• শিরোনাম


    ফিলিস্তিন সংকটের উৎস এবং সমাপ্তি | -ডঃ মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম

    অনলাইন সংস্করণ | ১৫ মে ২০২১ | ১০:২৮ অপরাহ্ণ

    ফিলিস্তিন সংকটের উৎস এবং সমাপ্তি | -ডঃ মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম

    ফিলিস্তিন সংকট মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংকট। ইসরাইলী সৈন্য কর্তৃক সেখানে প্রতিনিয়ত মুসলমানদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। মুসলমানদেরকে তাদের স্বীয় জন্মভূমি থেকে তাড়িয়ে তথায় জোরপূবর্ক ইহুদীরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই সংকটের সুত্রপাত। এ সংকট শুধু ফিলিস্তিনীদের জন্য নয়, বরং সারা মুসলিম উম্মাহকে দাবিয়ে রাখার একটা দীর্ঘ পরিকল্পণার অংশ। পত্র-পত্রিকাসহ অন্যান্য মিডিয়া মারফত আমরা সমকালীন ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে কমবেশী অবগত আছি। এই দীর্ঘ সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র, এবং ভবিতব্য ঘটনাবলী সংক্রান্ত আমাদের সম্যক ধারণা থাকা একান্ত প্রয়োজন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে এখানে সে ধারণা দেয়া হবে ইনশাল্লাহ।

    ধর্মীয়, ঐতিহাসিকও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রথমতঃ অত্র এলাকা বা তার আশেপাশেই শুরু হয় মেসোপোটেমিয়ান সভ্যতা যা বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা। এর অনেক পরে শুরু হয় প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা। দ্বিতীয়তঃ মানব সভ্যতার জন্মভূমি হওয়ার আল্লাহপাক সেখানে দুই তৃতীয়াশং নবী রসূল প্রেরণ করেন। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম (আঃ)কেও ফিলিস্তিন এলাকায় দাওয়াতি কাজের জন্য পাঠানো হয়। তৃতীয়তঃ সেখানে রয়েছে হযরত সুলাইমান (আঃ) কর্তৃক নির্মিত মসজিদুল আকসা যা মুসলমানদের প্রথম কেবলা ছিলো। চতুর্থতঃ ভৌগলিক এবং কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এ এলাকাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ড (Heart of Muslim Land), কারণ এটা আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের মুসলিম দেশসমূহের মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করেছে।



    ইহুদী সম্প্রদায়ঃ কিছু প্রাথমিক ধারণাঃ
    ইহুদী সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচত। তাদের এক নাম ‘বানি ইসরাইল’। হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর একটা খেতাব ছিলো ‘ইসরাইল’ (আল্লাহর বান্দা); আর এ জন্যই তার বংশধরকে ‘বানি ইসরাইল’ বা ইসরাইলের বংশধর বলা হয়। বর্তমানে তথকাথিত ইসরাইল রাষ্ট্র এ খেতাব থেকেই এসেছে। ইংজেরীতে তাদেরকে JEW এবং তাদের ধর্মকে বলা হয় JUDAISM যা এসেছে ‘‌জুডিস’ নামক এক স্থানের নাম থেকে। পবিত্র কোরআনে তাদেরকে ‘আহলিল কিতাব’, ‘বানি ইসরাইল’, এবং ‘ইহুদী’ এ তিন নামেই সন্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে আরো একটি খেতাবে তাদেরকে আমরা চিনে থাকি, খেতাবটা হলো জায়োনিষ্ট (Zoinist), যা এসেছে Zoin নামক জেরুসালেমে অবস্থিত এক পাহাড়ের নাম থেকে।

    ১৮৮০ সালে Nathan Birnbaum নামে এক অষ্টেলীয়ান ইহুদী তাদের তথকথিত পবিত্র ভুমিতে ফিরে যাওয়োর জন্য একটি আন্দোলনের প্রস্তাব করেন এবং সেই আন্দোলনের নাম হিসেবে এ নামটি ব্যবহার করেন। ১৮৮৭ সালে Theodore Herzl নামক এক হাংগেরিয়ান ইহুদী Der Judenstaat (The State of the Jews) নামক একটি বই লেখেন এবং International Zoinst Organization নামে একটি পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের রুপরেখা দাঁড় করান। তিনিই এই আন্দোলনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ইসরাইলী রাষ্ট্র এবং তাদের উপনিবেশ ঐ আন্দোলনেরই ফলশ্রুতি।

    ইহুদীরা নিজেদেরকে খোদার ‘পছন্দের একমাত্র বান্দা’ (Chosen people of God) মনে করে এবং এ কারণেই কেউ ধর্মান্তরিত হয়ে ইহুদী হতে চাইলেও ইহুদীরা তাকে গ্রহণ করেনা। আল্লাহপাক বানি ইসরাইলকে এক সময় বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা তা ধরে রাখতে পারেনি। কারণ পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী তাদের অধিকাংশ ইতিহাসই পাপাচার, হত্যা, লুণ্ঠন, ব্যভিচার, হঠকারিতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মিথ্যাচার, শিরক প্রভৃতিতে পরিপূর্ণ। এসবের ফলে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা থেকে স্খলিত হয়ে আল্লাহ কর্তৃক “অভিশপ্ত জাতি” হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তাদের কীর্তিকলাপ এবং অভিশপ্ত হওয়ার কারণে তারা রাষ্ট্রহারা হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। যুগে যুগে তারা চরম শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছে। ফেরাউন, রোমান, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কর্তৃক তারা পাইকারিহারে হত্যার শিকার হয়। মনে করা হয়, আল্লাহর অভিশাপের ফলশ্রুতি হিসাবে তারা কখনোই স্থায়ী কোন নিরাপদ বাসস্থানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তাদের নিজেদের কিতাব (তাওরাতে) বর্ণিত তাদের জঘন্য পাপাচারের কয়েকটা দৃষ্টান্ত নিম্নরূপঃ

    ১। হযরত সুলাইমানের (আঃ) পর ইসরাইল সাম্রাজ্য দুইভাগে বিভক্ত হয়ঃ জেরুসালেমের ইহুদীয়া রাষ্ট্র এবং সামারিয়ার ইসরাইল রাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াই হয়। হানানী নবী ইহুদী রাষ্ট্রের শাসক আশা’কে সতর্ক করলে নবীকে কারারুদ্ধ করা হয়।

    ২। বা’ল দেবতার পূজার জন্য ইহুদীদের তিরস্কার করলে ইসরাইলী রাজা ‌আখিতাব স্বীয় স্ত্রীর প্ররোচণায় ইলিয়াস নবীকে হত্যার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। নবী তখন সিনাই উপদ্বীপের পর্বতাঞ্চলে আশ্রয় নেন। তিনি বদদোয়া করেনঃ “হে আল্লাহ! বানি ইসরাইল তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে; তোমার নবীকে হত্যা করেছে তালোয়ারের সাহায্যে এবং একমাত্র আমিই জীবিত আছি। তারা আমার প্রাণ নাশের চেষ্টা করছে…” (১ রাজাবলী, ১৭ অধ্যায়, ১-১০ শ্লোক)।

    ৩। সত্য ভাষণের অপরাধে মিকাইয়া নামে অপর এক নবীকে কারারুদ্ধ করে তারা (১ রাজাবলী, ২২ অধ্যায়, ২৬-২৭ শ্লোক)।

    ৪। ইহুদী রাষ্ট্রে যখন প্রকাশ্যে মূর্তিপূজা ও ব্যভিচার চলতে থাকে এবং হযরত যাকারিয়া (আঃ) যখন এ ব্যাপারে সোচ্চার হন, তখন ইহুদি রাজা ‌ইউআস এর নির্দেশে তাকে মূল হাইকেলে সুলাইমানীতে মাকদীস ও জবেহ ক্ষেত্রের মাঝখানে প্রস্তারাঘাতে নিহত করা হয়।

    ৫। দাওয়াতের কারণে ইয়ারমিয়াহ নবীকে মারধর ও কারাবুদ্ধ করা হয়। এরপর ক্ষুধা ও পিপাসায় শুকিয়ে মেরেফেলার জন্য রশি দিয়ে বেধে কর্দমাক্ত কুয়ার মধ্যো ঝুলিয়ে রাখা হয় (যিরমীয়, ১৫ অধ্যায়)।

    ৬। ব্যভিচারের সমারোচনা করলে মামুস নবীকে দেশ থেকে বহিস্কারের কড়া নির্দেশ দেয়া হয় (মামুস ৭, ১০-১৩ শ্লোক)।

    ৭। ইহুদী শাসক হিরোডিয়াসের দরবারে ব্যভিচার ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচান করলে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) কে প্রথমতঃ কারারুদ্ধ করা হয়। পরে বাদশাহ নিজের প্রেমিকার নির্দেশে তাকে শিরচ্ছেদ করে। এরপর নবীর কর্তিত মস্তক থালায় করে বাদশাহ তার প্রেমিকাকে উপহার দেয় (মার্ক, ৬ অধ্যায়, ১১-১৯ শ্লোক)।

    ৮। সত্যের দাওয়াতের জন্য হযরত ঈসা (আঃ)কে কারারুদ্ধ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তৈরী করা হয়। রোমান শাসক পিতালিস ইহুদীদের বললো, ‍”আজ ঈদের দিন, তোমাদের স্বার্থে ঈসা অথবা বারাব্বাকে মুক্তি দিতে চাই। কাকে দিব?” ইহুদীরা বললো, “বারাব্বাকে মুক্তি দিন আর ঈসাকে ফাসি দিন।” (মথি ২৭, ২০-২৬ শ্লোক)। হযরত ঈসা (আঃ) ইহুদীদের জন্য বদ দোয়া করেনঃ

    Ah, sinful nation, A people loaded down with wickedness [with sin, with injustice, with wrongdoing], Offspring of evildoers, Sons who behave corruptly! They have abandoned (rejected) the LORD, They have despised the Holy One of Israel [provoking Him to anger], They have turned away from Him.

    ৯. ইহুদীদের পরিণতি সম্পর্কে খোদার ভবিষ্যদ্বাণীঃ Just as it pleased the LORD to make you prosper and multiply, so also it will please Him to annihilate you and destroy you. And you will be uprooted from the land you are entering to possess. Then the LORD will scatter you among all the nations, from one end of the earth to the other, and there you will worship other gods, gods of wood and stone… Among those nations you will find no repose, not even a resting place for the sole of your foot. There the LORD will give you a trembling heart, failing eyes, and a despairing soul.… (Deuteronomy 28:63-65).

    জায়োনিস্ট আন্দোলনঃ
    ইহুদীরা তাদের কিছু ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দাবীর প্রেক্ষিতে ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে জায়োনিষ্ট আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটিয়েছে। তাদের ধর্মীয় দাবী হলো তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী ইব্রাহীমকে বলা হয় ফিলিস্তিন যেতে। তিনি ফিলিস্তিনে পৌঁছার পর খোদা তাকে বলেন, “ইব্রাহীম দাঁড়াও, তোমার ভুখন্ড হলো নীল ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝখানে”। তাওরাতের এ বর্ণনা অনুসারে ইহুদীরা মনে করে ফিলিস্তিন ভুখন্ড হল খোদার পক্ষ থেকে তাদেরকে দান করা ভুখন্ড (Promised land)। কিন্তু তাদের এ ধর্মীয় দাবীর ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন আছে তা হলোঃ

    ১। তাওরাত বর্তমানে অবিকৃত অবস্থায় নেই, কাজেই তাওরাতে যেসব কথা বলা আছে সেগুলোর সবগুলোই যে সত্যিকারে খোদার বাণী তার কোন স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণ নেই। তাওরাতে বর্ণীত ইহুদীদের ধর্মীয় দাবী বিশ্বাস করাও মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

    ২। ধরে নেয়া হল, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে আল্লাহপাক এ বিশাল ভূখন্ড দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেটা ইহুদীদের ভাগেই পড়বে। ইব্রাহীম (আঃ) এর দুই সন্তান ছিলো, ইসহাক এবং ইসমাইল। ইহুদীরা এসেছে হযরত ইসহাকের পুত্র ইয়াকুব (আঃ) বংশ থেকে। ইসহাক ও ইসমাইল উভয়ের ভাগ সেখানে থাকার কথা।

    ৩। আসল ব্যাপার হলো এ ভূখন্ডকে কোন গোত্রের জন্য ওয়াদা করা হয়নি বরং সূরা আল বাকারা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটা সত্যিকার বিশ্বাসী বা ইমানদারদের জন্য আল্লাহপাক ওয়াদা করেছেন। কাজেই সত্যিকার ইমানের দাবী নিয়ে ইহুদীরা কখনোই এ ভূখন্ড পাওয়ার যোগ্য নয়। তাছাড়া এ ওয়াদা ছিল শুধু একটা বিশেষ সময়ের জন্য।

    ৪। দুনিয়ার ইতিহাস হলো ইমান আর কুফরের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এ দ্বান্দ্বিক ইতিহাসে আল্লাহপাকের তাওহীদের বার্তাবাহক হলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। কাজেই আল্লাহর ওয়াদা অনুসারে শেষ নবীর অনুসারী মুসলমানেরাই উক্ত ভূখন্ডের আসল দাবীদার।

    ৫। কোন বিশেষ গোত্রের (ইব্রাহীমের পুত্র) জন্য এটা ওয়াদা করা হয়েছে, এটা ধরলেও বতর্মান ইহুদীরা যে সত্যিকারে ইব্রাহীম বা ইয়াকুবের পুত্র তারও প্রমাণের কোন উপায় নেই। কারণ ইব্রাহীম (আঃ) দুনিয়াতে এসেছিলেন ৬০০০ বছর পূর্বে। তাছাড়া ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে ইসরাইলে বর্তমানে যেসব ইহহুদীরা বসবাস করছে, তাদের অধিকাংশই কাম্পিয়ান এবং কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী ককেশাস এলাকা থেকে এসেছে। তাদের ৯০ ভাগ নবম ও দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খেলাফত এবং খ্রীষ্টানদের দ্বিমুখী চাপের মধ্যে মাঝামাঝি ধর্ম হিসাবে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। খুবই অল্প সংখ্যক ইহুদীই ফিলিস্তিনের আদিবাসী। প্রায় ১৮০০ বছর ধরে ফিলিস্তিন এলাকা ইহুদী শূন্য ছিলো। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় ৭০০০ লোক রাশিয়া থেকে আসে যাদের মধ্যে ৩০ ভাগ ছিলো অইহুদী। তারা চাকুরীর সন্ধানে এসে ইহুদী পরিচয় দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

    ধর্মীয় দাবীর পাশাপাশি ইহুদীদের এতিহাসিক দাবী হলোঃ প্রায় চারশ বছর ধরে তারা এ এলাকা শাসন করেছে, কাজেই এটা তাদেরই ভূখন্ড। খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ থেকে ৯৬৩ পর্যন্ত এ এলাকা শাসন করেন হযরত দাউদ (আঃ)। এরপর দাউদ (আঃ) এর পুত্র সোলাইমান (আঃ) শাসন করেন খৃষ্টপূর্ব ৯২৬ পর্যন্ত। হযরত সুলাইমান (আঃ) এর মৃত্যুর পরই ইহুদী রাষ্ট্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সব মিলে প্রায় ৪০০ বছরের শাসন ছিলো ইহুদীদের। কিন্তু তাদের এ দাবী মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য কয়েকটি কারণেঃ

    ১। দাউদ এবং সোলাইমান (আঃ) আল্লাহর নবী ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও ছিলেন আল্লাহর নবী এবং রাসুল। কাজেই মুহাম্মদ (সঃ)-ই হলেন এর সত্যিকার উত্তরাধিকারী।

    ২। ইহুদীরা ইতিহাসের কোন এক সময়ে ৪০০ বছর এ এলাকা শাসন করেছে বলেই এটা তাদের এলাকা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে এই সাথে এটাও মেনে নেয়া দরকার যে মুসলমানরা ১৩৫০ বছর ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে, কাজেই এটা মুসলমানদের ভূখন্ড। মুসলমানেরা ইহুদীদের তিনগুনেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিন শাসন করেছে।

    ৩। ইহুদীরা যে ফিলিস্তিনের আদিবাসী তারও কোন প্রমাণ নেই। এ এলাকায় প্রায় ১১,০০০ বছর পূর্বে সভ্যতা শুরু হয়। দুনিয়ার প্রথম শহর হল ফিলিস্তিনের জেরিকো (খৃষ্টপূর্ব ৮০০০)। খৃষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ২,৫০০ এর মাঝে আরব থেকে বনুকেনান (কেনান গোত্র) ফিলিস্তিনে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে; আর এটা ঘটেছিলো বনি ইসরাইলীদের আসার ১,৫০০ বছর পূর্বে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যখন ফিলিস্তিনে এসেছিলেন, তার আগেই ফিলিস্তিনে জনবসতি ছিলো এবং বনুকেনান ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্য কোথাও যায় নাই। ইসলামের আগমণের পর বনুকেনান (ফিলিস্তিনের আদিবাসী) অন্যান্য গোত্রের সাথে মিশে যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। বতর্মানে ফিলিস্তিনের মুসলমানেরা তাদেরই বংশধর। কাজেই আদিবাসী হিসাবেও ফিলিস্তিন এলাকা মুসলমানদেরই প্রাপ্য।

    এখন প্রশ্ন হলো ইহুদীদের ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক দাবী ভূয়া হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপ কেন ইহুদীদের পক্ষ নিলো? এর পিছনে অনেক কারণ রয়েছেঃ

    ১. ইউরোপে মাটির্ন লুথার এবং জন ক্যালভিন কতৃর্ক প্রণীত ও প্রচারিত প্রটেস্টট্যান্ট আন্দোলন এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ আন্দোলন ইহুদী, খ্রীষ্টান সবাইকে তাদের আসল কিতাব (তাওরাত, ইনজিল) সরাসরি অধ্যয়নের অনুপ্রেরণা যোগায়। তাওরাতে উল্লিখিত ইহুদীদের ধমীর্য় দাবীর বিষয়টি সম্পর্কে ইহুদী খ্রীষ্টান সবাই এ সময় অবগত হয়। অবগতির ক্ষেত্র পার হয়ে পরবতীর্তে এটা একটা সংস্কৃতির রূপ পরিগ্রহ করে। জেরুসালেমে ফিরে যাওয়ার বিষয় নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও বই পুস্তক, উপন্যাস, ফিল্ম, প্রভৃতি রচিত হতে থাকে। অতীত নিয়ে স্মৃতিকাতর (nostalgic) ইহুদীরা নিজেদের এবং পাশ্চাত্য মননে তৈরি করে এক শক্তিশালী diaspora, নিজেদের অতীত ভূমিতে ফিরে আসার অভিপ্রায়ে।

    ২. নেপোলিয়ানের সময়ে এ সাংস্কৃতিক রূপ পরিবর্ধিত হয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। নেপোলিয়ান ১৭৯৮ সালে মিশরের ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদীদের পুনবার্সনের ঘোষণা দেন।

    ৩. উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে সারা ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনা মারাত্মক রূপ লাভ করে। এ জাতীয়তাবাদী ঢেউ ইহুদীদেরকে চরমভাবে নাড়া দেয় এবং তারা তাদের নিজস্ব এবং আলাদা ভূখন্ড সৃষ্টির দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ইহুদীবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও ইহুদীদেরকে ইউরোপ থেকে বহিষ্কারের ব্যাপারে সরকারকে বাধ্য করে। ফলে ইহুদীদের জন্য আলাদা বাসস্থানের (রাষ্ট্রের) পথ সুগম করতে অনেক ইউরোপীয় সরকার বাধ্য হয়।

    ৪. এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা রেখেছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি। ওসমানীয়া খেলাফতের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে ব্রিটিশ শক্তি মুসলমানদেরকে সারা জীবনের মত পরাস্ত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়। আর এ নিয়ে ব্রিটেনে অনুঠিত হয় দুই বছর ব্যাপী (১৯০৫-১৯০৭) কনফারেন্স। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে দীঘর্মেয়াদী কনফারেন্স। এই কনফারেন্সে মুসলিম বিশ্বকে চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু করার জন্য কতকগুলো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিলোঃ সুয়েজখাল ও ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি ‌মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডে (অর্থাৎ ফিলিস্তিনে) এমন এক জাতিকে পুনবার্সন করা যারা হবে মুসলমানদের চরমশক্র। কনফারেন্সের এই সুপারিশ অনুসারে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বালফোর জায়োনিষ্ট আন্দোলনের নেতা Lionel Walter Rothschild কে চিঠি লিখেন যেটা The Balfour Declaration নামে খ্যাত। চিঠিতে বলা হয়ঃ Britain would use its best endeavors to facilitate the establishment in Palestine of a national home for the Jewish People. (অর্থাৎ ফিলিস্তিনে ইহুদী জাতির জন্য একটা জাতীয় বাসস্থান প্রতিষ্ঠান ব্যাপারে ব্রিটেন সবার্ত্মক প্রচেষ্টা চালাবে)। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর এ ঘোষণা দেয়া হয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনের অর্ধাংশ দখল করে। ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তারা পুরো ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। এরপর থেকে সেখানে শুরু হয় ইহুদী পুনর্বাসন। চীন থেকেও ইহুদীরা ফিলিস্তিনে পুনবার্সিত হয়। এ প্রক্রিয়া ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে পুরোদমে চলতে থাকে এবং ১৯৪৮ সালে ইহুদী আগন্তুকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজারে। ব্রিটিশরা ইহুদীদের জন্য অথর্নৈতিক এবং রাজর্নৈতিক কাঠামো নির্মাণ এবং নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদীদের মাঝে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরীরও ব্যবস্থা নেয়া হয়। ১৯৪৮ সালে ইহুদীদের ছিলো অস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৭০ হাজার সৈন্য। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে সে সময় আরব দেশসমূহের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। যেমন জডার্নের সৈন্য ছিলো মাত্র ৪,৫০০। জডার্নের ৫০ জন কমান্ডারের মধ্যে ৪৫ জন্যই ছিলো ব্রিটিশ। মিশরের সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১০ হাজারের মত। সব মিলে পুরো আরব বিশ্বে মাত্র ৩০,০০০ সৈন্য ৭০ হাজার ইসরাইলী সৈন্যের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, যা প্রয়োজনে তুলনায় ছিলো খুবই নগণ্য। এখান থেকেই যাত্রা শুরু হলো জায়োনিষ্ট উপনিবেশ।

    জায়োনিস্ট উপনিবেশ ও ফিলিস্তন সংকটঃ
    বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া জায়োনিস্ট উপনিবেশের সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পটভূমিকা নিম্নরূপঃ

    ১৮৯৫: ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা ছিলো পাঁচ লাখ, তার মধ্য মাত্র ৪৭ হাজার ছিলো ইহুদী। ইহুদীরা পুরো ভূখন্ডের মধ্যে ০.৫ ভাগের মালিক ছিলো। এসব ইহুদীরা ফিলিস্তিনের আদিবাসী নয় বরং ১৬০৯ সালে স্পেন থেকে পালিয়ে এসে ফিলিস্তিন এলাকায় বসবাস শুরু করেছিল।

    ১৮৯৬: থিয়োডোর হারজেল তার রচিত বই The State of the Jews এ জায়োনিস্ট আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন।

    ১৮৯৭: সুইজারল্যান্ডে প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এবং ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য World Zionist Organization (WZO) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

    ১৯০৪: চতুর্থ জায়োনিস্ট কংগ্রেসে আজের্ন্টিনায় ইহুদীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

    ১৯০৬: জায়োনিস্ট কংগ্রেসে মত পরিবতর্ন করে তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চূড়ান্ত ভাবে ফিলিস্তিনকে বেছে নেয়া হয়।

    ১৯১৭: The Balfour Declaration সম্পন্ন হয়। ঐ সময়ে ফিলিস্তিনের মোট ৭ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ছিলো ৫ লক্ষ ৭৪ হাজার মুসলমান এবং ৭৪ হাজার খ্রীষ্টান। ইহুদী ছিলো ৫৬ হাজার।

    ১৯১৯: ফিলিস্তিনবাসীরা তাদের প্রথম জাতীয় কনফারেন্সে Balfour Declaration এ বিরোধিতা করে।

    ১৯২০: The San Remo conference অনুসারে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে নিজেদের উপনিবেশিক প্রশাসন জারি করে এবং হারবার্ট স্যামুয়েল নামে এক স্বঘোষিত জায়োনিস্টকে ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের প্রথম হাইকমিশনার নিয়োগ করে।

    ১৯২২: The Council of the League of Nations ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়।

    ১৯৩৬: মুসলমানদের জন্য ভূমি বাতিলকরণ এবং ইহুদী পুনবার্সনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনবাসীরা ৬ মাসের জাতীয় ধমর্ঘট পালন করে।

    ১৯৩৯: ব্রিটিশরা এক শ্বেতপত্র ছাপিয়ে ইহুদী পুনবার্সনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ পূবর্ক দশ বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। জায়োনিস্টরা এই সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করে এবং এক বিশাল সন্ত্রাসীগ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে ফিলিস্তিনবাসী ইহুদীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সমরাভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্যঃ সেখান থেকে সবাইকে সরিয়ে জায়োনিস্ট (ইহুদী) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

    ১৯৪৭: জাতিসংঘ ফিলিস্তিনবাসীদের জন্য (যারা ছিলো জনসংখ্যার ৭০ ভাগ এবং ৯২ ভাগ ভূখন্ডের মালিক) মোট ভূখন্ডের মাত্র ৪৭ ভাগ অনুমোদন করে (UN Resolution 181)।

    ১৯৪৮: ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে। জায়োনিস্টরা কোন পরিসীমা নিণর্য় না করেই ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। আরব দেশগুলোর সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনবাসীদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে।

    ১৯৪৯: জায়োনিস্টরা ফিলিস্তিনের ৭৭ ভাগ ভূখন্ড দখল করে নেয়। প্রচুর মুসলমানকে হত্যা করে এবং দশ লক্ষ ফিলিস্তিনবাসীকে (মুসলমান) তাদের স্বীয় বাসভূমি থেকে জোরপূবর্ক বিতাড়িত করে। পশ্চিম তীর (West Bank) জর্ডানের এবং গাজা মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

    ১৯৬৪: The Palestine Liberation Organization (PLO) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

    ১৯৬৫: আরবদের সাথে ইসরাইল নতুন যুদ্ধ শুরু করে এবং পশ্চিম তীর, গাজা সহ ফিলিস্তিনের বাকী এলাকাটুকু ইহুদীরা দখল করে নেয়। একই সাথে সিরিয়ার গোলান চুড়া এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপও দখল করে।

    ১৯৭৩: আরবদের সাথে ইসরাইলের আবার যুদ্ধ হয় এবং ইসরাইলীরা প্রথমবারেরমত পরাজয় বরণ করে কিন্তু ভূখন্ড লাভে মুসলমানেরা ব্যর্থ হয়।

    ১৯৭৪: রাবাতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পিএলওকে পুনর্গঠন করা হয় এবং নিষ্পেষিত ফিলিস্তিনবাসীদের উউদ্ধারের পূর্ণ দায়িত্ব পিএলওকে প্রদান করা হয়। এবছরই জাতিসংঘ পিএলওকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পিএলও‌’র চেয়ারম্যান ইয়াসীর আরাফাত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ প্রদান করেন।

    ১৯৭৮: আমেরিকার ছত্রছায়ায় ইসরাইল এবং মিশর Camp Devid চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

    ১৯৮২: PLO কে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ইসরাইল বাহিনী লেবানন আক্রমন করে এবং নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। হাজার হাজারর মুসলমানদেরকে হত্যা এবং গৃহহারা করা হয়।

    ১৯৮৩: জাতিসংঘ এক সম্মেলনের ডাক দেয় এবং সেখানে অন্যান্য প্রতিনিধিদের মাঝে পিএলওকেও ফিলিস্তিনবাসীদের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদানের আহবান করা হয়।

    ১৯৮৭: অধিকৃত ভূখন্ডে ফিলিস্তিনবাসীরা ‘ইনতিফাদা’ (পূনর্জাগরণ) আন্দোলন শুরু করে।

    ১৯৮৮: ফিলিস্তিন নেতা, আবুজিহাদ কে তার তিউনিসের বাসগৃহে হত্যা করা হয়। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক তাকে হত্যা করেন (১৪ই এপ্রিল)। ৩১ শে জুলাই জডার্নের রাজা হুসেন ঘোষণা করেন যে তিনি আর পশ্চিম তীরকে নিজের রাজ্যের অংশবিশেষ মনে করেন না। ১৫ই নভেম্বর UN Partition Plan 181 অনুসারে Palestine National Council আলজিয়ার্সে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রদান করে। ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগদানের জন্য ইয়াসির আরাফাতকে আহবান করা হলেও ইহুদী লবীর কারণে আমেরিকা তাকে ভিসা প্রদানে বিরত থাকে। ফলে ফিলিস্তিনের জন্য জেনেভাতে বিশেষ সেশনের আয়োজন করা হয়। এরপর শুরু হয় আমেরিকা ও পিএলও’র মধ্যে মতবিনিময়।

    ১৯৮৯: মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত The European Economic Community (EEC) সম্মেলনে শান্তি আলোচনার জন্য পিএলও’র প্রতি আহবান জানানো হয়।

    ১৯৯০: গাজার ৭ জন ফিলিস্তিনি মুসলমানকে তেলআবিবের নিকট ইহুদী কতৃর্ক নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় (মে ২০)। ইয়াসীর আরাফাত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিকট ফিলিস্তিনবাসীদের জানমাল এবং পবিত্র স্থানসমূহের নিরাপত্তার জন্য জরুরী বাহিনী প্রেরণের আবেদন করেন। ফিলিস্তিনে জরুরী নিরাপত্তা বাহিনী প্রেরণের বিরুদ্ধে আমেরিকা ভেটো প্রদান করে। অধিকৃত এলাকার ফিলিস্তিন নেতৃবর্গ তাদের অনশন ধমর্ঘট শেষে আমেরিকাকে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। বাগদাদে অনুষ্ঠিত আরব সম্মেলনে ফিলিস্তিনী ইনতিফাদাকে জোর সমথর্নপূবর্ক অধিকৃত এলাকায় সোভিয়েত ইহুদীদের পুনবার্সনের বিরোধিতা ও নিন্দা করা হয়। ২০শে জুন পিএলও আমেরিকার সামরিক অভিযানকে বিরোধিতা এবং প্রত্যাখ্যান করে। আমেরিকা পিএলও’র সাথে আলোচনা বাতিল ঘোষণা করে। ২৬ শে জুন ডাবলিন সম্মেলনে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলকে দায়ী করা হয় এবং সোভিয়েত ইহুদীদের অধিকৃত এলাকায় পুনবার্সনের নিন্দা করা হয়। ২রা আগস্ট শুরু হয় উপসাগরীয় সংকট।

    ১৯৯১: ১৬ই জানুয়ারী উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়। ২৩ শে সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য PNC আলজিয়ার্সে উপস্থিত হয়। ৩০ শে অক্টোবর মাদ্রীদে মধ্যপ্রাচ্য শাস্তি সম্মেলন শুরু হয়। ওয়াশিংটনে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জডার্ন ও লেবাননের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।

    ১৯৯২: ২৩ শে জুন ইসরাইলের নিবার্চনে লেবার পার্টি জয়লাভ করে এবং লেবার পার্টি কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। আগস্ট ২৫ তারিখে ৬ষ্ঠ বারের মত ওয়াশিংটনে আরব-ইসরাইলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলতে থাকে।

    ১৯৯৩: সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে পিএলও এবং ইসরাইল একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়।

    ১৯৯৪: ৪ঠা মে কায়রোতে গাজা এবং জেরিকো চুক্তি সম্পন্ন হয়, ২৯ শে আগষ্ট সম্পন্ন হয় ক্ষমতা হস্তান্তর চুক্তি। এরপর হেবরনের মসজিদ ৪৭ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে শান্তিচুক্তির অনেক কিছুই ভেস্তে যায়।

    ১৯৯৫: সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখে ওয়াশিংটনে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

    ১৯৯৬: জানুয়ারীতে ফিলিস্তিনে নিবার্চন সম্পন্ন হয়।

    ১৯৯৭: নেতানিয়াহুর সরকার নতুন করে পুনবার্সন কমর্কান্ড শুরু করে এবং পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নেয়। শান্তি আলোচনা ব্যহত হয়।

    এরপর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকেই অগ্রসর হতে হতে এখন চরম আকার ধারণ করেছে।

    এখন প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলী সৈন্যদের গুলীতে প্রাণ হারাচ্ছে অধিকারহারা ফিলিস্তিনী আবাল বৃদ্ধবণিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পতুর্গীজ, ডাচ, ইংরেজ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ, ফরাসী, রাশিয়ান, জামার্নী প্রভৃতি উপনিবেশিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রশস্ত এবং প্রত্যক্ষ হাত গুটিয়ে নেয়। বহাল থাকে জায়োনিস্ট উপনিবেশে। এরা অন্যান্য উপনিবেশিক শক্তি থেকে ভিন্ন। এদের মোটামুটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ

    ১. জায়োনিস্টদের উপনিবেশের পশ্চাতে রয়েছে তাদের ধমীর্য় এবং ঐতিহাসিক দাবী।

    ২. তাদের পলিসি হলো মুসলমানদের হত্যা করে বা বহিস্কার করে তথায় নিজেদের পুনবার্সন। ১৯৪৮ সালে তারা ৭০% মুসলমানকে জোর করে তাদের স্বীয় বাসভূমি ত্যাগে বাধ্য করে।

    ৩. এরা আগ্রাসনবাদে বিশ্বাসী। তাদের জাতীয় পতাকাই তার বাস্তব প্রমাণ। পতাকায় দুইটি নদীর মাঝখানে তারকার চিহৃ, অথাৎ State between two rivers (নীল এবং ইউফ্রেটিস)। তাদের পরিকল্পণা ফিলিস্তিনসহ সিরিয়া, মদিনা, মিশর, উত্তর কুয়েত, ইরাক এবং খায়বরসহ বিশাল এলাকা নিয়ে বৃহৎ ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকরণ।প্রায় একশ বছর আগে তাদের এই ম্যাপ উদঘাটিত হয়েছিল।

    ৪. তারা উপনিবেশ শুরু করেছে ব্রিটিশদের সহযোগিতায়। ব্রিটিশদের মতো জায়োনিষ্টদের উদ্দেশ্য মুসলমানদেরকে নিশ্চিহৃ করা বা পঙ্গু করে রাখা। ১৯৮১ সালে তারা ইরাকের পরমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে হামলা করে। সুদান তাদের থেকে ২০০০ কিঃমিঃ দূরে হলেও তথাকার বিদ্রোহীদের ইসরাইল সাহায্য করে আসছে।কয়েক বছর আগে পাকিস্তানে দুইজন ইহুদী গ্রেফতার হয়েছিলো। তারা পাকিস্তানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করার জন্য গিয়েছিল।

    ৫. দুনিয়ার বড় বড় শক্তির সাথে তাদের রয়েছে বৃহৎ যোগসূত্র।আমেরিকা, কানাডা, জার্মানী, ফ্রান্স, রাশিয়া ব্রিটেন, প্রভূতি দেশে তারা প্রচন্ড প্রভাবশালী।

    ৬. তাদের রয়েছে দুইশো’র বেশী পারমানবিক বোমা যা পুরো মুসলিমবিশ্ব ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। আন্তজার্তিক রাজনীতি, অথর্নীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অসামান্য প্রভাব। তারা মুসলিম বিশ্বে সমস্যা সৃষ্টিতে তৎপর। ১৯৯৭ সালের দিকে জর্জ সরোস নামে একজন ধরকুবের ইহুদীর কারণেই মালয়েশিয়াসহ পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিপাতিত হয়।

    ৭. জায়োনিস্ট উপনিবেশই বতর্মান বিশ্বে প্রত্যক্ষভাবে চলমান একমাত্র উপনিবেশ।

    ৮. নিষ্ঠুরতা এবং ববরর্তায়ও তারা অগ্রসর। ১৯৪৮ সালের হত্যাকন্ড তার জ্বলন্ত প্রমাণ। যুবক ছাড়াও তারা মহিলা এবং নিষ্পাপ শিশুদেরকে হত্যা করে, তাদের চক্ষু উৎপাটন করে এবং গর্ভবর্তী মহিলাদের পেট কেটে বাচ্চা বের করে পা দিয়ে মথিত করে। বতর্মানের হত্যাকান্ডও তাদের ববরর্তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

    ইসরাইল রাষ্ট্রের ভবিষ্যত ও ইহুদীদের পরিণতিঃ
    তাওরাত এবং পবিত্র কোরআন থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যেঃ (ক) কিয়ামত পযর্ন্ত ইহুদীরা বিভিন্ন কঠোর শাসক দ্বারা নিস্পেষিত ও শাস্তি পেতে থাকবে, (খ) তারা সম্পূর্ণ নিজেদের শক্তিতে কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে না।

    বিশ্লেষকদের মতে, বতর্মানে ইসরাইল রাষ্ট্রের মযার্দা আমেরিকা ও ব্রিটেনের গোলাম বৈ আর কিছু নয়। কখনোই ইসরাইল রাষ্ট্র স্থিতিশীল হবে না। এ রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদ ও শক্তির উপর নির্ভর করে একমাসও টিকে থাকতে পারবে কিনা সন্দেহ। এ রাষ্ট্রটি আমেরিকা ও ইউরোপীয়দের দৃষ্টিতে একটা অনুগত আজ্ঞাবহ “ষড়যন্ত্র কেন্দ্র” ছাড়া অন্য কোন গুরুত্ব বহন করেনা। পাশ্চ্যত্য শক্তিবলয়, বিশেষ করে আমেরিকার সাথে নানা ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে তাদের মদদপুষ্ট ও আশ্রিত হয়ে নিছক ক্রীড়ানক রূপে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ইসলামকে দুবর্ল করার জন্যই পাশ্চাত্য শক্তি ইহুদীদের সমথর্ন দিয়ে যাচ্ছে। কাজেই রাষ্ট্র হিসাবে ইসরাইল কখনোই স্থিতিশীল হবেনা।

    হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, পুরো জেরুজালেম মুসলমানদের হাতে আসবে এবং ইহুদীরা সমূলে ধ্বংস হবে। অধিকাংশ উলামাদের মতে ইহুদীরা সমূলে ধ্বংস হবে বলেই তারা ফিলিস্তিনে একত্রিত হচ্ছে। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেনঃ

    ১) কিয়ামতের পূর্বে তোমরা ছয়টা জিনিস গণনায় রেখঃ ক) আমার মৃত্যু (খ) জেরুসালেম জয়, (গ) তোমাদের এমন গণমৃত্যু যেমন মহামারীতে ভেড়া গণহারে মরে, (ঘ) সম্পদের এমন প্রাচুর্যতা যে একজনকে একশ দীনার দান করলেও সে খুশী থাকবে না, (ঙ) কোন আরবগৃহ সাধারণ দুর্যোগ ও রক্তক্ষয় থেকে রেহাই পাবে না, (চ) তোমাদের এবং বনি আসফার (রোমনদের) মাঝে চুক্তি হবে। পরে তারা চুক্তি ভঙ্গ করে তোমাদের উপর আক্রমণ করবে। তাদের সেনাবাহিনী আট পতাকাধারী হবে এবং প্রত্যেক পতাকার অধীনে থাকবে বার হাজার সৈন্য।

    ২) সে সময় (কিয়ামত) ততক্ষণ আসবেনা যতক্ষণ না তোমরা (মুসলমানেরা) ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবে এবং তাদেরকে হত্যা করতে করতে এমন হবে যে তারা (ইহুদীরা) গাছ ও পাথরের পশ্চাতে আশ্রয় গ্রহণ করবে, আর পাথর ও গাছ বলবেঃ “হে আল্লাহর বান্দা (মুসলিম)! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, তুমি এসে তাকে হত্যা কর”।

    ৩) দাজ্জাল ইসফাহান এলাকার (ইরানে) আবিভূর্ত হবে এবং তার অনুসারী হবে সত্তুর হাজার ইহুদী।

    মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডে অবস্থিত ইসরাইল রাষ্ট্রকে কিছু মুসলিম শাসক মেনে নিলেও মুসলিম উম্মাহ সম্ভবত কখনোই মেনে নিবে না, অন্যদিকে ইহুদীরাও তাদের স্বঘোষিত রাষ্ট্র ছেড়ে যাবেনা। ফলে ফিলিস্তিন সংকটের আশু সমাধান পুরো অন্ধকারে ঢেকে আছে। ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ নিয়ে পূর্বে অনেক আলোচনা চললেও বিশ্বমোড়লদের এ ব্যাপারে আগ্রহ অনেক কম।

    বিশ্লেষকদের ধারণা, অশান্তি, অরাজকতা, আর রক্তক্ষয় চলতে থাকবে বছরের পর বছর যতদিন না মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়।মুসলমানদের বতর্মানে নাজুক পরিণতির পিছনে রয়েছে তাদের অনৈক্যতা। আমেরিকা আজ সামান্য ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে গিয়ে পুরো আরব বিশ্ব সহ সারা বিশ্বের প্রায় দুইশো কোটি মুসলমানের বিরাগভাজন হচ্ছে। অনেকের মতে, মুসলমানদের এ নাজুকে পরিস্থিতির সমাধান হচ্ছে তাদের একতা, মজবুত ইমানী জজবা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং সে অনুসারে শক্তি সঞ্চয়। অন্যথায়, তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে ইমাম মেহেদীর আগমণ পর্যন্ত যখন জয় হবে জেরুসালেম, ধ্বংস হবে ইহুদী রাষ্ট্র, দূর হবে ফিলিস্তিন সংকট, এবং প্রতিষ্ঠিত হবে পরম শান্তি।

    ওয়াল্লাহু আ’লাম।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম