• শিরোনাম


    দুর্ঘটনা, সমাজ ও প্রশ্ন -আর্য সারথী

    | ৩০ মার্চ ২০১৯ | ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ

    দুর্ঘটনা, সমাজ ও প্রশ্ন  -আর্য সারথী

    এখন প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে! লাগামহীনভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে, এত এত মানুষের প্রাণ শেষ হয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল। স্বাভাবিক মৃত্যুর ব্যাপারে জনমনে তৈরি হয়েছে সংশয়,কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি এটা সেটা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। ব্যাপারগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে আশ্চর্যরকম মিল খুঁজে পাবো আমরা৷ অগ্নিকাণ্ড, ভবনধ্বস, ধর্ষণ, পরের সম্পত্তি দখল ইত্যাদি সবই দুর্ঘটনার পর্যায়ে পড়ে। আমরা যারা বাঙলা শব্দকোষ নিয়ে কিঞ্চিৎ নাড়াচাড়া করি তারা বেশ বুঝি দুর্ঘটনা বলতে বোঝায় অমঙ্গলকর বা ক্ষতিকর ঘটনা। তাই সকল প্রকার ক্ষতিকর ঘটনা বাঙলা ভাষার হিসেবে দুর্ঘটনা পদবাচ্য। এখন এই যে লাগামহীন দুর্ঘটনায় একটি সমাজ জর্জরিত হচ্ছে তার কপালে কি আছে? খুবই ভয়ানক প্রশ্ন। কিন্তু আমরা এখনও পর্যন্ত তুলতে ভয় পাচ্ছি। আমাদের মাথার ভেতরে আজ ঘোরাফেরা করে আমরা বুঝি সমাজের অতিরিক্ত কিছু ;সমাজ যায় যাক আমার কি? অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে আমার পাকাধানে মই পড়ার আগে সব ঠিকাছে। খুবই ভয়াবহ ব্যাপার। অথচ আমরা ভুলেই গেছি সমাজ হচ্ছে আমাদের কর্মের সামগ্রিক রূপ যা দিনশেষে বদলায় বা সজীব থাকার জন্য বদলায় আমাদেরই হাত ধরে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। এর মানে, সমাজের অন্য কারো ওপর আঘাত আসা মানে পরোক্ষভাবে আমার ওপরই আঘাত আসা এবং প্রত্যক্ষভাবে আমার ওপর আঘাত হবার সতর্কসংকেত মাত্র। আমরা ভুলে যাই আমাদের যাপিত জীবনের সাধারণ রূপ হিসেবে যা আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত ধরা দিচ্ছে ও আয়নার মত স্বচ্ছ করে দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজ রূপে তার যদি ত্রুটি থাকে কিংবা তার প্রক্রিয়ার মধ্যে যদি যেকোনো প্রকারের দুর্ঘটনা ঘটার সুযোগ বা উদাহরণ থাকে তারমানে সেই ত্রুটি সম্মিলিতভাবে আমাদেরই। আর ঠিক সেই সময় পর্যন্ত আমরা ত্রুটির সৎকার করতে পারবনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সজ্ঞানে কাজ করব৷ সেই কাজটা কি? রূপান্তর! ঠিক তাই। পরিবর্তন নিয়ত ঘটমান। প্রতিক্ষণে পরিবর্তন ঘটে ও ঘটবে। এটা যেকোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের ধর্ম। কিন্তু যখন সেই বিষয়ে ত্রুটি ধরা পড়ে পরিবর্তনের হাজার চেষ্টার পরও সেখানে কিছুই সম্ভব হয়না। দরকার পড়ে রূপান্তর। অস্তিত্বশীল সেই বিষয়ে গতি, পরিবর্তন হতেই থাকে। আবার সেই পরিবর্তন থেকে একটা আপাত দৃশ্যমান বিকাশ চোখে পড়তেও পারে। কিন্তু তাতে সেই ত্রুটির মধ্যেই ঘুরপাক খেতে হয়। সেই সময় সজ্ঞানে ঘটাতে হয় রূপান্তর ।

    আমরা সবখানে যে দুর্ঘটনা দেখছি তা দিনশেষে আমাদের কাছে আশ্চর্যজনকভাবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। কেননা কোনওকিছু যখন ততক্ষণ বলবৎ থাকে দোর্দণ্ডপ্রতাপে যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ তাকে অনৈতিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হ্যাঁ সত্যিই তাই৷বস্তুত এসব ত্রুটি, দুর্ঘটনা নিজের বলবৃদ্ধি করে চলে আমাদেরই যাপনপদ্ধতির মধ্যে এবং সকলের কর্মফল একটু একটু করে সঞ্চিত করে শেষকালে দৈত্যাকার রূপে সামনে আসে দুর্ঘটনা। এই সত্য আমরা আজও উপলব্ধি করতে পারিনি, আফসোস! আমরা সর্বদা গায়েবীভাবে দোষ চাপিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যাই৷ কখনও একে, কখনও ওকে, যারা ভাগ্য ও ঈশ্বর বিশ্বাস করেন তারা ভাগ্য ও ঈশ্বর কে, আবার আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সবাই যেহেতু রাষ্ট্র, সরকার ও আইন মানার মাধ্যমে আস্তিক তাই সবাই মিলে সরকার কে গালাগালি করে ক্ষান্ত হই। হ্যাঁ এখানে গোল বাঁধবে। কেননা মুখ ফস্কে একটা কথা বলে ফেললাম। কি কথা বলেছি তা পাঠক মাত্রেই বুঝবেন তাই দ্বিরুক্তি করছিনা বরং ভবিষ্যতে অযথা গালাগালি খাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেতে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিয়ে রাখি। প্রথমেই বলে রাখি আমি সরকারের লোক নই। সাফ কথা, আমি একজন কমিউনিস্ট, কোনও দলে হয়ত নেই তবুও কমিউনিস্ট। তাও এক প্রজন্মের নয়। ছোট থেকে বড় হয়েছি সমাজবিপ্লবের আদর্শ নিয়েই, পাঠ্যবই দেখার আগে দেখেছি লাল পতাকার মিছিল। তাই কোনও বুর্জোয়া দল বা তৎসংশ্লিষ্ট কিছুর পক্ষ নেবার কোনও কারণ নেই। তাহলে কেন আমি বর্তমানের সকল দোষের জন্য সরকার ও দুর্ঘটনার সাথে সংযুক্ত অন্যায়কারী, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে রাশি রাশি গালি দিয়ে ঘৃণা উগড়ে দিচ্ছিনা? হ্যাঁ, তাহলে নিশ্চয়ই ভেতরে সংশোধনবাদ দানা বেঁধেছে? তাও না। কারণ কমিউনিস্ট রাজনীতি মনে-মননে আছে বলেই বুঝি এসব গালাগালি করে ঘৃণা উগড়ে দিয়ে কিছুই করা যায়নি, যাবেও না। আজকে হয়ত আমরা বড় বড় গরম কথা বলে বিষয়টাকে শেষ করে দেব। কিন্তু একবার ভেবে দেখব কি এইযে কিছু ব্যক্তি ও সরকারকে বড় বড় গালি দিয়ে গালি বিপ্লব বা ঘৃণাবিপ্লব করছি তাতে কি আসল জায়গায় কিছু হচ্ছে? না, হচ্ছেনা। কেন হচ্ছেনা? কারণ আমরা শুধুমাত্র ঘৃণা নির্গমন করে একে দীর্ঘমেয়াদে স্বীকৃতিই দিচ্ছি। কারণ এই যে রাশি রাশি ঘৃণা বের করছি এতে করে মন হালকা হচ্ছে, একটা সময় মনে নতুন চিন্তা আগমনে৷ মাধ্যমে আমরা এই ঘটনাগুলোকে মেনে নিতে ও অন্তত নিজের গা বাঁচিয়ে চলার চর্চা শুরু করব৷ করব জি, আমরা তো করছিই। কারণ সংকট আমাদের যাপন প্রক্রিয়ায়। সমাজ শুধু সেই ব্যাপারটাকে আয়নার মত দেখিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনও মানতে পারছিনা৷



    আজ যে ব্যাপক প্রাণহানি, দুর্নীতি ও অধিকারহীনতা বিদ্যমান তা আমাদের যাপন করা কিংবা খানিক সময়ে উদযাপন করা ব্যবস্থার ফসল৷ যে ব্যবস্থা বা দানবীয় ব্যবস্থায় আমাদের বাস বা যাতে বাস করে এবং যার উৎপাদিত ভোগ সামগ্রী উপভোগ করে আরও ভোগের নেশায় মত্ত হয়ে যাকে পুনরুজ্জীবিত বা পুনরুৎপাদিত করছি সেই ব্যবস্থাটাই এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এই যে মৃত্যুর মিছিল, দুর্নীতি কিংবা অধিকার হরণ সেটা এই ব্যবস্থা দ্বারা উদ্ভাবিত। এই দানবীয় ব্যবস্থা কোনওভাবে আমাদের শান্তি দিতে পারেনা। অথচ আমরা এর মধ্যে মোক্ষলাভের ন্যায় কিছু একটা করতে চাই। কিন্তু আজও আমরা সামাজিকভাবে প্রশ্ন তুলেছি কি? না, তুলিনি। আমাদের সে সৎ সাহস এখনও হয়নি। তাই আমরা পরিবর্তনে বিশ্বাস রাখি। এই পরিবর্তনের মধ্যে আবার তথাকথিত বিকাশ আবিষ্কার করে ধন্য করি এই মানবজীবন৷ আর রূপান্তরের বা বৈপ্লবিক কোনও সংযোগ পেলে আর আটকায় কে! এই মানবজীবনে স্বর্গবাস নিশ্চিত।

    এভাবেই কি আমরা জীবন কাটিয়ে দেবার চিন্তা করছি? পরবর্তী প্রজন্মকে কোন পাশবিক সমাজে রেখে যাচ্ছি ভেবেছি কি?আমরা আমাদের জন্মে যে ভয়াবহতা দেখেছি তা ভবিষ্যতে আরও বিশাল ও বিকশিত হয়ে ধরা দেবে। এরচেয়ে ভয়াবহ পরিবর্তন, বিকাশ তথা আপাত রূপান্তর আর কি হবে? আমাদের প্রশ্ন করার সময় এসেছে। আর এই প্রশ্ন উত্থিত হতে হবে সামাজিকভাবেই। আর যখন এই প্রশ্ন যথার্থভাবে উঠবে উত্তর এমনিই ধরা দেবে৷ কারণ উত্তরবিহীন প্রশ্ন অকল্পনীয়। আর সেই প্রশ্ন যদি সম্মিলিতভাবে ওঠাতে হয় তাহলে বিদ্যমান দুর্ঘটনাসমূহের মধ্যে শেষ অবধি যে সংযোগ তৈরি হয় তা অনুধাবন করতে হবে।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম