• শিরোনাম


    জেনারেল কাসেম সোলাইমানীর হত্যা কান্ড কিছুটা বিশ্লেষণের প্রায়াস রাখে

    রিপোর্ট: মুফতি রহমতুল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার | ০৪ জানুয়ারি ২০২০ | ১:০৭ অপরাহ্ণ

    জেনারেল কাসেম সোলাইমানীর হত্যা কান্ড কিছুটা বিশ্লেষণের প্রায়াস রাখে

    ২০২০ সালের জানুয়ারীর ৩ তারিখ, ভোরের বেশ আগে বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আসেন ইরানের বিপ্লবী কুদস এলিট ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানী। তাঁকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসেন ইরাকী মিলিশিয়া কমান্ডার আবু মাহদী আল মুহান্দিস।

    ইরাক জুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে কয়েক মাস ধরে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নিহতের সংখ্যাও শতাধিক। ইরান নিয়ন্ত্রিত শিয়া সরকার বিক্ষোভরত সুন্নীদেরও হত্যা করেছে নির্বিচারে। তারপরও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি এই বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্যই ইরাক আসেন জেনারেল কাসেম সোলেইমানী।



    ইরাকের মার্কিন অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে যে গৃহযুদ্ধ ইরাকে শুরু হয়, সেই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় ইরান। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রাধীন সরকার বসাতে সক্ষম হয় তারা। নিজেদের সীমান্তের বাইরে নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হিজবুল্লাহর মাধ্যমে লেবাননের পর নতুন কোনো দেশ নিয়ন্ত্রণে আসে তাদের।
    একের পর এক ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকে গাজায়, সিরিয়ায় এমনকি আফগানিস্তানেও। সৌদি-আমিরাতের কাতার ব্লকেডের পর ইরান কাতার মিত্র হয়ে উঠে। ইরান হয়ে উঠতে শুরু করে মিডল ইস্টের বিগ প্লেয়ার।

    ইরানের সামরিক সাম্রাজ্য বিস্তারের মূল আর্কিটেক্ট হচ্ছেন বিপ্লবী কুদস ফোর্সের এই জেনারেল, যিনি ইরানীদের কাছে হাজী কাসেম নামেই পরিচিত।
    ইরানের সামরিক নীতি, পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেন এই জেনারেল।
    বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সমরবিদ বলা হয় তাকে। বলা হবে নাই বা কেন? তিনি যে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ দুটি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সিআইএর হিটলিস্টে এক নাম্বারে।
    ইজরায়েল জেনারেল কাসেম সোলেইমানীকে প্রকাশ্যেই তাদের এক নাম্বার শত্রু বলে।
    শুধু ইজরায়েল অবশ্য নয়, আরো অনেকের মাথা ব্যথার প্রধান কারণ হয়ে উঠেন ইরানী জেনারেল। তার মধ্যে আছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত। কারণ ইরাক ছাড়াও হাজী কাসেম ইরানের সীমান্ত টেনে নিয়ে গেছেন সিরিয়া, লেবানন, গাজা এবং ইয়েমেনে। পৌঁছে গেছে সৌদি আরবের একেবারে কানের কাছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাসের মাধ্যমে ১৫০০ কিলোমিটার দূরের ইরানকে তিনি টেনে নিয়ে গেছেন ইজরায়েল সীমান্তে।
    এ কারণে জেনারেল কাসেম যতটা না আমেরিকার মাথা ব্যথার কারণ, তারচেয়ে বেশী মাথা ব্যথার কারণ ইজরায়েল-সৌদি আরবের।
    ২০১৮ সালের নভেম্বরে নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, জামাল খাশোগী হত্যার এক বছর আগে সৌদি আরব একই টিম নিয়ে ইসরায়েলের একটি টিমের সাথে মিলে কাসেম সোলেইমানীকে হত্যার প্ল্যান করে। যার বাজেট ছিল দুই বিলিয়ন ইউএস ডলার। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আলাদা কোনো ভাড়াটে শক্তিকেও ব্যবহারের প্ল্যান করা হয়েছিল। অজ্ঞাত কোনো কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

    ইজরায়েল বা সৌদি আরব সুলেইমানীকে হত্যার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকলেও আমেরিকা তাকে হত্যার জন্য এতটা আগ্রহী হয়ে উঠেনি এতদিন। তার প্রধান কারণ আইএস, আল কায়েদা এবং আল নুসরাহ ফ্রন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উভয়ের শত্রু একই। কমন ইন্টারেস্ট শেয়ারের কারণে সুলেইমানীকে হত্যা করতে অতটা আগ্রহ দেখায়নি আমেরিকা।
    কিন্তু কিছদিন আগে বিক্ষোভকারীরা বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায়। পেন্টাগনের মতে, জেনারেল সোলেইমানীর অনুমোদনেই এই হামলা চালানো হয়।
    ইরানের অভ্যন্তরীণ কিংবা বাইরের যেকোনো বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন সোলেইমানী।
    ১৯৮০ সালের ইরাক-ইরান যুদ্ধে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে প্রথম আলোচনায় আসেন এই জেনারেল। ক্ষমতার বিচারে ইরানের যেকোনো সামরিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে তাঁর ক্ষমতা বেশী। তিনি নিজের এবং তার বাহিনীর জবাবদিহিতা করেন সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনীর কাছে। তাই ইরানীরাও কুদস ফোর্সের সংখ্যা এবং সামর্থ নিয়ে জানেন নধ খুব বেশী। তাদের রয়েছে আন্তমহাদেশীয় যুদ্ধাদল।
    অন্তত ১৫-২০টি দেশে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের স্বার্থের বিপরীতে ছদ্মযুদ্ধে লিপ্ত এরা।
    সোলেইমানীর কুদস ফোর্স সহায়তা করে লেবাননের হিজবুল্লাহকে, ফিলিস্তিনের হামাসকে, আফগানিস্তানে তালেবানকে, ইয়েমেনের হুতীদেরকে। এখানে শিয়া আসাদ সরকার যেমন আছে, তেমনি আছে সুন্নী হামাস এবং তালেবান।
    আমেরিকার বিরুদ্ধে তালেবানের যুদ্ধে তালেবানকে সহায়তা করে কুদস ফোর্স। ফিলিস্তিনের সুন্নী হামাসকেও কোনো সুন্নী গ্রুপ সহায়তা না করলেও অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ সহায়তার কথা প্রকাশ্যে বলে ইরান।
    এ কারণে জেনারেল সুলেইমানীকে শিয়া বা সুন্নীর পক্ষের শক্তি হিসেবে এককভাবে ফেলার মত এতটা সিম্পল নয়।
    কুদস ফোর্স তালেবানের অন্যতম মিত্র, যা কূটনীতিকদের কাছে বিশাল এক বিস্ময়।

    ইরানের অক্ষশক্তি ক্রমশ বৃদ্ধির পেছনে মূল মাস্টারমাইন্ড এই জেনারেল। দেশে রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে ইরান। একসময়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা হিজবুল্লাহকে ছাড়া সরকার গঠন করা যায় না লেবাননে। ইরাকে PMF (পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স) পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ব্লক।
    ইয়েমেনে হুতীদের সশস্ত্র সংগঠন ‘আনসারুল্লাহ’ একটি রাজনৈতিক শক্তি।
    ইজরায়েলী লবির কারণে ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে বছরের পর বছর। এরমধ্যেই বেড়ে চলেছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা। সব কিছুর মূল এই হাজী কাসেম।
    এমন বিপজ্জনক এক জেনারেল চলেন খুব সাদাসিধে ভাবে, সামরিক পোশাকের বদলে পরেন খুবই নরমাল পোশাক। এমন হাই প্রোফাইল জেনারেলদের শারীরিক ভাষা হয় খুবই ঔদ্ধত্য, সেখানে সোলেইমানী সম্পূর্ণ বিপরীত। যুদ্ধের ময়দানে একটা জ্যাকেট পরে নিজে ঘুরে বেড়ানো ছিল তার জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। তার প্রভাব ইরানে কতটুকু সেটা বুঝা যায় ঈমাম খামেনী যখন তার কপালে চুম্বন করেন, সেটা থেকে। এটি নিতান্তই কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
    ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বলা হলে তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন।
    ইরানীরা এই জাতীয় বীরের মধ্যে দেখতে পেতেন হযরত আলী (র) এর কাছের যোদ্ধা মালিক আল আশতারীর ছায়া। মালিক আল আশতারকে হত্যা করা হয়েছিল বিষ প্রয়োগে। এই কারণেই হয়তো খামেনী জেনারেল সোলেইমানীকে ‘জীবন্ত শহীদ’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন।

    আজ ভোরের আগে বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ী বহরে ড্রোন এবং হেলিকপ্টার থেকে রকেট হামলা করে আমেরিকা। এই হামলায় নিহত হন জেনারেল কাসেম সোলেইমানী, PMF এর কমান্ডার আবু মাহদী আল মোহান্দিস সহ ৫ জন। পেন্টাগন এবং ইরান উভয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করে।
    ডোনাল্ট ট্রাম্পের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। সাবেক হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল সিকিউরিটি অফিশিয়াল হিলারী ম্যান বলেন, জেনারেল সোলেইমানীকে হত্যা করার অর্থ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
    প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে কোনো প্রস্তাব উত্থাপন ছাড়াই, কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন ছাড়াই এই এই সিদ্ধান্ত নেন, যা আমেরিকার সংবিধান পরিপন্থী।
    এই সিদ্ধান্ত নিতে ইরান এবং সৌদি লবি অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। অবশেষে তারা সফল হয়।
    সোলেইমানীকে হত্যার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আরো অশান্ত হয়ে যাবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
    ইতিমধ্যে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৪%।
    জেনারেল কাসেম সোলেইমানী হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্য বিশাল বড় একটা ধাক্কা।
    হোঁচট খেতে পারে সিরিয়ায় আসাদ সরকারও।
    সেই সঙ্গে বিশাল বড় ধাক্কা হিজবুল্লাহ, হামাস এবং কমবেশী তালেবানের জন্যও।
    ফিলিস্তিনী হামাস যে অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে, সেটা অনেকটা হলফ করেই বলে দেয়া যায়।
    সুন্নীদের জন্য সোলেইমানী অস্বস্তির সবচেয়ে বড় কারণ সিরিয়ায় আসাদ সরকার। আসাদকে টিকিয়ে রাখতে কয়েক লাখ বেসামরিক নাগরিক হত্যার দায় ঠিক যতটা আসাদের, ততটাই জেনারেল সোলেইমানীর। আসাদকে টিকিয়ে রাখার পেছনে সবচেয়ে বেশী ভুমিকা সোলেইমানীর। তার মৃত্যু ইজরায়েল, আমেরিকা, সৌদি-আমিরাত ছাড়াও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে সিরিয়ার সুন্নী বিদ্রোহীদের। অন্যদিকে ইজরায়লের কাছে অসহায় হয়ে পড়বে হিজবুল্লাহ এবং হামাস।
    তার মৃত্যুর মাধ্যমে আসাদ সরকারের যদি পতন হয়, সেটা সান্ত্বনা হতে পারে সুন্নীদের জন্য। তবে এর মাধ্যমে ইজরায়েল সৌদি আরবের যে সাফল্য এবং তালেবান ও হামাসের যে ক্ষতি হবে, তাতে সেই সান্ত্বনা কতক্ষণই বা স্থায়ী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
    তবে ইরান এই ধাক্কা সহসায় কাটিয়ে উঠতে পারবেনা, এটা হলফ করেই বলা যায়। সামনে হয়তো ইরানের জন্য অপেক্ষা করছে আরো দুঃসময়।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম