• শিরোনাম


    টাইম ম্যানেজমেন্টে নবীজির আদর্শ: ড. মোখতার আহমাদ

    | ২৯ নভেম্বর ২০১৮ | ২:৫০ অপরাহ্ণ

    টাইম ম্যানেজমেন্টে নবীজির আদর্শ: ড. মোখতার আহমাদ

    মদিনা শরিফের পবিত্র মসজিদে নববিতে মহানবী (সা.) এর স্মৃতিবিজড়িত বাবে জিবরিল (আ.)। ছবি : আলী হাসান তৈয়ব

    আমাদের এমন এক আদর্শ প্রয়োজন, যিনি টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে সুপ্রিমলি সাকসেসফুল। মুহাম্মদ (সা.) এর নাম এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একক আদর্শ হিসেবে সামনে চলে আসে। তাঁর সময় ব্যবস্থাপনা কীরূপ ছিলÑ তা জানতে হলে আমাদের চোখ, কান খোলা রেখে নির্দিষ্ট ফোকাসের সঙ্গে তাঁর সিরাত তথা জীবনালেখ্য পড়তে হবে। যাতে আমরা তাঁর দৈনন্দিন ও নিয়মিত রুটিন জানতে পারি। আপনি যদি তা করতে পারেন, তবে আপনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যাবে

    সময় খুবই সীমিত, সীমাবদ্ধ, অথচ মৃত্যু সুনির্ধারিত, সুনির্দিষ্ট। এরই মধ্যে আমাদের এমন জীবনযাপন করা দরকার, যা মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্দেশিত লক্ষ্যে পরিচালিত ও আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি কল্যাণকর। অর্থাৎ, আমাদের এ যাপিত জীবন যেন সুনির্দিষ্ট টার্গেটভিত্তিক ও ইতিবাচক হয়।
    সে ক্ষেত্রে আমাদের এমন এক আদর্শ প্রয়োজন, যিনি টাইম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে সুপ্রিমলি সাকসেসফুল। মুহাম্মদ (সা.) এর নাম এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একক আদর্শ হিসেবে সামনে চলে আসে। তাঁর সময় ব্যবস্থাপনা কীরূপ ছিলÑ তা জানতে হলে আমাদের চোখ, কান খোলা রেখে নির্দিষ্ট ফোকাসের সঙ্গে তাঁর সিরাত তথা জীবনালেখ্য পড়তে হবে। যাতে আমরা তাঁর দৈনন্দিন ও নিয়মিত রুটিন জানতে পারি। আপনি যদি তা করতে পারেন, তবে আপনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যাবে। আপনি দেখবেন, তিনি দিনের প্রতিটি কাজে কতটা সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন; তিনি কীভাবে বিভিন্ন কর্মে অগ্রাধিকার চিহ্নিত করতেন, তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন কথা রাখার ক্ষেত্রে, কতটা সংক্ষিপ্তভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতেন এবং নিষ্ক্রিয় আলাপচারিতা থেকে নিজেকে কতটা বিরত রাখতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসাধারণ সৃষ্টিশীল এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে ধাবিত জীবন থেকে আমরা সময় ব্যবস্থাপনায় নিচের পাঠগুলো গ্রহণ করতে পারিÑ



    সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠুন
    রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছেও দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ? আমার উম্মতের সকালের কাজে বরকত দিন।’ অতএব, আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পারতপক্ষে সকালবেলায়ই করে ফেলুন। বিশেষত, সেসব কাজ যাতে মানসিক অংশগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। আপনি যদি কাজকর্মে বরকত পেতে চান, তবে এটিই ম্যাজিক। দিনের বাকি অংশ আপনি সজীব থেকে সব কাজ সুন্দরভাবে সম্পাদন করতে পারবেন।

    সব কাজ নামাজের সঙ্গে মিলিয়ে টাইমিং করুন
    রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, ‘সর্বোত্তম কাজ কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘সময়মতো নামাজ আদায় করা, বাবা-মায়ের প্রতি এহসান করা এবং আল্লাহর পথে জেহাদ করা।’ আয়েশা (রা.) কে প্রশ্ন করা হলো রাসুলুল্লাহ বাসায় কী করতেন? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তিনি বাসায় স্ত্রীদের গৃহস্থালি কাজে সহযোগিতা করতেন। আর সালাতের আজান দিলেই দ্রুত বেরিয়ে পড়তেন, যেন তিনি আমাদের চেনেন না।’
    অতএব, সালাতের সঙ্গে কোনো আপস নেই। প্রতি ওয়াক্ত সালাতের জন্য একটি নির্ধারিত সময় ঠিক করে নিন, যা কোনো অবস্থায়ই মিস করবেন না। অন্য সব ব্যস্ততাকে ফেলে ঠিক সে সময়ই নামাজ আদায় করুন। মনে রাখবেন, আপনার সব কাজ ও ব্যস্ততাকে বাদ দিয়ে সালাতে দৌড়ে আসা প্রমাণ করে, উদ্দেশ্যমূলক জীবনযাপন করতে আপনার মাঝে একটি অদম্য শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। আপনি আপনার সহকর্মী বা প্রকল্প দলের সঙ্গে মিটিংয়ের ক্ষেত্রে যেমন সময়নিষ্ঠ হতে চেষ্টা করেন, তেমনি আপনার সময়মতো নামাজ সম্পাদন করা উচিত।

    অগ্রাধিকার ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করুন
    রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দৈনন্দিন কাজ তিন ভাগে বিভক্ত ছিলÑ
    ক. আধ্যাত্মিক বিকাশ : প্রতিদিনের একটি নির্ধারিত সময়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে, একান্তই আল্লাহ তায়ালার জন্য উৎসর্গ করতেন। এটি সাধারণত রাতের শেষ ভাগ ছিল, যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেকে পরের দিনের জন্য আধ্যাত্মিকভাবে রিচার্জ করে নিতেন এবং এটি দ্বীন প্রচারের মিশনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে তার দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দিত। রাতের শেষবেলা তিনি নামাজ, দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে স্বীয় পালনকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতেন, কারণ তিনিই সব শক্তি ও ক্ষমতার উৎস।
    খ. পারিবারিক বিষয় : রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিতভাবে দিবসের একটি সময় পারিবারিক বিষয়গুলোর জন্য নির্ধারিত করে রাখতেন। তার সব ব্যস্ততার মাঝে তিনি প্রতিদিন পারিবারিক কার্যাদির প্রতি যথাযথ মনোনিবেশ করতেন। ফলে পরিবারের সদস্যদের কখনও তাঁর অনুপস্থিতির অভাব বোধ করতে হয়নি।
    আনাস বিন মালেক বলেন, ‘মানুষের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সবচেয়ে দয়ালু ছিলেন। তাঁর ছেলে ইবরাহিমকে মদিনার উপকণ্ঠে একজন ধাত্রী দুধ খাওয়াত। তার দুধমাতার স্বামী ছিলেন একজন কামার। আমরা তার কাছে যেতাম, ঘরটি কখনও কখনও ধোঁয়ায় পূর্ণ থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় সন্তানকে চুম্বন করতেন এবং কোলে তুলে নিতেন।’ (আল-আদাব আল মুফরাদ)।
    আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীদের জন্য সর্বোত্তম, আর তোমাদের মধ্যে আমিই স্ত্রীদের জন্য সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি)।
    গ. ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয় : তিনি দিবসের একাংশে ধারাবাহিকভাবে সাহাবিদের সময় দিতেন। যাতে কেউ নিজেকে অবহেলিত মনে না করেন, বা মনে না করেন যে তার ব্যাপারগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে। এ সময়টিতে পুরুষ বা মহিলারা তাদের ব্যক্তিগত, বৈবাহিক, আর্থিক, আধ্যাত্মিক, এমনকি স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসত। এ সময়ই তিনি অন্যান্য জাতি বা ধর্মীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিতেন। রাজনীতি, দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের স্নায়ুবিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন।
    জীবনের বিভিন্ন কাজের মাঝে বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার চার্ট তৈরি করুন। ভেবে দেখুন, আপনি যে কাজে এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, তার মূল্য এক ঘণ্টার সমমূল্য কিনা? প্রথমে কী করা উচিত? কোন কাজটি করতেই হবে, আর কোনটি করা উত্তম। গুরুত্বপূর্ণ কাজে ক্রমাগত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সময় বরাদ্দ দিন। যতক্ষণ না আপনি সামাজিক কাজে, পড়াশোনা, বাবা-মা, পতœী বা সন্তানদের প্রাত্যহিকভাবে সময় না দেন, তবে ধরা নেওয়া হয়Ñ আপনার কাছে তারা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্ভাবনা আছে, আপনি অবশেষে এ উচ্চ অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়াবলিতে অবহেলা শুরু করলেন।
    ভালো কাজে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়–ন
    রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো উত্তম কাজেই গড়িমসি করতেন না। বরং তিনি দ্রুত উত্তম কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। গড়িমসি শয়তানের অস্ত্র। নিচের কয়েকটি ঘটনা খেয়াল করুন :
    উকবা বিন হারিছ (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) আসরের নামাজ আদায় করেই দ্রুত নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবার বের হয় এলেন। আমি বললাম বা তাকে বলা হলো, ‘এমনটি করার কারণ কী?’ তখন তিনি বললেন, ‘ঘরে সদকার একখ- সোনা রেখে এসেছিলাম কিন্তু রাত পর্যন্ত তা ঘরে থাকা আমি পছন্দ করিনি। কাজেই আমি তা বিতরণ করে এলাম।’ (বোখারি)। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ছয়টি ঘটনা ঘটার আগে দ্রুত ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো : পশ্চিম থেকে সূর্যের উদয়, ধোঁয়া, দাজ্জাল, জন্তু এবং তোমাদের কারও মৃত্যু অথবা সাধারণ বিপর্যয়।’ (মুসলিম)।
    যারা গড়িমসি করে তারা না সময়ের গুরুত্ব বোঝে, না আল্লাহ। তাদের যেসব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন সেগুলো উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করে। প্রতিটি দিনের রয়েছে নিজস্ব কিছু কাজ এবং প্রত্যেকটি সময়ের থাকে কিছু একান্ত বাধ্যবাধকতা। ফলে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনে অলস, নিরর্থক সময় বলতে কিছু ছিল না। উত্তম কাজের জন্য প্রতিটি সুযোগ ব্যবহার করুন।

    অন্যের সময়কে মূল্য দিন
    রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদের সময় ও প্রয়োজনাদির প্রতি খুবই সুবেদী ও সংবেদনশীল ছিলেন। তাঁর বক্তব্য হতো খুবই সংক্ষিপ্ত, যথাযথ ও শক্তিশালী। প্রত্যেককে তিনি যথাযথ ও পরিপূর্ণ সময় দিতেন, ফলে প্রত্যেকেই থাকতেন পরিতৃপ্ত। তিনি নিজের প্রয়োজনে অথবা অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতায় অন্যের সময়কে অহেতুক নষ্ট করতেন না এবং যে কাজে যতটুকু সময় দেওয়া দরকার তার চেয়ে বেশি দিতেন না। নিচে তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো :
    আবু ওয়াইল (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার আম্মার আমাদের সামনে একটি খুতবাহ দেন। কিন্তু তা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত এবং অলঙ্কারপূর্ণ। খুতবা শেষ করে মিম্বর থেকে নামলে আমরা তাকে বললাম, ‘আবদুল ইয়াকিন, আপনি তো খুব সংক্ষিপ্ত ও বাগ্মিতাপূর্ণ বক্তৃতা দিলেন। তবে আপনি খুতবাটি একটু দীর্ঘতর করলে ভালো হতো।’ তিনি বললেন, ‘নামাজ দীর্ঘ হওয়া এবং ভাষণ সংক্ষিপ্ত হওয়া ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। অতএব, নামাজ দীর্ঘ করো এবং বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করো। কোনো কোনো বক্তৃতায় জাদুকরি প্রভাব রয়েছে।’ (মুসলিম : কিতাবুল জুমা)
    রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত : কিছু মহিলা নবী (সা.) কে অনুরোধ করলেন যেন তিনি তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দেন। কারণ পুরুষরা তাঁর সঙ্গে সর্বদাই কথা বলার সময় পায়। ফলে তিনি তাদের দ্বীনের শিক্ষা ও হুকুম-আহকামসংক্রান্ত তালিম প্রদানের জন্য একটি দিবস নির্ধারিত করে দিলেন। (বোখারি)। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত বা চিহ্ন তিনটি। যথা, ১. কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। ৩. আমানতের খেয়ানত করে। (মুসলিম)
    আপনার জীবনকে আরও বেশি উৎপাদনশীল, অর্থপূর্ণ, সফল, আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ ও উপভোগ্যরূপে রূপান্তরিত করতে আপনাকে যে সিদ্ধান্তটি এ মুহূর্তেই নিতে হবে তা হলো : সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রিয় নবী (সা.) তাঁর কাজকর্ম ও কথাবার্তায় আমাদের যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবে আপনার সময় পরিচালনা করুন

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম