• শিরোনাম


    দৈনিক ৩৬০ বার যাঁর কলিজায় আঘাত করেছি তিনি-মা: এস এম শাহনূর

    | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩:১৪ অপরাহ্ণ

    দৈনিক ৩৬০ বার যাঁর কলিজায় আঘাত করেছি তিনি-মা: এস এম শাহনূর

    “মা গো! আমায় বলতে পারিস কোথায়
    ছিলাম আমি-
    কোন্ না-জানা দেশ থেকে তোর
    কোলে এলাম নামি?”
    (কোথায় ছিলাম আমি/কাজী নজরুল ইসলাম)

    [জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-
    “মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
    “কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
    “এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।]
    (কত ভালবাসি/ কামিনী রায়)



    মা’শব্দটি এক অক্ষরের হলেও এর তাৎপর্য অতুলনীয়। তাই মা হওয়ার স্বপ্নটা প্রায় সব মেয়েরই থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ নারী মা হওয়ার পর এক অনন্য অনুভূতি পান।যে অনুভূতি নারীকে অসাধারণ করে তোলে।একজন নারীর জীবনে মা হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তই ভীষণ সুন্দর। দীর্ঘ নয় মাস শরীরের ভেতরে নানা শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবুও সে যন্ত্রণা তাঁর কাছে সুখের অনুভূতি দেয়।

    শিশু মায়ের গর্ভে আসার পরপর মায়ের মনে কাজ করে এক দারুন অনুভব। মা বুঝতে পারেন যে,আরেকটি নতুন প্রাণ তার শরীরে তরতর করে বেড়ে উঠছে। শিশু মুলত নড়াচড়া শুরু করে ৭ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়স থেকে। প্রথমে এগুলি “বুদবুদ” “কম্পন” বা “রূদ্ধ বাতাস” বলে মনে হতে পারে।কিন্তু শিশুর শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তখন পর্যন্ত ঠিকভাবে গঠিত হয় না বলেই মা তা সেইভাবে বুঝতে পারেন না। সাধারণত শিশুর বয়স ১৬ সপ্তাহ থেকে ২২ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে শিশু তার দেহের নড়াচড়া এমনভাবে করতে শুরু করে যে মা তা টের পেতে শুরু করে। এই সময় আল্ট্রাস্নোগ্রাফীর মাধ্যমেও মা শিশুর এই নড়াচড়া দেখতে পারেন এবং অনুভব করতে পারেন।
    এই সময় হঠাৎ পেটে লাথি, ঘুষি অনুভব করা কিংবা হঠাৎ হঠাৎ পেট ব্যথা শিশুর নড়াচড়ার ফলে মা অনুভব করতে পারেন।
    চিকিৎসকেরা এই নড়াচড়াকে মাছের সাঁতার কাটার সময়ের নড়াচড়া, প্রজাপতির উড়ে বেড়ানোর সময়ের নড়াচড়ার সাথে তুলনা করেছেন। মাঝে মাঝে এই ব্যথা গ্যাস্ট্রিক বা ক্ষুধার জন্য পেটে ব্যথার মত অনুভূত হয়।

    ➤২৪ থেকে ৩৬ সপ্তাহঃ
    এই সময় মহিলারা প্রায়শইঃ তাদের শিশুদের নড়াচড়াগুলিকে বর্ণনা করেন এইভাবে – “গড়াচ্ছে”, “লাথি মারছে”,”খোঁচা মারছে”, “কনুই মারছে”, এবং “টান টান হচ্ছে ”।

    মানবসমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার জন্য এবং সবচে’ বড় কথা, আল্লাহর পক্ষ হতে অর্পিত খেলাফতের দায়িত্ব বহন করার জন্য সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ, সবচে’ কঠিন ও কষ্টকর যে দায়িত্ব তা হলো সন্তান ধারণ ও সন্তান প্রসব। কে পালন করবে এ মহা-দায়িত্ব? মহান আল্লাহ এতদ্ বিষয়ে নারীকে নির্বাচন করেছেন এবং নারীর দেহসত্তা ও মানসসত্তাকে সেভাবেই তৈরী করেছেন।
    তারপর সবচে’গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক প্রতিপালন, তার শিক্ষা, দীক্ষা, নৈতিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন। আজকের শিশু হলো আগামী দিনের আদর্শ মা, আদর্শ বাবা এবং আলিমে দ্বীন, দাঈ ইলাল্লাহ ও মুজাহিদ ফী সাবীলিল্লাহ। তো কে পালন করবে শিশুকে গড়ে তোলার এ মহাদায়িত্ব? এখানেও নারীর ভূমিকাই বড়। মাতৃত্ব দিয়ে নারীকে আল্লাহ গৌরবান্বিত করেছেন, আর পিতৃত্ব দিয়ে পুরুষকে আল্লাহ মুক্তি দান করেছেন। মাতৃত্বের গৌরব অর্জন করার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি নারীকে প্রতিবার জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হয় এবং দীর্ঘ নয় মাস ব্যথার সাগর পাড়ি দিতে হয়। পক্ষান্তরে পুরুষকে শুধু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও ব্যয়ভার বহন করতে হয়।নারীদেরকে আল্লাহ তায়ালা মাতৃত্বের জন্যই বিশেষ করে সৃষ্টি করেছেন। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন উত্তম মা দাও আমি তোমাদেরকে একটি উন্নত জাতি উপহার দেবো’। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সন্তানের প্রথম শিক্ষক হচ্ছে, ‘মা’। রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত’।আল্লাহ তো নারী ও পুরুষ উভয়ের স্রষ্টা। তিনি জানেন, মাতৃত্ব কীভাবে অর্জিত হয়, আর পিতৃত্ব লাভ হয় কার কষ্টের সুফলরূপে। আল্লাহ বলেছেন-
    ﻭﻭﺻﻴﻨﺎ ﺍﻻﻧﺴﺎﻥ ﺑﻮﺍﻟﺪﻳﻪ ﺍﺣﺴﺎﻧﺎ ﺣﻤﺘﻠﻪ ﺍﻣﻪ ﻛﺮﻫﺎ ﻭﻭﺿﻌﺘﻪ ﻛﺮﻫﺎ
    (আর মানুষকে আমি উপদেশ দিয়েছি তার মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করার। তার মা তাকে বহন করেছে কষ্ট করে এবং প্রসব করেছে কষ্ট করে।)
    আল্লাহ তাআলা পিতামাতা উভয়ের প্রতি সদাচারের আদেশ করার পর বিশেষভাবে মায়ের কষ্টের কথা বলেছেন। এভাবে আল্লাহ নারীর মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করেছেন এবং সম্ভবত এ বিষয়েও তাম্বীহ করেছেন যে, পুরুষের পিতৃত্বের পিছনেও নারীর গর্ভযন্ত্রণা ও প্রসববেদনার অবদান।

    ★আসুন চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে জেনে নেই।

    ➤চিকিৎসকেরা বলছেন, গর্ভধারণের ১৬ সপ্তাহ হলে মা বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করেন। অনেক ক্ষেত্রে এটা ২৫ সপ্তাহ থেকেও শুরু হয়। বাচ্চা প্রতি ঘণ্টায় ৩০ মিনিট নড়াচড়া করে। মায়ের বসা বা শোয়া অবস্থায় বাচ্চা নড়াচড়া বেশি করে। সাধারণত রাত ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত বাচ্চা বেশি নড়াচড়া করে।

    ➤চিকিৎসকদের মতে, দু ঘন্টায় কমপক্ষে ১০ বার লাথি মারলে বাচ্চাকে সুস্থ বলে মনে করা যায়। তবে এর কম-বেশিও হতে পারে। তবে ১০ বারের কম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।

    ➤চিকিৎসকদের গবেষণায় দেখা গেছে, তৃতীয় ট্রিমেস্টারে(৭ মাস-জন্মের আগে পর্যন্ত )-মাতৃগর্ভে শিশু ঘন্টায় প্রায় ৩০ বার পর্যন্ত মুভ করে থাকে।
    দিনের একেক সময়ে বাচ্চা একেক হারে নড়তে পারে যেমন- ঠিক মায়ের ঘুমোনোর সময়ে অর্থাৎ রাত ৯টা থেকে ১টার মধ্যে এটা খুব বেশি সক্রিয় থাকবে এবং এই সময় মা বেশি লাথি অনুভব করবেন। শব্দে এবং সংস্পর্শেও অনেক সময় বাচ্চা নড়তে পারে, এমন কি পেটের স্পর্শে থাকা যে কেউ বাচ্চার লাথি টের পেতে সক্ষম হবে।

    ➤ বাচ্চারা ঘুমের সময় কোনো মুভমেন্ট করে না। এই স্লিপিং ফেজ সর্বোচ্চ ৯০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

    ★আসুন জেনে নেই মায়ের কলিজায় কতবার আঘাত করেছি!!

    ➤ মাতৃগর্ভে শিশু যদি দৈনিক ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১২ ঘন্টাও জেগে থাকে,উপরোক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে তাহলে সে মায়ের পেটে দৈনিক ১২ঘন্টা×৩০বার = ৩৬০ বার নড়াচড়া বা মোভ করে।

    ♦একটি শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্ণ সময়কাল হচ্ছে ৪০ সপ্তাহ।

    ➤উপরোক্ত ডাক্তারী তথ্যমতে,গর্ভধারনের ১৬ সপ্তাহ থেকে বাকী ২৪ সপ্তাহ জুড়ে শিশু মাতৃগর্ভে পা ছুড়ে তার সুস্থতার অস্তিত্বের জানান দেন।

    জীবনে অনেক হিসেব আর অংক করেছেন।আসুন এবার আমার কিংবা আপনার পৃথিবীতে আসার পূর্বে মায়ের পেটে কতটি লাথি,গুতা,কিল,ঘুষি মেরেছি তার একটি অংক করি।

    ➤প্রতিটি শিশু মাতৃগর্ভে প্রতি ১ দিনে লাথি মারেন=৩৬০ বার।
    ➤প্রতিটি শিশু মাতৃগর্ভে প্রতি ১ সপ্তাহ বা ৭দিনে লাথি মারেন ৩৬০×৭=২৫২০ বার।
    সুতরাং প্রতিটি শিশু মাতৃগর্ভে ২৪ সপ্তাহে লাথি মারেন ২৫২০×২৪=৬০৪৮০ বার।

    প্রতিটি মানব শিশু মায়ের কলিজায় কমপক্ষে ষাট হাজার,চার শ, আশিটি লাথি বা আঘাত করে নাড়ীর বাঁধন কেটে এই মর্ত্যের পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের জানানা দেন।

    খোকা মাকে শুধায় ডেকে–
    “এলেম আমি কোথা থেকে,
    কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’
    মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
    খোকারে তার বুক বেঁধে–
    “ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।
    (জন্মকথা/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

    পৃথিবীতে একমাত্র মায়ের ভালোবাসা স্বার্থহীন ও শর্তহীন। মায়ের যে ভালোবাসা সন্তানের প্রতি তা অতুলনীয়,নির্ভেজাল ও চির সজীব।আমার মা সহ পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

    ♥ রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ঈয়ানী সাগিরা।
    (সূরা বণী ইসরাইল, আয়াতঃ ২৩-২৫)
    [ অর্থঃ হে আল্লাহ্ আমার মাতা-পিতার প্রতি আপনি সেই ভাবে সদয় হউন, তাঁরা শৈশবে আমাকে যেমন স্নেহ-মমতা দিয়ে লালন-পালন করেছেন।] আমীন।

    💻এস এম শাহনূর
    (উইকিপিডিয়ান,কবি ও গবেষক)

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম