• শিরোনাম


    তারাবীহ নামায বিশ রাকাতঃ একটি দলীলভিত্তিক পর্যালোচনা- মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

    লেখক: মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী | ১২ মে ২০১৯ | ২:৪৫ অপরাহ্ণ

    তারাবীহ নামায বিশ রাকাতঃ একটি দলীলভিত্তিক পর্যালোচনা-  মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

    রাসূল সা., সাহাবায়ে কেরাম রা., তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীগণ এবং মুজতাহিদ ইমামগণের আমল দ্বারা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, তারাবী নামায বিশ রাকাত।

    কিন্তু ১২৮৪ হিজরীতে ভারতের আকবরাবাদ থেকে সর্বপ্রথম এক লা-মাযহাবী মৌলভী সাহেব আট রাকাত তারাবীর ফাতওয়া প্রদান করেন। এরপর ১২৮৫ হিজরীতে পাঞ্জাব সীমান্তে মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী আট রাকাত তারাবী নামায পড়া সুন্নত হওয়ার দাবি করেন।



    কিন্তু কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে তৎকালীন প্রাজ্ঞ হক্কানী উলামায়ে কেরাম উক্ত আট রাকাত তারাবীর ফাতওয়াকে ভুল হিসেবে প্রমাণিত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

    ১৩৭৭ হিজরীতে আরবে শায়েখ নসীব রেফায়ী ও শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহ. সর্বপ্রথম আট রাকাত তারাবীর মত প্রকাশ করেন। তখন শায়েখ আতিয়্যা সালিমসহ আরবের জমহুর উলামায়ে কেরাম তাদের উক্ত রায়কে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সাহাবায়ে কেরাম রা. এর যুগ থেকে চলে আসা হারামাইন শরীফাইন তথা বাইতুল্লাহ শরীফ ও মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবীর আমলকে অব্যহত রাখেন। যা আজো অব্যাহত রয়েছে।

    সুতরাং আট রাকাত তারাবী পড়ার মতকে অনুসরণের অর্থ হল, সাহাবা ও তাবেয়ীগণের অনুসৃত আমলকে প্রত্যাখ্যান করে নব্য সৃষ্ট বিদআতি দলের অনুসরণ করা।

    ♦তারাবীহ নামায বিশ রাকাতের প্রমাণ

    عن ابن عباس ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يصلى فى رمضان عشرين ركعة والوتر

    হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ রমজান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। {মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-২/২৯৪, হাদীস নং- ৭৬৯২, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ-২১৮, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং-১২১০২, মাজমাউজ যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-১৭২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯১}

    عن جابر بن عبد الله قال خرج النبى صلى الله عليه وسلم ذات ليلة فى رمضان فصلى الناس اربعة وعشرون ركعة واوتر بثلاثة

    হযরত জাবের রাঃ বলেনঃ রমজান মাসের এক রাতে রাসূল সাঃ বাহিরে তাশরীফ নিয়ে এলেন। আর সাহাবায়ে কেরামকে ২৪ রাকাত [৪ রাকাত ঈশার, আর ২০ রাকাত তারাবীহের] নামায পড়ালেন। আর তিন রাকাত বিতির পড়ালেন। [তারীখে জুরজান-২৭}

    যেহেতু কথিত আহলে হাদীস ভাইদের কাছে দলীল শুধু কুরআন ও সহীহ হাদীস। তথা আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর কথা। কোন ব্যক্তির মতামত তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর এ দু’টি হাদীসকে আল্লাহ এবং রাসূল সাঃ না সহীহ বলেছেন, না জঈফ বলেছেন। তাই গায়রে মুকাল্লিদরা এ দু’টি হাদীসকে না সহীহ বলতে পারবে, না জঈফ বলতে পারবে। এবার দেখার বিষয় হল, উম্মতের ঐক্যমত্বের আমল এর উপর আছে কি নেই? যদি দেখা যায় যে, উম্মতের আমল এর উপরই। তাহলে আমল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার দ্বারা উক্ত হাদীস সহীহ হয়ে যায়।

    ♣ওমর রাঃ এর আদেশ

    عن يحيى بن سعيد ان عمر بن الخطاب امر رجلا يصلى بهم عشرين ركعة

    হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় ওমর বিন খাত্তাব রাঃ এক ব্যক্তিকে বিশ রাকাত পড়ার হুকুম দিলেন। {মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-২/২৯৩}

    ♣হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামল

    وروى مالك من طريق يزيد بن خصيفة عن السائب بن يزيد عشرين ركعة

    হযরত সায়েব বলেনঃ হযরত ওমর রাঃ এর সময়কালে বিশ রাকাত তারাবীহ ছিল। {ফাতহুল বারী-৪/৪৩৬} যার সনদ বুখারীতে দুই স্থানে আছে।

    عن السائب بن يزيد ، قال : كنا نقوم في زمان عُمَر بن الخطاب رضي الله عنه بعشرين ركعة والوتر

    হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ রাঃ বলেনঃ আমরা হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহ ও বিতির পড়তাম। {সুনানে সুগরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং-৮৩৩, মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩}

    ইমাম নববী রহঃ, সুবকী রহঃ [শরহুল মিনহাজ], মোল্লা আলী কারী রহঃ [শরহুল মুয়াত্তা] ও সুয়ুতী রহঃ এ বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন।

    محمد بن كعب القرظى كان الناس يصلون فى زمان عمر بن الخطاب فى رمضان عشرين ركعة ويوترون بثلاث

    মুহাম্মদ বিন কাব কুরজী বলেনঃ ওমর ফারুক রাঃ এর শাসনামলে লোকেরা রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ ও তিন রাকাত বিতির পড়তো।

    عن يزيد بن رومان ، أنه قال : « كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة »

    হযরত ইয়াজিদ বিন রূমান বলেনঃ লোকেরা হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির রমজান মাসে আদায় করতো। {মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩, মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৩৮০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯৪}

    عن الحسن ان عمر بن الخطاب جمع الناس على ابى بن كعب فكان يصلى بهم عشرين ركعة

    হযরত হাসান রাঃ থেকে বর্ণিত। হযরত ওমর রাঃ লোকদেরকে হযরত উবায় বিন কাব রাঃ এর কাছে একত্র করে দিলেন। আর তিনি লোকদের বিশ রাকাত তারাবীহ পড়াতেন। {সুনানে আবু দাউদ-১/২০২, সিয়ারু আলামিন নুবালা-১/৪০০}

    عن ابى بن كعب ان عمر بن الخطاب امره ان يصلى باليل فى رمضان فصلى بهم عشرين ركعة

    হযরত উবায় বিন কাব রাঃ বলেনঃ হযরত ওমর রাঃ আমাকে এই মর্মে আদেশ দিলেন যে, আমি যেন লোকদেরকে তারাবীহ পড়াই। তখন বিশ রাকাত পড়া হতো। {কানযুল উম্মাল-৮/২৬৪}

    ইমাম বায়হাকী, আল্লামা বাজী, কাশতাল্লানী, ইবনে কুদামা, ইবনে হাজার মক্কী, তাহতাবী, ইবনে হুমাম, বাহরুর রায়েক প্রণেতা রহঃ প্রমুখগণ এ ব্যাপারে একমত হয়ে বলেনঃ হযরত ওমর ফরুক রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহের উপরই সকলের সিদ্ধান্ত স্থির হয়। এবং এভাবেই চলতে থাকে। ইংরেজ আমলের পূর্বে কোন একজন মুহাদ্দিস বা ফক্বীহ এটাকে অস্বিকার করেননি। আর সুন্নত হওয়ার জন্য সেটির নিরবচ্ছিন্ন হওয়া শর্ত। তাই এই বিশ রাকাত তারাবীহ সুন্নতে ফারূকী হয়েছে। এ সেই ওমর রাঃ, যার ব্যাপারে রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন যে, যদি আমার পর কোন নবী হতো তাহলে নবী হতো ওমর। তিনি আরো বলেছেনঃ দ্বীনের ব্যাপারে সবচে’ মজবুত হলেন ওমর রাঃ। যদি বিশ রাকাত তারাবীহ নামায বিদআত হয়, তাহলে হযরত ওমর রাঃ সহ সে সময়কার সমস্ত আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণের বিদআতি হওয়ার আবশ্যক হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেনঃ উবাই বিন কাব রাঃ তারাবীহ মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের মাঝে পড়াতেন। কোন একজনও এ ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করেনি। {মাজমুআ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-৩৩/১১২}

    ♣হযরত উসমান রাঃ এর শাসনামল

    ১০
    হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ বলেনঃ হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে লোকেরা বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন। আর হযরত উসমান রাঃ এর শাসনামলে লম্বা কেরাতের কারণে লাঠির উপর ভর দিতেন। {বায়হাকী-৪/২৯৬}

    হযরত উসমান রাঃ এর শাসনামলের একজন ব্যক্তির নামও বলা যাবে না, যে ব্যক্তি আট রাকাত পড়ে জামাত থেকে বেরিয়ে যেত। কিংবা কেউ বিশ রাকাত তারাবীহকে বিদআত বলেছে এমন একজন ব্যক্তিও পাওয়া যাবে না।

    ♣আলী রাঃ এর শাসনামল

    ১১

    عن ابى عبد الرحمن السلمى عن على قال دعى القراء فى رمضان فامر منهم رجلا يصلى بالناس عشرين ركعة قال وكان على يوتر بهم

    হযরত আবু আব্দুর রহমান সুলামী বলেনঃ হযরত হযরত আলী রাঃ রমজান মাসে কারীদের ডাকতেন। তারপর তাদের মাঝে একজনকে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়াতে হুকুম দিতেন। আর বিতিরের জামাত হযরত আলী নিজেই পড়াতেন। {বায়হাকী-৪/৪৯৬}

    عن ابى الحسناء ان عليا امر رجلا ان يصلى بالناس خمس ترويحات عشرين ركعة

    হযরত আবুল হাসনা বলেনঃ হযরত আলী রাঃ এক ব্যক্তিকে পাঁচ তারাবীহ এর সাথে বিশ রাকাত পড়াতে হুকুম দিয়েছেন। {সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৪৮০৫, ৪৩৯৭, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-২৩৪৭৪}

    হযরত আলী রাঃ নিজেই রাসূল সাঃ থেকে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি বিদআতের উৎপত্তি করবে তার ফরজ, নফল কিছুই কবুল হয় না। {বুখারী-২/১০৮৪, মুসলিম-১/১৪৪}

    হযরত আলী রাঃ আজানের পর ইশার নামাযের জন্য আবার ডাকতে শুনে বললেনঃ এ বেদআতিকে মসজিদ থেকে বের করে দাও। {বাহরুর রায়েক}

    তিনি এক ব্যক্তিকে ঈদগাহে ঈদের নামাযের আগে নফল পড়তে দেখে খুবই ধমক দিলেন লোকটিকে। যদি বিশ রাকাত তারাবীহ বিদআত হতো, তাহলে এর হুকুম কেন দিলেন তিনি?

    ইংরেজ শাসনের আগে একজন মুহাদ্দিস বা ফক্বীহের নাম বলা যাবে না, যারা আলী রাঃ এর শাসনামলের বিশ রাকাত তারাবীহ পড়াকে অস্বিকার করেছেন। কোন ব্যক্তি সেই জমানার একজন ব্যক্তির নামও বলতে পারবে না, যে ব্যক্তি আট রাকাত তারাবীহ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যেত। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল যে, বিশ রাকাতওয়ালী নামাযের নাম তারাবীহ হযরত আলী রাঃ বর্ণনা করেছেন। কোন খলীফায়ে রাশেদ বা কোন সাহাবী আট রাকাতের সাথে তারাবীহ শব্দ উচ্চারণ করেননি। হাদীস ভান্ডারে এর কোন প্রমাণ নেই।

    ১৩

    عن زيد بن وهب قال كان عبد الله يصلي بنا في شهر رمضان فينصرف وعليه ليل قال الا عمش كان يصلى عشرين ركعة ويوتر بثلث

    হযরত জায়েদ বিন ওহাব বলেনঃ হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ আমাদের তারাবীহ পড়িয়ে ফারিগ হতেন এমতাবস্থায় যে, তখনো রাত অনেক বাকি থাকতো, ইমাম আমাশ বলেনঃ তিনি বিশ রাকাত তারাবীহ আর তিন রাকাত বিতির পড়াতেন। {কিয়ামুল লাইল-১৫৭}

    হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ খোদ বলেছেন যে, সুন্নত ছেড়ে দেয়া উত্তম বেদআতের উপর মেহনত করার চেয়ে। {হাকেম-১/১,৩} যদি বিশ রাকাত তারাবীহ বিদআত হতো, তাহলে তিনি কেন পড়ালেন?

    ♦জমহুর সাহাবাগণ রাঃ

    ১৪

    ابو حنيفة عن حماد عن ابراهيم ان الناس كانوا يصلون خمس ترويحات فى رمضان

    হযরত ইমাম আবু হানীফা রহঃ, হযরত ইবরাহীম [মৃত্যু-৯৬হিজরী] থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয় লোকেরা [সাহাবী ও তাবেয়ীগণ] রমজান মাসে পাঁচ তারবীহার সাথে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তো। {কিতাবুল আসার লিআবী ইউসুফ}

    ১৫
    عن عبد العزيز بن رفيع قال كان ابى بن كعب يصلى بالناس فى رمضان بالمدينة عشرين ركعة ويوتر بثلاثة

    হযরত আব্দুল আজীজ বিন রফী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ হযরত উবায় বিন কাব রাঃ লোকদেরকে রমজান মাসে মদীনা মুনাওয়ারায় বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির নামায পড়াতেন। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}

    ১৬

    عن عطاء قال ادركت الناس وهم يصلون ثلثة وعشرون ركعة بالوتر

    হযরত আতা [মৃত্যু-১১৪হিজরী] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি লোকদের [সাহাবী ও তাবেয়ীগণ] বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির পড়তে দেখেছি। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}

    ♦তাবেয়ীগণ রহঃ

    হযরত সুয়াইদ বিন গাফালা যিনি বয়সে রাসূল সাঃ থেকে মাত্র তিন বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ইমামতি করাতেন। হযরত আবুল হাজীব বলেনঃ

    ১৭

    كان يؤمنا سويد بن غفلة فى رمضان فيصلى خمس ترويحات عشرين ركعة

    হযরত সুইয়াইদ বিন গাফালা রমজান মাসে আমাদের জামাতের সাথে পাঁচ তারবিহায় বিশ রাকাত নামায পড়াতেন। {বায়হাকী-২/৪৯}

    ১৮

    عن ابى البخترى انه كان يصلى خمس ترويحات فى رمضان ويوتر بثلاث

    হযরত আবুল বুখতারী রহঃ বলেনঃ তিনি রমজানে পাঁচ তারবিহায় বিশ রাকাত ও তিন রাকাত বিতির পড়তেন। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৭৬৮৬}

    ১৯

    عن سعيد بن ابى عبيد ان على بن ربيعة كان يصلى بهم فى رمضان خمس ترويحات ويوتر بثلاث

    হযরত সাঈদ বিন আবু উবায়েদ থেকে বর্ণিত। হযরত আলী বিন রাবীয়া পাঁচ তারবিহা তথা বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির জামাতের সাথে পড়তেন। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}

    এ সকল হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, বিশ রাকাতের সাথে তারাবীহ শব্দ এবং বিশ রাকাত তারাবীহের আমল তাবেয়ীগণের মাঝে বিনা প্রতিবাদে নির্বিঘেœ প্রচলিত ছিল। আর পুরো খাইরুল কুরুনে কোন এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যাবে না, যে ব্যক্তি বিশ রাকাত তারাবীহকে অস্বিকার করেছেন বা অপছন্দ করেছেন। কিংবা বিশ রাকাত তারাবীহকে বিদআত বলেছেন, বা আট রাকাত জামাতের সাথে পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেছেন। পুরো খাইরুল কুরুনের মাঝে আট রাকাতের সাথে তারাবীহ শব্দ ব্যবহার করেছেন এরকম কোন প্রমাণ কোথাও বিদ্যমান নেই।

    ♦মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবীহ

    মদীনা তায়্যিবাহর মাঝে হযরত ওমর রাঃ, হযরত উসমান রাঃ, হযরত আলী রাঃ এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহই পড়া হতো। আজো মদীনা মুনাওয়ারায় বিশ রাকাত তারবীহই পড়া হয়। হযরত আয়শা রাঃ ও মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থান করতেন। তিনিই রাসূল সাঃ এর এ ফরমান বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার দ্বীনের মাঝে বেদআত বের করবে, তার কাজটি পরিত্যাজ্য। যদি বিশ রাকাত তারাবীহের নামায বিদআত ও নাজায়েজ হতো, তাহলে হযরত আয়শা রাঃ বছরের পর বছর এর উপর চুপ করে বসে থাকতেন না।

    হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ ও মদীনায় অবস্থান করছিলেন। তিনি ঐ হাদীসের রাবী। যাতে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকটি বিদআত গোমরাহী আর প্রত্যেক গোমরাহী জাহান্নামে নিক্ষেপকারী।

    অথচ তারই সামনে অর্থ শতাব্দী পর্যন্ত মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে পড়া হচ্ছিল, অথচ তিনি এর বিরুদ্ধে কোন কথা বলেন নি। এটা হতে পারে না।

    ♦বাইতুল্লাহ শরীফে বিশ রাকাত তারাবীহ

    মক্কা মুকাররমায় হযরত আতা বিন আবী রাবাহ রহঃ [মৃত্যু ১১৪হিজরী] বলেনঃ ادركت الناس وهم يصلون ثلاثة وعشرون ركعة بالوتر তথা আমি লোকদের [সাহাবা ও তাবেয়ীগণ] বেতের নামাযসহ ২৩ রাকাত পড়তে দেখেছি। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}

    আর ইমাম ইবনে আবী মালিকাহ [মৃত্যু ১১৭হিজরী] লোকদের মক্কায় বিশ রাকাত তারাবীহ পড়াতেন। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}

    ইমাম শাফেয়ী রহঃ [মৃত্যু ২০৪হিজরী] বলেনঃ আমি স্বীয় শহর মক্কায় লোকদের বিশ রাকাত তারাবীহ পড়া অবস্থায়ই পেয়েছি। {তিরমিজী-১/১৬৬}

    আর আজ পর্যন্ত মক্কা মুকাররমায় বিশ রাকাত তারাবীহই পড়া হচ্ছে।

    ♦কুফায় বিশ রাকাত তারাবীহ

    কুফায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির পড়াতেন। {মুখতাসার কিয়ামুল লাইল-১৫৭}

    ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী রহঃ [মৃত্যু-৯৬হিজরী] বলেনঃ লোকেরা [সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণ] রমজান মাসে পাঁচ তারাবীহ [বিশ রাকাত] পড়তেন। {কিতাবুল আসার লিআবী ইউসুফ-৪১}

    ♦বসরায় বিশ রাকাত তারাবীহ

    হযরত ইউনুস রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আবুল আশআস [মৃত্যু ৮৩হিজরী] এর ফেতনার পূর্বে জামে মসজিদ বসরাতে দেখেছি যে, হযুরত আব্দুর রহমান বিন আবী বাকরা [মৃত্যু ৯১হিজরী] হযরত সাঈদ বিন আবীল হাসান [মৃত্যু ১০০হিজরী] এবং হযরত ইমরানুল আব্দী লোকদের পাঁচ তারাবীহ [বিশ রাকাত] পড়াতেন। {কিয়ামূল লাইল-১৫৮}

    মোটকথা, পুরো খাইরুল কুরুনের মাঝে বিশ রাকাত তারাবীহকে অস্বিকারকারী একজনও ছিল না। কোন ইসলামী রাজত্বে এটাকে অস্বিকার করা হয়নি। এটাকে অস্বিকার করে সর্ব প্রথম ইংরেজরা উপমহাদেশে আসার পর কতিপয় নামধারী আহলে হাদীস গায়রে মুকাল্লিদ গ্রুপ।

    ♦চার ইমাম রহঃ এর বক্তব্য

    শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী রহঃ বলেনঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত চার মাযহাবে সীমাবদ্ধ। এ চার ইমামের মাঝে প্রথম ইমাম হলেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ [মৃত্যু ১৫০ হিজরী] ও বিশ রাকাত তারাবীহের প্রবক্তা। [ফাতাওয়া কাজীখান-১/১১২} ইমাম মালিক রহঃ এর একটি বক্তব্য বিশ রাকাতের পক্ষে, দ্বিতীয় বক্তব্য ৩৬ রাকাতের পক্ষে। [যাতে বিশ তারাবীহ আর ১৬ রাকাত নফল] হেদায়াতুল মুজতাহিদ-১/১৬৭}

    ইমাম শাফেয়ী রহঃ বিশ রাকাতের প্রবক্তা। {আলমুগনী-২/১৬৭}

    ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহঃ এর মুখতার বক্তব্যও বিশ রাকাতের পক্ষে। [আলমুগনী-২/১৬৭}

    চার মাযহাবের ফিক্বহের ইবারতের মাঝে কোন একটি ইবারতেও শুধু আট রাকাত তারাবীহকে সুন্নত আর বিশ রাকাততে বিদআত বলা হয়নি।

    ♦সাহাবাগণের নিরবচ্ছিন্ন আমল ও ইজমার আলোকে

    তারাবীহ নামায বিশ রাকাত। সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে এ আমলই সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে। যা আজো সারা পৃথিবীতে আমল হয়ে আসছে। নব্য ফিতনা কতিপয় আহলে হাদীস নামধারী ছাড়া মসজিদে নববী এবং বাইতুল্লাহসহ সারা পৃথিবীতে তা সকল মুসলমাগণ আমল করে আসছেন।

    এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে আমলী ইজমা হয়েছিল।

    ইবনে কুদামা হাম্বলী রহঃ [মৃত্যু ৫৯৫ হিজরী] আলমুগনী গ্রন্থের ২য় খন্ডের ১৬৭ নং পৃষ্ঠায়, আল্লামা কাশতাল্লানী শাফেয়ী রহঃ [মৃত্যু ৯২৩ হিজরী] “ইরশাদুস সারী” এর ৩য় খন্ডের ৫১৫ নং পৃষ্ঠায় বিশ রাকাতের উপর সাহাবাগণের ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন।

    মোল্লা আলী কারী হানাফী রহঃ [মৃত্যু ১০১৪হিজরী] “শরহুন নুকায়া” এর ২য় খন্ডের ২৪১ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা সাইয়্যেদ মুরতাজা জুবাইদী [মৃত্যু-১২০৫ হিজরী] সাহেব “ইতহাফুল সাদাতুল মুত্তাকীন” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৭০০ নং পৃষ্ঠায় সাহাবাগণের এ ইজমাকে নকল করেছেন।

    ♦উম্মতে মুসলিমার ইজমা

    ১২৮৪ হিজরীর ইংরেজ আমলের আগে পৃথিবীর কোন মসজিদে রমজানের পুরো মাস মসজিদে আট রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে পড়ার কোন নজীর নেই। একটি মসজিদের নাম কোন কথিত আহলে হাদীস দেখাতে পারবে না। না মসজিদে নববীতে কোনদিন আট রাকাত তারাবীহ পড়া হয়েছে। না বাইতুল্লায়। না পৃথিবীর কোন মুসলিম পল্লিতে। রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে সর্বপ্রথম এ বিদআতের সূচনা হয়।

    এর আগে সমগ্র উম্মতে মুসলিমা ঐক্যমত্বের ভিত্তিতে ২০ রাকাত তারাবীহ পড়ে আসছেন।

    আল্লাহ তুমি আমাদেরকে লা-মাযহাবী ভাইদের ফেৎনা থেকে হেফাজত কর ৷

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম