• শিরোনাম


    ফুলকি (ছোট গল্প) [] ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

    | ২১ ডিসেম্বর ২০২১ | ৪:৪৬ অপরাহ্ণ

    ফুলকি (ছোট গল্প) [] ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

     

    ফুলকি, দশ বছরের ফুটফুটে একটি মেয়ে। কথা বলে সুন্দর করে। সারাদিন মা’কে অসংখ্যবার প্রশ্ন করে , মা বাবা কবে আসবে? ফুলকির প্রশ্ন শুনে মা রহিমার দু’চোখ পানিতে ভরে যায়। চোখের পানি মুছে মুখে হাসি টেনে বলে, এই তো মা! তোর বাবা শিগগির আসবে। একথা শুনে ফুলকি হতাশ হয়ে বলে, মাগো! জন্মের পর থেকে শুনে আসছি বাবা আসবে। কিন্তু বাবা তো আর আসে না। ফুলকির কথা শুনে রহিমা কান্না চেপে রাখতে পারে না। আঁচলে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলে।



    মায়ের কান্না দেখে ফুলকি মা’কে আবেগে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, কেঁদো না মা। তোমার কান্না যে আমি সইতে পারিনা। তুমিই তো বলেছো, বাবা আসবে। তাহলে কাঁদছো কেন? মেয়ের কথায় রহিমা কান্না বন্ধ করে। কিন্তু চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা। মনে মনে ভাবে, মেয়েকে আর কতদিন মিথ্যা আশ্বাস দেবে। কারণ সে তো দিন দিন বড় হচ্ছে। সবকিছু বুঝতেও শিখেছে। স্বামীর কথা চিন্তা করে রহিমার বুক এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে চাপা ভয় আর আতঙ্ক এসে ভর করে।

    ফুলকির জন্মের দু’মাস আগে তার বাবা রহিম চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে যায়। ভিসা জটিলতার কারণে আর দেশে ফিরতে পারেনি। ফোনে প্রতিবারই জানিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু কিছুদিন আর শেষ হয় না। বুঝতে শেখার পর ফুলকি একথা শুনে আসছে। জন্মের পর থেকেই সপবাবার আদর থেকে বঞ্চিত। তাই বাবার আদর পাওয়ার জন্য তার মনটা সারাক্ষণ কাঁদে। স্কুলে বাবারা যখন নিজের মেয়েকে আনতে যায়। তখন তা দেখে ফুলকি খুব কষ্ট পায়। এসময় তার মন বিষাদে ভরে চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবে, বাবা দেশে থাকলে তাকেও আনার জন্য স্কুলে আসতো। কিন্তু তা তো হবার নয়। কারণ বাবা থেকেও নেই। দুঃখে তার কচি মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।

    ফুলকি রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে, সে বাবার ফটো দেখেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাকে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মায়ের কাছ থেকে শুনেছে বাবা বাস্তবে ফটোর চেয়ে অনেক সুন্দর। ঠিক যেন রুপকথার রাজপুত্র। বাবার চেহারার প্রশংসা করার সময় মা কেন জানি আনমনা হয়ে যায়। দু’চোখের কোনে পানি জমে ছলছল করতে থাকে। বাবাকে না পেয়ে ফুলকি বাবার একটি ফটো তার কাছে রেখেছে। মাঝে মাঝে এই ফটো বের করে দেখে আর কথা বলে। সবসময় বাবার আদর পেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে বাবার কোলে চড়তে। রাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমুতে। আবার কখনও ইচ্ছে করে বাবার হাতে খেতে এবং তাকে নিজের হাতে খাওয়াতে। কিন্তু তার মনের সব আশা নিরাশাই থেকে যায়। কবে পূরণ হবে তা জানা নেই। অনেক বেদনায় মনটা নীরবে কেঁদে মরে। বেদনাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বাবার জন্য তার বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

    ফুলকি মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তার মনের ইচ্ছেগুলো বাবাকে বারবার জানায়। শুনে বাবা হেসে বলে, এবার বাড়িতে যেয়ে তোকে অনেক আদর করবো। তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। মাঝে মাঝে তোকে নিয়ে বেড়াতে যাবো। তোর সব ইচ্ছে পূরণ করবো। বাবার কথা শুনে ফুলকির হৃদয়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বাবা কথা দিয়েছে। শুধু তোমার আদর নয়,বাবা ফিরে আসার পর তার আদরও পাবো। বাবা বলেছে, আর বিদেশে না গিয়ে আমাদের সাথেই থাকবে। শুনে রহিমা খুব খুশি হয়। আজ দশবছর হতে চললো সেও স্বামী ছাড়া একাই মেয়ের সাথে বসবাস করছে। কিন্তু এই দুঃখ সে কাউকে বলতে পারেনা।

    এক সপ্তাহ পর একদিন সকালে সৌদিআরব থেকে স্বামীর ফোন পেয়ে রহিমা চিৎকার করে বলে, ফুলকি রে! খুশির খবর। তোর বাবা আগামিকাল বাংলাদেশে আসছে। বাবার আসার কথা শুনে ফুলকি মা’কে জড়িয়ে ধরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। স্বপ্নীল মোহে আছন্ন হয়ে মন ভরে যায় প্রশান্তিতে। হৃদয়ের সব উষ্ণতা নিগড়ে দেখে আকাশ ছোঁয়ার রাশি রাশি স্বপ্ন। বাড়িতে খুশির আমেজের সাথে বইতে থাকে স্বস্তির সুবাতাস। বাবাকে কী খাওয়াবে না খাওয়াবে তা নিয়ে বারবার মা’কে প্রশ্ন করেই যায়। আবেগ আর উত্তেজনায় রাতে ফুলকির ঘুমই হয়না। ভাবে, রাতটা কখন শেষ হবে? সময় কাটতেই চায় না। রাতটা কেন জানি খুব বড় মনে হয়। মনে মনে ভাবে, দেখার সাথে সাথে সে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর নেবে। বাবাকেও অফুরন্ত আদর করবে। জন্মের পর থেকে কাছে না পাওয়ায় বাবার আদর নেওয়া হয়নি এবং বাবাকেও আদর করা হয়নি। তাই এবার সে বাবাকে আর কোথাও যেতে দেবে না। সারাজীবন কাছে রাখবে। বাবাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।

    ফুলকি মা ও চাচার সাথে খুব সকালে মাইক্রোবাসে গ্রাম থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
    আনন্দে সে গাইতে থাকে, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। তার গান শুনে মা হেসে ফেলে। মায়ের সাথে সাথে সুমি আজ খুব ভালোভাবে সেজেছে। জন্মের পর এবারই সে প্রথম বাবাকে দেখবে। বাবাকে নিয়ে তার স্বপ্ন যেন ফুরাতেই চায়না। মনে মনে ভাবে, পরীর মতো ডানা থাকলে সে উড়ে এয়ারপোর্টে যেত। এসময় হঠাৎ মাইক্রোবাসের চাকা পাংচার হয়ে যায়। চাকা ঠিক করে রওয়ানা হতে আধাঘন্টা সময় লাগে। ফুলকি ও তার মা স্বপ্নীল মোহে আছন্ন হয়ে বুনে চলে রঙিন স্বপ্ন। এ স্বপ্নের যেন শেষ নেই। মাইক্রোবাস গন্তব্যের পথে এগোতে থাকে।

    এয়ারপোর্টে ঢুকতেই মোড়ে রাস্তায় প্রচন্ড ভীড়ে ফুলকিদের মাইক্রোবাস আটকে যায়। কিছুক্ষন আগে এখানে এক দুর্ঘটনায় একজন প্রবাসি মৃত্যুবরন করেছেন। তাকে রাস্তায় একপাশে শুইয়ে রাখা হয়েছে। চাদরে ঢাকা থাকলেও লাশ শনাক্তের জন্য মুখ খোলা । এসময় হঠাৎ রহিমার চোখ লাশের ওপর পড়তেই সে আঁতকে ওঠে মাইক্রোবাসের দরজা খুলে দৌড়ে সেখানে যেয়ে দেখে, দুর্ঘটনায় নিহত লোকটি তার স্বামী অর্থাৎ ফুলকির বাবা। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লাশ জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে, ওগো! আমরা যে তোমাকে নিতে এসেছিলাম। অথচ আমরা আসার আগেই তুমি ফাঁকি দিয়ে অনেক দূরে চলে গেলে। কেন এমন করলে? এখন মেয়েকে কী জবাব দেব? তোমাকে সে তো আর দেখতে পাবেনা। রহিমার কান্না আর আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা। সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া।

    রহিমা জানতে পারে, ফুলকির বাবা সৌদি আরব থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে তাদের সন্ধান না পেয়ে একটি ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। রাস্তার মোড়ে টার্ন নিতেই হঠাৎ একটি মাইক্রোবাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ট্যাক্সি ক্যাবটি দুমড়ে মুচড়ে ফুলকির বাবা রহিম মারাত্মকভাবে জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরন করে। রহিমা স্বামীর লাশ জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছে। এদিকে মাইক্রোবাসে বসে থাকা ফুলকি মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনে সেখানে ছুটে যায়। তাকে দেখে রহিমা কেঁদে কেঁদে বলে, ফুলকি রে! আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। রহিমের লাশ দেখিয়ে বলে, ইনি তোর বাবা। আমাদের সাথে দেখা না করে চলে গেছে না ফেরার দেশে। একথা শুনে ফুলকিও লাশের ওপর আছড়ে পড়ে এবং জড়িয়ে ধরে মুখ ও কপালে অনবরত চুমু খেয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, বাবা! এতদিন পর এসে কেন তুমি লাশ হয়ে দেখা দিলে? আমাকে আদর না করে কেন তুমি এভাবে চলে গেলে? আমি যে এতিম হয়ে গেলাম বাবা? এখন কাকে বাবা বলে ডাকবো? কে আমাদের দেখবে? তুমি যে চলে গেলে চির অবসরে। কত শখ ছিল তোমার কোলে প্রথমবারের মতো চড়বো। তোমাকে নিয়ে ঘুরবো। রাতে তোমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো। তোমার সাথে স্কুলে যাবো। ছুটির দিন আমরা একত্রে ঘুরে বেড়াবো। কিন্তু তা আর হলো কই বাবা? ফুলকি ও তার মা কিছুতেই এ মৃত্যু মেনে নিতে পারে না। তারা অবিরাম কেঁদেই চলে।

    আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলে বাবার লাশ নিয়ে ফুলকি মা ও চাচাসহ মাইক্রোবাসে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ফুলকি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে মৃত বাবার মাথা কোলে নিয়ে অনবরত আদর করেই যায়। তার আদর যেন ফুরাতেই চায় না। বেঁচে থাকতে না পারলেও মৃত্যুর পর বাবাকে শেষ বারের মতো এই আদর। এ হৃদয় বিদারক দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে রহিমা আঁচলে চোখের পানি মুছেই চলে। তাদের উচ্ছাসে রেখা টেনে দেয় শোক। আর এই শোক বহন করে গাড়ি এগিয়ে চলে গ্রামের পথে।

    লেখক ও কলামিস্ট :

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মগের মুল্লুক (কবিতা)

    ১১ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম