পাঁচটি প্রশ্নের জাওয়াব না দেয়া
    পর্যন্ত কোনো আদম সন্তান এক ক্বদম (পা) অগ্রসর হতে
    পারবে না, সে প্রশ্ন পাঁচটি হচ্ছে;
    এক. সে তার বয়সগুলি কিভাবে
    অতিবাহিত করেছে।
    দুই. সে তার যৌবনকাল কোন কাজে ব্যয়
    করেছে।
    তিন. সে তার ধন-সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে।
    চার. সে তার ধন সম্পদগুলি কোন পথে ব্যয় করেছে। পাঁচ. সে যে ইলম অর্জন করেছে, সে অনুযায়ী আমল করেছে
    কি না?
    এই পাঁচটি প্রশ্নের জাওয়াব না দেয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি
    হাশরের ময়দানে এক ক্বদম অগ্রসর হতে পারবে না।

    আসাদুজ্জামান খান সাহেব নিরব। কি যেন ভাবছেন। উনার ভাবনার জগতে আবার আমি হানা দিলাম; পবিত্র আল-কুরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, ওজনে কম দাতারা ওয়াইল নামন দোযখে যাবে(যা কঠিন একটা আযাবের জায়গা)! ওজনে কম দেয়ার আরেকটা অর্থ আছে, হাশরের দিন বান্দার হক মারবার জন্য ওকে আপনি নেকি দিতে হবে। অথবা নেকি না থাকলে সমপরিমাণ গুনাহ নিয়ে সেই ঋনদারের পাওনা আদায় করতে হবে। ওজনে কম, মালে ভেজাল, কালোবাজারি, অবৈধ মৌজুদ, রাষ্ট্রীয় টেক্সট ও শুল্কহীন ব্যবসা এ সব দ্বারাই কিন্তু আপনি কাউকে-না কাউকে ঠকাচ্ছেন! এ সবের বিচার একদিন আপনাকে কড়ায়গণ্ডায় গুনতে হবে। মনে রাখবেন, সেদিন কেউ কারো কোন উপকারে আসবেনা। নিজের জবাব নিজেই দিতে হবে। আজকে যারা আপনার অঢেল সম্পদের অংশিদার হবার আশায় আপনার মৃত্যুর অপেক্ষা করতেছে, সেই তারা কেহই কিন্তু গুনাহের অংশ নিতে এগিয়ে আসবেনা। ভূলের সুখ সবাই চাই, মাশুল নিতে কেহই রাজি নয়।

    আসাদুজ্জামান খান তন্ময় হয়ে কি যেন ভাবছিলেন, হুট করেই বললেন; আমি যদি সেসব অর্থ দিয়ে দ্বীনি কাজ করি? তাহলে ত হয়েই গেলো!
    আমি একটু হেসে বললাম, নাহ আংকেল হবেনা! বরং অবৈধ টাকা দ্বারা নেক কাজ করা আল্লাহর সাথে হাসি-মস্কারা করার মত। আচ্ছা বলেন ত, কেউ যদি প্রশ্রাব দিয়ে ওযু করে সেটা কি ওযু হবে নাকি ওযুর সাথে তিরস্কার করা হবে?? অবৈধ অর্থ অবৈধই, সেটা দিয়ে হজ্ব-যাকাত-সদকা-কুরবানি কিচ্ছুই বৈধ হবেনা। তবে হ্যা, কেউ চাইলে গোপনীয় ভাবে নিজের কাছে পড়ে থাকা সেসব অর্থ বিনা স্বার্থে, কোন প্রকার নেকি লাভে উদ্দেশ্য ছাড়া গরিবের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারবে । অন্যথায় সেসবের জন্য অবশ্যই অবশ্যই হাশরের দিবসে বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। আর ফরমালিন যে মেশান, এসব কিন্তু মানবতার ধ্বংসে বিরাট ভূমিকা রাখতেছে।

    তিনি হুট করেই বলে উঠেন, ফরমালিন ছাড়া ত পণ্য-সামগ্রীর আমদানিকৃত মালের সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়! তো??
    আমি এবার বললাম, আপনি কি চান কেউ আপনার খাদ্যে বিষ মিশাক? চান না! থাহলে আপনি কেন অন্যের খাদ্যে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছেন?? একজন মুশলিম ত অন্য মুসলিম ভাইয়ের এমন ক্ষতি করতে পারেনা।
    অবশ্য সে হিসেবে একটা বিকল্প কাজ করতে পারেন, ফরমালিন না মিশিয়ে স্বল্প লাভে পণ্য বাজারে ছাড়ুন, দ্রোত শেষ হয়ে যাবে। নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকবেনা। অথবা অল্পস্বল্প করেই আমদানি করুন, যেন দ্রোত শেষ হয়ে যায়। বিষ টাইপের ফরমালিন দিয়ে বেশিদিন রেখে, বেশি লাভ করে যে সুখ আপনি পান, মানুষের উপকারের কথা ভেবে বিকপ্ল পথে হাটুন, দেখবেন তার চেয়েও হাজারগুন বেশি সুখ পাবেন। তাছাড়া আপনার ফলের অনেকটাই কিন্তু রুগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে যেখা যায়, স্রিফ এসব বিষাক্ত ফল-ফলাদি খাওয়ার দরুন অনেক নরমাল রুগী সিরিয়াস রুগীতে অবনত হয়।
    যা ইসলাম শুধু নয়, কোন ধর্মই মেনে নেবে না। সকল ধর্মের মাঝেই কিন্তু মানবতার ব্যাপারে শ্লোগান আছে। মানব সেবাই পরম ধর্ম। ফরমালিনযুক্ত পণ্যের সরবরাহকারী কখনোই মানব সেবক হতে পারেনা, সে মনবতার দুশমন।

    আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলাম, খান সাহেবের চোখে পানি দেখতে পেলাম। উনি মুখ ফিরিয়ে আবেগে কাঁদছে। সম্ভবত অতিথ ভুলের প্রতি ভিষণ অনুতপ্ত। আমাকে বললেন, বাবা তুমি ত এই পিচ্ছি বয়সে অনেক জ্ঞানগৌরব করার কথা শিখেছ! আমি কিন্তু সেভাবে ভাবিনি।
    আমার ভুল হয়ে গেছে। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? আমি বললাম, যা কামিয়েছেন এই বয়সে, সবগুলো মিলিয়ে বিশাল। তাওবাটাও এত বিশালাকার হওয়া চাই।

    উনি বললেন, ধন্যবাদ হুজুর। আজকে আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।
    আমি বললাম, আপনার চোখ খোলায় ছিল। জাষ্ট চোখের উপরে একটা রঙিন আবরণ ছিল। যার কারনে সত্যটা দেখতে পাননি।
    ভাল থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ।

    #মধ্যাহ্ন, ১০.০৩.১৯ঈ:

    ________________________________________________
    #লিখক, ম. কাজী এনাম
    বিএসএস অনার্স (অর্থনীতি), ডাবল এমএ(হাদিস),
    উস্তাদ, জামিয়া কুরআনিয়া কাজীপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম