• শিরোনাম


    জয় বাংলা: স্লোগানে অভিধানে সংবিধানে প্রজ্ঞাপনে [] এস এম শাহনূর

    | ০৬ জুলাই ২০২২ | ৬:৪৬ অপরাহ্ণ

    জয় বাংলা: স্লোগানে অভিধানে সংবিধানে প্রজ্ঞাপনে [] এস এম শাহনূর

     

    জাতীয় স্লোগান জাতীয় ঐক্য ও প্রেরণার প্রতীক। বিশ্বের প্রায় ষাটটি দেশে জাতীয় স্লোগান আছে। আমাদের ছিল না। এখন আছে। তার ইতিহাস জানতে চলুন ফিরে যাই একটু পিছে।
    ‘৪৭ পরবর্তী পট পরিক্রমায় বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীকার চেতনার মন্ত্র ধ্বনি ‘জয় বাংলা’। বাঙালির মহাকবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি “আমার সোনার বাংলা”-কে জাতীয় সংগীত হিসাবে স্বীকৃতি (২ মার্চ ১৯৭১, পল্টন ময়দান) দিয়ে রবি ঠাকুরের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। “চল চল চল”-কে রণ সংগীতের স্বীকৃতির মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম পেলেন জাতীয় কবির খ্যাতি। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে নিঃসৃত ৭১’র ৭ই মার্চের ভাষণ এক অমর, অনবদ্য কবিতা। যে কবিতা/ভাষণ-কে (২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর, মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য ৪২৯ টি প্রামাণিক দলিলের মধ্যে একমাত্র অলিখিত ভাষণ।) ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ হেরিটেজ ডকুমেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে UNESCO.
    সেই কবিতার মাত্র দুটি শব্দ বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় জাতি-ধর্ম – বর্ণ মতভেদ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করে একাত্তরে। অথচ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে সরকারের সময় লেগেছে ৫০ বছর! আশার কথা হচ্ছে, উচ্চ আদালতের রায়ে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ২ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে।



    🇧🇩 স্লোগানে মননে জয় বাংলা :
    ➤১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পূ্র্ব, রাজপথে উচ্চারিত বজ্র কঠিন ঐক্যের ধ্বনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।
    ➤রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাগারে বন্দী শেখ মুজিব-কে মুক্তির স্লোগান ছিল জয় বাংলা, জয় শেখ মুজিব।
    ➤’৭০ এর ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জয় বাংলা ধ্বনিতে আওয়ামী লীগ জয় করে ১৬৭ আসন।
    ➤১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। ভঙ্গ করা হয় কারফিউ। উদ্বেলিত বাঙালির কণ্ঠে বার বার উচ্চারিত হয় জয় বাংলা স্লোগান।
    ➤৭১ সালে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত দিকনির্দেশনা ও ‘জয়বাংলা’ স্লোগান হয়ে যায় সব মুক্তিকামী মানুষের। বাঙালির বুকে স্পন্দিত, মুখে উচ্চারিত বীরত্ব প্রকাশের ভাষা এবং যুদ্ধেরও প্রধান হাতিয়ার ছিল জয় বাংলা।
    ➤জয় বাংলা/ জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা/ শেখ মুজিব, শেখ মুজিব, বীরবাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা, জাগো জাগো/ বাঙালি জাগো। ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা, জয় বাংলা…’।
    ➤’জয়বাংলা’ নামে রণাঙ্গন থেকে তখন প্রকাশিত হতো একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। সবার বুকে ও মুখে ছিল জয়বাংলা স্লোগান।
    ➤দীর্ঘ ৯ মাস জয় বাংলার লোক’ অভিহিত করেই লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করেছে পাকিস্তানের সমর্থক বাহিনী। আবার ‘জয়বাংলার লোক’ পাসওয়ার্ড (PASSWORD) ব্যবহার করেই মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ জনতার সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছে।

    ➤স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্বাক্ষরসংগীত ছিল ‘জয় বাংলা, বাংলার জয় ‘এবং অনুষ্ঠান সমাপ্তি ঘোষণা করা হতো ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করে। ১১ এপ্রিল ১৯৭১ প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ হয়েছিল ‘জয় বাংলা, জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে।
    ➤১০ জানুয়ারি ১৯৭২, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বিশ্বনন্দিত বিজয়ী বীর-কে বরণ করার স্লোগান ছিল জয় বাংলা।

    ➤ ১৯৭১ সালের ১১ মে প্রথম প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকা। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা মুদ্রিত হয়। জয়বাংলা পত্রিকার মূল শিরোনামের নকশা করেন কামরুল হাসান। পত্রিকাটি ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৪টি সংখ্যা প্রকাশ করে।
    🥊 লক্ষণীয়: পত্রিকাটির মূল শিরোনাম ‘জয়বাংলা’ নিরেট একশব্দে লেখা।

    ➤মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত হয়েছে এবং, পরে, ১৯৭২ সালে, বাংলা একাডেমি থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে সপ্তবহ্নির বই ‘জয় বাংলা! জয় মুজিব!’ যেখানে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাঙ্গালির ক্রমবর্ধমান আন্দোলন, তাঁর পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং এর পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও অবদান এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়। বইটির নাম টাইটেলে ‘জয় বাংলা’ দুটি আলাদা শব্দে লেখা হয়েছে।

    ➤বিদেশের মাটিতে জয় বাংলা নামে প্রথম টুর্নামেন্ট।
    ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে বিদেশে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা করতে ২০২১ সালে (২২ জানুয়ারি -২ ফেব্রুয়ারি) সুদানের উনামিড (UNAMID) এ নিয়োজিত (BANFPU) বাংলাদেশ ফর্মড পুলিশ ইউনিটের (BANFPU) অধিনায়ক শ্যামল আব্দুল হালিমের পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্বাবধানে ৭ টি দেশের অংশগ্রহণে “জয় বাংলা ভলিবল টুর্নামেন্ট” অনুষ্ঠিত হয়। [সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১। সুদান মিশন ও মুজিববর্ষ /শ্যামল আব্দুল হালিম,পূর্বাপর প্রকাশনী। ]

    ➤জয়বাংলা বলতে মনরে আমার:
    যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত একাত্তরে ২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদের লেখা “জয়বাংলা বলতে মনরে আমার’’। এই বইটিতে তিনি লিখেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের রুদ্রধ্বনি শিহরণ জাগা স্লোগান ‘জয়বাংলা’! সারা পৃথিবী কাঁপানো ঝাঁজালো স্লোগান ‘জয়বাংলা’। ‘জয়বাংলা’ শুধু একটি এবং একটি স্লোগানে দেহে শিহরণ জাগে, হৃদয় আন্দোলিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের এই হৃদয়গ্রাহী শ্রুতিমধুর স্লোগানে শরীরে একটা অলৌকিক শক্তি এসে যায় এবং বীর বাঙালির টগবগে রক্তে এক অজানা কাঁপন ধরিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের রুদ্রধ্বনি ‘জয়বাংলা’ ছিল অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের প্রণোদনা। ”

    🥊 লক্ষণীয়: লেখক বইটির নাম টাইটেলে নিরেট একশব্দে ‘জয়বাংলা’ ব্যবহার করেন।

    ➤মুনতাসীর মামুন রচিত উপন্যাস ‘জয় বাংলা’, এতে ১৯৬৯-১৯৭১ এর মধ্যকার কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের ঝড়ো দিনগুলোর কথা বিধৃত হয়েছে।উপন্যাসটির ১১০ পৃষ্ঠায়: ‘জয় বাংলা’ কীভাবে মানুষের মাঝে সঞ্চারিত হল এবং ১৩১ পৃষ্ঠায় ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। অতঃপর যে ধ্বনির মাধ্যমে বাঙালি কি চায় তা যেন একটি শব্দেই অনুরণিত হয়েছে তা হলো ‘জয় বাংলা’।

    🇧🇩 অভিধানে জয়বাংলা:
    বাংলা অভিধান অনুসারে ‘জয়’ শব্দের অর্থ হচ্ছে- ‘সাফল্য, বিজয়, যুদ্ধাদি’ দ্বারা অধিকার, পরাভূত করা, দমন, শত্রু দমন, আনন্দ, ফুর্তি, খুশি ইত্যাদি। জয়বাংলার অর্থ দাঁড়ায় বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয়। আমাদের অস্তিত্বে এই জয়বাংলা শব্দের শ্লোগানের ব্যবহার ও কার্যকারিতা আরও অনেক ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। ‘বাংলা বাঙালির হোক, বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক।’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অবিনাশী পঙক্তিমালা; সাতকোটি কণ্ঠে বেজে ওঠে বাঙালির হৃদয়ে লালিত ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।

    ➤বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, পঞ্চম পুনর্মুদ্রণ জুন ২০০৮] এ পৃথক দুটি শব্দে ‘জয় বাংলা’র ভুক্তি রয়েছে।

    ➤বাংলা একাডেমি বাংলা বানান-অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এর পঞ্চম পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৫] পৃথক দুটি শব্দে ‘জয় বাংলা’ ভুক্তি রয়েছে।
    কিন্তু বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে [প্রথম প্রকাশ মাঘ ১৪২২/ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] এ দুই শব্দের ‘জয় বাংলা’ নির্বাসিত। এখানে নিরেট একশব্দে; জয়বাংলা’র ভুক্তি রয়েছে।
    আবার একই অভিধানের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণের [বৈশাখ ১৪২৩ /এপ্রিল ২০১৬ ] ৫০৪ পৃষ্ঠায় জয় ভুক্তিতে স্তুতি বা শুভেচ্ছাসূচক উক্তি’র অর্থ প্রদর্শনে পৃথক দুটি শব্দে লেখা হয়েছে জয় বাংলা। একই পৃষ্ঠায় “বাংলাদেশের জয়সূচক ধ্বনি” অর্থেও পৃথক দুটি শব্দে ‘জয় বাংলা’র ভুক্তি রয়েছে।

    আবার পরিবর্তন! বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণের তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ, এপ্রিল ২০১৮] ৫০৪ পৃষ্ঠায় জয় ভুক্তিতে স্তুতি বা শুভেচ্ছাসূচক উক্তি’র অর্থ প্রদর্শনে পৃথক দুটি শব্দে জয় বাংলা লেখা হলেও একই অভিধানের একই পৃষ্ঠায় পৃথক জয়বাংলা ভুক্তিতে বাংলাদেশের জয়সূচক ধ্বনি” অর্থে নিরেট শব্দে ‘জয়বাংলা’ লেখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম বাকভঙ্গিতে ফাঁক আছে তবে দ্বিতীয়টিতে নেই।

    🇧🇩 বাংলাদেশের সংবিধানে জয় বাংলা:
    বাঙালির রক্তের অক্ষরে লেখা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪ নং আইন)-এর ৫৫ ধারাবলে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পঞ্চম তফসিল দ্বারা ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপরন্তু সংবিধানের ৭ (খ) ধারা অনুযায়ী সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদকে একটি অপরিবর্তনযোগ্য বিধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে পঞ্চম তফসিলে উল্লিখিত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি আমাদের সংবিধানের একটি অপরিহার্য ও অপরিবর্তনীয় অংশে পরিণত হয়েছে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, এপ্রিল, ঢাকা ২০১৬, পৃ. ৭৪-৭৬)।

    🥊লক্ষণীয়: সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সাতই মার্চের ভাষণের শেষে উল্লেখিত ‘জয় বাংলা’ পৃথক দুটি শব্দে লেখা রয়েছে।

    🇧🇩 জাতীয় স্লোগান হিসাবে প্রজ্ঞাপনে জয়বাংলা:
    ‘জয় বাংলা’ -কে জাতীয় স্লোগান হিসাবে চলতি ২০২২ সালের ২ মার্চ (বুধবার) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। যুগ্ম সচিব শফিউল আজিমের সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে,

    “সাংবিধানিক পদাধিকারী, দেশে ও দেশের বাইরে কর্মরত সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব জাতীয় দিবস উদযাপন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করবেন।”

    প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে,
    “সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সমাবেশ শেষে এবং সভা-সেমিনারে বক্তব্যের শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করবেন।
    এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।” বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।

    🥊লক্ষনীয়: প্রজ্ঞাপনে দুইবার ‘জয় বাংলা’ শব্দ এসেছে এবং প্রতিবারই পৃথক দুটি শব্দে লেখা হয়েছে।

    জয় এবং বাংলা মূলত দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ মিলেই একটি পদ ‘জয়বাংলা’; যেমন, বাংলা এবং দেশ দুটি আলাদা শব্দ কিন্তু উভয়ে মিলে ‘বাংলাদেশ’। প্রধান এবং মন্ত্রী দুটি আলাদা শব্দ কিন্তু উভয়ে মিলে ‘প্রধানমন্ত্রী। [টিএস রহমান]
    কিন্তু কেউ যখন স্লোগানটি উচ্চারণ করে অথবা নিনাদিত স্লোগানটি যখন শুনি একটানা বা বিরতিহীন ‘জয়বাংলা’ মনে হয় না। বরং পরিষ্কার দুটি ধ্বনিগুচ্ছের ‘জয় বাংলা’ মনে হয়।

    ➤সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুসারে সমাসবদ্ধ শব্দে ফাঁক রাখা যায় না। তাই ‘শহিদ মিনার’ বিজয় দিবস, জয় বাংলা লেখা শুদ্ধ নয়। এগুলো আসলে অশুদ্ধও নয়। যেমন: লেখা হয় জেলা প্রশাসক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়,
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সোনার বাংলা, স্বাধীনতা দিবস প্রভৃতি; বরং ব্যাকরণগতভাবে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও প্রমিত এবং অধিক দৃষ্টিনন্দন। তার কারণ হিসাবে ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা “কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ” গ্রন্থে বলা আছে, সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে লিখতে হয়, এটি সত্য— তবে সবসময় নয়? কখন? “উচ্চারণ, অর্থদ্যোতকতা ও শ্রুতিমাধুর্য বিবেচনায় যখন সুবিধা মনে হয়, তখন। নতুবা, ফাঁক রেখে লেখাই বিধেয়, এটিই বাংলার বৈশিষ্ট্য।”
    বাংলা ব্যাকরণে অসংলগ্ন সমাস বলে একটি কথা আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “সমাসবদ্ধ পদ অসংলগ্নভাবেও লেখা যায়। অসংলগ্নভাবে লেখা হলেও তা সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে গণ্য হয়।” বাংলায় সমাসের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে ইচ্ছা-নির্ভর বিষয়। ‘জয় বাংলা’ কথাটিকে অভিধান যতই সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে ‘জয়বাংলা’ বলুক না কেন—, ‘জয় বাংলা’ লিখলে ব্যাকরণগতভাবে কিংবা অর্থ ও শ্রুতিমাধুর্য প্রকাশে কোনো বিঘ্ন হয় না, বরং শ্রতিমাধুর্য বৃদ্ধি পায়।” [সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ/ বাংলা ভাষার মজা – ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.]

    “সমাসের মুখ্য কাজই হলো শ্রুতিমাধুর্য রক্ষা করা। বাংলা সংস্কৃত ভাষা নয়। এর উচ্চারণে শ্রুতিমাধুর্যের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। বাংলাভাষীর কাছে ছোট ছোট সহজ-উচ্চার্য শব্দই শ্রুতি মধুর হিসাবে প্রতিভাত।” তাই নিরেট ‘জয়বাংলা’র মত আলাদা ‘জয় বাংলা’ও ব্যাকরণগত শুদ্ধ। তবে একই লেখা যেন ভিন্নতা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা সমীচীন।

    জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশ নামকরণ করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা/ সংগীত/ রণসংগীত/ স্মৃতিসৌধ/ফুল/ফল/পাখি/মাছ প্রভৃতি বঙ্গবন্ধু নিজেই ঘোষণা করেন। কবি কাজী নজরুলের “বাংলা বাঙালির হোক,বাংলার জয় হোক,বাঙালির জয় হোক” এই অমর বাণী থেকে উৎসারিত ‘৭১ এর ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে নিঃসৃত, স্বাধীনতার প্রেরণা ও শক্তির উৎস; সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে স্পন্দিত ও নন্দিত শ্লোগান ‘জয় বাংলা’।
    বাংলাদেশ বেতার, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তর, বাংলা একাডেমি মুদ্রিত ভাষণের অনুলিপি এবং ওই সময়ে ব্যক্তিগতভাবে ভাষণ সংগ্রহকারীদের তথ্যমতে সেদিন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে নিঃসৃত ভাষণের শেষ শব্দটি মোটেও নিরেট একশব্দে ছিলনা। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন রচিত ‘জয় বাংলা’ উপন্যাসের ১৩১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে সেদিন জয় বাংলা শব্দটি কীভাবে জনসমুদ্রে তরঙ্গায়িত হয়ছিল তা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
    “… গলার স্বর উঠছে নামছে। ফুরিয়ে এলো বলা, সব শেষে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।” ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বাংলা’ গর্জে ওঠে রেসকোর্সের লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে।”
    তাই জাতির জনক সেদিন যেভাবে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেছিলেন আর সব কিছুর মত ঠিক সেভাবেই তা লেখা ও বলা সমীচীন হবে।

    ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে স্বাক্ষরিত হয় বিজয়ের ইতিহাস। তাই জয় বাংলা কোনো দলীয় স্লোগান নয়, কোনো ব্যক্তির স্লোগান নয়, এর মালিক বাংলাদেশ। এটা বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও প্রেরণার প্রতীক। যুগে যুগে ঝিমিয়ে পড়া বাঙালির চেতনায় বাঙালিত্ব জাগিয়ে সাধারণ বাঙালিকে বিশ্বসেরা বীর বাঙালিতে পরিণত করে যে স্লোগান তার নাম-ই জয় বাংলা।

    লেখক: এস এম শাহনূর
    কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম