• শিরোনাম


    বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসক করোনায় যোদ্ধা

    ডাঃ মঈন উদ্দিনের জীবন ও কর্ম: এস এম শাহনূর

    | ১৮ এপ্রিল ২০২০ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

    ডাঃ মঈন উদ্দিনের জীবন ও কর্ম: এস এম শাহনূর

    “কোন কালে শোধ হবেনা তোমার ঋণ
    জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে মহাকাল,
    আর্ত মানবতার সেবক ডা.মঈন উদ্দিন
    জান্নাতে হউক তব ঠিকানা অনন্তকাল।”

    গত ১৫ এপ্রিল ২০২০ইং রোজ বুধবার সকাল পৌনে ৭টায় ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ডা. মঈন উদ্দিন মারা যান বলে জানিয়েছেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের উপপরিচালক লে. কর্নেল এ বি এম বেলায়েত হোসেন।



    কুর্মিটোলা হাসপাতালের উপপরিচালক বলেন, ‘ডা. মঈন উদ্দিন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে আমাদের এখানে এসেছিলেন। তিন দিন ধরে ভেন্টিলেশনে ছিলেন। রেসপিরেটরি ফেইলিওরের কারণে মারা যান তিনি।’

    ৫ এপ্রিল (রোববার) সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে ওই চিকিৎসকের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে।এরপর থেকে তিনি নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় তাঁর বাসায় আইসোলেশনে ছিলেন। তিনিই সিলেটের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী ছিলেন।
    হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল রাতে তাঁকে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৫টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়।

    তার চেম্বার ছিল নগরের সুবহানিঘাট ইবনে সিনা হাসপাতালে। সেখানে তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন ও রোগী দেখতেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে কোনো প্রবাসী করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে তিনি সংক্রমিত হয়েছেন।
    এদিকে, তার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় সংস্পর্শে থাকা চিকিৎসকসহ ১৬ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়। পরে তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।
    করোনায় মৃত্যুবরণকারী ডা. মঈন সিলেটের সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সিদ্দিক আলীর ছেলে। তিনি দুই সন্তানের জনক।ডা. মঈন ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের ইন্টারনাল মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন।
    বৈশ্বয়িক মহামারি করোনার নিরুদ্ধে যুদ্ধে অনেক ডাক্তার কাপুরুষের মতো ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গেলেও, যুদ্ধে লড়ছেন যারা তাদের একজন মানবিক ডাক্তার হিসেবে অলংকিত ডা: মঈন উদ্দিন। তিনি খারাপ মানুষের ভীড়ে সত্যিকারের বীরপুরুষ।জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘সোনার বাংলায়, সোনার মানুষ চাই’। তিনি বঙ্গবন্ধুর বাংলায় সোনার এক মানুষ। করোনা তাকে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু গোটা ডাক্তার সমাজের ইমেজ ও অহংকারের বাতিঘর হয়ে ইতিহাসে অম্লান এখন তিনি। অসম্ভব এই মেধাবী মানুষ, অনেকের নিকট বিশ্বাসী বা আল আমীন হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সুনামগঞ্জ ছাতকের দক্ষিণ সুরমা ইউনিয়নের নাদামপুর গ্রামে হয়েছিল তার জন্ম। স্থানীয় ধারণ নতুন বাজার হাইস্কুল থেকে এসএসসি, সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে বিসিএস পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ছাতক হাসপাতালে যোগদান করেন। পরে প্রমোশন পেয়ে যোগদান করেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া তিনি মেডিসিন বিষয়ে এফসিপিএস, কার্ডিওলজি বিষয়ে এমডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তার বাবা মরহুম মুনসী আহমদ উদ্দিন এক পল্লী চিকিৎসক ছিলেন। ৩ বোনের একমাত্র ভাই ডা: মঈন। তার স্ত্রী ইশরাত জাহানও একজন ডাক্তার। ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতি শুক্রবার নিজ গ্রামের সাধারন মানুষেদেও ফ্রি চিকিৎসা দিতেন তিনি। নগরীর একটি বেসরকারী হাসপাতালে চেম্বার করলেও এলাকার লোকজনের প্রতি ছিলেন খুবই উদার। একজন প্রকৃত ধার্মিক হিসেবে তার খ্যতি ছিল। তার পেশাগত অসাধারন মানবিক আচরনে সর্বমহলে গরীবের ডাক্তার হিসেবে প্রশংসিত হন তিনি। দুই পূত্র সন্তানের জনক ডা: মঈন পেশাগতভাবে উচ্চতায় পৌছে গেলেও শেকড়ের প্রতি মায়া ও কর্তব্যহীন হয়ে স্বার্থপরতার নির্মমতা তাকে গ্রাস করেনি। সেকারণে তার পল্লী চিকিৎসক পিতার শেষ অনুরোধ অসহায় রোগীদের নিয়মিত সেবা প্রদান শিরধার্য ছিল তার জীবনে। প্রতি শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে সিলেট থেকে ছুটে যেতেনে অদূরে গ্রামের বাড়ি। বিনামূল্যে গরিব অসহায়দের দিতেন ব্যবস্থাপত্র সহ প্রয়েজনীয় সহযোগীতা। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পও করেছেন তিনি। এমন মানবিক মানুষ মানুষের সেবা করতে গিয়েই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অবশেষ মৃত্যুর কাছে হার মানলেন মানিবক এই ডাক্তার। তার মৃত্যু সংবাদে এলাকার হিন্দু মুসলিম সবাই অঝোরে কেঁদেছেন।

    জানা যায়,বিনা ফিতে দেখা দরিদ্র রোগীদের কোম্পানী প্রদত্ত ঔষধ বিলিয়ে দিতেন তিনি।’ এলাকার কোন রোগী তার সিলেট চেম্বারে গেলেও তিনি তাদের ফ্রি দেখতেন। মানুষের সঙ্গে এমন ভালো ব্যবহার করতেন যাতে রোগীর রোগ অর্ধেক কমে যেতো। ‘ডা. মঈন উদ্দিন ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে আমেরিকার ফ্লোরিডা প্রবাসী সাংবাদিক গোলাম সাদাত জুয়েল ‘লেখেন-

    ‘২০০২ সাল থেকে পিতৃহীন মেধাবী ডাঃ মঈন উদ্দিন ও উনার পরিবারের গার্জিয়ান আমার শশুর আব্দুল নুর । ‘‘মেধাবী’’ শব্দটা ডিকশনারি তে লেখা হয়েছে মঈন উদ্দিন এর জন্য। আর” আল আমিন” নামে আরবিতে যে শব্দটা সেটাও মঈন ভাইয়ের জন্য। সারা জীবন নাকি পড়াশোনার মাঝে ডুবে ছিলেন, বাহিরের জগত থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। অসম্ভব মেধাবী, আরেকটা জিনিস খুব কম রোগী দেখতেন একজন রোগী উনার চেম্বার থেকে বের হত হাসিমুখে, কোয়ালিটি প্রাকটিস করতেন, রাতে যখন ইবনে সিনার রোগীদের ভিজিট করতেন উনার জন্য রোগীরা উদগ্রীব থাকতো, উনার ব্যবহারে রোগী অর্ধেক ভাল হত । গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত রোগী দেখতেন ফ্রি। তারপরও তিনি বৈষয়িক ভাবে ডাক্তারী করেই স্বচ্ছল ছিলেন।”

    💻এস এম শাহনূর
    (কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক)

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম