• শিরোনাম


    চাঁদপুরের ‘রক্তধারা’ স্মৃতিস্তম্ভ কথা কয়: এস এম শাহনূর

    | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

    চাঁদপুরের ‘রক্তধারা’ স্মৃতিস্তম্ভ কথা কয়: এস এম শাহনূর

    লোককথার প্রসিদ্ধ চাঁদ সওদাগরের নাম কিংবা চাঁদ ফকিরের পুণ্য নামের স্মৃতিধন্য মেঘনার স্রোতধারায় পুষ্ট চাঁদপুর পর্যটকদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়ে গেছে আজো।ভ্রমণ পিপাসু মানুষের মনের জানালায় চাঁদপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য পৌঁছে দিতেই আমার এই প্রয়াস।
    লোককথার সওদাগরের বাণিজ্যতরী সপ্তডিঙা মধুকর একদিন এই উর্বর জনপদে ভিড়েছিলে। তাহারি সম্বৃদ্ধ নামে পরিচিত চাঁদপুর এই লোকবিশ্বাস অনেকেরই মনে দৃঢ় হয়ে গেঁথে আছে। কারো কারো মতে শহরের পুরিন্দপুর বর্তমানে কুড়ালিয়া হলার মহল্লার চাঁদ ফকিরের নাম হতে চাঁদপুর নামের উৎপত্তি। বারো ভূঁইয়াদের আমলেই ভূখণ্ড বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায়ের দখলে ছিল এই অঞ্চলে তিনি একটি শাসন কেন্দ্র স্থাপন করেন তাই ইতিহাসবিদ জেএম সেনগুপ্তের মতে চাঁদ রায়ের নামানুসারেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে চাঁদপুর।
    পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থল চাঁদপুর বড় স্টেশনের মোলহেডে বধ্যভূমিতে অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ’রক্তধারা’।১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চাঁদপুর জেলার পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায়, চাঁদপুর পুরাণ বাজার এবং চাঁদপুর বড় স্টেশনে কয়েকটি নির্যাতন কেন্দ্র বা টর্চার শেল তৈরি করে।মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এখানে হানাদার বাহিনী সড়ক ও রেলপথে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লার পশ্চিম অঞ্চল, নৌপথে মুন্সীগঞ্জ, শরিয়তপুর, ভোলা, বরিশাল, খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ জনগণ ও যাত্রীদের ধরে এনে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করত, নারীদের ধর্ষণ করত। ধারণা করা হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে এখানে হত্যা করে মেঘনা নদী মোহনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। চাঁদপুরের ডাকাতিয়া ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে ঘূর্ণির গভীরতা প্রায় নয়শত ফুট। পাথর বেঁধে মৃত দেহগুলো ফেলে দিলে তা মুহূর্তেই ২০-২৫ মাইল দূরে চলে যায়। মানুষের রক্তস্রোত মেঘনা-ডাকাতিয়ার স্রোতে মিলিত হয়ে সৃষ্টি হয় ‘রক্তধারা’।

    “মোলহেডের মাটির নিচে এবং পাশে নদী
    একাত্তরে কত্তো মানুষ লুকিয়ে রাখে বধি।
    লাকসাম আর চাটগাঁ হতে রেলগাড়িতে চড়ে
    আসতো যারা ঢাকা হতে আনতো তাদের ধরে।
    সেই স্মৃতিতে “রক্তধারা” আলোয় জ্বলে রাত্রে
    চার পংক্তি আছে লেখা নাম ফলকের গাত্রে।
    পাক হানাদার আর রাজাকার খুন করেছে যাদের
    ‘রক্তধারা’ শ্রদ্ধা জানায় রক্তলেখা তাদের।
    ‘রক্তধারা’ চাঁদপুরে আজ একাত্তরের স্মৃতি
    বীর শহীদে শ্রদ্ধা ভরে ইলিশ জানায় প্রীতি।
    [ছড়াকার ডাঃপীযূষ কান্তি বড়ুয়া]



    স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর ২০১১ সালে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের দাবিতে প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘রক্তধারা’।রক্তধারা’র স্থপতি চঞ্চল কর্মকার । এ স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৯ সালে ৩১ অক্টোব এর নামফলক সংস্কার করেন মাহমুদুল হাসান খান।

    রক্তধারা এক স্তম্ভ বিশিষ্ট এতে ৩টি রক্তের ফোঁটার প্রতিকৃতি দিয়ে বোঝানো হয়েছে রক্তের ধারা। টেরাকোটার মুরালে আঁকা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি ঘটনাবলীর চিত্র।
    এই স্মৃতিস্তম্ভে লেখা আছে-

    ‘নরপশুদের হিংস্র থাবায় মৃত্যুকে তুচ্ছ করেছে যারা
    এখানে ইতিহাস হয়ে আছে তাঁদের রক্তধারা
    এ শুধুই স্মরণ নয়
    নয় ঋণ পরিশোধ
    এখানে অবনত শ্রদ্ধায়
    নরপশুদের জানিও ঘৃণা আর ক্রোধ।’

    ➤দেখে নিন ইলিশ ভাস্কর্য বা ইলিশ সেলফি জোন:

    ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ ও ‘ব্র্যাডিং জেলা’ চাঁদপুরের ইলিশের ঐতিহ্য ও সুখ্যাতি অর্জন ধরে রাখতে এবং অদূর ভবিষ্যতে মোলহেডকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ‘ভাস্কর্য ইলিশ’ নির্মাণ করা হয়েছে ।


    চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেডের পূর্ব পাশে ব্র্যান্ডিং জেলার সেলফি জোন হিসেবে ইলিশের এ ভাস্কর্য নির্মাণ করছেন চিত্রশিল্পী আজাদ হোসেন।

    ➤কিভাবে যাবেন:

    বাস: পদ্মা এক্সক্লুসিভ (সায়েদাবাদ)। ভাড়া: ২৭০ টাকা। বাস সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রতি ৩০ মিনিট পরপর ছেড়ে যায়।

    লঞ্চ: ঢাকা সদরঘাট থেকে সকাল ৭.২০ মিনিট থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় লঞ্চ চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

    ভাড়া: ডেকঃ ১০০ টাকা, চেয়ার: ১৫০ টাকা (নন-এসি), চেয়ার: ২৫০-২৮০ টাকা (এসি), কেবিন (সিঙ্গেল): ৪০০-৫০০ টাকা।

    চাঁদপুর ঘাট থেকে অটোতে ১০/১৫ টাকায় বড় স্টেশন, তিন নদীর মোহনায় মোলহেডের ‘রক্তধারা’য় যেতে পারবেন।

    💻লেখক: এস এম শাহনূর
    (কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক)

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম