• শিরোনাম


    কুৎসিত চেহারার আড়ালে হেজবুত তাওহীদের লুকোচুরি [] সাহাদত হোসেন খান।

    | ০৯ এপ্রিল ২০২১ | ৩:৪৩ অপরাহ্ণ

    কুৎসিত চেহারার আড়ালে হেজবুত তাওহীদের লুকোচুরি [] সাহাদত হোসেন খান।

    ভ্রান্ত আকিদার হেজবুত তাওহীদ নিজেদের কুৎসিত চেহারা আড়াল করতে লুকোচুরি খেলছিল এবং চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছিল। তাদের কার্যকলাপে প্রমাণিত হয়, বিদেশে তাদের প্রভু আছে। ইসলাম বিদ্বেষী কোনো বিদেশি শক্তির কাছে তাদের আত্মা বিক্রি। বিদেশি শক্তির স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে তারা কাজ করছিল। দেশের শীর্ষ আলেমরা হেজবুত তাওহীদকে একটি ফেতনা হিসেবে দেখছিলেন এবং মুসলমানদের ঈমান লুটের জন্য তাদের অভিযুক্ত করেন।

    হেজবুত তাওহীদ ইসলামের নাম ভাঙ্গায়। কিন্তু তাদের কোনো কথা ও কাজ ইসলামের পক্ষে যায় না। দেশের মূল ধারার কোনো ইসলামি দল ও গ্র“পের সঙ্গে তাদের মিল নেই। কোনো ইসলামি দল তাদেরকে সমর্থন করে না। মিত্র বলে মনে করে না। তবু তারা ছিল মাঠে সক্রিয়। বাইরের শক্তি এবং সরকারি সমর্থন ছাড়া তাদের পক্ষে একদিনও টিকে থাকা সম্ভব নয়। পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলো মুসলমানদের ‘জঙ্গি’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে গণ্য করছে। পাশ্চাত্যের সমর্থন লাভে হেজবুত তাওহীদ জঙ্গি বিরোধী একটি ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল এবং দেশের বিদ্যমান ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোকে জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করছিল।



    আমাদের আলেম-ওলামাদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা এবং মুসলমানদের দুর্দশার জন্য একতরফা মুসলিম শাসকদের সমালোচনা করা হচ্ছে এ বাতেল সংগঠনের একমাত্র কাজ। তাদের মুখে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের কোনো প্রশংসা শোনা যায়নি। শুধু দোষ আর দোষ। অমুসলিমরাও মুসলমানদের এত তীব্র সমালোচনা করে না। বুঝা যায়, ইসলামের দুশমনরা নিজেদের পরিচয়ে যা করতে পারেনি, মুসলিম নামধারী হেজবুত তাওহীদকে দিয়ে তারা তা করিয়ে নিচ্ছিল। ডাক্তার যেমন রোগীর লক্ষণ দেখে রোগ বলে দিতে পারেন, তেমনি লক্ষণ দেখে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, হেজবুত তাওহীদ ইহুদি-খ্রিস্টান-ইসকনের লেলিয়ে দেয়া একটি পথভ্রষ্ট গ্র“প। তারা মূলত ইসলামকে অপ্রিয় করার অশুভ মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা ইসলাম অবমাননায় মুখ খোলে না এবং মুসলমানদের প্রতি অন্যায়ের বিরোধিতা করে না। মুসলিম নির্যাতনের একটি দৃষ্টান্ত দেখানো সম্ভব নয় যেখানে হেজবুত তাওহীদ কথা বলেছে। একথা অস্বীকারের কোনো জো নেই যে, আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইসরাইল-এ তিনটি শক্তি হচ্ছে মুসলমানদের মূল শত্র“। আমাদের দেশের প্রতিটি ইসলামি দল ও সংগঠন এ তিনটি দেশের কঠোর বিরোধিতা করে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে হেজবুত তাওহীদের কোনো বক্তব্য নেই। এতেই প্রমাণিত হয়, তাদের সঙ্গে এ ভুঁইফোড় সংগঠনের কোনো না কোনো ধরনের সম্পর্ক রয়েছে এবং এসব দেশের স্বার্থে তারা কাজ করে।

    ২০১৯ সালের শেষপ্রান্তে দুটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। একটি ছিল ভোলার চর বোরহানুদ্দিনে বিশ্বনবী (সা.)কে কটাক্ষ এবং আরেকটি ছিল বাবরি মসজিদের রায়। এ দুটি ঘটনার কোনোটিতে হেজবুত তাওহীদ মুসলমানদের মতো স্বাভাবিক আচরণ করতে পারেনি। এ রহস্যময় সংগঠনের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম কোনোটার নিন্দা করেনি। এ ধরনের ঘটনায় তাকে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর একটাই, আমরা দেখছি। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। কথিত এমাম সেলিম ছাড়া এ ধরনের অপ্রত্যাশিত উক্তি আর কেউ করেননি।

    ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখা যায়। ভিডিওর কভারে হেজবুত তাওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের ছবি এবং ‘বাবরি মসজিদের রায় নিয়ে একটি প্রশ্ন’ শিরোনাম দেখতে পাই। আমি এমন একটি জিনিস খুঁজছিলাম। তখনো আমি ছিলাম বিছানায়। বিছানা ছেড়ে ভিডিও ওপেন করি। আমি ধৈর্যের সঙ্গে সেলিমের বক্তব্য শুনি। আমি আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম যে, সেলিম বাবরি মসজিদের রায়ের সমালোচনা কিংবা নিন্দা করবে না। আমার বিশ্বাস সঠিক প্রমাণিত হয়। ঠিকই সেলিম রায়ের সমালোচনা করেনি। হেজবুত তাওহীদের সমাবেশে প্রশ্ন করেছিল রামপুরার জনৈক ফরিদউদ্দিন রব্বানি। প্রশ্নকর্তা আমার এলাকার এবং বিষয়টি বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত হওয়ায় আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। রব্বানি নিজের পরিচয় দিয়ে বললো, সম্প্রতি ভারতের আদালত বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের রায় দিয়েছে। এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামি দল বিক্ষোভ কর্মসূচি, আন্দোলন ও লংমার্চ ইত্যাদির ঘোষণা দিয়েছে। এব্যাপারে হেজবুত তাওহীদের বক্তব্য কি।

    কত সুন্দর একটি প্রশ্ন! কিন্তু প্রশ্ন শুনে যেন সেলিমের মেজাজ বিগড়ে যায়। কর্মসূচি দেয়ায় সে ইসলামি দলগুলোর প্রতি ক্ষিপ্ত হয়। সেলিম প্রায় আধা ঘণ্টার মতো বক্তব্য রাখে। সে তার প্রকৃত মনোভাব গোপন করার জন্য বলতে শুরু করলো, গত কয়েকদিন থেকে আমি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আমি দেখছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে প্রশ্ন করেছেন, জানতে চেয়েছেন আমাদের প্রতিক্রিয়া কি। বিষয়টি এক কথার দুই কথার নয়। আমরা রাজনীতি করি না। আমাদের কোনো দূরভিসন্ধি নেই। আমরা ইস্যু তালাশ করি না। ১৯৯০ সালে (১৯৯২ সালে) বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া হলে আমরা কয়েক হাজার ছাত্র বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলাম। হিন্দু মন্দির পাহারা দিয়েছিলাম। তখন ইতিহাস জানতাম না। এখন আমার কাছে খোলাসা হয়েছে। এসব বিক্ষোভ রাজনীতির অংশ। আমরা বিক্ষোভ করবো না। তারা (ইসলামি দলগুলো) উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। সরকারকে বলবো সীমান্ত খুলে দিন। লংমার্চ করুক। দেখি কি করতে পারে।
    ভিডিওর সর্বত্র ছিল এ জাতীয় কথা। ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর আমি ইউটিউবে হেজবুত তাওহীদের আরেকটি ভিডিও দেখেছি। এ ভিডিওতে এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি নিয়ে আলোচনা করে। আমি অনেকক্ষণ ভিডিও দেখেছি। দীর্ঘক্ষণ সে ভারত ও আসামের ইতিহাসে নিয়ে কথা বলেছে। সে কি যে বলতে চাইলো আল্লাহ ভালো জানেন। আমি কখনো কোনো বক্তাকে বিষয় এড়িয়ে প্রসঙ্গের বাইরে কথা বলতে দেখিনি। সেলিম পারে। এ ব্যাপারে সে অত্যন্ত উস্তাদ। আমি অবাক হই এমন একটা ভ-কে লোকজন সর্মথন করে কিভাবে। আমি অন্যসব ভিডিও থেকে আরো অনেকের সাক্ষাৎকার নোট করেছি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ভারতের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গাঙ্গুলি ও স্বামী অগ্নিবেশ। আমি তাদের সাক্ষাৎকারের প্রতিটি শব্দ গ্রহণ করেছি। তাদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আমার কাছে মণিমুক্তার মতো মূল্যবান মনে হয়েছে। আমি আবেগে আপ্লুত হয়েছি। একথা ঠিক যে, ভারতের উগ্র হিন্দুরা অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙ্গেছে। আবার একথা ঠিক যে, হিন্দুদের একটি অংশ মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে এবং তীব্র ভাষায় মসজিদ ভাঙ্গার এবং মসজিদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সমালোচনা করেছে। আমি বাবরি মসজিদের রায়ের ভালো-মন্দ যতটুকু শিখেছি সেটুকু তাদের কাছ থেকে। আমার দুঃখ এখানেই যে, হিন্দুরা স্পষ্টাক্ষরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরোধিতা করলো। আর হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিম মুসলিম হয়েও শুধু কথা চিবালো। বিশ্বের ইতিহাস বলার চেষ্টা করলো। সে তার বক্তৃতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেছে ১৯৯২ সালে মরহুম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের লংমার্চ এবং আমাদের আলেম-ওলামাদের সমালোচনায়। তার যত জেদ সব আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে। আলেমরা হলেন ইসলামের বাতি। এসব বাতি নিভে গেলে আমাদের সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু থাকবে না। সেলিম ও তার সংগঠন হেজবুত তাওহীদ তাই চায়।
    হেজবুত তাওহীদ নামে কোনো সংগঠন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। আকস্মিকভাবে তাদের প্রতি আমার মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। আমি দেখতে পাই যে, সারাদেশে বিরোধী দল কোথাও পা ফেলতে পারছিল না। ওয়াজ মাহফিলের ক্ষেত্রেও একথা সত্যি। অনেক মাওলানার ওয়াজ নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারপন্থী হলে কোনো সমস্যা ছিল না। বিরোধী মনোভাবাপন্ন হলেই সর্বনাশ। বিরোধী মনোভাবাপন্ন হলে পুলিশ ধাওয়া করতো। রাস্তায় দাঁড়াতে দিতো না। বেধড়ক লাঠিপেটা করতো। অবশেষে গাড়ি পোড়ানোর মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিতো। বিরোধী দলের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ছিল ডজন ডজন মামলা। অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। জাতীয় ইতিহাসের এমন ঘন দুর্দিনে হেজবুত তাওহীদ প্রতিদিন কিভাবে সমাবেশ করছিল তা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। আমি নিশ্চিত যে, সরকারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। সরকারের ছত্রছায়ায় তারা কাজ করতো। নয়তো তাদের পক্ষে বুক ফুলিয়ে সভা সমাবেশ করা সম্ভব হতো না।
    এমন এক বিপজ্জনক সময় কেউ জোর কথায় কথা বলতো না। শুধু হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিমের গলা ছিল চড়া। বুঝা যাচ্ছিল, তাকে কেউ শক্তি যোগাচ্ছে। বিরোধী মনোভাবাপন্নরা কখনো তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানায়নি। কিন্তু সেলিম প্রায়ই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাতো। তখন তাকে তাদের ভাষায় এমাম বলে মনে হতো না। মনে হতো সে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংঠনের নেতা।
    হেজবুত তাওহীদের জনৈক জাফর আহমদ অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রেসক্লাবে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে আমাকে তিনটি বই উপহার দেন। আমি বইগুলো গ্রহণ করি। লাইব্রেরিতে প্রবেশ করা মাত্র প্রেসক্লাবের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিরুল ইসলাম কাগজী আমার হাত থেকে একটি বই নিয়ে নেন। তিনি কোন বইটি নিয়েছেন আমি তার নাম দেখিনি। কাগজীর মুখে আমি প্রথম হেজবুত তাওহীদের এমাম বায়েজীদ খান পন্নীর নাম শুনি। কাগজী বললেন, তিনি ইউটিউবে বায়েজীদ খান পন্নীকে নিয়ে আলোচনা শুনেছেন। আরো বললেন, পন্নী হলেন হেজবুত তাওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এবং একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। কাগজীর কথা শুনে আমার গা ছম ছম করতে থাকে। পাশে ছিলেন একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। কাগজীর কথা শুনে তিনি কান খাড়া করেন। তাকে সন্দেহ করার সুযোগ না দেয়ার জন্য অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই। জাফর আহমদের প্রতি আমার ভীষণ রাগ হয়। তাকে অভিসম্পাত করতে থাকি। তিনি যেন আমার হাতে আগুনের কয়েকটি টুকরো ধরিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। আমি নিজের কাছে কৈফিয়ত দিতে পারছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম না জাফর আহমদ আমাকে কেন টার্গেট করলেন। ইচ্ছা করছিল বাকি দুটি বই ফেলি দেই। ফেলে দিতে গেলে আরো সন্দেহ দেখা দিতো। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বে রেখে দেই। কাগজী একটি বই রেখে দেওয়ায় কিছুটা ভারমুক্ত হই। মনে হলো বইটি একটি পাঠক খুঁজে পেয়েছে। আমার কাছে থাকলে তো পড়ে থাকতো। এক নজর চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারি, বইগুলো নিন্মমানের। বাকি দুটি বই নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। একটি বইয়ের নাম ‘দাজ্জাল: ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতা’ এবং আরেকটি বইয়ের নাম ‘দ্য লস্ট ইসলাম।’ আরো জানতে পারি বায়েজীদ খান পন্নী হলেন সেলিমের শ্বশুর এবং তিনি ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। বাড়ি টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। বিএনপির প্রথম মেয়াদে পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তার ভাই। সেলিমের বাড়ি নোয়াখালী। এলাকা ছাড়া হওয়ায় সে কুষ্টিয়ায় বসবাস করছে। তার পূর্ণ নাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম।
    রেফারেন্স বই হলে আমি কখনো ফেলে রাখি না। আমার ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাবজেক্টের বাইরে আমি কখনো পড়াশোনা করি না। বই পড়া ছাড়া বই লেখা যায় না। আমি প্রতিদিন কমবেশি পড়াশোনা করি। তবে এতটুকু আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি যে, হেজবুত তাওহীদের বই থেকে আমার শেখার কিছু নেই। ২০১৯ সালে অক্টোবরের শেষদিকে তাদের নামাজের একটি ভিডিও পাই। এতে দেখতে পাই হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিম ইমামতি করছে। মন্তব্য দেখে আমি ভিডিওর প্রতি আকৃষ্ট হই। সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলা হয়, ‘দেখুন ইমামের আগে মুছল্লিরা রুকু-সেজদা করছে।’ এখান থেকে শুরু হয় হেজবুত তাওহীদের সঙ্গে আমার জানাশোনা। ভিডিওতে সেলিমের ইমামতিতে নামাজের দৃশ্য দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। এমন নামাজ আমি জীবনেও দেখিনি।
    ১৯৯৭ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে ইরান সফরে গিয়ে এক অদ্ভুত নামাজের মুখোমুখি হই। শুক্রবারে ইরানি গাইডের সঙ্গে জামারানে খোমেনির মাজার দেখতে যাই। ফিরতে ফিরতে দুুপুর হয়ে যায়। জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য সোজা তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে প্রবেশ করি। টুপি না থাকায় আফসোস করছিলাম। প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথায় বাঁধি। ভেতরটা খচ খচ করছিল। না জানি কে কি মনে করে। ইরানের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ খাতামি নামাজে শামিল হন। আমি তাকে বার বার দেখছিলাম। নামাজের জন্য লাইনে দাঁড়াই। ডানে-বামে তাকিয়ে দেখি কারো মাথায় টুপি নেই। একটু আগে আমি টুপি না থাকার জন্য আফসোস করছিলাম। আর তখন মাথায় রুমাল বাঁধা থাকায় নিজেকে বিসদৃশ মনে হতে লাগলো। এক ফাঁকে প্যান্টের পকেটে রুমাল গুঁজে ফেলি। আমার পাশে ইরানি গাইড। নামাজ শুরু না হতেই দেখি তিনি একটি কৃত্রিম হাতে খুলে নিচে রেখেছেন। আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে যাই। আমাদের বিস্ময় দূর করার জন্য ইরানি গাইড বললেন, তিনি ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আহওয়াজে ইরাকি হামলায় একটি হাত হারিয়েছেন। ১৯৮০-৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বহুবার আহওয়াজের নাম শুনেছিলাম।
    সামরিক বাহিনী থেকে এই ইরানি গাইড অবসর গ্রহণ করেছেন। তিনি একটি কৃত্রিম হাত লাগিয়েছেন। তার কথা শুনে ভীতি দূর হয়। নামাজ শুরু হয়ে যায়। এক কি দুই রাকায়াত পড়ে দেখি অন্যদের সঙ্গে আমাদের নামাজ মিলে না। আমার পাশে ছিলেন চট্টগ্রামের অধ্যাপক আবদুন নূর। আমি তার দিকে তাকাই। তিনি জানি কিভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলেন। আমি তাদের নামাজ কিছুই বুঝিনি। এমন নামাজ জীবনে কোনোদিন দেখিনি। নামাজ বাদ দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। শিয়াদের নামাজ জানা না থাকায় আমার জায়গায় আমি বসে থাকি। অপেক্ষা করতে থাকি কখন সবার নামাজ শেষ হয়। ইরানিদের নামাজ পড়া দেখছিলাম। দেখলাম সেজদা দিয়ে পাথরে কপাল ঠুকে। এ পাথর নাকি কারবালার। সামনে একটি বিরাট গর্ত দেখলাম। সেখানে একজনকে নামাজ পড়তে দেখলাম। তিনি ইমাম সাহেব কিনা বুঝতে পারছিলাম না। সৈয়দ মোহাম্মদ খাতামি কোথায় কিভাবে নামাজ পড়েছেন তাও দেখিনি। মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলন করে আমেরিকা ও ইসরাইল বিরোধী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। শ্লোগানে শ্লোগানে মসজিদ চত্বর প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মনটা বিষিয়ে যায়। কি একটা শ্রদ্ধা নিয়ে ইরানে গিয়েছিলাম। সত্যি মনটা খারাপ হয়ে যায়। অনুশোচনা হতে লাগলো। মনে মনে বললাম, কেন এলাম। আগে জানলে আসতাম না। একসময় অপেক্ষার পালা শেষ হয়। এ অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলবো না।
    হেজবুত তাওহীদের নামাজ ছিল ঠিক এরকম। কারো মাথায় টুপি নেই। এমাম সেলিম জোরে জোরে বাংলায় নিয়ত করে মাগরেবের নামাজে ইমামতি শুরু করে। রুকু-সেজদা করার সময় সেলিম যেন লেফট-রাইট করছিল। মনে হয়েছিল, সে যেন নামাজ নয়, একটি সামরিক কুচকাওয়াজ পরিচালনা করছিল। কুইক মার্চ। যার কখনো হাসি পায় না সেও যদি এ নামাজ দেখে তাহলে না হেসে পারবে না। এ নামাজকে মস্করা ছাড়া আর কিছু বলা ঠিক নয়। ইসলামে পর্দা প্রথা ফরজ। কিন্তু সেদিন সেই নামাজে দেখলাম পুরুষ ও মহিলা একত্রিত হয়ে নামাজ পড়ছে। জানি না সেলিমের পিতা জীবিত কিনা। যদি সেলিম তার পিতার কাছে জানতে চাইতো তিনি কিভাবে নামাজ পড়েন। তাহলে তিনি সাক্ষ্য দিতেন যে, তিনি সেলিম ও হেজবুত তাওহীদের মতো নামাজ পড়েন না। তার দাদাও একই সাক্ষ্য দিতেন। মুসলমানদের নামাজ পড়া দেখে অমুসলিমরা দলে দলে কালেমা গ্রহণ করেছে। নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ। তার সামনে দাঁড়ানো। নামাজের মধ্য দিয়ে বান্দা স্রষ্টার নৈকট্য কামনা করে। এক অপার্থিব জগতের সন্ধান পায়। আল্লাহর ওলিরা কখনো কখনো সারারাতে এক রাকায়াত নামাজ শেষ করতে পারতেন না। আমাদের নবী (সা.) এক সেজদায় রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহ বলতেন, হে কাম্বলিওয়ালা মাথা তুলুন।
    সেই নামাজকে হেজবুত বানিয়েছে অ™ু¢ত। এ ধরনের নামাজ দেখলে বিধর্মীরা ইসলাম গ্রহণ করা দূরে থাকুক, যারা আছে তারা থাকবে কিনা সন্দেহ। আসলে সেলিম ও হেজবুত তাওহীদ এমনটাই চায়।
    শৈশব থেকে নামাজ পড়ি। আমার পিতা ও দাদা ছিলেন আলেম। ইসলাম আমার রক্তে। হেজবুত তাওহীদের সঙ্গে আমার কোনো শত্র“তা নেই। আমি সারাজীবন ওয়াজ শুনেছি। ওয়াজ শুনলে শান্তি পাই। এমন দৃষ্টান্ত খুব কম আছে যে, ওয়াজ শুনে কাঁদিনি। শুধু আমি নই, প্রত্যেকটা মানুষ কাঁদে। বুক ভাসিয়ে কাঁদে। কান্নার বাঁধ ভেঙ্গে যায়। সারাজীবনের কান্না ফুঁসে ওঠে। পাথরের মতো হৃদয় গলে যায়। নিজেকে একটা নতুন মানুষ বলে মনে হয়। এজন্য ওয়াজ শুনতে দূর দূরান্তে ছুটে গিয়েছি। গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছি। চরমোনাইয়ের মরহুম হুজুর মাওলানা ফজলুল করিমের বহু ওয়াজ শুনেছি। নরসিংদীর জামেয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা কামালউদ্দিন জাফরি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মাসুম, হাবিবুর রহমান যুক্তিবাদী, মাওলানা আমিনুল হক, শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক, মাওলানা ফজলুল হক আমিনী, বায়তুল মোকাররমের মরহুম খতিব মাওলানা উবায়দুল হক, মাওলানা মোহাম্মদ আলী লাহোরীসহ বহু বক্তার ওয়াজ শুনেছি। তবে সবচেয়ে বেশি শুনেছি মোফাচ্ছেরে কোরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ। সাঈদীর ওয়াজ শোনার অপরাধে দৈনিক খবর থেকে চাকরি হারিয়েছি। আমার জীবনে একটি ইচ্ছা ছিল। সাঈদী মুক্তজীবনে থাকলে আমি তাকে আমার কয়েকটি বই উপহার দিতাম। বলতাম, হুজুর আপনার গর্জনকে আমি ভাষা দিয়েছি। আমার বইয়ে আপনার ওয়াজের গর্জন শুনতে পাবেন। কিন্তু আমার ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল। সাজানো সাক্ষ্য দিয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ আলেমকে বানানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধী। কোরআনের কোকিলকে কোরআনের মাঠ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। জানি না হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিম সাঈদীর ওয়াজ শুনেছে কিনা। শুনে থাকলে কোনো কথা নেই। সাঈদীর কণ্ঠে আল্লাহপাক মধু ঢেলে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ‘নাহমাদু সাল্লিআলা রাসুলিহিল কারিম’ বলে তিনি ওয়াজ শুরু করলে মনে হতো আকাশের দরজা ভেদ করে জমিনে শান্তি বর্ষিত হচ্ছে। চারদিকে এক মধুর আবেশ ছড়িয়ে পড়তো। নেমে আসতো পিনপতন নিস্তদ্ধতা। তার ওয়াজের সঙ্গে শুরু হতো হো হো ক্রন্দন। আমি তার কাছে ঋণী। তার ওয়াজ শুনে বুঝেছি সত্যি ইসলাম মহান ও শ্রেষ্ঠ। আর হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিমের বক্তৃতা? সেলিমের বক্তৃতা শুনলে কারো চোখে পানি আসে না। সে তার বক্তৃতায় ষাড়ের মতো আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে গজরাতে থাকে। তার আক্রোশ শুধু আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে। সেলিমের সমাবেশে তার সামনে কিছু লোককে দেখা যায়। এসব লোককে মনে হয় সিনেমার দর্শক। তাদের মাথায় না থাকে টুপি, না থাকে গায়ে পাঞ্জাবি, না থাকে ইসলামি ছুরুত।

    আলেম-ওলামারা হলেন আমাদের মাথার তাজ। তারা ইসলামি সভ্যতার পতাকা বহন করছেন এবং তারা হলেন ইসলামের প্রতিনিধি। সেলিম আমাদের খুঁটিতে আঘাত করছে। সে বার বার তাদেরকে ধর্মব্যবসায়ী হিসেবে গালি দেয়। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করলে করছে সেলিম ও তার দল, আলেম-ওলামারা নন। সে চুনোপুটি হয়ে লম্বা লাফ মারে। আমরা অশিক্ষিত নই। এখনো হেজবুত তাওহীদের অশুভ উদ্দেশ্য বুঝার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলিনি। আমরা মাটির তৈরি মানুষ। আমাদের চিন্তা ও কর্মে ভুল হতে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহর রহমতের দরজা আমাদের জন্য খোলা। আমার অনুরোধ ভালো না লাগলে অথবা বদহজম হলে হেজবুত তাওহীদ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাক। কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু বিদেশি শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অধিকার তাদের নেই। মাঠ ফাঁকা পেয়ে সেলিমের মতো কুলাঙ্গাররা এমাম হয়ে গেছে। আমরা সবাই বলি ইমাম। কিন্তু হেজবুত তাওহীদের লোকেরা তাদের নেতাকে বলে ‘এমাম।’ আমরা নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেই। সবাই আমরা লিখি মুসলমান অথবা মুসলিম। কিন্তু হেজবুত তাওহীদের সব বইপুস্তকে লেখা হয় ‘মোসলেম।’ কেন তারা মুসলমান না লিখে মোসলেম লিখছে জানি না। আসলে মুসলিম হিসেবে পরিচয় না দিয়ে গোলমাল বাধিয়ে তারা প্রমাণ করছে, তারা আসলে মুসলমান নয়। হেজবুত তাওহীদ শুধু আমাদের প্রাণপ্রিয় ধর্ম ইসলমাকে বিকৃত করছে তাই নয়, তারা আমাদের মাতৃভাষাকেও বিকৃত করছে। তাদের ভাগ্য ভালো যে, তাদের ভাষা বিকৃতি আদালতের নজরে আসেনি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আদালতের নজরে এলে হেজবুত তাওহীদ এবং তাদের সব প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে তাদের একটি ভাষা বিকৃতি উল্লেখ করা হলো। ‘দাজ্জাল: ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতা’ শিরোনামে বইয়ের ভূমিকায় হেজবুত তাওহীদের এমাম বায়েজীদ খান পন্নী লিখেছেন, ‘বেসমেল্লাহের রহমানের রহিম। চৌদ্দশ’ বছর থেকে মোসলেম উম্মাহর ঘরে ঘরে দাজ্জাল সম্বন্ধে আলোচনা চোলে আসছে। আল্লাহর শেষ রসুল মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে যেসব কথা বোলে গেছেন, পৃথিবীতে কি কি ঘটনা ঘোটবে সেগুলি সম্বন্ধে আভাষ ও সরাসরি যা জানিয়ে দিয়েছেন সেগুলির মধ্যে দাজ্জাল সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যেমন চিত্তাকর্ষক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বিগ্নকর।’
    হেজবুত তাওহীদের বইপ্স্তুকের সব জায়গায় একই বানান রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। তাদের এসব বানান রীতির উৎস কি জানি না। সংবাদপত্রের কোনো কর্মী কখনো বলবেন না যে, বাংলা ভাষায় এ ধরনের বানান রীতি সিদ্ধ। হেজবুত তাওহীদ ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে জন্ম নেয়া একটি দেশের ভাষার সঙ্গে মস্করা করছে। আলোচ্য বইয়ের ৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বায়েজীদ খান পন্নী দাজ্জাল সম্পর্কে বিশ্বনবীর (সা.) বর্ণনাকে অস্বীকার করে লিখেছেন, ‘মহাশক্তিধর পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতাই হোচ্ছে আল্লাহর রসুল বর্ণিত সেই নির্দিষ্ট দাজ্জাল।’
    হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিমের কাছে জিজ্ঞাস্য, ইসলামের পর্দা প্রথা কি সমকালীন আলেম-ওলামাদের তৈরি নাকি এ বিধান আল্লাহর? পর্দার বিধান যদি আল্লাহর হয়ে থাকে তাহলে রদবদল করার সাধ্য কারো নেই। কিন্তু হেজবুত তাওহীদ কোন সাহসে এবং কোন যুক্তিতে আল্লাহর বিধানকে অমান্য করছে? আমি হেজবুত তাওহীদের বর্তমান এমাম সেলিমকে বলতে শুনেছি, ইসলামে পর্দার নামে নাকি মহিলাদের বাক্সবন্দি করে রাখা হয়েছে। মহিলাদের মনে এমন এক কুমন্ত্রণা ঢুকানো হয়েছে যে, প্রত্যেক মহিলার সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলছে। অনেকের সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। দাড়ি সম্পর্কেও সেলিমের বক্তব্য একই ধরনের। সবাই দাড়ি রাখে না বা রাখতে পারে না। কিন্তু দাড়ি না রাখার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। নিজের দোষ স্বীকার করে নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু সেলিম দাড়ি না রাখার পক্ষে সাফাই গায়।
    বাতেল হেজবুত তাওহীদের আকিদা হচ্ছে সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহির মতো। সম্রাট আকবর দাবি করেননি যে, তার উদ্ভাবিত ধর্ম ইসলাম। তিনি তার ইচ্ছামতো একটি নতুন ধর্ম প্রচার করেন। প্রতিদিন সকালে সম্রাটের দর্শন লাভ করতে হতো। দর্শন লাভে তাকে সেজদা করতে হতো। দাড়ি চেঁছে ফেলতে হতো। দ্বীন-ই-ইলাহিতে আজান দেয়া, গরু জবাই, রোজা ও হজ পালন এবং পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বীন-ই-ইলাহি প্রচারে সম্রাট আকবর লুকোচুরি করেননি। অন্যদিকে হেজবুত তাওহীদ লুকোচুরি করছে। তারা ভেতরে অবস্থান করে ইসলামের ক্ষতি করছে। হেজবুত তাওহীদ তাদের এমামুুজ্জামান বায়েজীদ খান পন্নীকে আল্লাহর আসনে বসিয়েছে। বায়েজীদ খান পন্নীর নিরঙ্কুশ আনুগত্য কামনা করা হচ্ছে। মুসলমান একমাত্র আল্লাহ ও তার রসূলের (সা.) আনুগত্য স্বীকার করতে পারে। অন্য কারো নয়। পীর-ওস্তাদকে আমরা অবশ্য শ্রদ্ধা করবো। কিন্তু আমরা মানুষের নিরঙ্কুশ আনুগত্য স্বীকার করতে পারি না। একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাগরিকদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য কামনা করা হয়। এ অর্থে হেজবুত তাওহীদ নাৎসি ও ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে সমতুল্য। বায়েজীদ খান পন্নী একটি ইসলামি সংগঠনের ইমাম হতে পারেন কিনা তা একটি জিজ্ঞাসা। তাকে দিব্যি বিড়ি টানতে দেখা যাচ্ছে। বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণ করছেন। এমন গাঁজাখোর ইমাম আর দেখিনি। আজ পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় নেতাকে ধূমপান করতে দেখিনি। কারো মুখে শুনিনি। ধর্মীয় নেতা কিংবা ইমাম হলেন পবিত্রতার প্রতীক। তার শুভ্র ব্যক্তিত্বে সবাই বিমোহিত হয়। কিন্তু হেজবুত তাওহীদ এমন এক জিনিস যাদের একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দেখতে ইচ্ছা করে না। তাদেরকে নরকের কীট ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আলেমদের চেহারা হয় নূরানী। তাদের চেহারার দিকে তাকালেই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে। তারা হলেন নায়েবে রসূল, রসূলের ছায়া, রসূলের প্রতিরূপ। আর বায়েজীদ খান পন্নী ও তার জামাতা সেলিম? তাদের দিকে তাকালে বমি আসে। তাদের চেহারায় না আছে মাধুর্য, না আছে সম্মোহনী আকর্ষণ। তারা হলো শয়তানের প্রতিরূপ।
    বায়েজীদ খান পন্নী ১৯৯৫ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়ায় হেজবুত তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেন। পন্নী দাবি করেছেন, ২০০৮ সালের ২ ফেব্র“য়ারি মহান আল্লাহ নাকি ১০ মিনিটে তাকে ৮টি মোজেজা দান করেছেন। নবীদের ক্ষেত্রেও নাকি এরকম হয়নি। পন্নীর মোজেজা প্রাপ্তির দাবি হচ্ছে নবুওয়াত প্রাপ্তির সমতুল্য। ২০১২ সালে পন্নীর মৃত্যুর পর তার মেয়ে জামাতা হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম এমাম হিসেবে সংগঠনের হাল ধরে। বাংলাদেশে সংগঠনটি কালো তালিকাভুক্ত।
    হেজবুত তাওহীদ তাদের অনুসারীদের জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। কাউকে চিকিৎসার অভাবে মরতে না দেয়ার অঙ্গীকার করছে। ভালো কথা। সত্যি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ভাগ্যলিপি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি বলা হয়, জান্নাত প্রাপ্তি এবং রোগ শোকে আর্থিক সুবিধার আশায় কিছু বিভ্রান্ত ও অপরিণামদর্শী লোক হেজবুত তাওহীদের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে তাহলে কি ভুল হবে? জান্নাত কে না চায়। আমরা সবাই চাই। হেজবুত তাওহীদের জাফর আহমদ আমার সঙ্গে করতে এসেছিলেন এ উদ্দেশ্যে। তিনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর আমার একটি পোস্টে আল্লাহর উদ্দেশে আক্ষেপ করে বলেছিলাম, ‘মৃত্যুর পর আল্লাহর দেখা পেলে বলবো, হে মাবুদ তুমি আমাকে কেন বদর উহুদ অথবা কারবালায় শহীদ হওয়ার সুযোগ দিলে না।’
    জাফর আহমদ আমার এ পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘আখেরি নবী বলে গেছেন, আমার উম্মতের একটি দল দুনিয়া থেকে আমার বিদায় নেয়া পরও বদর ও উহুদ-এ দুুটি জিহাদে অংশগ্রহণ না করেও শহীদ হওয়ার মর্যাদা লাভ করতে পারবে। কিন্তু কিভাবে?’ এতটুকু লিখে তিনি বায়েজীদ খান পন্নীর একটি লিঙ্ক দেন এবং আমার সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দেন। আমি জাফর আহমদের মন্তব্যের বিপক্ষে কিছু লিখিনি। আমি অবশ্যই জান্নাতের প্রত্যাশা করি। কিন্তু জাফর আহমদের দেখানো পথে আমি জান্নাতে যেতে পারবো একথা শুরুতেও বিশ্বাস করিনি এবং পরে তো নয়ই। আমি আমার নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করবো। আমি কোথায় যাবো, না যাবো সে সিদ্ধান্ত নেবেন স্বয়ং আল্লাহপাক। কিন্তু হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিম দুনিয়াতে জান্নাত বিলানো শুরু করেছে। যেন সে জান্নাতে পাঠানোর ঠিকাদারি পেয়েছে। আমি বিশ্বাস করি যে, হেজবুত তাওহীদ জান্নাতের পথ প্রদর্শন করতে পারে না। তারা সরলপ্রাণ মানুষকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
    আমি ইউটিউবে হেজবুত তাওহীদের অনেকগুলো ভিডিও দেখেছি। একটি ভিডিওতে এমাম সেলিম ভোলার চর বোরহানুদ্দিনে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনার জন্য আলেম-ওলামাদের দোষারোপ করে। সেলিম একবারও বিশ্বনবী (সা.)কে কটাক্ষ করার নিন্দা করেনি। সেলিম বলছিল, সবাই নাকি তার প্রতিক্রিয়া শোনার অপেক্ষায় ছিল। সে যেদিকে বলতো সেদিকে নাকি ছিল বিপদ। তাই সেলিম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
    ভোলায় বিশ্বনবী (সা.)কে কটাক্ষ করার প্রতিবাদে মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমীর প্রতিক্রিয়ায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি তাকে চিনি না। চেনার দরকারও নেই। চোখ বুজে সাক্ষ্য দেয়া যায় যে, তার মতো রসূল (সা.) দরদী মুসলমান ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১৬ জন আছে কিনা সন্দেহ। মুফতি মাহমুদ কাসেমী যে ভাষায় এবং যে আবেগ দিয়ে ভোলায় মুছল্লি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছেন, হেজবুত তাওহীদ অনুরূপ ভাষায় নিন্দা করলে আমি তাদের প্রশংসা করতাম। আমি হেজবুত তাওহীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। জানি না তাদের হাত পা কার কাছে বাঁধা। আর কিছু না পারলেও তারা দৃশ্যত নিন্দায় অন্যদের সঙ্গে সুর মেলাতে পারতো। কিন্তু তাও করেনি। মনে হয় তাদের আত্মা কারো কাছে বিক্রি। ইসলামের দুশমনদের কাছে আত্মা বিক্রি না হলে মহানবী (সা.)এর অবমাননায় হেজবুত তাওহীদ নীরব থাকতে পারতো না। হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিমের আচরণের সঙ্গে ভানু বন্দোপ্যাধ্যায়ের একটি কৌতুক হুবহু মিলে যায়। কৌতুকটি হলো এরকম। একবার এক মক্কেল উকিলকে বললো, ‘স্যার আপনি চেষ্টা না করলে তো আমার ফাঁসি হয়ে যাবে।’ কিন্তু উকিল কিছুই করেননি। তিনি শুধু তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘আমি আছি না?’ মক্কেলের ফাঁসি হয়ে গেলে সে উকিলের সঙ্গে দেখা করে বললো, ‘স্যার আমার তো সব শেষ। ফাঁসি হয়ে গেছে। এখন কি করবো।’ মক্কেলের কথা শুনে উকিল সাব বললেন, ‘ঝুলে পড়ো। আমি আছি না?’
    হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিমের অবস্থা ছিল এরকম। আমাদের ভাঙ্গাচোরা আলেম সমাজ ভোলায় বিশ্বনবী (সা.)এর অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। রক্ত দিয়েছেন। বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের রায় দানের বিরুদ্ধে লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছেন। আর হেজবুত তাওহীদ? তারা কিছুই করেনি। তারা ইসলামের দুশমনদের পক্ষে অবস্থান নেয়। বিশ্বনবীর (সা.) অবমাননার বিরুদ্ধে নীরব থেকে হেজবুত তাওহীদের কথিত এমাম কিভাবে নিরঙ্কুশ আনুগত্য আশা করতে পারে? জার্মানির হ্যামিলন শহরের বংশীবাদক যে নিকৃষ্ট কাজটি করেছিল, হেজবুত তাওহীদ ঠিক একই ধরনের ঘৃণিত কাছ করছিল। ইঁদুর মারার পারিশ্রমিক না পাওয়ায় বংশীবাদক বাঁশি বাজিয়ে শহরের শিশুদের পাহাড়ের গুহায় নিয়ে মেরে ফেলেছিল। একইভাবে হেজবুত তাওহীদ আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়ার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। তারা আমাদেরকে ইসলামের বাইরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা ইসলামের ভেতর বিভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছো। অনুসারীদের কি চোখ নেই? তারা কি দেখে না যে, কারো সঙ্গে হেজবুত তাওহীদের আচরণ মেলে না? সবাই ভুল। আর হেজবুত তাওহীদ কি একা সঠিক? হেজবুত তাওহীদ সবার মনস্তত্ত্বে এমন একটি ধারণা ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, ইসলাম খারাপ, আমাদের আলেম-ওলামারা খারাপ। এতদিন আলেম-ওলামারা শুধু আমাদের ডুবিয়েছেন। আর আল্লাহপাক আমাদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধারে হেজবুত তাওহীদকে নাজেল করেছেন। একেই বলে, হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। হেজবুত তাওহীদের এমাম সেলিম দিন রাত আলেম-ওলামাদের সমালোচনা করছিল, ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করছিল। তার কি তাদের জুতা বহন করার যোগ্যতা ছিল? তার সাহসের তারিফ করতে হয়। হিমালয় সদৃশ ইসলামি পন্ডিত ও গবেষকদের সমালোচনা করতে তার বিবেকে বাধেনি। কোনো মুসলিম মনীষীর সঙ্গে তার তুলনা হয় না। তার তুলনা হয় বুনো ষাড়ের সঙ্গে। সেলিম নিজেকে একটি দাঁতাল ষাড় ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। অচিরে সেলিম ও তার শ্বশুর বায়েজীদ পন্নী নিক্ষিপ্ত হবে ভন্ডনবী গোলাম আহমদ কাদিয়ানির পাশে।

    (লেখাটি লেখকের ‘জাতীয় ও বহির্বিশ্ব’ বই থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করবে আফসার ব্রাদার্স)

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম