• শিরোনাম


    ‘জাতীয় পত্রিকা’র কোন রাষ্ট্রস্বীকৃত বা অফিসিয়াল সংজ্ঞা নেই :-আশাফা সেলিম

    | ৩১ জানুয়ারি ২০২০ | ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ

    ‘জাতীয় পত্রিকা’র কোন রাষ্ট্রস্বীকৃত বা অফিসিয়াল সংজ্ঞা নেই  :-আশাফা সেলিম

    ‘হাট্টিমাটিম টিম/তারা, মাঠে পাড়ে ডিম…’। এই বিখ্যাত ছড়ার ‘হাট্টিমাটিম টিম’ নামে কোন কিছু নেই। এটি ছেলে ভোলানো, কাল্পনিক কিছুর নাম। ঠিক সেরকমই একটি মৌখিক নাম ‘জাতীয় পত্রিকা’। কিন্তু আদতে ‘জাতীয় পত্রিকা’ বলে কোন কিছু নেই! এটি একটি বহুল প্রচলিত অস্বচ্ছ ধারণা। ‘জাতীয় পত্রিকা’র কোন রাষ্ট্রস্বীকৃত বা অফিসিয়াল সংজ্ঞা নেই! গুগল সার্চ ইঞ্জিনও এ বিষয়ে কোনো আর্টিকেল বা সংবাদ খুঁজে পায়নি। তার মানে, বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে ‘জাতীয় পত্রিকা’ নামের অস্পষ্টতার বিষয়টি সেভাবে উত্থাপিতই হয়নি? অথচ সব মহলেই এটি অনেকেই উচ্চারণ করেন। লেখেনও অফিসিয়ালি। এমনকি আইনের গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ ‘নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট)’-এর ইলেক্ট্রনিক ভার্সনে ‘ইধহমষধ হধঃরড়হধষ হবংিঢ়ধঢ়বৎ’ কথাটি লেখা আছে।

    আবার- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬’ ও ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮’-এও ‘বহুল প্রচারিত জাতীয় সংবাদপত্র’ কথাটির উল্লেখ রয়েছে! অথচ ‘ন্যাশনাল নিউজপেপার’ বা ‘জাতীয় পত্রিকা’ শব্দবন্ধ দুটোর কোনো অফিসিয়াল অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুগ যুগ ধরে এই নামটি টিকে আছে মূলত মানুষের মুখে মুখে!



    ‘জাতীয় পত্রিকা কাকে বলে’, এই প্রশ্নটি সংবাদপত্র-সংশ্লিষ্ট কিংবা সাধারণ যে কোন মানুষের কাছে রাখলেই উত্তর আসে, ‘যেসব পত্রিকা ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়, এবং সারাদেশ কাভার করে, তাকেই ‘জাতীয় পত্রিকা’ বলে।

    চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপির)-এর অনলাইন তথ্যমতে (সবশেষ হালনাগাদ: ১৮ এপ্রিল ২০১৮) ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ৪৭৬টি। প্রচলিত অর্থে এগুলোকেই ‘জাতীয় পত্রিকা’ বলা হচ্ছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত হবে, এবং সারাদেশে যাবে। ব্যস! এটাই ‘জাতীয় পত্রিকা’ হয়ে ওঠার বহুল প্রচলিত মৌখিক ক্রাইটেরিয়া!

    বিষয়টির গভীরে গিয়ে ‘জাতীয় পত্রিকা’র অফিসিয়াল সংজ্ঞা বা স্বরূপ খুঁজতে, ইন্টারনেটসহ সংশ্লিষ্ট সবখানে দুমাস অনুসন্ধান চালিয়েছি। ঢাকা ও রংপুরের পত্রিকা-সংশ্লিষ্ট বেশ কজন বিশিষ্টজনের কাছে প্রশ্ন রেখেছি: ‘জাতীয় পত্রিকা বলতে কী বোঝায়? এর অফিসিয়াল সংজ্ঞা কী’। উত্তরে প্রায় সবাই বলেছেন- ‘যেসব পত্রিকা ঢাকা থেকে বের হয়, এবং সারাদেশ কাভার করে, সেগুলোকেই জাতীয় পত্রিকা বলে’। কিন্তু, লিখিত সংজ্ঞা কেউ দিতে পারেননি।

    সারাদেশ কাভার করার কথা বললে-হাতে গোনা কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ছাড়া কোনটিই সারাদেশ কাভার করে না। অথবা, রংপুরেই দেখেছি, কোন পত্রিকা ৫ হাজার কপি আসে, কোনোটি ৫ কপিও আসে (সে পত্রিকার নামও অধিকাংশ মানুষই জানেন না)।

    অপরদিকে, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক মো. শাহ আলমগীর বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন- ‘জাতীয় পত্রিকা বলে আসলে কিছু নেই। ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোকেই সাধারণত জাতীয় পত্রিকা বলা হয়ে থাকে। তবে কোনো পত্রিকার পক্ষ থেকে বলা হয় না যে, তারা জাতীয় পত্রিকা। এটি একটি প্রচলিত ধারণা। তবে, কখনো কখনো বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের নামের সাথে ‘জাতীয়’ শব্দটি বসিয়ে দেয়া হয়। এটা ঠিক না। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি অথরিটি থাকা দরকার”।

    চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপির)-এর মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইসতাক হোসেনকে আমি ‘জাতীয় পত্রিকা’র অফিসিয়াল সংজ্ঞার সংকটের কথা জানালে তিনি সম্মতি জানান এবং তার পরামর্শে ডিএফপির পরিচালক (বিজ্ঞাপন ও নিরীক্ষা) আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন আমাকে ফোনে জানান- ‘প্রত্যেকটি উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে যাদের সার্কুলেশন আছে, তারা জাতীয় পত্রিকা বলে দাবি করে।….এটা হলো সাংবাদিকদের দাবি। জাতীয় পত্রিকার অফিসিয়ালি কোন অস্তিত্ব নেই। তাই এর সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যও নেই…’।

    আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার প্রফেসর ড. গোলাম রহমানের মতে, ‘জাতীয় পত্রিকা বলতে ধারণা করা হয়, পুরো দেশকে কাভার করে, এমন পত্রিকা। কিন্তু এর কোন অফিসিয়াল সংজ্ঞা বা গ্রামার নাই। জাতীয় বলে আসলে কিছু নেই। থাকাটা জরুরিও না। পত্রিকার ক্ষেত্রে তো ডিএফপি নির্ধারিত গ্রেড আছে; এ গ্রেড, বি গ্রেড, সি গ্রেড। জাতীয় পত্রিকা হিসেবে ডিফাইন করা না করায় কোনো সুবিধা-অসুবিধা বা সমস্যার কথা তো শুনিনি’।

    মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, দি ডেইলি এশিয়ান এইজ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বললেন- ‘সেই ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে, যেগুলো প্রভিন্সে ছাপা হতো, সেগুলো প্রভিন্সিয়াল বা আঞ্চলিক, আর ক্যাপিটাল অর্থাৎ লন্ডন থেকে ছাপা হলে সেগুলোকে ন্যাশনাল বলা হতো। সেই ধারণাই গত ৪৭ বছরে কেউ পাল্টায়নি। প্রচলিত নিয়মে, কোন্টি জাতীয় পত্রিকা, সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু, জাতীয়করণ বলতে, কোনো একটি/দুটি পত্রিকার সরকারিকরণ চাই না; বরং আমি শত ফুল ফুটুক নীতিতে বিশ^াসী’।

    উত্তরবাংলা ডটকমের সম্পাদক ড. শাশ^ত ভট্টাচার্য বললেন- ‘জাতীয় পত্রিকা একটি অস্পষ্ট ধারণা। আসলে এর কোন প্রকৃত সংজ্ঞা বা স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায় না’। বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাবিউর রহমান প্রধান বললেন- ‘জাতীয় পত্রিকার কোন জাতীয় চরিত্র নেই! ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়ে সারাদেশে গেলেই যদি তাকে ‘জাতীয়’ বলা হয়, তাহলে এমন অনেক পত্রিকা আছে, যেগুলো সারাদেশ তো দূরের কথা, ঢাকারই সব জায়গায় যায় না। আমি ছাত্রাবস্থায়ও এর সংজ্ঞা পাইনি; ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে গিয়েও এর কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা দিতে পারি না, তাতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। তাই সরকারিভাবে এর একটা সুরাহা হওয়া উচিত। দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বিশিষ্ট কলামিস্ট মাহবুব কামাল বলেন- ‘জাতীয় পত্রিকা বলাটা ঠিক না। বলা উচিত মেইনস্ট্রিম বা মূলধারার পত্রিকা’।

    যে যাই বলুন, আমার মতে, মহান ‘জাতীয়’ শব্দটি যুক্ত করে, কেবল প্রকাশের স্থান বা প্রচার পরিধি বিবেচনায় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের (সংবাদপত্র) পরিচয় (কাগজে মুদ্রিত) ‘জাতীয় পত্রিকা’ হওয়া উচিত নয়। তাছাড়া, ঢাকা থেকে প্রকাশের কারণে ‘জাতীয়’ হলে তো ঢাকায় অনেক বিল্ডিং আছে, বাজার আছে; সেগুলোকেও কি তাহলে ‘জাতীয় বিল্ডিং’, ‘জাতীয় বাজার’ বলা হবে?

    আবার, কিছু দৈনিক আছে পাকিস্তানপন্থি, সৌদিআরব বা আফগানপন্থি; যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই মনেপ্রাণে বিশ^াস করে না, আজও মেনে নিতে পারে না আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাকে; যারা প্রশ্ন তোলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে; শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ছবি চাঁদে পাঠিয়ে দেশে চরম সংকট তৈরি করে। কেবল ‘ঢাকা থেকে প্রকাশিত’র তকমা লাগিয়ে সেসব পত্রিকাও কি ‘জাতীয় পত্রিকা’র মুকুট মাথায় দিয়ে চলবে? সেটা তো হতে পারে না। কারণ, সেটা তো যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা শোভা পাওয়ার মতোই কষ্টের ও অগ্রহণযোগ্য!

    জাতীয় সংগীত শুনলেই আমরা গভীর শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে যাই। কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাই- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…’। জাতীয় পতাকা, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ, কবি, অধ্যাপক যেখানেই ‘জাতীয়’ শব্দটি যুক্ত, আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধাবনত হই। ‘জাতীয়’ শব্দটিই আসলে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় জাতির চেতনা ও স্বত্বায় মিশে আছে। গভীর সম্মানসূচক এই অভিধা আমাদের দেশপ্রেমের স্বাক্ষর বহন করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘জাতীয়’ অভিধাপ্রাপ্ত যে কোন কিছুরই পরিচিতি সারাদেশে প্রায় সর্বব্যাপী। সর্বজনগ্রাহ্য। নিজ মহিমায় উজ্জ্বল। সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। পশু-পাখি-মাছ-ফুল-ফল কিংবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব সর্বজনীন।

    তাই, নির্ধারিত সংজ্ঞার মাধ্যমে ‘জাতীয় পত্রিকা’ শব্দবন্ধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। সেটি সম্ভব না হলে, ‘জাতীয় পত্রিকা’ বলা বা লেখা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করে, ‘কেন্দ্রীয় পত্রিকা’, ‘ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা’, ‘রাজধানীর পত্রিকা’ ইত্যাদির যে কোন একটি বলা যেতে পারে। কারণ, ‘জাতীয়’ শব্দটি সমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্বকারী, খুবই মর্যাদাপূর্ণ স্পর্শকাতর একটি শব্দ। সে কারণে, ‘জাতীয়’ শব্দটির ব্যবহারও হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, নির্ধারিত শর্ত ও বৈশিষ্ট্যের আলোক। রাষ্ট্র যেহেতু এখনো কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি, তাই নানাক্ষেত্রেই লক্ষ্য মিটি থবা কখনো কখনো বেমানান কোন কিছুর সঙ্গেও জুড়ে দেয়া হয়!

    হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ৯ বছরের শাসনামলে, দেশে অনেক যুগান্তকারী অর্জন হয়েছে। তারই নেতৃত্বে মহাকাশে স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ পাঠিয়ে, বাংলাদেশ আজ এলিট ক্লাবের সদস্য। এই মহা উৎকর্ষের যুগে এসে, ভেগ আখ্যা বা অস্পষ্ট অভিধায় কোন প্রতিষ্ঠান তথা জাতির আঁধারে থাকার কোন মানে হয় না। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণমাধ্যমবান্ধব বর্তমান সরকারই পারে ‘জাতীয়’ শব্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে জাতিকে ধোঁয়াশামুক্ত করতে। তাই, এর সমাধানে আমি বিনীতভাবে তথ্যমন্ত্রী তথা সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ ও যথাযথ আশু পদক্ষেপ কামনা করছি।

    [লেখক : ছড়াকার, সংস্কৃতিকর্মী ও কলামিস্ট]

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম