• শিরোনাম


    বঙ্গবন্ধুর চেতনায় রবীন্দ্রনাথ

    | ২৯ মার্চ ২০২২ | ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

    বঙ্গবন্ধুর চেতনায় রবীন্দ্রনাথ

    পলক রহমান: রবীন্দ্রনাথকে বিশ্লেষণ করা সত্যিই এক অসাধ্য ব্যাপার। তাঁর জীবন এবং সৃষ্টি নিয়ে ভাবনায় ভেসে যেতেও কূলহারা হতে হয় মাঝে মাঝে। অথচ ভাবনার পাখা এত বিস্তৃত এত প্রসারিত যে সে পাখায় বাতাসে ভর করে অসীম শূন্যে মেঘের পর মেঘ পাড়ি দেওয়া কোন ব্যাপারই না। সেখানেও যেন কবিগুরুকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে, উড়তে উড়তে, ঘুরতে ঘুরতে চোখে ক্লান্তির তন্দ্রায় একসময় নেমে আসতে হয় ধরায়। তবুও শেষ হয় না এই কালজয়ী মানুষটাকে নিয়ে কোনো কল্পনা অথবা বাস্তব রাজ্যেও রাজত্ব।

    তাইতো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শুধু এই বলতে ইচ্ছে হয় যে তিনি বাঙালি বিশ্বকবি হয়ে না জন্মালে বোধহয় আজ আমাদেরও বাঙালি হয়ে জন্ম নেওয়ার এই যে অহংকার, গর্ব আর সম্মান তা বুঝি আর কোনদিনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াত না।
    হয়ত বলা হবে কেন বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান কি আমাদেরকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেননি। অবশ্যই করেছেন। কিন্তু আমাদের বঙ্গবন্ধুও যে সেই প্রেরণা, শক্তি, জিদ, সাহস, প্রতিজ্ঞা আর শেকল ভাঙার মন্ত্র পেয়েছিলেন এই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ-এর থেকেই। আর নজরুলতো ছিলেন সবসময়ই মুক্তির দিশারী। যা প্রভাবিত করেছে, করছে এবং আগামীতেও করবে আমাদের বাঙালি জীবনের অধিকার আদায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই।
    বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ অনুক্ষণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু যেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, পুরানো বিমানবন্দর তেজগাঁওতে অবতরণ করলেন সেদিন তাঁর চোখে আনন্দ অশ্রুর বন্যা ছিল। সকল অবিসংবাদিত নেতা, সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলার আপামর জনগণের সামনে শোভিত মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর চোখে ঝরতে থাকে আনন্দ অশ্রু। নয় মাস বাংলা দেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানের কারাগারে সেই নয় মাস তার নিজের সাথে আর মৃত্যুভয়ের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রেখে যে কালজয়ী বাঙালি মানুষটির কথা প্রথমেই স্মরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনি আর কেউ নয়, তিনি হলেন আমাদের অহংকারের আর এক বাঙালি বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “হে কবিগুরু তুমি ঠিক নও। তুমি এসে আজ দেখে যাও আমরা স্বাধীন ! আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। তুমি বলেছিলে, সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।”
    তিনি আরো বললেন, “কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।”
    এ ছিল শেখ মুজিবের একেবারেই অভিমানের কথা, জিদের কথা, এ থেকে সঞ্চয় করা শক্তি আর সাহসের কথা। কেননা রবি ঠাকুরেরওতো এ ছিল এক চরম অভিমানের কথা তার ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায়। নইলে এ কথা যে তাঁর নিজেকে বলা হচ্ছিল বা হচ্ছে তা কি তিনি জানতেন না ! কারণ তিনিও যে মনেপ্রাণে সেই বাঙালিদেরই একজন। কবিগুরুর মনেও এ অভিমান জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল বলে সংগ্রাম করেছেন কলমের অস্ত্র হাতে। আর শেখ মুজিব সেখান থেকে শক্তি সাহস অভিমান জিদ আর অনুপ্রেরণা নিয়ে করেছেন সশস্ত্র সংগ্রাম। তিনি সে সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন। পক্ষান্তরে তাঁকে অস্ত্র তুলে এই সংগ্রামে জয়ী হওয়ার জন্য যে ব্যক্তিটি তাঁর মনে বসে থাকতেন সে হলো রবীন্দ্রনাথ, আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
    কিন্তু আজ যদি সে দিনের সেই স্বাধীনতার ডাক, পরবর্তীতে স্বশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নিয়ে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে বাঙালির ইতিহাস আর অস্তিত্বের কী হতো ? কী হতো যারা মারা গিয়েছিল সেই ৩০ লক্ষ বাঙালি মা ভাইবোনেদের ? তাঁদের আত্মা আজও অভিসম্পাত দিত শুধু শেখ মুজিবুরকে নয় সকল বাঙালি জাতিকে। আর বলত কবিগুরু এত বলার পরও কেউ বিশ্বাস করেনি যে আমরা বাঙালিরা আসলেই মানুষ নয়। সাথে বঙ্গবন্ধুও হয়তো কাঁদতেন। আজ কেঁদেছেন আনন্দে, সেদিন ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন মনে গভীর কষ্ট আর দুঃখ নিয়ে। ক্ষুদিরামের মতো কোন অহংকার বা গর্বও থাকত না হয়ত সেদিন !
    যদি বঙ্গবন্ধু সশ্বস্ত্র সংগ্রামে সত্যিই পরাজিত হতেন তাহলে তিনি এভাবে না বলে (তা বলার সুযোগ পেতেন কি না!) চোখের জল ঝরাতে ঝরাতে বলতেন কবিগুরু তুমি ঠিকই বলেছিলে, “সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি”।
    শেখ মুজিবুর রহমান এর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং মুনতাসীর মামুন এর “বন্ধু কোষ” এর পাতায় পাতায় চোখ রাখলে প্রতিমুহূর্তে শিহরিত হতে হয় যে বঙ্গবন্ধু কত দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’, ‘সুপ্রভাত’, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’, ‘দুই বিঘা জমি’ প্রভৃতি কবিতা যেমন আবৃত্তি করতেন, তেমনি গুনগুন করে রবীন্দ্রনাথের গানও গাইতেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার’ বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।এমনকি আমাদের বঙ্গমাতাও বঙ্গবন্ধুর কারাবাস কালীন সঞ্চয়িতাসহ রবীন্দ্র রচনাবলি, নজরুল, শরৎ ইত্যাদি সাথে দিয়ে দিতেন। এছাড়াও রবীন্দ্র রচনাবলির বিভিন্ন বই কিনেও কারাগারে পাঠাতেন।
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কত অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা থাকলে ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করলে শিল্পী ও প্রগতিবাদী মানুষের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু একাত্ম হন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ব্যবস্থা মানি না , আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এই দেশে গীত হবেই।’ ১৯৬৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, ‘Tagore had reflected the hopes and aspiration of the millions of Bengalies through his works. Without him the Bengali Language was incomplete’ রবীন্দ্র সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে সমধিক গুরুত্ব আরোপ করে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে আহ্বান জানান। রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার কারণেই বারবার রবীন্দ্রবাণী উচ্চারিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে, তাঁর চেতনার গভীরতম প্রদেশে অধিষ্ঠিত ছিল রবীন্দ্রনাথ।
    এ কথা বলাই বাহুল্য যে, সে কারণেই সেদিন এই অবিসংবাদিত নেতার মনে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের মাটিতে পা রেখে যে কবির কথা তাঁর স্মরণে এসেছিল তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ। তা না হলে এত বিশ্ব বরেণ্য নেতা , কবি, লেখক, মাশায়েখ, আলেম ওলামায়ে একরাম, প-িত, বৈজ্ঞানিক, গবেষক, শাসক থাকতে কবিগুরুর নাম কেন নিতে হয়েছিল তাঁকে ? সুতরাং এই হলো বঙ্গবন্ধু তথা বাঙালি জীবনে রবীন্দ্রনাথের আলো, আকর্ষণ এবং সর্বোপরি তাঁর দর্শনের প্রভাব। শেখ মুজিব আরো বললেন, “আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই। আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি।” রবীন্দ্রনাথের দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন বলেইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সঙ্গীত তিনি মুখে যেমন আওড়িয়েছেন তেমনি “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করতে তিনি এতটুকু দ্বিধা করেননি।
    পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দিল্লি হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে বিমানে বসে বঙ্গবন্ধু বাষ্প রুদ্ধস্বরে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাইতে থাকেন এবং সহযাত্রী ভারতীয় কূটনীতিজ্ঞ শশাঙ্ক এস ব্যানার্জীকে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে বলেন। এ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে বলে বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন। তা না হলে তিনি তো নিজেও একটা সঙ্গীত লিখে বলতে পারতেন এই আমার সৃষ্টি জাতীয় সঙ্গীত। দেশ যখন স্বাধীন করেছি মানে সৃষ্টি করেছি তখন তার জাতীয় সঙ্গীতটাও নিজে তৈরি করে দিয়ে গেলাম। এখন থেকে এটাই হোক প্রতিষ্ঠিত। তাহলে সেদিন কি কেউ ছিল তাঁকে কিছু বলবে বা সংবিধান কি পরিবর্তন হতো ! কিন্তু তা হয়নি। কেননা শেখ মুজিব নিজেও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন প্রতিটি মুহূর্তে। আর সেটাই তাঁকে আর এক শ্রেষ্ঠ বাঙালি তথা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে বিশ্বের দরবারে সম্মানিত করেছে। আর শ্রেষ্ঠ হতে গেলে শ্রেষ্ঠর সাথেই থাকতে হয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায়। তা না হলে শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না।



    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম