• শিরোনাম


    ‘ফাতাওয়ায়ে জামেয়া’: বাংলাভাষায় ফতোয়ার আকর গ্রন্থ -মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস, অতিথি লেখক | ১০ এপ্রিল ২০২০ | ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ

    ‘ফাতাওয়ায়ে জামেয়া’: বাংলাভাষায় ফতোয়ার আকর গ্রন্থ -মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস

    বই: ফাতাওয়ায়ে জামেয়া (১-১০)
    লেখক: মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.
    প্রকাশনায়: বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স
    প্রকাশকাল: আগস্ট ২০১২ ইং,
    বিক্রয়মূল্য: পনেরশ টাকা

    জীবনের যে কোন সমস্যার কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সমাধানকে ফতোয়া বলা হয়। মুসলমানের যিন্দেগীর সর্বক্ষেত্রেই এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র, অর্থনীতি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সবই এর প্রয়োগক্ষেত্র। ফতোয়া ইসলামী শরীয়তের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ফতোয়া ব্যতীত ইসলামী শরীয়ত পরিচালনার কথা কল্পনাও করা যায় না। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই ফতোয়ার ধারা শুরু হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা., সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈন, তাবে-তাবেঈন এবং আইম্মায়ে মুজতাহিদীন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত উম্মতের উলামায়ে কেরাম এই ধারাবাহিকতা সুরক্ষিত রেখেছেন।
    আরবী ও উর্দূভাষায় ফতোয়াগ্রন্থের আধিক্য থাকলেও বাংলাভাষায় তা নিতান্ত অপ্রতুল ছিলো। তবে বর্তমানে উলামায়ে কেরামের অক্লান্ত পরিশ্রমে উক্ত অঙ্গনে আশার আলো ফুটে ওঠছে। আলহামদুলিল্লাহ, ফাতাওয়া গ্রন্থ প্রকাশের ধারাবাহিকতা দিনদিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এসবের মাঝে জামেয়া কোরআনিয়া লালবাগ থেকে প্রকাশিত ‘ফাতাওয়ায়ে জামেয়া’ বিশেষ গুরুত্বের দাবী রাখে। কারণ, কলেবর বৃহৎ হবার পাশাপাশি গ্রন্থটি দ্বীনের এমন এক মারকায থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যেখান থেকে ফতোয়াবিরোধীদের সকল কুটচাল নস্যাৎ করে দেয়ার আন্দোলনের ডাক এসেছিল। আসুন, ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত উপাখ্যান শুনি মুফতী মাওলানা তৈয়ব দা.বা.-এর বর্ণনায়। তিনি বলেন, “২০০১ সালের পহেলা জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানার ব্রাঞ্চ থেকে রায় দেওয়া হয়, বাংলাদেশে সবধরনের ফতোয়া অবৈধ। ইসলাম ও শরিয়াহর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক এ রায়ে চমকে ওঠেন এ দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী এবং উলামায়ে কেরাম। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। ঠিক সে সময় আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. হাইকোর্টের রায়দাতা দুই বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানাকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে ফতোয়া প্রকাশ করেন। এবং হাইকোর্টের ফতোয়া-নিষিদ্ধের রায়ের বিরুদ্ধে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেন। পুরো দেশ তখন আমিনী রহ.-এর এই সাহসী আহ্বানে সাড়া দিয়ে গর্জে ওঠে। দলমত নির্বিশেষে হকপন্থী সমস্ত উলামায়ে কেরাম তাঁকে সমর্থন জানান। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ., বায়তুল মুকাররমের খতীব আল্লামা উবায়দুল হক রহ.-সহ সকলেই এ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আন্দোলন চলতে থাকে দুর্বার গতিতে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারও এ আন্দোলন দমানোর জন্য দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পন্থা বেছে নেয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ডাকে সারা দেশে হরতাল কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল। ওই দিনই দুপুরের দিকে মুফতি আমিনী রহ.-কে লালবাগ থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারপর একই দিন রাতের বেলা দিনাজপুরের একটি জনসভা থেকে ফেরার পথে গাজিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-কে। সরকার ভেবেছিল আন্দোলনের এই দুই প্রাণপুরুষকে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু ফল দাঁড়াল ঠিক এর বিপরীতটা। জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিলে যেমন হয়, পুরো বাংলাদেশ সেভাবে গর্জ উঠল তাঁদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে শুরু হয় নজিরবিহীন আন্দোলন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় হুজুর রহ. ঘোষণা দেন মুফতি আমিনী ও শায়খুল হাদীস রহ.-কে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মপ্রাণ মানুষ রাজপথে থাকবে। তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আন্দোলনের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। আন্দোলন তুমুল বেগে চলতে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে পুলিশ ও বিডিআর সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্দোলনরত আপামর জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এতে অসংখ্য মানুষ গুরুতর আহত হবার পাশাপাশি ৬ জন সাধারণ মুসল্লি ও মাদরাসা ছাত্র শাহাদত বরণ করেন।’’ -(fateh24.com ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৯)
    শহীদানের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলার যমীনে ফতোয়ার মর্যাদা সমুন্নত হয় । এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমান ফতোয়ার মান রক্ষাকারী মুফতী আমিনী রহ. ও বি-বাড়িয়ার ৬ শহীদের কাছে Fণী হয়ে থাকবে। আর এই রক্তক্ষয়ী দাস্তানের সম্পৃক্ততায় মুফতী আমিনী রচিত ‘ফাতাওয়ায়ে জামেয়া’ও অমর হয়ে থাকবে ইতিহাসের সোনালী পাতায়।
    কিতাবটি সম্পর্কে গ্রন্থপ্রণেতা ও ফতোয়ার স্বাক্ষরকারী মুজাহিদে মিল্লাত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. লিখেন,“বাংলাভাষায় লিখিত এই ফাতাওয়া গ্রন্থটি আলেম-উলামা, ইমাম-খতীব, মুফতিয়ানে কেরামের জন্য বহু জটিলতা নিরসনে বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া ফতওয়া বিভাগের ছাত্ররা গ্রন্থটিকে তাদের শিক্ষাজীবনে গাইড লাইন হিসেবে কাজে লাগাতে পারবেন নিঃসন্দেহে। সাধারণ পাঠকরাও জীবন পথে বহু সমস্যার সমাধান বের করে নিতে পারবেন গ্রন্থটির সাহায্যে।”
    সম্পাদকীয় শিরোনামে বলা হয়, “যে স্থানে ও যে যুগে মুসলমানের অস্তিত্ব থাকবে, সে স্থানে ও সে যুগে ফতওয়া ও দারুল ইফতার অস্তিত্বও প্রশ্নাতীতভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠতে বাধ্য। সেই অপরিহার্যতারই একটি সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে লালবাগ জামেয়ার দারুল ইফতা। লালবাগ জামেয়ার দারুল ইফতার কার্যক্রম শুরু হয় জামেয়ার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই। মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ খান রহ.-এর মাধ্যমে এর প্রাথমিক সূচনা। আর মুফতী আবদুল মুঈয রহ.-এর হাতে দারুল ইফতার সূচনা হয় পূর্ণাঙ্গ আঙ্গিকে।…। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে মুদ্রণ ও প্রকাশনা কর্ম-সাধনা তেমন একটা না থাকলেও সর্বপ্রথম বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসে লালবাগ জামেয়া। এর মাঝিমাল্লার ভূমিকায় শক্ত হাতে দাড় টেনে ধরেন লালবাগ জামেয়ার প্রধান পরিচালক, প্রধান মুফতী, শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী। …। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস গ্রন্থটি আলেম-উলামা, ইমাম-খতীব, মুফতী, ছাত্র-শিক্ষকসহ সাধারণ পাঠকদেরও চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।”
    কিতাবটির গ্রন্থনা ও সম্পাদনার কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন বরেণ্য কতিপয় আলেম-সাহিত্যিক। তারা হলেন: *মুফতী মাওলানা তৈয়ব হুসাইন *মাওলানা ফয়জুল্লাহ *মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল *মুফতী সাখাওয়াত হুসাইন। সার্বিক বিবেচনায় বক্ষমান ফতোয়াগ্রন্থটি অনন্য ও অসাধারণ। বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য বিরাট নিয়ামত। অতএব, মূল্যবান এই কিতাবটি সকল শ্রেণীর পাঠকের সংগ্রহে থাকা একান্ত প্রয়োজন।।



    লেখক: মুফতি ছালেহ বিন আব্দুল কুদ্দুস
    প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক: শাহবাজপুর, বি-বাড়িয়া, বাংলাদেশ।
    ১০/৪/২০২০ইং, শুক্রবার।।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম