• শিরোনাম


    পদ্মফুলের দেশ ‘গোঁসাইস্থল’ -ম.কাজীএনাম

    -ম.কাজীএনাম, স্টাফ রিপোর্টার | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৯:০০ পূর্বাহ্ণ

    পদ্মফুলের দেশ ‘গোঁসাইস্থল’  -ম.কাজীএনাম

    ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার গোপিনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ড এর ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেষে বয়ে গেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম একটা ছায়াঢাকা সবুজ-শ্যমলের অভয়ারণ্য ছোট্ট একটি গ্রাম ‘গোঁসাইস্থল!’

    আয়তনে ছোট হলেও বৃটিশ আমল থেকে নিজস্ব মৌজা নিয়ে গঠিত প্রাকৃতি বেস্টিত বৈচিত্র্যময় এই গ্রামটি! উপজেলার সাথে রয়েছে গ্রামের সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবেশ হলেও ইলেক্ট্রিসিটি আছে অনেক বছর থেকে।



    ভারত থেকে বয়ে আসা ছিনাই নদী, গ্রামের মেটোপথ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনমোগ্ধকর ছোট্ট গ্রামটি দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য।
    কবি বলেন,
    ‘গ্রামটি আমার ছবির মতো!’
    ছবির মতো বলতে যা বুঝায়, গোঁসাইস্থল গ্রামটি ঠিক তেমনই।
    মুক্তিযুদ্ধে এলাকাটি ছিলো ২নং সেক্টরে। গ্রামের দক্ষিন পশ্চিমে লক্ষিপুর গ্রামের পশ্চিম দিকে ছিল পাকিস্তানিদের বাঙ্কার।১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর আমাদের প্বার্শবর্তী গ্রাম লতুয়ামুড়া এবং চকচন্দ্রপুরে পাকবাহিনীদের সাথে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। মুক্তিবাহিনী সাহস আর গংগাসাগর, উজানিস্বার মুক্তিযুদ্ধাদের সহায়তায় বাড়াই, চন্ডিদ্বার, গোঁসাইস্থল, গানপুর, জগান্নাথপুর লুতয়ামুড়া কিছুটা পাকমুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পর শুরু হয় গ্রামের গ্রামের নতুন অধ্যায়।

    গ্রামের নামকরন নিয়ে নানান কথা শুনা যায়..
    গ্রামের প্রবীন লোক হিসাবে মরহুম আলহাজ্ব যদু মিয়ার বরাতে লোকমুখে শুনা যায় যে, প্রায় ৯০০ বছর পুর্বে অাজকের সিলেট অঞ্চল তৎকালে বিতালং রাজ্যভুক্ত ছিলো। শ্রী সনাতন ছিলেন ওই ‘বিতালং’ রাজ্যের রাজকুমার। অাধ্যাত্বিকতার টানে রাজ্য ছাড়েন রাজকুমার সনাতন। বহু এলাকা ঘুরে শেষতক তিনদিকে বিলে ঘেরা গোঁসাইস্থল টিলার উপর বটগাছের তলায় অাসন পাতেন সনাতন। টিলা ভূমিটির পূর্বদিকে বিলের ওপারে হিন্দু সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ একটি গ্রামের নাম গোঁসাইস্হল। যার পাশেই অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহি গ্রামের প্রধান আকর্ষন পদ্মবিল।পরবর্তীতে সাধক সনাতন গোস্বামী প্রয়াত হলে এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। যিনি সোনাতন গোঁসাই নামের ছিলেন। তার নামের গোঁসাই থেকেই গোঁসাইস্থল নামের উৎপত্তি।

    সেখান থেকে মন্দির এবং গোঁসাইস্থল বাজার। একটা সময় ছিল, যখন এই বাজার ছিলো খুবই জমজমাট। আশেপাশের আট-দশটি গ্রাম বাড়াই, জগ্নাথপুর, ব্রাহ্মনমুড়া, ভুল্লাবড়ি, সৈয়দপুর, রামপুর, দৌলতপুর, দিঘিরপার ও গানপুর সহ বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ সমাগম হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং সঠিক পরিচর্চার অভাবে বাজারটির সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। হারিয়েছে বাজারের শ্রী।

    সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যমলা গ্রাম বাংলার প্রকৃতির প্রতিরূপ যেনো গ্রামটিকে দূর থেকে কাছে টানে।

    গ্রামের মৌলিক ও প্রধান ঐতিহ্য হচ্ছে পদ্মবিল। চারদিকে ছোট বড় পাহাড় বেষ্টিত একটি বিল। দক্ষিনে ছিনাই নদী। দেখলে মনে
    হয় পাহাড় বিলটিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীদের ভীরে পদ্মবিলের চারপাশ লোকারণ্য হয়ে থাকে। এলাকার অনেকেই ডিঙি দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়ে দেয়। অনেকে আন্তরিক ভাবে কাজটি করিলেও পেশা হিসেবে কাজ করছে অনেকেই। সে হিসেবে পদ্ম সিজনে এলাকার শ্রমজীবী মানুষ পাচ্ছে সুবর্ণ সুযোগ।

    বৈশাখের ধান কাটার পর বর্ষার পানি যখন ধানি জমিগুলো তলিয়ে যায়, পদ্মরা তখন জেগে উঠে। এই জেগে উঠা অনেকটা প্রতিযোগিতা মুলক। কার আগে কে দেখবে সূর্যের আলো। এবং ফুটামাত্র নিজেদের ঐতিহ্য বিলের বুকে এমন বিস্তার করে যে, এটা তাদের বসতি স্থায়ী। ফুলেফুলে বিল ফুলেল হয়ে যায়।
    কিন্তু কয়েক দিনের মাঝেই ফুলগুলো হারিয়ে যায়, ফুল থেকে খাবার উপযোগী অসাধারণ একটা পানিফল ফলে। ফের নতুন সুর্যোদয় দেখার জন্য নতুনেরা ফূটে উঠে। ফের হারিয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার ফুলেরা পাপড়ি মেলে বিলকে করে তুলে ‘পদ্মময়’ কাননকুসুম।

    রাঙা ফুলের গন্ধে বিভোর, শ্রাবনের অঝোর ধারায় বিলের
    জল থাকে টইটুম্বুর। ঢেউয়ের তালে তালে পদ্ম ও শাপলারা খেলা করে মোহনীয় চিত্তে। যে বিল পদ্মফুল, শাপলা-শালুক, পানিফল দিয়ে ভরপুর এই বিলটির দিকে তাকালে হৃদয়ে প্রেমের বাশি বেজে উঠে। এই বুঝি আমি পদ্মের প্রেমে পড়লাম। এই বুঝি হারিয়ে গেলাম পদ্মফুলের দেশে।

    আষাঢ় মাস থেকে শুরু করে আশ্বিন মাস পর্যন্ত প্রচুর পদ্মফুল দেখা যায়। ফুল শেষে এই বিলে সাধারনত এক ফসলি ইরি ধান চাষ করে। সেই সাথে অনেকে সবজিও চাষ করে থাকে।

    গ্রামটিতে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কেন্দ্রিয় মসজিদ,একটি ফুরকানিয়া মাদ্রাসা এবং একটি পাঞ্জেগনা মসজিদ। চিত্তবিনোদনের জন্য রয়েছে ৩০ একর জায়গায় নির্মিত জোবেদা পার্ক। আছে এতিহ্যবাহি গোঁসাইস্থল বাজার। আছে বৃটিশ আমলের ক্যাম্প। যা বর্তমানে বি.জি.বি কোম্পানি সদরে পরিনিত হয়ছে। আছে পূরনো মন্দির। কসবা থানার সবচেয়ে প্রাচীনতম এবং বড় পহেলা বৈসাখের ঐতিহ্যবাহি মেলা এই গোঁসাইস্থল গ্রামেই অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র দুই হাজার জনসংখ্যা নিয়ে গঠিত গ্রামে শিক্ষার হার নেহায়েত কম নয়। ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী নিয়েই গ্রামটি পূর্ণতা পেয়েছে।

    সাহিত্যের ভাষায় ঘোলাভরা ধান, ঘোয়ালভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ এই গ্রামে রয়েছে। সব মিলিয়ে সত্যিই গ্রামটি বিমুগ্ধকর। পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে এলাকার সুনাম অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। পর্যটকরা নির্ভয়ে এখানে আসতে পারে। তাদের কোন প্রকার সমস্যা হয়না। বলা যায়, পদ্মফুলের মতোই এলাকার মানুষের প্রস্ফুটিত মন।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম