• শিরোনাম


    চাঁদপুরের মোলহেড এ যেন বারমুডা ট্রায়েঙ্গেল: এস এম শাহনূর

    | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৫:১৪ অপরাহ্ণ

    চাঁদপুরের মোলহেড এ যেন বারমুডা ট্রায়েঙ্গেল: এস এম শাহনূর

    বাংলাদেশের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল
    আমার দেখা চাদঁপুরের মোলহেড!

    প্রকৃতির নিবিড় মমতায় পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া বিধৌত চাঁদপুর যেনো এক রূপ নগরের রাজকন্যা। যার রূপের যাদুতে মুগ্ধ হয়ে নেমে আসে আকাশের চাঁদ।
    মেঘনা ডাকাতিয়ার জলজ জ্যোৎস্নার বিগলিত স্রোতধারায় পুষ্ট, ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এক নিবিড় শ্যামল জনপদের নাম চাঁদপুর।যার আয়তন প্রায় ১৭০৪.০৬ বর্গ কিলোমিটার।চাঁদপুর হচ্ছে চাঁদের নগর।এ চাঁদ আকাশের বিনিদ্র যামিনী জাগা চাঁদ নয় এ চাঁদ কোন ব্যক্তির কাল বিকীর্ণ নামের বিচ্ছুরণ।



    “কথা কয়-কথা কয়-ক্লান্ত হয় নাকো
    এই নদী
    এক পাল মাছরাঙা নদীর বুকের রামধনু
    বকের ডানার সারি শাদা পদ্ম
    নিস্তব্ধ পদ্মের দ্বীপ নদীর ভিতরে
    মানুষেরা সেই সব দেখে নাই।”

    —জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে যে-কেউ মুগ্ধ হয়ে জীবনানন্দ দাশের এই কবিতা আওড়াতে পারেন।নদী ঘিরে দেখা যায় এমন মনোরম দৃশ্য। এমন মনোরম দৃশ্য উপভোগের জন্য সকাল-বিকেল সেখানে লোকসমাগম ঘটে। সকাল থেকে বিকেলের দিকে লোকের ভিড় থাকে আরও বেশি।

    হিমেল হাওয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা জায়গাটি হচ্ছে চাঁদপুর শহরের পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ত্রিকোণাকার, প্রবল ঘূর্ণাবর্ত অংশটি যা মোলহেড নামে পরিচিত। বড় স্টেশন মোলহেড, যেটা মোহনা নামেও পরিচিত। আবার অনেকে একে শহরের ‘ঠোডা’ হিসেবেও বলে থাকেন। ছোটবেলা থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর কথা অনেকেই শুনেছেন।হয়তো আপনার যাওয়া হয়নি কখনও আটলান্টিক মহাসাগরে। কিন্তু দেখে আসতে পারেন ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিপাক সৌন্দর্য চাঁদপুরের মোলহেড ট্রা’য়া’ঙ্গে’ল। চারপাশ থেকে প্রবাহিত তীব্র স্রোত, মাঝে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিপাক। ভয়ংকর ওই ঘূর্ণিপাকে কিছু পড়লে তার আর হদিস মেলে না।

    এমনকি বড় বড় যাত্রীবাহী লঞ্চও তলিয়ে গেছে এখানে, যেগুলোর সন্ধান কোনোদিনই আর পাওয়া যায়নি। বলছি চাঁদপুরের ত্রিনদীর সঙ্গমস্থলের কথা, যা স্থানীয়ভাবে কোরাইলার মুখ নামেও পরিচিত।নদীগুলো তিনদিক থেকে প্রবাহিত হয়ে মিশে যাওয়ায় সেখানে পানির বিশাল এক ঘূর্ণিগর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আর এই ট্রায়াঙ্গেলে পড়েই নিখোঁজ হয়েছে শত শত মানুষ, লঞ্চসহ কার্গো কিংবা ট্রলার। তিন নদীর এ সঙ্গমস্থল যেন এক মৃত্যুকূপ।মোহনাটি নদীর একেবারে তীরে অবস্থিত। সাধারণত নদীর তীর অগভীর থাকে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, নদীর তীরে হওয়া স্বত্বেও এই মোহনা অনেক গভীর। বর্ষাকালে এটি রূপান্তরিত হয় মৃত্যুকূপে। পানির ভয়ঙ্কর ঘূর্ণি দেখে মানুষের মনে শিহরণ জাগে। এই মোহনা নিয়ে লোকমুখে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে।

    জনশ্রুতি আছে, এই মোহনা এক ছেলের অভিশাপে সৃষ্টি হয়েছে। সে হয়তো হাজার বছর আগের কথা। তখন মোহনাস্থলে কোনো নদী ছিল না। ছিল ছোটখাটো বাজার, হোটেল আর দোকানপাট। নদী ছিল কয়েক কিলোমিটার দূরে। একদিন বিকেলে ছোট এক দ্ররিদ্র ছেলে একটি হোটেলে গিয়ে খাবার চায়। হোটেলের মালিক তাকে তাড়িয়ে দেয়। ছেলেটি পুনরায় খাবার চাইতে গেলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।ছেলেটি আবারও ওই হোটেলে যায়। এবার হোটেলের লোকটি রেগেমেগে তার গায়ে গরম তেল ছুড়ে মারে। অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাদঁতে কাঁদতে ছেলেটি চলে যায়। ওই রাতেই হোটেল অবধি কয়েক কিলোমিটার জায়গা নদীর অতলে হারিয়ে যায়। তৈরি হয় মোহনা। ওই ঘটনার বহু বছর পর ওই ঘূর্ণিপাকে পড়ে একটি লঞ্চ ডুবে যায়। তখন ডুবুরিরা লঞ্চের সন্ধানে নদীর তলদেশে গিয়ে দেখে একটি ছোট ছেলে চেয়ারে বসে আছে। ঘটনাগুলো আদৌ সত্যি কি-না তার কূল-কিনারা নেই।

    এখানে এমভি শাহজালাল, মদিনা, দিনার ও নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে যায়। সবগুলো লঞ্চেই প্রচুর যাত্রী ছিল।তীব্র স্রোতের কারণে অধিকাংশ যাত্রীই বেঁচে ফিরতে পারেননি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এমভি নাসরিন-১,২০০৩ সালের ৮ জুলাই এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবিতে মারা যান ১১০ জন, নিখোঁজ হন ১৯৯ জন।এখন পর্যন্ত এখানে ডুবে যাওয়া কোনো লঞ্চের সন্ধান পায়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ – বিআইডব্লিউটিএ।

    এ স্থান হতে পশ্চিম দিগন্তে খুব স্পষ্টভাবে সূর্যাস্ত দেখা যায়। ইংরেজি শব্দ মোলহেড (Molehead) মানে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ অভিঘাত হতে স্থল ভূমিকে রক্ষার জন্য পাথর কংক্রিট দ্বারা নির্মিত শক্ত প্রাচীর বা বাঁধ।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মিলিত প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণি হতে চাঁদপুর শহরকে রক্ষার জন্য বোল্ডার দ্বারা এটি নির্মিত হয়। এই মনোরম স্থানটি চাঁদপুরের শ্রেষ্ঠ নৈসর্গিক বিনোদন স্থান। তিন নদীর সঙ্গমস্থলে গড়ে ওঠা শহরের নজির হিসেবে চাঁদপুর অনন্য।জেলা প্রশাসন জায়গাটিকে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ নামে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

    ছড়াকার ডাঃপীযূষ কান্তি বড়ুয়া লিখেছেন,
    “শহরটা দেহ হলে আছে তার তিল
    তিলটাই নেয় কেড়ে মুসাফির দিল্
    সরকারি নামে তারে ডাকে মোলহেড
    নদী ভেঙে গড়ে তিল যেন রেডিমেড।
    অবারিত মিলনে তিনটি নদী
    ছুটে যায় সাগরে মহাজলধি।
    ত্রিনদীর সংযোগ নজর কাড়া
    আছে তরু আকাশের নীলের সাড়া।
    শান্তির হাওয়া মেলে মন জুড়িয়ে
    বিনোদনের যায় দিন,কাল ফুরিয়ে।
    নগরীর মোলহেড স্বর্গ বিলাস
    মেঘনার সঙ্গমে স্বস্তিনিবাস।
    এইখানে বসে খাও ইলিশ মুড়ি
    পৃথিবীতে মোলহেড নেইকো জুড়ি।”

    সেখানে বসে দেখা যায়, পদ্মা মেঘনার উন্মত্ততা, সূর্যাস্ত, মাছ ধরা, নানা ধরনের নৌযান চলাচলের দৃশ্য। এই বড় স্টেশনের পাশেই রয়েছে পদ্মা, মেঘনার রুপালি ইলিশসহ নানা ধরনের তাজা মাছের বিশাল আড়ত।
    বড় স্টেশনের এক পাশে স্টিমারঘাট, আরেক পাশে লঞ্চঘাট, মধ্যখানে রেলস্টেশন। অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের জন্য জায়গাটি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কিছু স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। প্রবেশের মুখে রুপালি ইলিশের একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।এ বিষয়ে পরে লিখব অবশ্যই। ইলিশ মাছের জন্য প্রসিদ্ধ চাঁদপুরকে ‘ইলিশের বাড়ি’ বলা হয়। তাই শহরের আইকন হিসেবে ভাস্কর্যের জন্য ইলিশকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এই ভাস্কর্যকে ‘সেলফি জোন’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁদপুরে ব্যাপক গণহত্যার সাক্ষী বধ্যভূমিটিও সেখানে। সেই বধ্যভূমির স্মৃতিরক্ষার্থে ‘রক্তধারা’ নামে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।
    চাঁদপুরে মোলহেড ছাড়া সাধারণ বিনোদনের জন্য কোন স্পট নেই বললেই চলে।তিন নদীর মিলনস্থল এই মোলহেডে ভরা বর্ষায় প্রচন্ড ঘূর্ণস্রোতে এক ভয়ংকর সৌন্দর্যে রূপ নেয়। এই ঘূর্ণিস্রোতের পাকে পড়ে গত দু তিন দশকে বেশ কিছু যাত্রীবাহী লঞ্চ হারিয়ে যায়, অনেকটা বারমুডা ট্রায়াংগেলের রহস্যের মতো! সূর্যাস্তের প্রাক্কালে দিগন্ত ব্যাপী এক মায়াবী সৌন্দর্যের জাল বিস্তারী এই মোলহেড শত শত মানুষের সলিল সমাধিও ঘটিয়েছে। তবুও নৈসর্গিক সৌন্দর্য পিয়াসী মানুষের নিকট এর আকর্ষণ দুর্নিবার।

    ➤কিভাবে যাবেন:
    বাস: পদ্মা এক্সক্লুসিভ (সায়েদাবাদ)। ভাড়া: ২৭০ টাকা। বাস সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রতি ৩০ মিনিট পরপর ছেড়ে যায়।

    লঞ্চ: ঢাকা সদরঘাট থেকে সকাল ৭.২০ মিনিট থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় লঞ্চ চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
    ভাড়া: ডেকঃ ১০০ টাকা, চেয়ার: ১৫০ টাকা (নন-এসি), চেয়ার: ২৫০-২৮০ টাকা (এসি), কেবিন (সিঙ্গেল): ৪০০-৫০০ টাকা।

    চাঁদপুর ঘাট থেকে অটোতে ১০/১৫ টাকায় বড় স্টেশন, তিন নদীর মোহনায় যেতে পারবেন।অথবা চাঁদপুর জেলার প্রাণকেন্দ্র শপথ চত্তর মোড় থেকে রিক্সা, অটোরিক্সা, বা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়। শপথ চত্তর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১/১.৫ কিলোমিটার।

    💻লেখক: এস এম শাহনূর
    (কবি ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক)

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম