• শিরোনাম


    বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এড. সিরাজুল হকের জীবন ও কর্ম [] এস এম শাহনূর

    | ২৭ অক্টোবর ২০২১ | ৬:৩২ অপরাহ্ণ

    বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এড. সিরাজুল হকের জীবন ও কর্ম [] এস এম শাহনূর

    বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া।মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি কসবা। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭১ পূর্ববর্তী সময়ে তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কান্ডারী। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আর যে মানুষটি শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে আওয়ামী লীগকে দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি হলেন কসবার মাটি ও মানুষের অহংকার এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া। তিনি বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হকের পিতা। এডভোকেট সিরাজুল হক মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে গঠিত ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

    সিরাজুল হক ১৯২৫ সালে ১ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) তৎকালীন কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার পানিয়ারূপ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালে ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দুজনের মধ্যে বয়সের সামান্য পার্থক্য থাকলেও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী ছিলেন এডভোকেট সিরাজুল হক। দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বড়ই মধুর, সিরাজুল হকের ডাক নাম বাচ্চু। বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম খোকা। একে অপরের সাথে সম্বোধন ছিল ডাক নামেই।জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর হাতে হাত রেখে মধুমতি নদী সাঁতরে পাড় হয়েছেন দুজনে। অত্যন্ত মেধাবী সিরাজুল হক “হাজী মুহাম্মদ মহসিন বৃত্তি” পেয়েছিলেন। তা দিয়েই তিনি লেখাপড়া করেছেন।



    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া একই আদর্শে দেশের মানুষের চিরস্থায়ী মুক্তি কামনা করেছেন।কখনো কখনো একই খাবার দু-জনেই ভাগাভাগি করে খেয়েছেন। একই আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তৎকালীন স্বৈর-শাসকের হাতে কারাবরণ করেছেন। তবুও তিনি তাঁর আদর্শ থেকে পিছপা হননি।
    ১৯৫২ সালের  ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।

    তিনি ১৯৭০ সালে (কসবা-বুড়িচং নির্বাচনী এলাকা থেকে) পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে এমএনএ, ১৯৭৩ সালে (কসবা-আখাউড়া এলাকা থেকে) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কসবা-বুড়িচং নিয়ে গঠিত তৎকালীন কুমিল্লা-৪ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

    সবই ঠিকঠাক ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বুল পাল্টালেও এডভোকেট সিরাজুল হক তা করেননি। ঘাতকের হাতে এক সময়ের সহপাঠী ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর ও তাঁর পরিবারের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তিনি প্রতিবাদে ফেটে পরেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিচক্র যখন উল্লাসে মত্ত সেই বিপদসংকুল সময়ে খুনিদের চোখের ওপর চোখ রেখে একমাত্র যে ব্যক্তিটি সিংহের মত গর্জে উঠেছিলেন তিনি অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক।

    ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রী সভার আমন্ত্রণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যিনি, তিনি কসবার গর্ব মাননীয় আইনমন্ত্রীর পিতা এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া।

    তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সনদ পত্র (এল এফ ২৯/২০২১) নিয়ে ছাড় পাওয়া চলচ্চিত্র “আগস্ট ১৯৭৫”। শামীম আহমেদ রনী’র কাহিনী সংলাপ ও চিনাট্যে মোঃ সেলিম খান প্রযোজিত ও পরিচালিত ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড দীর্ঘ এ চলচ্চিত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা ও হত্যা পরবর্তী কুচক্রী মহলের চালচিত্র ফুটে উঠেছে। কিছু সংখ্যক বিপদগামী সেনা কর্মকর্তার সহযোগিতায বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু খন্দকার মোশতাক আহমেদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে। খন্দকার মোশতাক তার মন্ত্রী সভায় মন্ত্রীত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের খ্যাতিমান কয়েকজন ব্যক্তিকে টেলিফোন করে আমন্ত্রণ জানায়। উক্ত চলচ্চিত্রটি শুরু হওয়ার ৩৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড এ খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রথম যাঁকে ফোন করেছিলো তিনি হলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবার কৃতি সন্তান এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া।এ সময় রাজ্যের চিন্তায় চিন্তিত উপমহাদেশের খ্যাতিমান আইনজ্ঞ এডভোকেট সিরাজুল হককে বেশ চিন্তিত ও বিমর্ষ দেখা যাচ্ছিল। তিনি থুঁতনির নিচে ডান হাত রেখে চেয়ারে বসা,পাশের একটি টেবিলে রাখা টেলিফোন,ওপাশ থেকে আসা রিং টোনের শব্দ ওনার মোটেও ভাল লাগেনি। ফোনবেলটি ৪ বার বাজার পর রিসিভার হাতে নিয়ে কানের কাছে রাখলেন। শিষ্টাচার দেখাতে গিয়ে বললেন, হ্যালো…
    ওপাশ থেকে যার কণ্ঠ শুনতে পেলেন তার কণ্ঠ শুনার জন্য তিনি হয়তো মোটেও প্রস্তুত ছিলেননা। ওপাশ থেকে যে শব্দ গুলো এডভোকেট সিরাজুল হকের কানে এলো তা হল, “খন্দকার মোশতাক আহমেদ বলছি”।
    নামটি শুনেই যেন হক সাহেবের মাথায় বাজ পড়ল!

    তবু বললেন,”বলুন”।
    ওপাশ থেকে জবরদখলী খন্দকার মোশতাক আহমেদ বলছিল, “আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে জেনেছেন যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। আমি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। খুব শিগগিরই জাতীয় সংসদের সভা ডাকা হবে। আপনাকে আমার মন্ত্রী সভায় অংশ নেয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

    ইতিহাসের জঘন্যতম চরিত্র খন্দকার মোশতাক আহমেদের এ প্রস্তাব তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। শুধু তাই নয়,সিংহের মত কণ্ঠ উঁচু করে শুনালেন বাংলাদেশের রক্তিম ইতিহাসের প্রতিবাদ মাখানো ঝাঁঝালো কিছু কথা। তিনি বললেন,
    “আপনি খুনি,রাষ্ট্রপতি হওয়ার এবং সভা ডাকার কোনো এখতিয়ার আপনার নেই। আপনি অবৈধ রাষ্ট্রপতি, আপনার সংসদ মানিনা,আপনাকে প্রেসিডেন্ট মানিনা।”

    এ বলেই টেলিফোনের রিসিভারটি রেখে দিলেন। ওদিকে খন্দকার মোশতাক আহমেদ স্বপ্নভঙ্গের আশংকায় রিসিভার হাতে রেখেই মনের অজান্তে উচ্চারণ করলেন, “আ হা”। কপালে চিন্তার ভাজ, মুখে আফসোসের গোঙানিসহ রিসিভার রাখলেন।

    এডভোকেট সিরাজুল হক এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের এ কথোপকথন মাত্র ১মিনিট ৩০ সেকেন্ড! বা তারও কম সময়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে এ কথাগুলোর মূল্য অনেক বেশি। এডভোকেট সিরাজুল হকের মত কিছু মানুষ এখনও আছে।আছে বলেই দেশ চলে, আমরা চলি।

    এতদ বিষয়ে লেখক ও লোকজ সংস্কৃতির গবেষক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপন লেখেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ করেছিলেন, অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া, পানিয়ারূপ, কসবা। ১৬ অক্টোবর ১৯৭৫ বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাক, আওয়ামী লীগের এমপিবৃন্দ, ১৫ আগস্টের হত্যাকারী রশিদ, ফারুক, শাহরিয়ার, মেজর নূর, নাজমুল হুদা, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, মোশতাক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা আতাউল গণি ওসমানীসহ অনেকেই কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনিতে। এমপি সিরাজুল হক অনেক কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করেন। তিনি প্রথমেই বলেন- “তোকে কে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছে?, তোর হাতে শেখ মুজিবের ও তাঁর পরিবারের রক্ত লেগে আছে। সাংবিধানিক কোন অধিকারে তুই রাষ্ট্রপতি আমরা জানতে চাই।” সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে রেখে তিনি বলেন,”তুই জনগণ দ্বারা নির্বাচিত না, রাষ্ট্রপতি না থাকলে, উপ- রাষ্ট্রপতি, উপ- রাষ্ট্রপতি না- থাকলে স্পিকার তবে তুই কোন সংবিধানে, এখানে এলি।” তখন তাঁকে মেরে ফেলার জন্য রশিদ, ফারুক অস্ত্র তাক করে।মুশতাক তাদের বলল,”আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছি।” তখন সিরাজুল হক সাহেব বলেন, “কোনো খুনি আমার বন্ধু হতে পারে না। তুই কিসের বন্ধু?। বঙ্গবন্ধুর খুনি আমার বন্ধু হতে পারে না।” হট্টগোলে সভা ভেঙে যায়।সেদিন এমপিবৃন্দ ট্রাকে করে এমপি হোস্টেল থেকে বঙ্গভবনে এসেছিলেন।কারণ মোশতাকের গাড়ি তাঁরা ব্যবহার করবেনা। তাঁরা গভীর রাত পর্যন্ত মিটিং করেন।তিনি হিংস্র হায়েনাদের সামনে বক্তব্য রাখার দুটি কারণ- এক. আইনজ্ঞ, সংবিধান প্রণেতা, দুই. তিনি বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের সাথী, তদুপরি সাহসী ও স্পষ্টভাষী।[১]

    ৭৫ এর পটপরিক্রমায় অবৈধ ভাবে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতি হয়ে খন্দকার মোশতাক কিন্তু সংসদ ভেঙ্গে দেননি। তাঁর ইচ্ছে ছিল সংসদীয় দলের সভা ডেকে তিনি সংসদ নেতা হবেন, প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করবেন। তাই বঙ্গভবনের সম্মেলন কক্ষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা আহ্বান করেন। আওয়ামী লীগের ২৯৩ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে প্রায় ১০০ জনের মত সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। বঙ্গভবনের সম্মেলন কক্ষে সভা শুরু হয়। মঞ্চে মোশতাক, আর তার দু পাশে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো মেজর ফারুক ও রশিদ। সভা শুরু করে মোশতাক বললেন, তাকে সংসদ নেতা নির্বাচন করার জন্য এবং বাকশাল বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন। বলেন, দেশ এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় চলবে, এজন্যই তিনি সংসদ বহাল রেখেছেন।
    মোশতাকের বক্তব্যের পর পিন পতন নীরবতা। কারো মুখে শব্দ নেই। তার বক্তব্যের জবাব যারা দিতে পারতেন, সেই জাতীয় চার নেতা জেলে। অত্যন্ত ভীতিকর পরিবেশে নিরবতাকে ভঙ্গ করে সদস্যদের মাঝামাঝি জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক ।
    প্রথমেই তিনি বললেন, ‘খন্দকার তোমার দুই পাশের ওদের সরে যেতে বল’। অস্ত্রধারী দুই মেজর হক সাহেবের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল। পরে মোশতাক ইঙ্গিত দিলে মেজররা রুমের বাইরে চলে যায়। তারপর অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক কোনো ভূমিকা না করে মোশতাককে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন ‘মুজিবকে কেন খুন করেছো?’ স্যরি মি. মোশতাক,আমি তোমাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্বোধন করতে পারলাম না, তুমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবৈধ । ক্ষোভে গর্জে ওঠলেন সিরাজুল হক। মোশতাক ক্ষুব্ধ  হয়ে জনাব সিরাজুল হক সাহেবের সাথে উদ্ধত আচরণ করলেন, জবাবে সিরাজুল হক সাহেব বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন “সাহস থাকলে বাইরে আয় ঝিনাইদহের তাবিজ বেচুইন্নার পুত”।সিরাজুক হক সাহেবের হুংকারে খুনী মোশতাকের সেদিনের বৈঠক ভেস্তে গিয়েছিল।হন হন করে বের হয়ে চলে আসলেন বঙ্গভবন থেকে।

    ➤একবার বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সিরাজুল হক গিয়েছিলেন দেখা করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন খন্দকার মোশতাক এবং তাহের উদ্দীন ঠাকুর।বঙ্গবন্ধু সিরাজুল হক সাহেবকে ডেকে নিয়ে বললেন, বাচ্চু আমার কাছে খবর আছে খন্দকার মোশতাক তোমায় মেরে ফেলবে।অবাক হয়ে সিরাজুল হক সাহেব বললেন,কি বলছ?তারপর বঙ্গবন্ধু বললেন হ্যাঁ আমার কাছে এই খবর আছে।বঙ্গবন্ধু আরও বললেন তোমরা জানোনা আমি জানি মোশতাকের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত হারামীতে ভরা।আমি কোন রিস্ক নিতে চাইনা,তোমার সাথে নিরাপত্তা রক্ষী দিতে চাই।তখন সিরাজুল হক সাহেব আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন,যদি তুমি শুনেই থাকো মোশতাক আমায় মেরে ফেলবে তবে নিশ্চিত থাকো সে আমায় না,তোমাকে মেরে ফেলবে।বঙ্গবন্ধু বললেন,আরে না,কি বলো?সিরাজুল হক সাহেব বললেন হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি।তখন বঙ্গবন্ধু বললেন ব্যাটাকে ধরে ফেলব নাকি এখানে?সিরাজুল হক সাহেব বাঁধা দিয়ে বললেন রাখো,আরেকটু দেখো।পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে সিরাজুল হক সাহেবের সবচেয়ে আফসোসটা ছিলো কেন আমি সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বাঁধা দিয়েছিলাম,কেন সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বললামনা মোশতাককে ধরে ফেলো।

    ১৯৭৯ সালে দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল এমএজি ওসমানীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে তিনি সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনে জেনারেল ওসমানী হেরে গেলে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে নীরব ছিলেন এবং নিজের আইন ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।
    অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক তার বন্ধু সহপাঠী শেখ মুজিবের রক্তের ঋণ শোধ করেছিলেন জীবন সায়াহ্নে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করে। ক্ষুরধার আইনী যুক্তি দিয়ে ২১ বছর পর প্রমাণ করতে পেরেছিলেন অপরাধীদের নৃশংসতা। হয়েছে তাদের মৃত্যুদণ্ড। শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাই নয়, জাতীয় চার নেতা, যারা ছিলেন এডভোকেট সিরাজুল হকের রাজনৈতিক সহচর তাদের হত্যার বিচারের জন্যও আইনী লড়াই নামেন। বিচার হয় জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের।১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় কৌঁশলী ছিলেন তিনি। অসংখ্য চাঞ্চল্যকর মামলার সফল কৌঁসুলি তিনি। তিনি বলতেন, “আইনজীবীরা শুধু আইনের উপজীব্য করে না, তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, তাই আইনজীবীদের অপর নাম কৌঁসুলি।”

    ➤ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা আখাউড়া) নির্বাচনী এলাকা থেকে দুই, দুই বার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দুই মেয়াদেই এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।

    স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের (কসবা) সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম লেখেন, “১৯৬৬ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে ছয় দফা ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা পুলিশের চাপের পালিয়ে বেড়ালেও বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনচেতা মনোভাবের ধারক ও বাহক হিসেবে সিরাজুল হক প্রতি মাসেই বাড়িতে (পানিয়ারূপ) আসা-যাওয়া করতেন।
    আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে দেশের দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে দলীয় পরিচিতির আবডালে রেখে নির্বাচনী অভিযান পরিচালনার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা একজন মেধাবী আইনজীবীর পক্ষেই সম্ভব ছিল। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভেম্বর মাসে কসবা হাইস্কুলের মাঠে জনসভায় দুপুর প্রায় ১২টায় লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
    বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিরাজুল হক মঞ্চে উঠে প্রথমে তিনি যে বক্তব্য রাখলেন তাতে এত বড় জনসমাগমেও পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল।
    মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর সিরাজুল হক নিজের এলাকায় এলেন কিন্তু  বাংলাদেশের সংবিধান রচনার দায়িত্বে থাকায় দেশের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সংবিধান রচনার কাজ সমাপ্ত করলেন।”[২]
    সন্ত্রাস- মাদক, দূর্নীতিমুক্ত কসবা-আখাউড়া বিনির্মানে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা জাতি আজও শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করে। এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়ার পিতা ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের এক উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা। পিতার পেশাগত কারণে বাচ্চু মিয়াও কোথাও বেশিদিন স্থির হতে পারেননি। পিতা ও পরিবারের স্থান পরিবর্তনের সাথে ছোটকাল থেকেই বদলেছে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
    তিনি , বি,এ (অনার্স), এম এ (ক্যাল) এম এ এল এল বি, ঢাকা, সিনিয়র এডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। তিনি কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ২৫ ভিগা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা, ৫০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা, ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ এর সুদ মওকুফ করা, সকল কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য কর্মের সংস্থান করা, যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নের মধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক কাজে নিয়োজিত করা, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা, আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান, এই নীতির প্রতিষ্ঠা করা, জাতীয় উন্নতির লক্ষ্যে সমাজের সর্বস্তরে সততা প্রতিষ্ঠা করা এবং দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, কসবা এবং আখাউড়ার সার্বিক বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের অন্তর্ভূক্ত করা, কসবা এবং আখাউড়ার সার্বিক যোগাযোগের অসুবিধা দুরীকরনে রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন করা, উপোরোন্ত নীতিমালা এবং কাজ সমূহের বাস্তবায়নে পবিত্র অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ কাজ বাস্তবায়িত করতে না পারলেও, চেস্টার ত্রুটি করেন নি। বর্তমানে তাহার সু-যোগ্য সন্তান এডভোকেট আনিছুল হক, মাননীয় সংসদ সদস্য ও আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। তাহার বাবার পবিত্র অঙ্গীকার তিলে তিলে পালন করে দেশকে সুন্দরভাবে গড়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

    ব্যক্তিগত জীবনে এডভোকেট সিরাজুল হক জাহানারা হককে বিয়ে করেন। তিনিও স্বামী সিরাজুল হকের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাঁরা দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক জননী।

    অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর পরলোক গমন করেন।
    ২০২০ সালের ১৮ এপ্রিল ৮৬ বছর বয়সে বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহানারা হক রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে (পুরাতন অ্যাপোলো হাসপাতালে) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
    ২০১৭ সালের ১০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে একটি হাসপাতালে তার ছোট ছেলে আরিফুল হক রনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৬ বছর বয়সে মারা যান।
    ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই তার একমাত্র মেয়ে সায়মা ইসলামও ৬৫ বছর বয়সে ঢাকায় মারা যান।

    বড় ছেলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দুইবারের সফল আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। বিয়ের তিন বছরের মাথায় ১৯৯১ সালের ২ জানুয়ারি সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী নূর আমতুল্লাহ্ রিনা হককে হারান। এরপর তিনি আর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি। তাঁর কোনো সন্তানাদি নেই।

    তথ্য ঋণ:
    [১] দৈনিক ইত্তেফাক,আগস্ট ১৯৯০।
    [২] দৈনিক সমকাল, ২৯ অক্টোবর ২০১৫।
    [৩] উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যম।

    [৪] চলচ্চিত্র : আগস্ট ১৯৭৫, পরিচালক- মোঃ সেলিম খান।

    লেখক: এস এম শাহনূর
    কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম