• শিরোনাম


    কুরবানীর ইতিহাস ও বিধি বিধান [] মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

    মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া, অতিথি লেখক | ১৯ জুলাই ২০২০ | ২:০৫ পূর্বাহ্ণ

    কুরবানীর ইতিহাস ও বিধি বিধান  [] মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

    ইসলামের অন্যতম একটি নিদর্শন হচ্ছে- কুরবানী।
    যা সমগ্র মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। যেমন- মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি। যাতে তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর উপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।” (সূরা হজ্জ ৩৪) মানব জাতির সেই কুরবানির বিধানটি অতীব প্রাচীন।

    বস্তুত মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কুরবানি হযরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল এর দেয়া কুরবানি থেকেই কুরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়। যেমন- পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “হে রাসূল আপনি আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানি করেছিল। তাদের একজনের কুরবানি কবুল হলো। অন্যজনের কুরবানি কবুল হলো না।” (সুরা মায়েদা ২৭) অবশ্য আমাদের উপর যে কুরবানির বিধান প্রচলিত হয়ে আসছে তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর রাহে যে কুরবানি করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা দৃষ্টান্তহীন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের কথা। স্বপ্নাদৃষ্ট হলেন আল্লাহর প্রিয় খলিল হযরত ইবরাহীম (আঃ) কুরবানি করতে। তিনি পশু কুরবানি করলেন একটির পর একটি। কিন্তু সে কুরবানি তার প্রতিপালকের নিকট গৃহীত হলো না।
    হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্দেশ পেলেন এমন বস্তু কুরবানি করতে যা তার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কী সেই প্রিয় জিনিস? হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তো স্বীয় পুত্র ইসমাঈল। তবে কি তার মহান প্রভু ইবরাহীম ও হাজেরার পরম আদরের সন্তান ইসমাইল এর কুরবানি চান? আল্লাহর আদেশ ছিল অতি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।



    সন্দেহেরও কোন অবকাশ ছিল না তাতে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্তম্ভিত না হয়ে আল্লাহর আদেশের কথা পুত্র ইসমাইলকে জানালেন। জবাবে পুত্র ইসমাইল বললেন, “হে আমার প্রিয় পিতা, আপনি যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন তা সন্তুষ্টির জন্য আপনি তা পালন করুন। ইনশাল্লাহ্ আপনি আমাকে সবুরকারীদের মধ্যে পাবেন।” (সুরা সাফ্ফাত ১০২) হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ) উভয়েই আল্লাহর হুকুম পালনে অবিচল সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। মা হাজেরাও স্বেচ্ছায় আদরের সন্তানকে সাজিয়ে দিলেন। পিতামাতা পুত্রের আল্লাহর পথের কুরবানির এ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম। বালক ইসমাইলকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) নিয়ে গেলেন মিনায় (বর্তমান হাজীদের কুরবানির স্থান)। যখন প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করতে উদ্যত হলেন সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীদ্বয়ের আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের কুরবানি কবুল করলেন। আনুগত্য ও কর্তব্য পরায়ণতার পুরস্কার স্বরূপ একটি মোটা তাজা পশু (দুম্বা) পাঠিয়ে পুত্রের পরিবর্তে জবাই করার হুকুম প্রদান করলেন।
    বস্তুতঃ ইবরাহীম (আঃ) এর পুত্র কুরবানি দেয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত করে রাখার জন্যই উম্মতে মোহাম্মদীর উপর তা ওয়াজিব করা হয়। সেই থেকে সারা বিশ্বে ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ উদ্যাপিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঈদুল আযহা তথা কুরবানি এক ঐতিহ্যময় স্থান দখল করে আছে।

    কুরবানীর হুকুমঃ
    ইসলামের অন্যতম একটি নিদর্শন হচ্ছে- কুরবানী। কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। কুরবানীর হুকুম সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
    فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ؕ
    কাজিই তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর। (সূরা কাউছার ২ আয়াত৷)
    আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন-
    قُلْ اِنَّ صَلَاتِىْ وَنُسُكِىْ وَ مَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَۙ.
    বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ জগত সমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালারই জন্য৷ (সূরা আনআম ১৬২ আয়াত৷)
    আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন-
    وَلِكُلِّ اُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللّٰهِ عَلٰى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْۢ بَهِيْمَةِ الْاَنْعَامِ ؕ
    আমি প্রত্যেক জাতীর জন্য কুরবানী নির্ধারন করে দিয়েছি৷ যাতে আমি তাদেরকে জাবনোপকরণ স্বরুপ যেসব চতুষ্পদ জন্তুু দিয়েছি, তা যবেহ করার মাধ্যমে যেন আল্লাহর নাম উচ্চারন করে৷ (সুরাহ হজ ৩৪ আয়াত)
    আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন-
    لَنْ يَّنَالَ اللّٰهَ لُحُـوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰـكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْ‌ؕ.
    তোমাদের কুরবানীর পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছেনা৷ বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া৷ (সুরাহ হজ ৩৭ আয়াত)

    ১৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর বিধানঃ
    সামর্থবানদের উপর প্রতি বছর কুরবানী করা ওয়াজিব৷ আর সামর্থ থাকা সত্যেও কুরবানী তরককারী ফাসিক৷ কুরবানী তরক কারীদের কঠোর নিন্দা করে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
    عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ ‏ “‏ مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا ‏”‏ ‏.‏
    হযরত আবু হুরায়রা রাযিঃ থেকে বর্ণিত৷
    হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্তেও কুরবানী করেনা, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। সনদ হাসান৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২৩ হাদীস৷ মুসনাদে আহমাদ ৮০৭৪ হাদীস৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৪৭১ পৃষ্ঠা৷)

    ২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানী যাদের উপর ওয়াজিবঃ
    প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক নেসাবের মালিক মুসলিম নর-নারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব৷ অর্থাৎ যে ব্যক্তি ১০ই যিলহাজ্ব ফযর থেকে ১২ই যিলহাজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে৷
    (সুনানে আবু দাউদ ২৭৮৮ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২৪
    হাদীস৷ আল মুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৷ মাসআলাঃ
    কুরবানী যাদের উপর ওয়াজিব নয়ঃ
    নাবালেগ ও পাগল নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে তাদের অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে থেকে কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৫ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৪৭৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৷ মাসআলাঃ
    মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে যে সকল হাজী মক্কা, মিনা ও মুযদালিফায় কুরবানীর সময় ১৫ দিন থাকবে তারা মুকীম। নেসাবের মালিক হলে হজ্বের কুরবানী ব্যতীত ঈদুল আযহার কুরবানীও তাদের উপর ওয়াজিব হবে৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৮ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ২/১৬৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে মাদানিয়া ৫/৩৪৩ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৷ মাসআলাঃ
    ঋনগ্রস্থ ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়৷ অর্থাৎ যার সম্পদ ও ঋন সমান বা বেশী,তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়৷ তবে কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ (ফতোয়ায়ে ইউনুছিয়া ২/৫৬৩ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৯৬ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৷ মাসআলাঃ
    গরীব মিসকিন বা নেসাবের মালিক নয় এমন ব্যক্তির উপরও কুরবানী ওয়াজিব নয়। তবে তারা কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৬৬৭ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৩৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর নেসাবঃ
    কুরবানীর নেসাব হলো-
    ১৷ সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি স্বর্ণ৷
    ২৷ সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি রূপা৷
    ৩৷ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার যে কোন একটির সমমূল্য পরিমান টাকা৷
    ৪৷ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্য পরিমাণ ব্যবসায়ী পন্য৷
    ৫৷ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্য পরিমাণ প্রয়োজন অতিরিক্ত সম্পদ৷
    উল্লেখিত পাঁচটি সম্পদের প্রত্যেকটিই পরিপূর্ণ নেসাব৷ তবে কারো কাছে যদি উক্ত সম্পদ সমূহের প্রত্যেকটির কিছু করে অংশ থাকে যেমন কিছু স্বর্ণ, কিছু রূপা, কিছু টাকা, কিছু ব্যবসায়ী পন্য এবং কিছু গচ্ছিত সম্পদ, তবে সবগুলো মিলিয়ে যদি রূপার নেসাব পরিমান হয় তাহলে সে নেসাবের মালিক হিসেবে গন্য হবে৷ (তাফসীরে কাবীর ৩২/১৩২ পৃষ্ঠা৷ তাফসীরে রুহুল মায়ানী ১৫/৩১৬ পৃষ্ঠা৷ সহীহু মুসলিম ১/৩১৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৪৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৷ মাসআলাঃ
    শুধু স্বর্ণ ব্যতীত অন্য সকল সূরতেই রূপার নেসাব ধর্তব্য হবে৷ যেমন কারো কাছে দুই ভরি স্বর্ণ ও ১-টাকা রয়েছে৷ শুধু ১-টাকা থাকার কারনে তার নেসাব সোনা থেকে রূপার দিকে পরিবর্তন হবে। কেননা তার মালিকানায় দুই প্রকার সম্পদ জমা হয়েছে। আর এই দুই প্রকার সম্পদের মুল্যমান যেহেতু সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মূল্য থেকে বেশী, তাই সে নেসাবের মালিক বলে গন্য হবে৷ (ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৬৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে শামী ২/২৯৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৷ মাসআলাঃ
    টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসেনা এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়ীক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য হবে।
    (আদ দুররুল মুখতার ৯/৫৫২ পৃষ্ঠা৷)

    ১০৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরী নয়! বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৯৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১১৷ মাসআলাঃ
    হাজাতে আছলিয়ার পরিচয়ঃ
    হাজাতে আছলিয়ার
    পরিচয় হলো- মানুষের জীবন-যাপনে যা অত্যাবশ্যকীয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে যা ব্যবহারে আসে, তাই হাজাতে আছলিয়া বা নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদ৷ আর ব্যক্তি বিশেষে হাজাতে আসলিয়া বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১২৷ মাসআলাঃ
    বসতবাড়ি, ঘরের আসবাবপত্র, পরিধানের কাপড়, ব্যবহারের গাড়ি, রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহৃত হাড়ি-পাতিল, ডেগ ও বাসনপত্র ইত্যাদি হাজাতে আছলিয়া তথা নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের মধ্যে গন্য হবে৷ তবে বড় বড় ডেগ, বড় বড় বিছানা ইত্যাদি যা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার হয়না বরং দু-এক বছরে কখনও অনুষ্ঠানে প্রয়োজন হয়, তা হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবেনা৷
    (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৩৷ মাসআলাঃ
    ঘরে সাজিয়ে রাখা আসবাবপত্র যেমন কাপ-প্রিচ, জগ-গ্লাশ, চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি যা সারা বছরে একবারও ব্যবহার করা হয়না, তাও হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৪৷ মাসআলাঃ
    ঘরের আলমারিতে সাজিয়ে রাখা মহিলাদের শাড়ী, কাপড় ইত্যাদি যা বছরে একবারও ব্যবহার করা হয়না, তাও হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৫৷ মাসআলাঃ
    কারো ৫০ বিঘা জায়গা রয়েছে। এতে চাষাবাদি করে যে ফসল হয়, সবগুলোই তার সংসারে খরচে হয়ে যায়। তাহলে পুরো ৫০ বিঘা জমি তার জন্য হাজাতে আছলিয়া তথা নিত্যপ্রয়োজনীয়। পক্ষান্তরে কারো ১০ বিঘা জায়গা রয়েছে। যার ৮ বিঘার ফসলে তার সংসার চলে যায়৷ তাহলে ২ বিঘা জমি তার জন্য প্রয়োজনতিরিক্ত সম্পদ৷ যা নেসাবের মধ্যে গন্য হবে৷ (আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷)

    ১৬৷ মাসআলাঃ
    কারো ১০-টি বাড়ি রয়েছে। যার ভাড়া দ্বারা সে জীবিকা নির্বাহ করে। সংসার বড় হবার কারনে সকল টাকাই ব্যয় হয়ে যায়৷ তবে ১০টি বাড়ী তার হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবে। পক্ষান্তরে কারো দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। যার একটির ভাড়া দ্বারা তার সংসার ভালভাবে চলে, তবে অন্য ফ্ল্যাটটি তার জন্য প্রয়োজনতিরিক্ত সম্পদ৷ যা নেসাবের মধ্যে গন্য হবে৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৭৷ মাসআলাঃ
    কাজের জন্য চাকর নওকর ও ব্যবহারের যানবাহন৷ যা প্রয়োজনে একাধিকও হতে পারে৷ তা হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবে৷ অনুরুপভাবে
    পেশাজীবীদের পেশার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী যেমন গরু, ট্রাক্টর, লাঙ্গল-জোয়াল, কুদাল ইত্যাদিও হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবে৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৮৷ মাসআলাঃ
    ব্যবহারিক কম্পিউটার, ডেক্সটপ, লেপটপ ইত্যাদি হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবে৷ প্রক্ষান্তরে
    রেডিও-টেলিভিশন, সিডি-বিসিডি ইত্যাদি হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ১৯৷ মাসআলাঃ
    ব্যবহারিক মোবাইল, ঘড়ি, চশমা ইত্যাদি যত দামিই হোক একাধিক হলেও হাজাতে আছলিয়ার মধ্যেই গন্য হবে৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ২০৷ মাসআলাঃ
    আলেম ও তালেবে এলেমের কিতাবাদি যত দামিই হোক না কেন তা হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গন্য হবে। তবে ব্যাবসার জন্য হলে নেসাবের মধ্যে গন্য হবে৷ (ফতোয়ায়ে শামী ৫/১৯৮ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৮৬ পৃষ্ঠা৷)

    ২১৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুঃ
    ছয় প্রকার পশু দ্বারা কুরবানী করা যায়ঃ
    ১৷ উট৷
    ২৷ গরু৷
    ৩৷ মহিষ৷
    ৪৷ ছাগল৷
    ৫৷ ভেড়া৷
    ৬৷ দুম্বা৷
    এছাড়া অন্য কোন পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৮ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫ পৃষ্ঠা৷ আল হিদায়া ৪/১৫০ পৃষ্ঠা৷)

    ২২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর বয়সঃ
    ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স চন্দ্রমাস হিসেবে কমপক্ষে পূর্ন এক বছর হতে হবে। তবে ছয় মাসের ভেড়া ও দুম্বা যদি মোটা-তাজায় দেখতে এক বছরের মতই দেখা যায়, তাহলে কুরবানী সহীহ হবে। তবে ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কুরবানী সহীহ হবেনা৷
    (সুনানে আবু দাউদ ২৭৯৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩৯ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৮ পৃষ্ঠা৷)

    ২৩৷ মাসআলাঃ
    গরু ও মহিষের বয়স চন্দ্রমাস হিসাবে কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। এর কম হলে কুরবানী সহীহ হবেনা।(সুনানে নাসায়ী ৪৩৭৮ হাদীস৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫ পৃষ্ঠা৷)

    ২৪৷ মাসআলাঃ
    উটের বয়স চন্দ্রমাস হিসাবে কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। এর কম হলে কুরবানী সহীহ হবেনা৷ (ইলাউস সুনান ৭/২৪৫ পৃষ্ঠা৷
    ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৮ পৃষ্ঠা৷)

    ২৫৷ মাসআলাঃ
    বিক্রেতা যদি পশুর বয়স পূর্ন হয়েছে বলে সাক্ষ্য দেয় এবং পশুর শারীরীক গঠন দেখেও যদি তেমনই মনে হয়, তবে বিক্রেতার কথার উপর আস্থা রেখে সে পশু ক্রয় করা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা সহীহ হবে। (ফতোয়ায়ে শামী ৫/২২৫ পৃষ্ঠা৷)

    ২৬৷ মাসআলাঃ
    শরীকী কুরবানীঃ
    ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এ তিন প্রকার পশু দ্বারা কেবল একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়৷ এ তিন প্রকার পশুতে শরীকী কুরবনী সহীহ হবেনা৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৫৩ হাদীস৷
    ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০১ পৃষ্ঠা৷)

    ২৭৷ মাসআলাঃ
    উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে, কারো কুরবানী সহীহ হবেনা। তবে সাতের কম জোড় বা বিজোড় যে কোন সংখ্যক যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় শরীক হতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৮ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩২ হাদীস৷
    ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০০ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা৷)

    ২৮৷ মাসআলাঃ
    সাত ভাগে কুরবানী করলে সবার ভাগ সমান হতে হবে। কারো ভাগ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ কারো দেড় ভাগ এমন হলে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা। (খোলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫ পৃষ্ঠা৷
    আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা৷)

    ২৯৷ মাসআলাঃ
    শরীকী কুরবানী করলে, সকলের নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। অন্যথায় যদি কোন শরীকের নিয়ত গলদ থাকে, যেমন লোক দেখানো বা গোশত খাওয়া ইত্যাদি, তবে করো কুরবানী সহীহ হবেনা। তাই শরীক নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৯ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৩০৷ মাসআলাঃ
    কোন শরীকের পূরো বা অধিকাংশ উপর্জন যদি হারাম হয়, অথবা কেউ হারাম উপার্জন দ্বারা শরীক হয়, তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা।
    (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা৷ কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা৷)

    ৩১৷ মাসআলাঃ
    সুদখোর ও ঘোষখোরের সঙ্গে কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে সে যদি হালাল টাকা দিয়ে শরীক হয়, তবে কুরবানী সহীহ হবে৷ (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা৷
    কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা৷)

    ৩২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু ক্রয় করার পুর্বেই অংশীদার নির্দিষ্ট করে নেয়া উচিত৷ তবে ধনী ব্যক্তি পশু ক্রয় করার পরও অংশীদার শরীক করতে পারবে৷ কিন্তু অনুত্তম হবে৷ আর গরীব ব্যক্তি অর্থাৎ তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় সে পশু ক্রয় করার পর কাউকে শরীক করতে পারবে না। তবে পশু ক্রয়ের পুর্বে যদি শরীকের নিয়ত থাকে তাহলে অংশীদার নিতে পারবে৷ (মুয়াত্তা মালিক ১০২৮ হাদীস৷ আল-হিদায়া ৪/৩৭৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৩৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু জবেহ করার পর কাউকে অংশীদার শরীক করা জায়েয হবেনা৷ যদি করে তবে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৪৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পূর্বে কোন শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানীর অনুমতি দেয়, তবে জায়েয হবে। অন্যথায় ঐ শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তার স্থলে অন্য কাউকেও শরীক করতে পারবে। (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫১ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯ পৃষ্ঠা৷

    ৩৫৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর সাথে অন্য ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়ার বিধানঃ
    কুরবানীর পশুতে অন্য নিয়তে যারা শরীক হতে পারবে৷
    ১৷ আকীকার নিয়তে৷
    ২৷ ওলীমার নিয়তে৷
    ৩৷ হজ্বের কুরবানীর নিয়তে৷
    এছাড়া অন্য কোন নিয়তে কুরবানীর পশুতে শরীক হওয়া জায়েয হবেনা৷ (আহসানুল ফতোয়া ৭/৫৩৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৪৯৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে ইউনুছিয়া ২/৫৪৩ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৬৷ মাসআলাঃ
    যেসকল পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হয়নাঃ
    কুরবানীর পশু মোটা-তাজা হওয়া উত্তম৷ এবং সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী।(সুনানে আবু দাউদ ২৭৯২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৩ হাদীস৷ আল-হিদায়া ৪/৪৩১ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৭৷ মাসআলাঃ
    যে পশু এত দূর্বল ও রুগ্ন যে জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেটে যেতে পারেনা, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷)

    ৩৮৷ মাসআলাঃ
    যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে যদি অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে যায় অথবা শিং এখনো উঠেইনি তবে এরুপ পশু দ্বারাও কুরানী সহীহ হবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৪ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৫ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷)

    ৩৯৷ মাসআলাঃ
    যে পশুর দুটি চোঁখই অন্ধ বা একটি চোঁখ পূরো অন্ধ বা একটি চোঁখের তিন ভাগের এক ভাগ কিংবা আরো বেশি দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷
    বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৪০৷ মাসআলাঃ
    যে পশুর কোন দাঁত নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে,খাবার চিবিয়ে খেতে পারে না,এমন পশু দ্বারও কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৩ পৃষ্ঠা৷)

    ৪১৷ মাসআলাঃ
    যে পশুর লেজ, কান বা অন্য কোন অংগের এক তৃতীয়াংশ বা তদপেক্ষা বেশি কেটে গেছে, সে পশু দ্বারাও কুরবানী সহীহ হবেনা। তবে যে পশুর জন্ম থেকেই কান ছোট সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে। আর যে পশুর জন্মগতভাবেই কান নেই, তা দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪২ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৪৯৮ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮২ পৃষ্ঠা৷)

    ৪২৷ মাসআলাঃ
    যে পশু তিন পায়ে ভর দিয়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারেনা বা এক পায়ে কোনরুপ ভর দিতে পারেনা, এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা সহীহ হবেনা। তবে পা দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে যদি চলতে পারে, তবে কুরবানী করা সহীহ হবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৩ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮১ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৩৷ মাসআলাঃ
    যে পশু এমন শুষ্ক যে, তার হাড়ের মগজ শুকিয়ে গেছে, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে হাড়ের মগজ না শুকালে কুরবানী সহীহ হবে।(সুনানে আবু দাউদ ২৮০২ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৪৪ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৪৷ মাসআলাঃ
    যে পশুর এলার্জির কারনে গোশত নষ্ট হয়ে গেছে, সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবেনা।
    তবে গোশত যদি নষ্ট না হয়ে থাকে, তবে কুরবানী সহীহ হবে। (সুনানে নাসায়ী ৪৩৭১ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮০ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৪২ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৫৷ মাসআলাঃ
    গর্ভবতী পশু দ্বারা কুরবানী করা মাকরুহ হবে। তবে কুরবানী সহীহ হবে৷ গর্ভবতী পশু জবাই করার পর যদি বাচ্চা জীবীত পাওয়া যায়, তাহলে সে বাচ্চা জীবীত সদকাহ করে দেয়া উত্তম হবে৷ (ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া ৩/৩৬৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫০ পৃষ্ঠা৷ মালাবুদ্ধা মিনহু ২৭৬ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৬৷ মাসআলাঃ
    কেউ কুরবানীর জন্য ভালো পশু ক্রয় করার পর যদি তাতে এমন দোষ দেখতে পায় যে, যার কারনে কুরবানী সহীহ হবেনা,তবে ঐ পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে না। বরং ভিন্ন একটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা যদি গরীব হয়,তাহলে ঐ ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী সহীহ হবে। (ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷
    খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৭৷ মাসআলাঃ
    পশু জবাই করতে গিয়ে যদি ক্রটিযুক্ত হয়ে পড়ে, যেমন ধরতে বা বাধতে বা শুয়াতে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেল ইত্যাদি তাহলে সে পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে।
    (ফতোয়ায়ে শামী ৫/২৮৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৬ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২৮২ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৮৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের পূর্বে উপকৃত হওয়ার বিধানঃ
    কুরবানীর পশু ক্রয় বা নির্ধারণ করার পর তা থেকে কোনরুপ উপকৃত হওয়া জায়েয হবেনা। যেমন মালামাল বহন করা, হাল চাষ করা, আরোহন করা ইত্যাদি। তবে কেউ যদি কুরবানীর পশু থেকে উপকৃত হয়, তাহলে উপকারের বিনিময় যেমন হাল চাষ বা বোঝা বহনের মূল্য সদকাহ করে দেওয়া ওয়াজিব হবে৷ (মুসনাদে আহমাদ ২/১৪৬ পৃষ্ঠা৷
    ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০০ পৃষ্ঠা৷)

    ৪৯৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর দুধ পান করা মাকরুহ৷ তবে দুধ দোহন না করলে যদি পশুর কষ্ট হয়, তবে দুধ দোহন করে তা সদকাহ করে দিবে৷ আর যদি দুধ দোহন করে নিজে খেয়ে ফেলে,তাহলে তার মূল্য সদকাহ করে দেওয়া মুস্তাহাব হবে৷ (মুসনাদে আহমাদ ২/১৪৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০১ পৃষ্ঠা৷)

    ৫০৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু ক্রয় বা কুরবানীর জন্য নির্ধারন করার পর যদি জবাইয়ের পুর্বেই বাচ্চা প্রসব করে,তবে বাচ্চাটি জীবীত সদকাহ করে দেওয়া ওয়াজিব হবে৷ আর কেউ যদি বাচ্চাকেও জবাই করে ফেলে, তাহলে তার গোশত সদকাহ করা ওয়াজিব হবে৷ কিন্তু এরুপ ক্ষেত্রে জীবীত সদকাহ করাই উত্তম৷ (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০১ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে ইউনুছিয়া ২/৫৩৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৫১৷ মাসআলাঃ
    অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানী করাঃ
    কুরবানী শুধু নিজের পক্ষ থেকে ওয়াজিব হয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তানাদি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পক্ষ থেকে ওয়াজিব হয়না৷
    তবে তাদের পক্ষ থেকে নিজ সম্পদ দ্বারা কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ (সহীহুল বুখারী ১৭০৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২২ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৭৯০ হাদীস৷
    ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০০ পৃষ্ঠা৷)

    ৫২৷ মাসআলাঃ
    একান্নভুক্ত পরিবারে শুধু পরিবার কর্তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে৷ তবে সাবালক ছেলে-মেয়ে বা অন্নান্য সদস্যরা যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয় তাহলে প্রত্যেকের উপর পৃথকভাবে কুরবানী ওয়াজিব হবে। যেমন পিতার জিবদ্দশায় ছেলেরা যদি একই সাথে কারবার করে তবে তাদের সকলের মালকে বন্টন করে যদি প্রত্যেকের ভাগে নিসাব পরিমান সম্পদ হয়, তাহলে প্রত্যেকের উপর পৃথকভাবে কুরবানী ওয়াজিব হবে৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২৫, ৩১৩৫, ৩১৪৭ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৫০৫ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০০ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/২৯২ পৃষ্ঠা৷ আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৬ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৩৷ মাসআলাঃ
    কারো পক্ষ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত ওয়াজিব কুরবানী করলে সহীহ হবেনা। অবশ্য একই পরিবারভুক্ত কোন সদস্য অন্য সদস্যের পক্ষ থেকে তার জ্ঞাতসারে নিয়মিত কুরবানী করলে সহীহ হবে৷ তবে প্রকাশ্যে অনুমতি নেওয়াই উত্তম। (সহীহুল বুখারী ১৭০৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩৩ হাদীস৷ আদ দুররুল মুখতার ৬/৩১৫ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৪৷ মাসআলাঃ
    হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। যেমন হযরত আলী রাযিঃ হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওসিয়ত অনুযায়ী প্রতিবছর তার পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন৷ (সুনানে তিরমিযী ১৪৯৫ হাদীস৷ সুনানে দাউদ ২৭৯০ হাদীস৷ মিশকাতুল মাসাবীহ ১৫৪২ হাদীস৷)

    ৫৫৷ মাসআলাঃ
    ঈছালে সাওয়ারের উদ্দেশ্যে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল কুরবানী করা জায়েয হবে৷ তেমনিভাবে জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও তার ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে নফল কুরবানী করা জায়েয হবে। আর উক্ত কুরবানীর গোশত সকলেই খেতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৭৯০,২৮১০ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৫২১ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫২ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৬৷ মাসআলাঃ
    মৃত ব্যক্তির ওসিয়তকৃত করা কুরবানী ওয়াজিব৷ এবং সে কুরবানীর গোশত গরীব মিসকীনদের মাঝে সদকাহ করে দেওয়াও ওয়াজিব। (মুসনাদে আহমাদ ১/১০৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০৮ পৃষ্ঠা৷ ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫২ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৭৷ মাসআলাঃ
    হজ্বের কুরবানী তথা হাদী নিজ দেশে করা জায়েয হবেনা৷ তবে মুকিম হজিদের ঈদুল আযহার কুরবানী নিজ দেশের বাড়িতে করা জায়েয হবে৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৬৬ হাদীস৷
    সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩৩ হাদীস৷ আহকামুল কুরআন ২/২৫-২৬ পৃষ্ঠা৷ ইলাউস সুনান ১০/৩৪০ পৃষ্ঠা৷ আদ দুররুল মুখতার ৬/৩১৫ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৮৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর সময়ঃ
    যিলহজ্ব মাসের ১০, ১১, ১২ তারিখ এ তিন দিনই কুরবানী করা যায়। অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্ব ঈদের নামাযের পর থেকে ১২ই জিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিবারাত যে কোন সময়ই কুরবানী করা যায়৷ তবে ১ম দিন অর্থাৎ ১০ তারিখে কুরবানী করা সর্বোত্তম। তারপর দ্বিতীয় দিন৷ অতঃপর তৃতীয় দিন।
    (ফতোয়ায়ে তাতার খানিয়া ৩/৩৪৫ পৃষ্ঠা৷
    ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/২৯৬ পৃষ্ঠা৷ আহসানুল ফতোয়া ৭/৫১০ পৃষ্ঠা৷ আল হিদায়া ৪/৩৭৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৫৯৷ মাসআলাঃ
    ঈদের দিন ঈদের নামাযের পর কুরবানী করা ওয়জিব৷ তাই নামাযের পুর্বে কুরবানী করা জায়েয হবেনা৷ তবে কোন ওযরের কারনে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায আদায় করতে না পারে, তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর কুরবানী করা জায়েয হবে৷ (সূরা কাউসার ২ আয়াত৷ সহীহুল বুখারী ৯৮৫, ৫৫৪৬ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫১ হাদীস৷ আদ দুররুল মুখতার ৬/৩১৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৬০৷ মাসআলাঃ
    ঈদের দিন ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানী করলে পুনরায় নামাযের পর কুরবানী করা ওয়াজিব হবে৷ তবে নামাযের পুর্বে যাবাইকৃত পশুটি সাধারণ পশু যাবাহের মত হবে এবং তার গোশত খাওয়া হালাল হবে৷ কিন্তু যেখানে ঈদের নামায ওয়াজিব নয়, সেখানে সুবহে সাদিকের পর থেকেই কুরবানী করা জায়েয হবে৷ (সহীহু বুখারী ৫৫৪৬ হাদীস৷ মুসলিম ৪৯৫৮, ৪৯৫৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৩ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০২ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৪৮৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৬১৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীদাতা ও পশু এক স্থানে থাকা জরুরী নয়। বরং কুরবানীদাতা ভিন্ন দেশেও কুরবানী করতে পারবে। সেক্ষেত্রে পশু যে এলাকায় থাকবে সেই এলাকায় ঈদের নামাযের পরে কুরবানী করতে হবে। এক্ষেত্রে কুবোনীদাতার ঈদের নামাযের সাথে কুরবানীর কোন সম্পর্ক নেই। বরং পশু যে এলাকায় আছে সে এলাকার ঈদের নামাযই ধর্তব্য হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৩ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০২ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৪৯০ পৃষ্ঠা৷)

    ৬২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু জবায়ের বিধানঃ
    কুরবানীর পশুকে দক্ষিন দিকে মাথা দিয়ে কেবলামুখী করে শুয়ানো সুন্নাত। অতঃপর নিম্নের দুআটি পাঠ করা মুস্তাহাব –
    ﺇِﻧِّﻲ ﻭَﺟَّﻬْﺖُ ﻭَﺟْﻬِﻲَ ﻟِﻠَّﺬِﻱ ﻓَﻄَﺮَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﺣَﻨِﻴﻔﺎً ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺸْﺮِﻛِﻴﻦَ . ﺇِﻥَّ ﺻَﻼﺗِﻲ ﻭَﻧُﺴُﻜِﻲ ﻭَﻣَﺤْﻴَﺎﻱَ ﻭَﻣَﻤَﺎﺗِﻲ ﻟِﻠَّﻪِ ﺭَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴﻦَ ﻻ ﺷَﺮِﻳﻚَ ﻟَﻪُ ﻭَﺑِﺬَﻟِﻚَ ﺃُﻣِﺮْﺕُ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﺃَﻭَّﻝُ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻤِﻴﻦَ.
    তারপর “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করা ওয়াজিব৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২১ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৫২১ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৭৯৫, ২৮১০ হাদীস৷ সুনানে দারিমী ১৯৮৪ হাদীস৷ মুসনাদে আহমাদ ১৪৪২৩ হাদীস৷)

    ৬৩৷ মাসআলাঃ
    পশু জবাই করার সময় জবাইকারীর জন্য বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবাই করা ওয়াজিব৷ যিনি জবাই কাজে সাহায্য করবে তার জন্যও বিমমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা ওয়াজিব৷ সুতরাং জবাইকারীর মধ্যে যদি কোন একজন ইচছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ ছেড়ে দেয়, তবে কুরবানী সহীহ হবেনা এবং গোশত খাওয়াও হালাল হবেনা। তবে যারা পশু ধরবে তাদের জন্য বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব৷ (সূরা আনআম ১২১ আয়াত৷ সহীহুল বুখারী ৫৫৬৫ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৪০ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৪৷ মাসআলাঃ
    পশু জবেহের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ তরক করলে কুরবানী সহীহ হবেনা এবং এর গোশত খাওয়াও হালাল হবেনা৷ তবে ভুলে বিসমিল্লাহ ছুটে গেলে কুরবানী সহীহ হবে এবং গোশত খাওয়াও হালাল হবে৷ (সূরা মায়িদা ৩ আয়াত৷ সূরা আনআম ১২১ আয়াত৷ সুনানে আবু দাউদ ২৮১৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৭৩ হাদীস৷ মুয়াত্তা মালিক ১০৩৩ হাদীস৷ আল হিদায়া ৪/১১৯ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২২৭ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৬/২৪১ পৃষ্ঠা৷ জাওয়াহিরুল ফিকাহ ১/৪৫০ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৫৷ মাসআলাঃ
    হলক্ব ও কন্ঠের মধ্যখানে পশু জবাই করা সুন্নত৷ আর জবাইয়ের মধ্যে কমপক্ষে চারটি রগ কাটা ওয়াজিব৷
    ১৷ হলকুম- শ্বাসনালী৷
    ২৷ মারি- খাদ্যনালী৷
    ৩৷ অজীন- রক্তনালী৷
    ৪৷ অদজান- শাহরগ৷
    এই চারটি রগের মধ্য হতে তিনটি রগ কাটলেও কুরবানী সহীহ হবে৷ কিন্তু তিনটি রগের কম কাটলে কুরবানী সহীহ হবেনা এবং গোশত খাওয়াও হালাল হবেনা। (সুনানে আবু দাউদ ২৮২৬ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৩৭ পৃষ্ঠা৷ আল কুদুরী ২/২২৯- ২৩০ পৃষ্ঠা৷ আল হিদায়া ৪/১২৩-১২৪ পৃষ্ঠা৷ মালাবুদ্ধা মিনহু ২৭২ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৬৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু জবেহ করার সময় দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলা মাকরুহে তাহরীমী৷ কেননা তা মুশরিকদের জবেহের সাদৃশ্যতা৷ তবে ছুরি অধিক ধারালো হওয়ার কারনে অনিচ্ছায় মাথা আলাদা হয়ে গেলে মাকরুহ হবেনা৷ (মুয়াত্তা মালিক ১০৩৭ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে তাতার খানিয়া ৩/৩৬৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/২৮৬ পৃষ্ঠা৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৪৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৭৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা সুন্নত। কেননা হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে কুরবানীর পশু জবাই করতেন৷ তাছাড়া ইমাম বুখারী রহিঃ বলেছেনঃ হযরত আবু মুসা আশআরী রাযিঃ তার কন্যাদেরকে কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবাই করতে নির্দেশ দিয়েছেন৷ তাই পুরুষ মহিলা উভয়ের জন্য কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবাই করা সুন্নত৷ তবে নিজে জবাই করতে না পারলে কোন নেককার ব্যক্তির মাধ্যমে জবাই করানো উত্তম৷ আর এক্ষেত্রে কুরবানীদাতার জন্য জবাইস্থলে উপস্থিত থাকা মুস্তাহাব। তবে মহিলাদের পর্দার ব্যঘাত ঘটলে উপস্থিত হওয়া নিষিদ্ধ৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৫৮ হাদীস৷ সহীহু মুসলিম ৪৯৮১ হাদীস৷ সুনানে নাসায়ী ৪৪১৯ হাদীস৷ ফাতহুল বারী ১০/১৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০০ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৮৷ মাসআলাঃ
    জবাই করার নিয়ম জানলে নাবালেগ ছেলে মেয়েও কুরবানীর পশু জবাই করতে পারবে এবং কুরবানীও সহীহ হবে৷ (সহীহুল বুখারী ২৩০৪, ৫৫০১ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৮২ হাদীস৷ আল হিদায়া ৪/১১৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৬৯৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর নিয়ত শুধু কুরবানীদাতার জন্য জরুরী৷ আর নিয়তের জন্য মনের এরাধাই যথেষ্ট৷ সুতরাং জবাইকারীর জন্য কুরবানীর নিয়ত করা বা
    কুরবানী দাতাদের নামের লিষ্ট করা এবং জবেহের পুর্বে সে লিষ্টের নামগুলো উচ্চারন করা বিদআত হবে৷ অতএব তা পরিহার করা উচিত৷ (আল ফিকহুল ইসলামী ৪/৩০০ পৃষ্ঠা৷ আল হিদায়া ৪/১২২ পৃষ্ঠা৷)

    ৭০৷ মাসআলাঃ
    সমাজের সকল কুরবানীর পশু একত্র করে একই স্থানে তথা ঈদগাহে বা মাঠে জবেহ করা মুস্তাহাব৷ কেননা ইসলামী সোনালীযুগে এমনটিই প্রচলিত ছিল৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৫২ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৮১১ হাদীস৷)

    ৭১৷ মাসআলাঃ
    পশু জবাইয়ের পর জান বের হবার পূর্বে চামড়া ছোলা, রগ কাটা, ছুরি দিয়ে গলার হাড্ডিতে আঘাত করা বা অন্য কোন অঙ্গ কাটা ইত্যাদি মাকরূহে তাহরীমী। অতএব তা পরিহার করা উচিত৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৪৯ হাদীস৷ সুনানে নাসায়ী ৪৪০৫ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৭০ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৪০৯ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬০ পৃষ্ঠা৷)

    ৭২৷ মাসআলাঃ
    এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা মাকরুহ৷ কেননা এতে পশুর মনে ভয় ও আতংক সৃষ্টি হয়৷ অনুরুপভাবে পশুর সামনে ছুরি ধার দেয়াও মাকরুহ৷ তাতেও পশুর মনে ভয় ও আতংক সৃষ্টি হয়৷ আর পশুর মনে ভয় ও আতংক সৃষ্টি করতে ইসলাম নিষেধ করেছে৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৪৯ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৭২ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৮১৪ হাদীস৷ সুনানে নাসায়ী ৪৪০৫ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৪৭ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৩৷ মাসআলাঃ
    ধারালো ছুরি দ্বারা পশু জবাই করা সুন্নত৷ আর ভোতা ছুরি দ্বারা পশু জবাই করা মাকরুহ৷ কেননা এতে পশুর কষ্ট হয়৷ আর পশুকে কষ্ট দিতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৪৯ হাদীস৷ সুনানে দাউদ ২৮১৪ হাদীস৷ সুনানে নাসায়ী ৪৪০৫ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৪৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৪৷ মাসআলাঃ
    কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয হবে। বরং এটা জবেহকারীর হকও বটে৷ তবে কুরবানীর গোশত বা পশুর কোনো কিছু দ্বারা পারিশ্রমিক দেওয়া জায়েয হবেনা৷ (সহীহুল বুখারী ১৭১৬ হাদীস৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪ হাদীস৷ আল বাহরুর রায়েক ৮/৩২৬ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৪৯৮ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৫৷ মাসআলাঃ
    কসাই বা গোশত কাটার কাজে সাহায্যকারীকে চামড়া, গোশত, পায়া বা কুরবানীর পশুর অন্য কোন অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবেনা। কেউ দিলে তার মূল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে৷ তবে পূর্ন পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ব্যতীত গোশত বা পশুর অন্য কোন অংশ দেওয়া উত্তম হবে৷ (সহীহুল বুখারী ১৭১৬ হাদীস৷ আহকামুল কুরআন ৩/২৩৭ পৃষ্ঠা৷ আল বাহরুর রায়েক ৮/৩২৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৬৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর গোশতের বিধানঃ
    কুরবানীর গোশত তিনভাগ করা সুন্নত৷
    ১৷ একভাগ নিজের জন্য৷
    ২৷ একভাগ আত্মীয়-সজনের জন্য৷
    ৩৷ একভাগ গরীব-মিসকীনের জন্য৷
    অবশ্য কেউ যদি পুরো গোশত নিজে রাখে বা পুরো গোশত বিলিয়ে দেয় তবে তাও জায়েয হবে। (সূরা হজ্ব ২৮ আয়াত৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০০ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৯৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৭৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। আর কুরবানীর প্রথম দিন সকাল থেকে কোন কিছু না খেয়ে নিজ কুরবানীর গোশত দ্বারা খানা শুরু করা সুন্নাত। হযরত রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর দিন নিজ কুরবানীর গোশত দ্বারা খানা শুরু করতেন। তবে যিলহজ্বের ১১- ১২ তারিখে নিজ কুরবানীর গোশত দ্বারা খানা শুরু করা সুন্নাত নয়। বরং এ সুন্নত কেবল ১০-তারিখের জন্য খাস। (সূরা হজ্ব ২৮ আয়াত৷
    তিরমিযী শরীফ ১/১২০ পৃষ্ঠা৷ আদ দুররুল মুখতার ২/১৭৬ পৃষ্ঠা৷ আল বাহরুর রায়িক ২/১৬৩ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৮৷ মাসআলাঃ
    শরীক হয়ে কুরবানী করলে গোশত অনুমান করে ভাগ করা জায়েয হবেনা। বরং নিক্তি দ্বারা মেপে ভাগ করতে হবে৷ তবে যে ভাগে মাথা,পা ইত্যাদি থাকবে সে ভাগে গোশত কম হলেও সমস্যা হবেনা৷ (আদ দুররুল মুখতার ৬/৩১৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫১ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৯৭ পৃষ্ঠা৷)

    ৭৯৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর গোশত সংরক্ষন করাঃ
    কুরবানীর গোশত সংরক্ষন করা বা শুটকি দিয়ে জমিয়ে রাখা জায়েয হবে। এমনকি ফ্রিজে সংরক্ষন করে সারা বছর খাওয়াও জায়েয হবে৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৯৭ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৯ হাদীস৷ সুনানে তিরমিযী ১৫১১ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৫৭ পৃষ্ঠা৷)

    ৮০৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর গোশত অমুসলিমকে দেয়াঃ
    কুরবানীর গোশত অমুসলিমকে দেওয়া জায়েয হবে৷ বরং ক্ষেত্র বিশেষে দেওয়াটা উত্তমও বটে। তাই প্রতিবেশী হিন্দুদেরকেও কুরবানীর গোশত দেওয়া যাবে৷ (ইলাউস সুনান ১৭/২৫৮ পৃষ্ঠা৷ আল মুহীতুল বুরহানী ৮/৪৬৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০০ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে তাতার খানিয়া ১৭/৪৩৭ পৃষ্ঠা৷)

    ৮১৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর গোশত বিক্রি করাঃ
    কুরবানীর গোশত বিক্রি করা জায়েয হবেনা৷ কেউ বিক্রি করলে তার কুরবানী সহীহ হবেনা৷ (ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৮২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর কোন অংশ কুরবানীদাতার জন্য বিক্রি করা জায়েয হবেনা। কেউ কোন কিছু বিক্রি করলে তার মুল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে। অনুরূপভাবে কুরবানীদাতার নিকট থেকে কুরবানীর পশুর কোন কিছু ক্রয় করাও জায়েয হবেনা৷ অনেক সময় গরীব মিসকীনেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাড় চর্বি ইত্যাদি সংগ্রহ করে। অতঃপর তা বিক্রি করে। তা জায়েয হবে। মোটকথা কুরবানীদাতা কোন কিছু বিক্রি করতে পারবে না। (ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০১ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৩৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর দশটি জিনিস খাওয়া হারামঃ
    ১৷ প্রবাহিত রক্ত৷
    ২৷ প্রস্রাব৷
    ৩৷ পায়খানা৷
    ৪৷ পুলিঙ্গ৷
    ৫৷ স্ত্রীলিঙ্গ৷
    ৬৷ মুত্রথলি৷
    ৭৷ অন্ডোকোষ৷
    ৮৷ রগ৷
    ৯৷ পিত্তি/পিন্ড৷
    ১০৷ মাংসগ্রন্থি/টিউমার৷
    (ইমদাদুল ফতোয়া ৪/১১৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে শামী ৫/২১৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে জামেয়া ৫/২৩৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৫৯ পৃষ্ঠা৷ তাহতাবী ৪/৩৬০ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৪৷ মাসআলাঃ
    সামাজিক গোশতের বিধানঃ
    অনেক সমাজে এরুপ প্রচলন রয়েছে যে, সমাজের প্রতিটি কুরবানীর পশুর গোশতের একতৃতীয়াংশ গোশত সমাজিক গোশত নামে একত্রিত করা হয়৷ অতপর সে গোশত বন্টন করে সমাজভুক্ত সকলকে দেয়া হয়৷ উদ্দেশ্য হলো সমাজের বাতৃত্ববন্ধন ঠিক রাখা৷ এ পদ্ধতি জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত হলো- কুরবানীদাতাগণ যদি কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি ব্যতীত স্বতঃস্ফুর্তভাবেই কুরবানীর এক তৃতীয়াংশ গোশত সামাজিক বন্টনে দিতে রাজি হয়৷ তবে উক্ত পদ্ধতি জায়েয হবে এবং উক্ত সামাজিক গোশত ধনী-গরীব সকলেই নিতে পারবে এবং সকলেই খেতে পারবে৷ কেননা এ গোশত জমা করার পুর্বেই সকলের এরুপ নিয়ত ছিল যে, আমরা সকলেই উক্ত গোশত থেকে কিছু করে অংশ নেবো৷ সুতরাং সামাজিক গোশত সদকাহ বা দান হিসেবে গন্য হবেনা৷ তবে খেয়াল রাখতে হবে মান্নতের কুরবানী এবং মৃত ব্যক্তির ওসীয়তকৃত কুরবানীর গোশত যেন জমা করা না হয়৷ কেননা তা কুরবানীদাতাদের জন্য খাওয়া জায়েয হবেনা৷ আর সামাজিক গোশত বন্টনের পুর্বে কারো জন্য নেয়া জায়েয হবেনা এবং বন্টনের পরেও অন্যের ভাগ থেকে নেয়া জায়েয হবেনা৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৮ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০১ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৫৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে মাদানিয়া ৫/৩৬৫ পৃষ্ঠা৷ খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩২১ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৫৷ মাসআলাঃ
    #কুরবানীর পশুর চামড়ার বিধানঃ
    কুরবানীর পশুর চামড়া পরিশোধন করে নিজে ব্যবহার করা জয়েয হবে৷ তবে কেউ যদি বিক্রি করে তবে তার পুরো মুল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৯৭ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৪৮৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৫/৩০১ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৬৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর চামড়ার মুল্য সদকাহ করার নিয়তে বিক্রি করা জায়েয হবে। তবে নিজে খরচ করার নিয়তে বিক্রি করা জায়েয হবেনা। তবে যে নিয়তেই বিক্রি করুক না কেন সর্বাবস্থায়ই তার মূল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে। সহীহুল বুখারী ১৭০৭ হাদীস৷ সুনানে মাজাহ ৩১৫৭ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৫২ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৭৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর চামড়ার মুল্য হুবহু সদকাহ করা জরুরী। তাই চামড়ার মূল্য নিজ প্রয়োজনে খরচ করে পরে নিজে থেকে দিলে আদায় হবে বটে কিন্তু গোনাহ হবে। (সহীহুল বুখারী ১৭০৭ হাদীস৷ সুনানে মাজাহ ৩১৫৭ হাদীস৷ ইমদাদুল ফতোয়া ৩/৫৫২ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৮৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশুর চামড়া দেহ থেকে আলাদা করার পুর্বে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয হবেনা। সুতরাং এরুপ ক্রয়-বিক্রয় পরিহার করা উচিত৷ (সুনানে তিরমিযী ১২৩০ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে শামী ৭/১৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে আলমগীরী ৩/১৯ পৃষ্ঠা৷)

    ৮৯৷ মাসআলাঃ
    আত্মীয়-স্বজন যদি গরীব হয় তবে তাদেরকে চামড়ার মূল্য দেয়া উত্তম। কেননা তাতে দ্বিগুন সাওয়াব রয়েছে৷
    ১৷ দানের সাওয়াব৷
    ২৷ আত্নীয়তা সম্পর্ক রক্ষার সাওয়াব। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৮৪৪ হাদীস৷ মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৬/৫৪২- ৫৪৬ পৃষ্ঠা৷ বেহেশতী জেওর ৩/২৯৩ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়া ও মাসায়িল ৪/১০০-১০১ পৃষ্ঠা৷)

    ৯০৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর চামড়ার মূল্য এমন দরিদ্র ব্যক্তিকে দেয়া সর্বাধিক উত্তম যে দ্বীনদার বা তালিবুল ইলম৷ কেননা এতে ইলমেদ্বীনের সহযোগীতা করার কারনে সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব রয়েছে৷ যা মৃত্যুর পরেও জারি থাকবে৷ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৭ হাদীস৷ সহীহুল বুখারী ১৭০৭, ১৭১৬ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬১ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৫০২ পৃষ্ঠা৷)

    ৯১৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর চামড়ার মুল্য মাসজিদ-মাদরাসার কাজে ব্যবহার করা বা রাস্তাঘাট নির্মাণ করা কিংবা কোন স্থাপনা তৈরী করা অথবা মাসজিদ মাদরাসার স্টাফদের বেতন দেয়া ইত্যাদি জায়েয হবেনা।
    (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৭ হাদীস৷ সহীহুল বুখারী ১৭০৭, ১৭১৬ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬১ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৫০২ পৃষ্ঠা৷)

    ৯২৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু হারিয়ে গেলে করনীয়ঃ
    কুরবানীর পশু ক্রয় করার পর যদি হারিয়ে যায় বা মারা যায় কিংবা চুরি হয়ে যায়, তবে কুরবানীদাতা ধনী হলে অর্থাৎ তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হলে আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব হবে৷ আর কুরবানীদাতা গরীব হলে আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব হবেনা।(সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪ পৃষ্ঠা৷ খোলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৩৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর পশু হারানো বা চোরি হওয়ার পর আরেকটি পশু ক্রয় করার পর যদি হারানো পশুটিও পাওয়া যায় তবে কুরবানীদাতা গরীব হলে তথা যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় তার জন্য দুটো পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। আর ধনী হলে যে কোনো একটি পশু কুরবানী করলেই যথেষ্ট হবে। তবে উভয়টি কুরবানী করা উত্তম। (সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪ পৃষ্ঠা৷ ইলাউস সুনান ১৭/২৮০ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৭ পৃষ্ঠা৷

    ৯৪৷ মাসআলাঃ
    কুরবানী না করে মূল্য সদকাহ করার বিধানঃ
    অনেকে এরুপ ধারনা রাখে যে, কুরবানীর দিন এতো পশু কুরবানী না করে এর মূল্য গরীবদের মাঝে দান করে দিলে তো গরীবদের বেশী ফায়দা হবে৷ তাদের এ ধ্যান ধারনা গর্হিত৷ কেননা কুরবানীর বিধানদাতা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা৷ আর আল্লাহর বিধানে ক্ষুদ তালাশ করা কুফরী৷ সুতরাং এরুপ মনোভাব পরিহার করা উচিত৷ (আদ দুররুল মুখতার ৬/২২৫ পৃষ্ঠা আল কুদুরী ২/২৩৫- ২৩৭ পৃষ্ঠা৷ আল হিদায়া ৪/৪৪৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৫০০ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৫৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর কাযাঃ
    কারো উপর কুরবানী ওয়াজিব হওয়া সত্যেও যদি কোন কারণবশতঃ কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী করতে না পারে, তবে তার জন্য কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগল/ভেড়া বা গরুর একসপ্তমাংশ কিংবা তার মূল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে৷
    আর কেউ পশু ক্রয় করার পরও যদি কুরবানী করতে না পারে, তবে তার জন্য ঐ পশুটিই জীবীত সদকাহ করা ওয়াজিব হবে। (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬৮ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৬৷ মাসআলাঃ
    কেউ কুরবানীর দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর যদি পশু জবাই করে, তবে পুরো গোশত সদকাহ করে দেওয়া ওয়াজিব হবে। তবে এক্ষেত্রে যদি গোশতের মুল্য জীবীত পশুর থেকে কমে যায়, তবে ঐ হ্রাসকৃত মুল্যও সদকাহ করা ওয়াজিব হবে। (আদ দুররুল মুখতার ৬ /৩২০ পৃষ্ঠা৷ আশরাফুল হিদায়া ৯/৪৯৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৭৷ মাসআলাঃ
    কারো যদি কয়েক বছরের কুরবানী কাযা হয়ে থাকে, তবে প্রতি বছরের জন্য একটি ছাগল বা উহার মূল্য সদকাহ করা ওয়াজিব হবে৷ (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৫ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ১/৩৬৮ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৮৷ মাসআলাঃ
    হাস মুরগী কুরবানী করাঃ
    কোনো কোনো এলাকায় কুরবানীর দিন দরিদ্রদের মাঝে হাস মুরগী কুরবানীর প্রচলন রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ নাজায়েয ও বিদআত। তবে কুরবানীর নিয়ত ব্যতীত হাস-মুরগী বা অন্য কোন প্রাণী জবাই করা জায়েয হবে৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৯ হাদীস৷ সহীহু মুসলিম ৪৯৬৪ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৫৪ হাদীস৷ মুসনাদে আহমাদ ২০২১০ হাদীস৷ খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৪ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে বাযযাযিয়া ৬/২৯০ পৃষ্ঠা৷)

    ৯৯৷ মাসআলাঃ
    কুরবানীর দিন সমূহে কুরবানী ব্যতীত গরু ছাগল ইত্যাদি জবাই করা জায়েয হবে৷ তবে ১০ই জিলহজ্ব ঈদের নামাযের পুর্বে জবেহ করা মাকরুহ হবে৷ কেননা তা কুরবানীর সাদৃশ্যতা হওয়ায় ধোকার আশংকা রয়েছে৷ (সহীহু মুসলিম ৪৯৬৩ হাদীস৷ সুনানে আবু দাউদ ২৮০০ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে বাযযাযিয়া ৬/২৯০ পৃষ্ঠা৷ খুলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৪ পৃষ্ঠা৷)

    ১০০৷ মাসআলাঃ
    ঈদের দিন অর্ধবেলা রোযাঃ
    অনেক এলাকায় ঈদের দিন পশু জবেহের আগ পর্যন্ত রোযা রাখার প্রচলন রয়েছে৷ অথচ শরীয়তে দিনের অংশ বিশেষে রোযা রাখার কোন বিধান নেই৷ সুতরাং তা বিদআত৷ তাছাড়া শরীয়তের বিধান হলো ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম৷ (সুনানে আবু দাউদ ২৪১৬, ২৪১৮ হাদীস৷ সুনানে নাসায়ী ২৩৭৩, ২২৫৭ হাদীস৷ মুসতাদরাকে হাকীম ১১২৭ হাদীস৷ তিরমিযী শরীফ ১/১২০ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ১/৩২৪ পৃষ্ঠা৷ আল বাহরুর রায়িক ২/১৬৩ পৃষ্ঠা৷)
    ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻋﻠﻢ ﺑﺎﻟﺼﻮﺍﺏ .

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আওয়ারকণ্ঠ২৪.কম