• শিরোনাম


    নীতিহীন রাজনীতি দেশের মঙল করতে পারে না

    লেখক: মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া । | ২০ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৯:০৮ অপরাহ্ণ

    নীতিহীন রাজনীতি দেশের মঙল করতে পারে না

    সাধারণ অর্থে রাজনীতি শব্দটিকে বিশ্লেষন করলে আমরা বুঝি নীতির রাজা বা শ্রেষ্ঠ নীতি অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ নীতির আদর্শে রাজনীতি গঠিত। কিন্তু আজ আমরা রাজনীতি বলতে নীতিহীনতার প্রাধান্যই লক্ষ্য করছি।
    বিশেষ করে বাংলাদেশে এখন অপরাজনীতির ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। দিন দিন জনগণের মধ্যে অপরাধের প্রতি ঘৃণা কমে যাচ্ছে। মানুষ অপরাধ করে বীরত্ব প্রকাশ করছে। অনিয়মই আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে। অপরাধ করার পর অপরাধ বোধ কমে যাচ্ছে। অপরাধ করাটা আজ ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এবং অপরাধীকে সমাজের স্মার্ট পার্সন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
    একটি দেশের রাজনীতির উপর দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিরাজমান। যদি দেশকে একটি ঘরের সাথে তুলনা করি তবে রাজনীতি নিঃসন্দেহে ঘরের ছাদ। ঘরের ছাদে ফাটল থাকলে যেমন বৃষ্টির পানি আটকানো যায় না ঠিক তেমনি কোন দেশের রাজনীতিতে ফাটল থাকলে সে দেশকে নিরাপদ আবাস হিসেবে গণ্য করা যায় না।
    রাজনীতি সংশোধন না হলে দেশের সবকিছুই ত্রুটি পূর্ণ থাকবে। রাষ্ট্রীয় আইন কানুন, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় শাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিছুই সম্ভব নয়।
    রাজনীতি একটি জাতির সকল কিছুর উর্দ্ধে। রাজনীতিবিদগণ যে কোন রাষ্ট্রের পথ প্রদর্শক। তাদেরকে সকল স্তরের মানুষেরা অনুসরন করে। যদি পথ প্রদর্শকরা ভন্ড ও নীতিহীন হয় তবে সমাজের ভবিষ্যত কোন দিকে যাবে! তাই নীতিহীন রাজনীতিতে দেশ পরিচালিত হলে দেশের মানুষকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
    আমি মনে করি কোন মানুষই অপরাধী নয়। মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহন করে না। প্রত্যেকটি মানুষ নিষ্পাপ হয়েই জন্মগ্রহন করে। একটি মানুষের খারাপ হওয়ার পেছনে খারাপ পরিবেশকেই দায়ী করছি। যে পেটের দায়ে অপরাধ করে সে অপরাধী নয়। বরং যারা মনের খায়েশে অপরাধীদের জন্ম দেয় বা যারা কারো অধিকার হরণ করে অপরাধ করতে বাধ্য করে তারাই প্রকৃত অপরাধী। গ্রামে ভূত তাড়ানোর একটি গল্প শুনেছিলাম- যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়াব সেই সরিষার মধ্যেই যদি ভূত থাকে তবে ভূত তাড়াব কি দিয়ে? যদি শিক্ষক অজ্ঞ হয় তবে ছাত্ররা বিজ্ঞ হবে কিভাবে? তাই নেতারা যদি নীতিহীন হয় তবে অনুসারীদের অবস্থা কি হবে এটা যে কেউ বলতে পারবে। সুতরাং নেতাদের হতে হবে জ্ঞানী ও সচ্চরিত্রবান তাহলেই তো সাধারন জনগণ পরিবর্তিত হবে।
    একটি ১০০ তলা ভবনের ২য় থেকে ১০০ তলা পর্যন্ত যেমন ১ম তলার উপর দাড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি একটি দেশের সকল শ্রেণীর মানুষ রাজনীতির উপর দাড়িয়ে থাকে। দক্ষ মাঝির উপর নৌকার যাত্রীদের গন্তব্য সুনিশ্চিত হয় আর মাঝি যদি অদক্ষ হয় তবে যাত্রীদের গন্তব্য অনিশ্চিত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
    কথায় আছে-
    একটি আলোর কণা পেলে
    লক্ষ প্রদীপ জ্বলে,
    একটি মানুষ মানুষ হলে
    বিশ্বজগৎ টলে।
    আমাদের বাংলাদেশের সমাজের আধার দূর করার জন্য এরকম একটি আলোর কণা দরকার যে একা নিজে জ্বলে লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করবে। আমাদের দেশে অনেক জনগন বেড়েছে কিন্তু মানুষ বাড়েনি। সত্যিকার অর্থে মানুষের মত একটি মানুষ একটি জাতিকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
    বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধরনের রাজনীতিবিদ নেতৃত্ব দিচ্ছে-
    এক- ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ
    দুই- উত্তরাধীকারী রাজনীতিবিদ
    তিন- ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদ
    ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ:- আজকাল রাজনীতির অপব্যবহারের কারণে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে ঢুকে পড়ছে। রাজনীতিকে তারা সেকেন্ড এবং সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা মনে করছে। এবং ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের আগে কয়েক কোটি টাকা খরচ করছে হাজার কোটি টাকা লাভের আশায়। আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করলে এটা হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ লাভ না থাকলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করে না। তারা বোঝে বিনিয়োগ মানেই লাভ, যেখানে লাভ নেই সেখানে তারা বিনিয়োগ করার প্রশ্নই উঠে না। তাই ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদরা দেশের কোন মঙ্গল করতে পারে না। ভালো ব্যবসায়ী ভালো সংগঠক হতে পারে ভালো মুনাফা অর্জন করতে পারে কিন্তু জাতির জন্য যা কিছুই করুক না কেন তাই সে বিনিয়োগ হিসেবে ধরে এবং উচ্চ লাভের প্রত্যাশা করে। ব্যবসায়ীরা রেডিমেট নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং মাল কড়ি কামানোর বিশাল সুযোগ হিসেবে রাজনীতিকে ব্যবহার করে।

    উত্তরাধীকারী রাজনীতিবিদ:- পরিবারতন্ত্রের বেড়াজালে আজ বাংলাদেশের রাজনীতি চরমভাবে পেচিয়ে গেছে। আর তাইতো উত্তরাধীকারীরা রাজনীতিকে পৈতিৃক সম্পত্তির মত করে ব্যবহার করছে। যুগে যুগে আমরা যেসব আলোচিত নেতার আবির্ভাব দেখেছি তারা অধিকাংশই বিশাল রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহন করেনি। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির ছেলেমেয়েরাই যদি ভালো নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য হত তবে- আব্রাহাম লিঙ্কন,বারাক ওবামার মত বস্তির ছেলেরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারত না। নরেন্দ্র মোদীর মত চা বিক্রেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারত না। মাওলানা ভাসানীর মত নেতার আবির্ভাব হত না।



    আর সবচেয়ে বড় কথা হলো নেতৃত্ব যদি উত্তরাধীকার সূত্রেই পাওয়া যেত তবে কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হত না।ভারতবর্ষ কোনদিন স্বাধীনতার আলো দেখত না, গান্ধিজীর মত জন্ম হত না। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে উঠে আসা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে স্বাধীন বাংলাদেশ হতো না।
    দক্ষ নেতৃত্ব স্রষ্টার অমূল্য দান। মহৎ কিছু অর্জনের জন্য মহান ত্যাগ করতে হয়।

    ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদ:- আজকের সমাজে ধান্দাবাজ নেতার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী। ভূইফোর সংগঠনের নামে সভাপতি হয়ে চলে চাঁদাবাজির মহোৎসব। সমাজসেবার নামে ফটোবাজি করে সমাজের বারোটা বাজায় এসব দালালরা। এমপি মন্ত্রীদের ছবির সাথে পোষ্টার ছাপিয়ে এরা বড় নেতা বনে যায়। অনুষ্ঠানের নামে চলে চাঁদা তোলার মহড়া।বঙ্গবন্ধু,জিয়ার ছবি টাঙ্গিয়ে জমি দখল। অপকর্ম ঢাকতে বড় বড় দলের পতাকা তলে আশ্রয়। এসব নেতা বৃষ্টির ফোটার মত ঝুপঝাপ করে নেমে পড়ে।এরা স্বার্থের জন্য কারো পায়ে মাথা ঠেকাতেও দ্বিধা করে না।
    ধান্দাবাজরা রাজনীতিকে আরও বেশী কলুষিত করেছে। এরা খুবই ভঙ্গুর চরিত্রের এবং সমাজে এদের তিক্ততাই বেশী। আমাদের দেশ বেকারত্বের এক মহাসমাবেশ তাই এখানে পেট চালাতেও অনেকে ধান্দা করে। আর অনেকেই চায় না যে গোটা জাতি অভাবমুক্ত হোক কারন সবাই যদি অভাবমুক্ত হয়ে যায় তবে তো ওদের পিছনে ঘুর ঘুর করার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই এই বেকারত্বকে পুঁজি করে বংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল ধান্দাবাজ তৈরির এক বিশাল কারখানা গড়ে তুলেছে।
    আজকের নেতারা বুদ্ধিচর্চা করে তাইতো জাতি আজ মেধাহীন হয়ে পড়ছে। ধান্দাবাজরা সামান্যকিছু লাভের আশায় দেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, খুনি, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীরা যখন সমাজের নেতৃত্বে আসে তখন তারা মানুষের জন্য কি করবে? ধান্দাবাজদের নেতৃত্বে সমাজ কখনোই এগিয়ে যাবে না।তাই সমাজ থেকে এদের উপড়ে ফেলা উচিত।
    এক্ষেত্রে আমি তাদের দোষারোপ করছি না। সত্যিকার অর্থে যাদের সৎ প্রতিভাবান মেধা আছে তারা সেটা প্রয়োগ করছি না তাইতো ধান্দাবাজরা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশে মেধাবী ভালোমানুষের অভাব নেই। যদি ভালো মানুষের চেয়ে খারাপ মানুষ বেশী হত তবে ঘরবাড়ির চেয়ে জেলখানা বেশী থাকত। আসল কথা হচ্ছে অল্প কিছু খারাপ মানুষের দাপটে ভালো মানুষেরা নিশ্চুপ। আমি এখানে খারাপদের দোষ দিচ্ছি না, দোষ হলো যারা ভালো মানুষ সেজে বসে আছে। তারাও আসলে ভাল মানুষ নয়- ভালো মানুষের মত অভিনয় করা খারাপ মানুষের দল।

    আসুন আমরা সকলেই সচেতন হয়, দেশের কল্যাণে এগিয়ে আসি।
    এবং ইসলাম আল্লাহ পাকের মনোনীত ধর্ম, শান্তির ধর্ম, ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করি আর তাতেই দেশের মঙল হবে, দেশের জনগণের মঙল হবে। আমাদের দেশ একটি সোনার বাংলাদেশ রুপান্তরিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
    আর এটা হবে আদর্শ রাজনীতি।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম