• শিরোনাম


    তথ্য সন্ত্রাসের কবলে ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজ : নুরে আলম জাহাঙ্গীর (সম্পাদকীয়)

    | ০৮ মার্চ ২০২০ | ৯:১০ পূর্বাহ্ণ

    তথ্য সন্ত্রাসের কবলে ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজ : নুরে আলম জাহাঙ্গীর (সম্পাদকীয়)

    সমস্ত পৃথিবীতেই মুসলিম জাতি আজ নির্যাতিত নিপিড়ীত। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে পৃথিবীর সকল অমুসলিমদের কাছে একটা ভুল মেসেজ / তথ্য পৌঁছে দিয়েছে অমুসলিমদের উগ্রপন্থী দলগুলি..।

    ভারতবর্ষের উগ্রবাদীদের ভাষ্য হচ্ছে, মুসলমানরা আরব দেশ থেকে উড়ে এসে জোরে বসে তাদের অত্যাচার করেছে, মহিলাদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছে, তাই তারা মুসলমানদেরকে মেরে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে।



    আজ দিল্লির দিকে তাকিয়ে তাই প্রতীয়মাণ হচ্ছে, মুসলমানদের উপর মোদির সন্ত্রাসী বাহিনী বারবার হামলা করছে। গত (২৫-২৬) দুই দিনে মুসলমানদের অসংখ্য বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করেছে এই উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীরা। এই নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই….।

    মুসলমানরা কি আসলেই তাদের উপর অত্যাচার করেছিল? যদি অত্যাচার করতো তাহলে আজ হিন্দুস্থানে ১টা হিন্দুও থাকতো না, সবাই মুসলমানে পরিনত হয়ে যেতো।

    ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সকল নাগরিকের জান মাল ইজ্জত আব্রু হেফাজতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের কর্তার। সকল ধর্মের নাগরিক তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই আজও ভারতবর্ষে সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দু।

    এদেশে রাজনৈতিক ভাবে ইসলাম প্রবেশ করে সেনাপতি
    ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজির মাধ্যমে তখন বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত সেন রাজবংশের শাসন ছিল।
    সেন রাজবংশের দীর্ঘকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি।
    বাংলায় তার আগমনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল পূর্বেই। সেনশাসক বল্লাল সেন কৌলিণ্য পদ্ধতির প্রয়োগ করে সমাজে উচ্চ-নীচ ভেদপ্রথার এক দূর্লঙ্ঘনীয় দেয়াল নির্মাণ করে ফেলেছিলেন। কদর্য অস্পৃশ্যতায় অপমানিত ও লাঞ্ছিত যখন সমাজের নীচস্তর, তখন উচ্চশ্রেণির অরুচিকর যৌনতা ও নগ্নতার অভিলাষে সমাজবক্ষে এক নিদারুণ রুদ্ধশ্বাস নীরবতা। উচ্চ-নীচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় অভিন্নতা থাকলেও উঁচুশ্রেণির ঘৃণা নিম্ন শ্রেণির মানুষকে সব সময় করে রেখেছিল সঙ্কুচিত। তারা তাদের অধিকার দূরে থাক, বেঁচে থাকার চেষ্টা করার সাহস পর্যন্ত পায়নি। লক্ষ্মণ সেনের দীর্ঘ শাসনকালে কষ্টের করুণকাল প্রলম্বিত করেছিল মাত্র। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আগমন বখতিয়ারের।

    তাঁর নেতৃত্বেই বাংলা প্রাচীন থেকে মধ্যযুগে পদার্পণ করে। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলা অন্ধকার কুয়াশা পেরিয়ে আলোময় ভোরের সন্ধান পায়। “ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা বিজয়ের পর লাখণাবতীতে রাজধানী স্থাপন করে রাজ্যের শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনে মনোনিবেশ করেন। রাজ্যকে তিনি কয়েক অঞ্চলে বিভক্ত করে তাঁর সহযোগীদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এ সময়ে তিনি তাঁর আমীর উমরাহর সহযোগিতায় বাংলার বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মকতব, মাদরাসা ও সুফি খানকাহ নির্মাণ করেন।” শুরু হয় বাংলার নবযুগে পথ চলা। এ সময় থেকেই বাংলার রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি ও ধর্ম মানবিক হয়ে উঠতে শুরু করে। তাই বখতিয়ার খলজির বাংলায় আগমন চরম আকাক্সিক্ষত একটি পট। নীহাররঞ্জন রায় সুদীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন, “একটা বৃহৎ গভীর ব্যাপক সামাজিক বিপ্লবের ভূমি পড়েই ছিল কিন্তু কেউ তার সুযোগ গ্রহণ করেনি। মুসলমানরা না এলে কী উপায়ে কী হতো বলার উপায় নেই।”

    সুতরাং বলা যায় তখন মুসলমানদের আগমন এদেশের মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক রহমত ছিল, নিম্ন শ্রেণির হিন্দুরা উঁচু শ্রেণির হিন্দুদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেল।

    মুসলমানরা যখন এদেশে শাসন কার্য শুরু করেছে, তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও আচার ব্যাবহার দেখে অনেক হিন্দু এবং বৌদ্ধিস ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।

    মুসলমানরা আরব থেকে আসলেও এই ভারতবর্ষকে নিজের দেশ মনে করতেন। আট শত বছরের সুদীর্ঘ শাসনামলে অনেক স্থাপনা তৈরি করেছেন, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সাজিয়েছেন ভারতবর্ষকে।

    এই ভারতবর্ষেই তারা বিবাহ-সংসার করেছেন এবং ইন্তেকাল করেছেন। তাদের অসংখ্য কবর আজও ভারতবর্ষে বিদ্দমান।

    মুসলমানরা কাউকে জোর করে মুসলমান বানাইনি কিংবা বিবাহ-শাদি করেনি। জোর পূর্বক বিবাহ বহির্ভূত যৌন নির্যাতনও করেনি। তাদের উপর নির্যাতনের যে অভিযোগ তা ইংরেজ সরকারের বানানো, তাদের তথ্য সন্ত্রাসের কারণে আজ ভারতে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব।

    ১৭৫৭ সালে যখন ইংরেজরা এদেশের মসনদে আসীন হয়, তখন থেকেই তারা তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে।

    তারই ধারাবাহিকতায় কিছু হিন্দুধর্মাবলম্বীকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে আপন করে নেই…।

    প্রথমত বৃটিশরা এদেশে এসে জমিদারি প্রথা চালু করে, মুসলিম শাসকরা যে সকল সরকারি চাকরিজীবীদের মাধ্যমে খাজনা তুলতো তাদেরকে আয়ত্ত করে নেই – তারা যে সমস্ত জমির খাজনা তুলতো তাদেরকে ঐসমস্ত জমির মালিক বানিয়ে দেয়া হয়- তারা বনে যায় বিশাল বড় জমিদার, শুরু হলো ইংরেজদের গোলামী, এর বেশিরভাগ অংশই ছিল হিন্দু।

    ইংরেজরা যখন এদেশে আগমন করে তখন ক্ষমতার মসনদে ছিল মুসলমানেরা। মুসলমানদের থেকে তারা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল – তাই মুসলমানদের সাথে ইংরেজদের বিরোধ সর্বদাই ছিল তুঙ্গে। মুসলমানরা সর্বদাই চেষ্টা চালিয়েছিল এই দেশকে ইংরেজ মুক্ত করতে – স্বাধীন করে নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে।

    ইংরেজ সরকার মুসলমানদের কারণে ক্ষমতাকে নিজ স্বার্থে প্রয়োগ করতে ব্যার্থ হয়ে কিছু হিন্দুকে হাতিয়ে নেয়, সরকারি চাকরিতে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়।

    হিন্দুরা মনে করতো মুসলমান এবং ইংরেজ দুটিই ভিনদেশী শাসক। মুসলমানরা আরব থেকে আর ইংরেজরা বৃটেন থেকে এসেছে, তাদের জন্য উভয়ই সমান, কিন্তু তারা উভয়ের পার্থক্য বুঝতে ভুল করেছিল।

    মুসলমানরা এদেশ থেকে অর্জিত মুনাফা এই ভারতবর্ষের মেরামতেই খরচ করেছে, ১ টাকাও তারা আরব দেশে পাচার করেনি, পক্ষান্তরে ইংরেজরা তাদের ২০০ বছরের শাসনামলে শুধু তাদের অর্জিত মুনাফা নয় এদেশের নিম্নমানের কৃষকের রক্ত চুষেও বৃটেনে পাচার করেছে।

    বৃটেন আজ পৃথিবীর সমৃদ্ধ ধনী দেশ, বড় বড় অট্টালিকা করেছে আমাদের দেশ থেকে পাচার করা অর্থ দিয়ে।

    তারা তাদের শাসনামলে কেউ যেন তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে না পারে সেই স্বার্থে এই দেশের দুইটি বৃহৎ জাতি হিন্দু এবং মুসলমানদের মাঝে সর্বদা দাংগা বাধানোর উস্কানি দিতো, মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যে তাদের কিছু হিন্দু অনুচর দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগে ভরপুর ছিল তাদের ইতিহাসের গ্রন্থগুলি।

    এই ইতিহাস পড়ে আজকের উগ্রবাদী হিন্দু যুবকেরা মুসলমানদের উপর অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালাচ্ছে।

    এই মিথ্যে ইতিহাস পড়ে গতবছর ভারতের উত্তরপ্রদেশের রামকোলার বিজেপি মহিলা মোর্চার নেত্রী সুনীতা সিং গৌড় ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘মুসলিমদের জন্য একটাই সমাধান রয়েছে।
    হিন্দু ভাইয়েদের ১০ জন করে দল তৈরি করে মুসলিম মা ও বোনেদের প্রকাশ্য রাস্তায় গণধর্ষণ করা উচিত। এরপর সবাইকে দেখানোর জন্য তাদের বাজারের মাঝখানে ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত। ‘
    এখানেই না-থেমে তিনি আরও বলেন, মুসলিম মা ও বোনেদের উচিত নিজেদের সম্ভ্রম লুঠ করতে দেওয়া।
    কারণ দেশকে রক্ষা করতে এ ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই।
    পরে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

    মুসলমানর শুরু থেকেই ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন, ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ হঠানোর আন্দোলন করে আসছিলো। পরবর্তীতে হিন্দু নেতারাও এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম নেতৃত্বের যৌথ আন্দোলনে ১৯৪৭ সালেএই দেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

    তাদের লেখা পূর্বের ইতিহাস গ্রন্থ রয়ে যায় তাদের উগ্রবাদী নেতাদের কাছে।
    পরবর্তীতে অন্যান্য হিন্দু লেখকেরা সঠিক ইতিহাস রচনা করেছিলেন।

    হিন্দু ভাইদের প্রতি আহবান আপনারা মুসলমানদের ৮০০ বছরের শাসনামলের সঠিক ইতিহাস জানুন।

    তবেই একটি অসাম্প্রদায়িক সুন্দর ও সুখের সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।
    সুখি ও সমৃদ্ধশীল ভ্রাতৃত্ব পূর্ণ ভারতবর্ষ হউক এই কামনা করি।

    লেখক: নুরে আলম জাহাঙ্গীর
    সম্পাদক: আওয়ার কণ্ঠ
    কাতার প্রতিনিধি : এস.টিভি

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০১ জুলাই ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম