• শিরোনাম


    তুর্কিরা কেন নিজেদের ভাষাকে এত গুরুত্ব দেয়?

    | ০৭ মে ২০১৯ | ৬:৫৯ অপরাহ্ণ

    তুর্কিরা কেন নিজেদের ভাষাকে এত গুরুত্ব দেয়?

    একজন তুর্কি বিদেশী ভাষা জানা সত্ত্বেও ভিনদেশী লোকের সাথে তুর্কি ভাষা দিয়েই কথা শুরু করে।

    তুর্কিদের কট্টর জাতীয়তাবাদী আর ভাষাগত গোঁড়ামির কথা সর্বজনবিদিত। এরা একদিকে যেমন নিজেদের দেশপ্রেমকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্থান দেয় তেমনি নিজের ভাষাকে সবার উপরে প্রাধান্য দেয়।



    এই প্রাধান্যের বিষয়টা অনেক সময় এতো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছে যে একজন তুর্কি বিদেশী ভাষা জানা সত্ত্বেও ভিনদেশী লোকের সাথে তুর্কি ভাষা দিয়েই কথা শুরু করে।

    এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশী ভাষাজ্ঞান যাচাই বাছাই করা হয় না।

    সরকারি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড অফিসার হওয়ার জন্য যে পরীক্ষা দিতে হয় সেখানেও ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশী ভাষার বালাই নেই। তবে সরকারি কিছু বিশেষ শাখার জন্য বিদেশি ভাষায় পারদর্শিতার উপর ভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্ট পেতে হয়।

    এমনকি বিমানবন্দরে বা বহিঃশুল্ক বিভাগে যারা চাকরি করে তাদেরও বেশিরভাগই বিদেশী ভাষায় পারদর্শী না।

    আর তুর্কিদের সাথে তাদের বিদেশী ভাষাজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে গেলে এরা বিষয়টা নিয়ে মোটেও বিব্রত না বরং গর্ব বোধ করে।

    তুর্কি ভাষা চর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেকোনো নতুন বিদেশী শব্দ দেশি ভাষায় ঢোকার আগে ওই শব্দটিকে উপযুক্ত একটি সমার্থক শব্দ দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়।

    আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দেশটিতে মাত্র দুটি ইংরেজি পত্রিকা, একটি ইংরেজি এবং একটি আরবি টেলিভশন আছে।

    তুর্কিরা রেডিও টিভিসহ অন্য সব গণম্যাধমে টকশো বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে তুর্কি ইংরেজির অপ্রাসঙ্গিক মিশ্রণ একেবারেই নেই। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বন্ধু বান্ধবের সাথে ইংরেজী বলে নিজেকে জাহির করার ব্যার্থ প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়না।

    চায়ের দোকান, কফির কাপে, রেস্তোরাঁয় বা আড্ডায় ইংরেজীর ঝড় তুলে না।

    যদি জিজ্ঞেস করা হয় বিদেশিরা আসলে তোমরা তাদের সাথে কিভাবে কথোপকথন করবে। উত্তরে একই কথা: যারা আমাদের দেশে আসবে তারা তুর্কি ভাষা শিখে আসুক।

    তবে এগুলোর মানে এই নয় যে এরা মোটেও বিদেশী ভাষা জানেনা। যারা বৈদেশিক সম্পর্কের কোনো বিষয়ে কাজ করে যেমন পর্যটন, আমদানি রপ্তানি, বা উচ্চতর শিক্ষা তাদের অবশ্যই বিদেশী ভাষা শিখতে হয়।

    এরপরও কিন্তু তুর্কি আন্তর্জাতিক পরিসরে পিছিয়ে নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বিশ্বে প্রথম সারিতে না থাকলেও একেবারে পিছিয়ে নেই।

    আমরা আমাদের ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছি, রক্ত দিয়েছি, শহীদ হয়েছি। এবং সর্বোপরি নিজেদের অধিকার আদায় করেছি। এরা আমাদের মতো ভাষার জন্য শাহাদৎ বরণ করেনি। আমাদের বাংলাভাষার পদচারণ করে এসেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা বিশ্বে আমাদের এই ভাষা নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠান করা হয়। আমারা প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালন করি। শহীদ মিনারে ফুল দেই, শ্রদ্ধা ভোরে স্মরণ করি ভাষা শহীদদের।

    তুর্কি ভাষার এরকম কোনো ইতিহাস নেই। কিন্তু তাই বলে ভাষার প্রতি এদের দরদ কিন্তু একটুও কম নয় বরং আমাদের থেকে বেশিই মনে হয়।

    যত বড় হোটেল বা রেস্তোরাঁই হোক না কেন যোগাযোগের মাধ্যম হবে শুধুই তুর্কি ভাষা।

    এদের দেশে যেকোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা কনফারেন্সে প্রধান ভাষা হবে তুর্কি। সাথে অন্য বিদেশী ভাষায় তরজমার ব্যবস্থা থাকবে।

    এতো কিছুর পরেও থেমে নেই এদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অগ্রগতি। তুরস্ক আজ বিশ্বের উন্নত ২০ টি অর্থনীতির একটি। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এবং মুসলিম বিশ্বে সম্মানজনক অবস্থানে আছে। এদের টিভি সিরিয়াল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আমেরিকার পরে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। পৃথীবির প্রায় ১১০ টি দেশে এদের টিভি নাটক প্রচার হয়। প্রযুক্তিগত দিক দিয়েওএরা অনেক এগিয়ে।

    এতকিছু বলার উদ্দেশ্য তুর্কির প্রশংসায় পঞ্চমূখ হওয়া অথবা বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করা নয়। আমাদেরও অনেক অগ্রগতি আছে। এমনকি আমি বিদেশী ভাষা শিক্ষা বা ব্যবহারেরও বিরোধী না। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে, অজোপাড়া গা থেকে শুরু করে শহরতলীতেও বাসে, দোকানে, রেস্তোরাঁয়, চায়ের দোকানে যেভাবে ইংরেজি ব্যবহার হচ্ছে আমার কথা তার বিরুদ্ধে। একটা বিষয় আমার মাথায় আসে না এসব জায়গায় হয়তো কখনোই কোনো বিদেশির যাওয়ার সম্ভবনা নেই তারপরও কেন যত্রতত্র এতো বিদেশী ভাষার ব্যবহার। এটা কি আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে নাকি হীনমন্যতায় ভোগার ফলে? কারণ আমাদের দেশপ্রেমে তো কোনো ঘাটতি নেই।

    আমাদের দেশে কোনো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান তো দূরে থাকে জাতীয় প্রোগ্রামগুলোতেও যেখানে অংশগ্রহণকারীদের সবাই বাংলাদেশী সেখানেও দেদারছে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। এমনকি সভা-সমাবেশের ব্যানার, পোষ্টার বা ফেস্টুনেও ইংরেজি লেখাটা একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে।

    এভাবে যত্রতত্র বিদেশী ভাষা ব্যবহার করে আমরা হয়তো ভাবছি যে আমাদের অবস্থান বা মর্যাদা অনেক উন্নত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা নিজেদেরকে ছোট করছি, ভাষার প্রতি ভালোবাসার ঘাটতিকে প্রকাশ করছি আর ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক নিজের ভাষার অবমাননা করছি।

    ভাষার মাসে দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ভাষা শহীদদের। বাংলা ভাষার প্রতি আরো বেশি দরদ, ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের সমাজের সর্বস্তরে এই প্রত্যাশায়।

    ​লেখক: সারওয়ার আলম, ডেপুটি চিফ রিপোর্টার-নিউজ পাবলিশার, আনাদলু এজেন্সি, তুরস্ক

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম