• শিরোনাম


    বাংলা ভাষার প্রাচুর্য ও ৫২’র অর্জন -ম.কাজীএনাম

    ম. কাজী এনাম, স্টাফ রিপোর্টার | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯:৫৭ অপরাহ্ণ

    বাংলা ভাষার প্রাচুর্য ও ৫২’র অর্জন  -ম.কাজীএনাম

    ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেয় ১৯৫০ ও ১৯৫২ সালে। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নতুন করে ঘোষণা দেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এতে বাঙালি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন আরও জোরদার করার শপথ গ্রহণ করে। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি ঘটান। ফলে ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণীপেশার মানুষের মাঝে নিদারুণ ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের গতিবেগ ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৩০ জানুয়ারি ঢাকার রাজপথে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় এবং জনসভা করা হয়। আন্দোলনকে আরও তীব্র ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ৩০ জানুয়ারির জনসভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। গঠিত কমিটির সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে ভাষা দিবস হিসেবে পালন এবং দেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির হরতাল কর্মসূচি বানচাল করার লক্ষ্যে তৎকালীন গভর্নর নুরুল আমীন সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সরকারের এ অশুভ কর্মকাণ্ডের দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা গোপন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়, যে কোনো মূল্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান করা হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়। সে দিন ছাত্রসমাজের প্রতিবাদী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। ক্রমান্বয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। ওই সময় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন চলছিল ঢাকায়। ভাষার দাবিতে সোচ্চার মিছিলটি জোর কদমে এগিয়ে চলে প্রাদেশিক ভবন অভিমুখে। সে দিন ঢাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলির আঘাতে একে একে রাজপথে লুটিয়ে পড়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর প্রমুখ যুবকরা। বুকের ফিনকিঝরা তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার পিচঢালা কালো পথ। বাংলার মানুষের রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া কালি দিয়ে লেখা হয় এক অনন্য ইতিহাস। অবশেষে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সাময়িকভাবে বাংলাকে অন্যতম জাতীয় ভাষা করার প্রস্তাব প্রাদেশিক পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তারপর সাংবিধানিকভাবে ১৯৫৬ সালে সংবিধানের ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

    ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি : ভাষা আন্দোলন বাঙালির গণচেতনা ও স্বাধিকার আন্দোলনের এক বলিষ্ঠ ভূমিকা। ভাষার জন্য আন্দোলন এবং জীবনদানের মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত করা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষের ভাষার জন্য সংগ্রাম ও রক্তদানের ইতিহাস নেই। তাই ভাষা আন্দোলন বাংলার জনগণের মধ্যে নতুন জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করে। এ আন্দোলনই পর্যায়ক্রমে বাঙালি জাতিকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল, তা পরবর্তী আন্দোলনগুলোর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। সুতরাং ভাষা আন্দোলনই পরবর্তীকালে সব রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথকে সুপ্রশস্ত করেছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভাষা আন্দোলনই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি ও চেতনা এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সফল অনুপ্রেরণা।



    তথাপিও বর্তমান দেশের পরিস্থিতি, সভ্যতা ও বিদেশি সাংস্কৃতিক নানা দিক পর্যবেক্ষণ করে একটা ভিন্নমত পোষণ করা যায় যে, এদেশে পূর্ণাঙ্গ ভাবে এখন আর সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রূপরেখা নেই। যে ভাষার জন্য আমার দেশের ছাত্র জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল, সেই ভাষা আজ বিদেশী প্রভুত্ববাদ প্রতিষ্টায় অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। মিলিয়ে যাচ্ছে প্রায় ভিন্নদেশীয় ভাষার সংমিশ্রণে। ইহা আমাদের স্বদেশ ও স্বভাষা প্রেমিদের জন্য বিরাট এক অশনিসংকেত।

    ভিনদেশী টিভি সিরিয়াল, বিদেশি পত্রিকা-ম্যাগাজিন, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ভিন্ন মাধ্যম ভাষা, ভিনদেশী ভাষার জন্য চাকুরীর ভয়, প্রবাসগামীদের ভাষার ভিন্নতা সহ সরকারী-বেসরকারিভাবে আমাদের ঐতিহ্যকে আমরাই যেন আজ গলাটিপি হত্যা করতে উদ্যত হয়ে আছি। প্রতিটি কাজের প্রতিটি আচরণে হিন্দি এবং ইংরেজিকে নিজেদের এমন ভাবে ধারণ করতেছি, অনেক ক্ষেত্রে বাংলা শব্দটি অজানা থাকলেও হিন্দি এবং ইংরেজি জানা থাকে ঠিকই। বিষয়টি সাধারণ নয়, আমাদের জন্য অতিব লজ্জার। ইংরেজিতে বাকপটু ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের যখন মাতৃভাষা বাংলাতে ৫মিনিট বক্তৃতা দিতে বলা হয়, মিনিট খানেক যেতেই আটকে যায়। কারণ উচ্চ শিক্ষিত হলেও সভ্যতা যে পেয়েছে বাংলা-ইংরেজি সংমিশ্রণের প্রাচুর্য্যে, সেটাই। কিন্তু কেন? এটাই কি ছিলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মূলনীতি??

    সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন দেখা যায়, একদল ভাষাপ্রেমিরা একুশে বইমেলাতে আসে বিদেশি সাহিত্য খুঁজতে। আসে বিদেশি সাংস্কৃতিকে গায়ে মেখে। খুব আশ্চর্য লাগে। অথচ এই একুশে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে আমাদের তরুন প্রজন্মকে যেন মাতৃভাষার জন্য আগ্রহী করে তোলা যায়। কিন্তু হচ্ছেটা উল্টো। সকলেই বিদেশি এডভেঞ্চার ও সংলাপে আকৃষ্ট বেশি। কারণ এই প্রজন্মকে মাতৃক্রোড় থেকেই বেশি সাহিত্য ও সভ্যতাকে অন্তরের মাঝে বদ্ধমূল করে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশকোম্পানি তাদের ইংরেজি ভাষা নিয়ে চলে গেলেও যেন আজও তাদের প্রেতাত্মারা এ রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়ে যাচ্ছে, দাপিয়ে যাচ্ছে, নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।

    চাকুরীর ক্ষেত্রে যেটা হয় বা হচ্ছে, সেটা মোটেও কাম্য নয়। আধুনিককালের জন্য, টেকনোলজি জানার জন্য, বিজ্ঞানের ব্যবহারের জন্য ইংরেজি জানা অতিব জরুরী। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে? কখনোই কাম্য নয়।
    অন্যকিছু না হউক, অন্তত ন্যূনতম শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় হলেও হলেও তো স্বদেশীয় ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবী রাখে। কারণ এই মাতৃভাষা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মতো আমাদের মাঝে দ্বৈবক্রমে অর্জিত হওয়া কোন সাধারণ কিছু নয়। এই ভাষার প্রতিটা বর্ণে, প্রতিটা শব্দে, প্রতিটা পদে লেগে আছে ছোপছোপ রক্ত। অথচ আজকে চাকুরীর জন্য খুঁজে নেওয়া হয় ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, মেপে নেওয়া হয় ইংরেজি স্কোরের অর্জনগুলো। তাহলে আমাদের সেই রক্ত দেওয়ার মানেগুলো কি ছিল? চাকুরী-ব্যবসা সহ দেশের যে কোন একটি ভাল প্রতিষ্টানের সাথে সংযুক্তির পূর্বশর্ত ইংরেজি ভাষা। স্বদেশী ভাষায় রচিত সাহিত্যগুলোও আজ যেন বদ্ধ প্রাচীরঘেরা একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় হাহাকার ধ্বনি করছে। এই কি ছিল থাহলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রূপরেখা, সীমারেখা ও চাওয়া-পাওয়া?

    ‘ভাঙতে হবে ভাঙবো তালা
    বাংলা দিয়ে গড়বো প্রাচীর,
    মিটাবো ফের মনে জ্বালা
    উঠাব নতুন রণ শামশীর।’

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম