• শিরোনাম


    বই পরিচিতিঃ অর্ধেক হুমায়ূন অর্ধেক আমি

    রিপোর্ট: সাজিদুল ইসলাম সাজিদ, স্টাফ রিপোর্টার | ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ৪:২৫ পূর্বাহ্ণ

    বই পরিচিতিঃ অর্ধেক হুমায়ূন অর্ধেক আমি

    বইয়ের নামঃ অর্ধেক হুমায়ূন অর্ধেক আমি
    লেখকঃ মুহাম্মদ কামাল হোসেন
    মুদ্রিত মূল্যঃ ১৬০ টাকা
    গ্রন্থসত্বঃ লেখক
    প্রকাশনীঃ দাঁড়িকমা
    প্রচ্ছদঃ সাজিদুল ইসলাম সাজিদ

    বই পরিচিতি তুলে ধরেছেন লেখিকাঃ জিনাত আরা করিম
    জনপ্রিয় লেখক ও গল্পকার মুহাম্মদ কামাল হোসেন’র “অর্ধেক হুমায়ূন অর্ধেক আমি” আঠারোটি ছোটগল্প সংবলিত একটি গল্পগ্রন্থ।



    বইটির নামকরণ থেকে শুরু করে প্রচ্ছদ নিঃসন্দেহে সবাইকে আকৃষ্ট করার মতো। বইটিতে সমাজের অতিপরিচিত অথচ অসহনীয় চিত্রপট তুলে ধরেছেন চিনু কবিরাজ চরিত্রের মধ্যদিয়ে। গ্রন্থের শুরুটা হয়েছে ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা’ গল্পটির মধ্য দিয়ে। এখানে কবিরাজ চিনু’র ঘৃণ্য লোভ ও অসততা ফুটে উঠেছে।

    একজন কবিরাজ কিভাবে সমাজের অসহায় মানুষদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সর্বশ্রান্ত করে তারই লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে। বিচিত্র এই পৃথিবী। বিচিত্রতায় ভরা এখানকার মানুষের মনন মানসিকতা। চলার পথে কখনও কারও সাথে পরিচয় হয় আর কে কখন মনের চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে, কখন আবার কে দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে মনের আড়ালে চলে যায়, সেটা সঠিক বলা যায় না। তেমনি আবার কে কখন আসন গেঁড়ে বসে যায় মনের কোণে সেটাও আঁচ করা যায় না, কিংবা করার কিছু থাকে না। কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। ‘পেঁজা মেঘে ভেজা সূর্য’ তেমনি একটা চমৎকার গল্প। এই গল্পে রোহিঙ্গাবাসীদের জীবন,সংগ্রামের বাস্তব চিত্র ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।

    ‘কাঁধে একখানা ব্যাগ ঝুলিয়ে হলুদ পাঞ্জাবী পরা ছেলেরা কখনো হিমু হতে পারে না। বাবা আমাকে নিয়ে ভুল স্বপ্ন দেখেছেন! আবার অন্যদিকে আমাকে বুঝে না, রূপা বুঝতে চায় না অথচ আমাকে সুপারগ্লু’র মতো ভালোবাসে।’ এখানেও হুমায়ূন আহমেদের হিমু ও রূপা চরিত্রের চিত্রায়নে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

    পাঠক এই গল্পে কিছুটা হলে বিভ্রান্ত হবেন। হুমায়ূনীয় ঢং এ গল্পটি ভালোই ফেঁদেছেন গল্পকার। মুগ্ধ হওয়ার মতো একটি গল্প। নারীর শরীরের গন্ধ পেলে হুঁশ থাকেনা, শুঁকে শুঁকে জোঁকের মতো ঠিক কোত্থেকে এসে হাজির হয়। চন্দনার মতো মেয়েদের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে জগলুদের মতো সমাজের নরকীটগুলো। ‘বিপন্ন প্রহর’ গল্পে সমাজের এই কুৎসিত দিকটাও সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় লেখক তুলে ধরেছেন তাঁর অপূর্ব লেখনীতে।

    জীবনের অঙ্ক কখনো মেলে না। এ যে বিধাতার গড়ে দেয়া কঠিন সূত্র। মেলাবার সাধ্য তাই কারো নেই, যতক্ষণ না তিনি চাইবেন। মানুষ তবুও হিসেব কষেন তাঁর জীবন সায়াহ্নে এসে। ইশতিয়াক চৌধুরী ও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি তাঁর ফেলে আসা অতীত কে দুপুরের নির্জনতায় খুঁজে ফিরেন ধনুকের মতো কুঁজো রাস্তাটায় এসে অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে। এই রাস্তার সাথে তিনি তাঁর নিজ জীবনের মিল খুঁজে পান।

    লেখক ‘বেলা অবেলা’ গল্পে ইশতিয়াক চৌধুরীর জীবন চিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিপুণভাবে। ইশতিয়াক চৌধুরী ছিলেন একজন সজ্জন সৎ আদর্শবান ও পরহেজগার সু প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। অথচ সন্তান’রা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা – মা’কে মায়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কিভাবে অবহেলা করে সন্তান বড় হয়ে বৃদ্ধ বাবা মা’কে – বর্তমান সমাজের এ নিষ্ঠুর ও বাস্তবমূখী দৃশ্যপট উঠে এসেছে লেখকের কলমের আঁচড়ে।

    অতীতের ভালোলাগা – ভালোবাসা, স্বপ্নভঙ্গের যে নীল বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছিলো খোকা, ত্রিভূজ প্রমের গল্পের পরিসমাপ্তি টেনেছেন খুব সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ হাতে লেখক তাঁর ‘ইচ্ছে ডানার মেঘবালিকা’ গল্পে। চিরকাল সেঁজুতিদের সহজ- সরল ভালোবাসা সমাজের দন্ড – মুন্ড কর্তা ব্যক্তিদের কাছে নিষ্পেষিত হয়েছে। সেঁজুতিরা কেবল ভালোবেসে নিজেকে নিঃশ্বেষ করে দেয় – তাদের ভালোবাসার মূল্যায়ণ কেউ করতে পারেনি। আর লেখক তাঁর ‘কেঁচো প্রেমের ইতিকথা’ গল্পে সেঁজুতিদের জীবনের ক্রিয়দাংশ তুলে এনেছেন নিপুণ শব্দ শৈলী আর নান্দনিক বাক্যের মিশেলে। গরীবদের শখ – আহ্লাদ থাকতে নেই। তাঁদের অনেক ইচ্ছেই এরকম অপূর্ণ থেকে যায়। যার নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার আবার পোলাও কোর্মা! অদৃষ্ট তাই পরিহাস করে। নিয়তির এক চরম খেলা! রমজান আলীর স্বপ্নগুলো ঠিক তেমনি। তাঁর স্বপ্নগুলো বিধাতা যেনো অলখে মুখ টিপে হাসেন। এ যেনো আমাদের সমাজের অসহায় মানুষদের শুধু শুধু স্বপ্ন দেখার কল্পনা মাত্র। যা শত চেষ্টার পরও আশাহত হওয়ার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে রমজান আলীর জীবনে।

    লেখক মুহাম্মদ কামাল হোসেন তাঁর ‘ভাতঘুম’ গল্পে রামজান আলীর আশাহত স্বপ্নকে লেখন শৈলীর নিপুণতায় সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। লাবণ্য ‘দের জীবন সত্যি ই “সেমিকোলন” এর মতো। দিলেও আচ্ছা, না দিলেও ক্ষতি নেই। স্রেফ ক্ষণিকের অনাহুত অতিথি। এ সমাজ লাবণ্যদের মনের গন্ডি ছোঁয় না, কেবল তাদের ঐ শরীরটুকু তাদের প্রয়োজন। মুখোশধারী, ভদ্রবেশী এই নরকীটদের কেবল কামনার রসটুকু ঝেড়ে ফেলার জন্য লাবণ্যদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই লাবণ্যদের স্বপ্ন আছে, আর সেই স্বপ্ন এই নরকীটদের ইচ্ছের কাছে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হয়। তাই তো মীরু কে দেখে লাবণ্য’র স্বপ্নময় রঙিন ফানিস ক্ষণিকের তরে আকাশ ছোঁয়। তবে মীরুরাও ভুল করে লাবণ্যদের নাগপাশে বসে খেয়ালের তরী বেয়ে। সত্যি সমাজের এই নগ্ন রূপটুকু খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক তাঁর ‘প্রেমের আলামত পাওয়া গেছে’ গল্পে।

    তেমনি ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধের নির্মম জীবনের চিত্র, দেশপ্রেম, অপেক্ষার ক্লান্ত প্রহর উঠে এসেছে লেখকের ‘বিজয়ের লাল বারাদায়’। লেখক মুহাম্মদ কামাল হোসেন সত্যি অনবদ্য লেখন। তাঁর অপূর্ব লেখন শৈলীর নিপুণতা ‘অর্ধেক হুমায়ূন অর্ধেক আমি’র প্রতিটি গল্পে এর স্বাক্ষর রেখেছেন। বইটির সমালোচনা কী করবো বুঝতে পারছি না, তবে কয়েকটি গল্পে আরেকটু নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যেতে পারতো বহমান নদীর স্রোতের মতো। এতে অন্তত পাঠকের তৃষিত মন আরেকটু ভরতো। এই যেনো ছোটগল্পের মতোই শেষ হয়েও হইলো শেষ। হয়তোবা এই জন্যি, ছোটগল্পের স্বার্থকতা এখানেই লুকায়িত।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    বলৎকার (কবিতা)

    ১২ জুলাই ২০১৮

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম